অসম্পূর্ণ তদন্ত রিপোর্টে যা আছে

জিয়া হত্যার ষড়যন্ত্র উদ্ঘাটনে কমিশন হোক

জিয়া হত্যার ষড়যন্ত্র উদ্ঘাটনে কমিশন হোক

“রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৮১ সালের ৩০ মে ভোর পৌনে ৪টার দিকে চট্টগ্রামের যে সার্কিট হাউসে অবস্থান করছিলেন, সেখানে কমান্ডো কায়দায় হামলা চালানো হয়। হামলাকারীরা পরপর দুটি রকেট ছোড়ে এবং কয়েকটি গ্রেনেড বিস্ফোরণ ঘটায়। দুটি রকেটই নিচতলার সেই কক্ষে আঘাত হানে, যার ঠিক ওপরের কক্ষে জিয়াউর রহমান অবস্থান করছিলেন। রকেট হামলার পর শুরু হয় তীব্র গোলাগুলি। হামলাকারীদের কয়েকজন দ্রুত মূল সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠে যায়, আর বাকিরা ভবনের পূর্বপাশের পেছনের সিঁড়ি ব্যবহার করে।

রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান তার কক্ষের পূর্বপাশের দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এসে বলেন, ‘তোমরা কী চাও?’ প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে অনুপ্রবেশকারীরা স্টেন মেশিনগান থেকে গুলিবর্ষণ করে তার শরীর ঝাঁজরা করে দেয় এবং রাষ্ট্রপতি মেঝেতে লুটিয়ে পড়েন। যে বীর যোদ্ধা তার মানুষ ও দেশকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসতেন, তার সেই বলিষ্ঠ কণ্ঠ চিরতরে স্তব্ধ হয়ে যায়।”

বিজ্ঞাপন

আজ থেকে ৪৫ বছর আগে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে বিপথগামী সেনাদের হাতে নৃশংসভাবে নিহত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের বিচার বিভাগীয় তদন্ত রিপোর্টে এই বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। তদন্ত রিপোর্টটি এত দিন আলোর মুখ দেখেনি।

তদন্ত রিপোর্টটিতে বলা হয়, ‘রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের গুলিবিদ্ধ মরদেহের ময়নাতদন্তে তার শরীরে পৃথক ২০টি গুলির ক্ষত পাওয়া যায়। রাষ্ট্রপতির মুখে বেশ কয়েকটি গুলি লেগেছিল। তার নিচের চোয়ালের হাড় টুকরো টুকরো এবং ঘাড়ের সব গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সম্পূর্ণ ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল। খুব কাছ থেকে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের গুলির কারণে এমনটি হয়েছিল। তার বুক ও পেটে প্রায় ১০টি গুলির ক্ষত, ডান হাতে দুটি, নাভির নিচে একটি এবং দুই পায়ের বিভিন্ন স্থানে কয়েকটি ক্ষত ছিল।’

কমিশন প্রমাণ পায় সেদিনের হামলায় বিদ্রোহীদের মাত্র ১৪ থেকে ১৫ কর্মকর্তা অংশ নেয়। চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নিরাপত্তাব্যবস্থা এতটাই শিথিল ছিল যে, সেখানে ব্যাপক অস্ত্রসজ্জা থাকা সত্ত্বেও হত্যাকারীরা প্রায় বিনা বাধায় তাদের উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করতে পেরেছিল। হামলাকারীদের বিরুদ্ধে সেদিন কার্যত কোনো প্রতিরোধই গড়ে তোলা যায়নি; তাদের জন্য পুরো ঘটনাটিই ছিল জুলিয়াস সিজারের বিখ্যাত উক্তি ‘ভিনি, ভিডি, ভিচি’-এর মতো, যার অর্থ এলাম, দেখলাম, জয় করলাম।

রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার সময় চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক ছিলেন জিয়াউদ্দিন এম চৌধুরী, যিনি হত্যাকাণ্ডের পরপরই সার্কিট হাউসে গিয়ে জিয়াউর রহমানের ক্ষতবিক্ষত লাশ যারা দেখেছিলেন তাদের একজন। গত বছরের ২৪ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্রের মেরিল্যান্ডের পটোম্যাক শহরের বাসায় গিয়ে এই চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে আমি তার সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছিলাম, যা আমার দেশ-এ ৫ ও ৬ নভেম্বর ২০২৫ ছাপা হয়। তিনি আমাকে জানিয়েছিলেন, রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পর সামরিক তদন্ত ও বিচার বিভাগীয় তদন্ত হয়েছে। সামরিক তদন্তের পর দায়ীদের কোর্ট মার্শালে বিচার হয়। মামলায় ৩৩ সেনা অফিসারের মধ্যে ১৩ জনকে ফাঁসির দণ্ড এবং ৮ জনকে দেওয়া হয় বিভিন্ন মেয়াদে দণ্ড। তবে বিচার বিভাগীয় তদন্তের রিপোর্ট আলোর মুখ দেখেনি। তদন্ত রিপোর্টটি তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আব্দুস সাত্তারের কাছে জমা দেওয়া হয়েছিল। তিনি সাক্ষাৎকারে আমাকে এও বলেছিলেন, বিচার বিভাগীয় ওই রিপোর্টটি প্রকাশ করা উচিত। তাছাড়া জিয়াউদ্দিন এম চৌধুরী আমাকে জোর দিয়ে বলেছিলেন, দেশকে, মানুষকে সত্য জানানোর প্রয়োজনেই রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের আসল রহস্য উন্মোচিত হওয়া উচিত ছিল, যা গত ৪৫ বছরে উদঘাটিত হয়নি। তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট কেনেডি হত্যার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বলেছিলেন, কেনেডি হত্যার পর গঠিত হয়েছিল বিচারপতি ওয়ারেন কমিশন, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল হত্যাকারীদের সঙ্গে আর কেউ জড়িত ছিল কি নাÑএর পেছনে ষড়যন্ত্র ছিল কি নাÑকাদের ষড়যন্ত্র ছিলÑসেই সত্য উদঘাটন করা। জিয়া হত্যার ক্ষেত্রেও সত্য উদঘাটনের প্রয়োজনে আরেকটি কমিশন হওয়া উচিত, যারা এই হত্যার প্রকৃত ষড়যন্ত্র উদঘাটন করবেন।

সম্প্রতি রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামি মেজর (অব.) মো. মোজাফফর হোসেনকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বনানীর ডিওএইচএস থেকে গ্রেপ্তার করে। তার গ্রেপ্তারের পর জিয়াউর রহমান হত্যার বিষয়টি আবার আলোচনায় আসে। এরই মধ্যে সহযোগী ডেইলি স্টার জিয়া হত্যার বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশনের রিপোর্টটি প্রকাশ করে, যা এত দিন আলোর মুখ দেখেনি। ওই তদন্ত রিপোর্টেও মেজর (অব.) মোজাফফরের প্রসঙ্গ উল্লেখ রয়েছে।

তদন্ত কমিশন ও তাদের কর্মপরিধি

১৯৮১ সালের ৩০ মে ভোরে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে বিপথগামী কিছু সেনা কর্মকর্তার হাতে জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার ঘটনা তদন্ত করে রিপোর্ট দেওয়ার জন্য তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আব্দুস সাত্তার ১৯৮১ সালের ৬ জুন একটি তদন্ত কমিশন গঠন করে। সাবেক প্রধান বিচারপতি রুহুল ইসলামের নেতৃত্বে এই কমিশনের সদস্য ছিলেন বিচারপতি আবু তাহের মোহাম্মদ আফজাল (যিনি এটিএম আফজাল নামে পরিচিত এবং তিনি পরে প্রধান বিচারপতি হন) এবং খুলনার জেলা ও দায়রা জজ সৈয়দ সিরাজ উদ্দিন আহমেদ। কমিশন ২৫ জুন ১৯৮১ সালে কাজ শুরু করে। তারা যে ভবনে কাজ শুরু করে, সেটি গণভবন হয়।

প্রাথমিকভাবে তদন্ত কমিশনের কার্যপরিধির মধ্যে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ড কোনো ষড়যন্ত্রের ফল ছিল কি নাÑতা তদন্তের দায়িত্ব অন্তর্ভুক্ত ছিল। এতে বলা হয়েছিল, ষড়যন্ত্র হয়ে থাকলে এর সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত, তাদের উদ্দেশ্য কী ছিল, তা জানা, পরিকল্পনা উদঘাটন এবং কীভাবে তা সংগঠিত ও বাস্তবায়ন করা হয়েছিল, সেটিও তদন্ত করতে বলা হয়েছিল। একই সঙ্গে এই ষড়যন্ত্রে যারা সমর্থন বা সহায়তা করেছিলেন, তাদের শনাক্ত করে সম্পৃক্ততার ধরন ও মাত্রা নিরূপণেরও দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল কমিশনকে। তবে তদন্ত কমিশন যে তদন্ত রিপোর্ট ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির কাছে জমা দেয়, তাতে উল্লেখ করা হয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পরে ষড়যন্ত্র উদঘাটনের বিষয়টিকে কমিশনের কার্যপরিধি থেকে বাদ দেয় একটি প্রজ্ঞাপন জারির মাধ্যমে। প্রজ্ঞাপনটি হচ্ছেÑস্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় (পুলিশ শাখা-৪) ১৯৮১ সালের ১৩ জুনের প্রজ্ঞাপন নম্বর ৩৬৫-৬/১০৬/৮১-পি ১ (৪)-এর মাধ্যমে ২ নম্বর অনুচ্ছেদের (র) দফা বাদ দিয়ে সংশোধন করা হয়। ওই প্রজ্ঞাপনের পর তদন্ত কমিশনের কার্যপরিধি দাঁড়ায় সার্কিট হাউসে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য কী ব্যবস্থা ছিল, কোথায় ঘাটতি ছিল, তা মূল্যায়ন করা। কমিশন রাষ্ট্রপতির নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তি, বিভাগ ও সংস্থার কোনো ব্যর্থতা ছিল কি না, জিয়াউর রহমানের লাশ কেন নিরাপদ হেফাজতে নেওয়া হয়নি, হামলাকারীরা কীভাবে জিয়াউর রহমানের লাশ সরিয়ে ফেলে, অপরাধীদের আত্মসমর্পণ পর্যন্ত পুলিশসহ বেসামরিক প্রশাসনের কর্মকর্তাদের ভূমিকাও তদন্ত করে। চট্টগ্রামের তৎকালীন জেলা প্রশাসকের সাক্ষাৎকার এবং অন্যান্য তথ্যপ্রমাণ ও অনুসন্ধানে জানা যায়, তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল এরশাদের হস্তক্ষেপেই তদন্ত কমিশনের কার্যপরিধি থেকে জিয়াউর রহমান হত্যার ষড়যন্ত্র উদঘাটনের বিষয়টি বাদ দেওয়া হয়। তদন্ত কমিশন যে কার্যপরিধি দিয়ে তদন্ত কার্যক্রম চালায়, তাতে তারা তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল এরশাদসহ ৬২ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ করে।

সামরিক একান্ত সচিব লে. কর্নেল মাহফুজের বিশ্বাসঘাতকতা

আমাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে চট্টগ্রামের তৎকালীন জেলা প্রশাসক জিয়াউদ্দিন এম চৌধুরী জিয়া হত্যার সঙ্গে তার সামরিক একান্ত সচিব লে. কর্নেল মাহফুজের সম্পৃক্ততার কথা জোরালোভাবে বলেছিলেন। তার কথা সাংবাদিক অ্যান্থনি মাসকারেনহাস তার ‘অ্যা লিগেসি অব ব্লাড’ বইয়েও উল্লেখ করেছেন। বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশনের যে রিপোর্ট সদ্য প্রকাশিত হয়েছে, সেখানেও লে. কর্নেল মাহফুজকে হত্যাকাণ্ডে জড়িত অন্যতম ব্যক্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সামরিক আদালতে দোষী সাব্যস্ত হয়েছিলেন লে. কর্নেল মাহফুজ এবং তাকে বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশনের রিপোর্ট জমা দেওয়ার আগেই ৩ সেপ্টেম্বর ১৯৮১ সালে ফাঁসি দেওয়া হয়। তার অন্যতম সহযোগী রাষ্ট্রপতি জিয়ার এডিসি ক্যাপ্টেন মাজহারুল হক এবং আরেক সেনা কর্মকর্তা মেজর মুজিবুর রহমানকেও একই দিন ফাঁসি দেওয়া হয়।

এ প্রসঙ্গে তদন্ত কমিশনের রিপোর্টে বলা হয়, ‘আমাদের এ কথা বিশ্বাস করার যথেষ্ট প্রমাণ পেয়েছি যে, সার্কিট হাউসে শহীদ রাষ্ট্রপতির ব্যক্তিগত কর্মকর্তাদের এক বা একাধিক ব্যক্তির কারণে তার নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়েছিল।’ হত্যাকাণ্ডের রাতে লে. কর্নেল মাহফুজ সার্কিট হাউসে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কক্ষের পূর্বপাশের একটি কক্ষে ছিলেন। কমিশনের কাছে ক্যাপ্টেন হকের বক্তব্য অনুযায়ী, গোলাগুলি পুরোপুরি থেমে যাওয়ার পর তিনি নিজের কক্ষ থেকে বের হয়ে দক্ষিণের বারান্দা দিয়ে ৪ নম্বর কক্ষÑঅর্থাৎ যে ঘরে রাষ্ট্রপতি ছিলেন সেই ঘরের দিকে এগিয়ে যান। এ সময় তিনি বারান্দার অপর প্রান্ত থেকে লে. কর্নেল মাহফুজকে আসতে দেখেন। মাহফুজ ক্যাপ্টেন মাজহারুল হককে বলেন, সবকিছু শেষ হয়ে গেছে। তারা ৪ নম্বর কক্ষের সামনে রক্তের মধ্যে রাষ্ট্রপতিকে মৃত অবস্থায় দেখেন। সেখানে রাষ্ট্রপতির প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তা লে. কর্নেল এ এফ এম মঈনুল আহসান এবং পিজিআরের ক্যাপ্টেন আশরাফুল হাফিজ খানের লাশও দেখতে পান। এই কর্মকর্তা ঘটনাস্থলে নিহত হলেও কর্নেল মাহফুজ একই অবস্থায় থেকে কীভাবে বেঁচে গেলেন এবং তার শরীরে সামান্য আঁচড়ও লাগেনিÑপ্রশ্ন তোলে কমিশন।

তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, হত্যাকাণ্ড চালিয়ে হত্যাকারীরা চলে যাওয়ার বেশ কিছুক্ষণ পর একজন ওয়্যারলেস অপারেটর দরজায় কড়া নাড়ার আগ পর্যন্ত লে. কর্নেল মাহফুজ ও এডিসি ক্যাপ্টেন মাজহার কেউই নিজ নিজ কক্ষ থেকে বের হননি। দেখা গেছে, এই দুই সেনা কর্মকর্তা নিজ নিজ কক্ষে টেলিফোন নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। দীর্ঘসময় তারা বাইরে বের হওয়ার তাগিদই অনুভব করেননি।

এডিসি মাজহার সম্পর্কে রিপোর্টে বলা হয়, তার কক্ষের সঙ্গে রাষ্ট্রপতির কক্ষের একটি সংযোগ দরজা ছিল। কিন্তু গোলাগুলির সময় তিনি সেটি খোলার চেষ্টা করেননি। ঘটনার সময় ওই দরজা দিয়ে রাষ্ট্রপতির কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করাই ছিল এডিসির জন্য সবচেয়ে সহজ কাজ। হত্যাকারীরা যখন রাষ্ট্রপতির কক্ষের দরজায় আঘাত করছিল, তখন তাকে বের করে আনার সম্ভাব্য পথগুলোর একটি ছিল এডিসির কক্ষ। সংযোগ দরজা দিয়ে রাষ্ট্রপতিকে বের করে আনতে পারলে অন্তত কিছু সময়ের জন্য হলেও একঝাঁক গুলি থেকে তিনি রক্ষা পেতেন। কিন্তু এডিসি তা করেননি।

নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা ব্যর্থতা

বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশনের রিপোর্টে বলা হয়, রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ড ছিল নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা ব্যবস্থার চরম ব্যর্থতার ফল। কমিশনের এই সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে কোনো দ্বিধা নেই যে, চট্টগ্রামের তৎকালীন জিওসি মেজর জেনারেল আবুল মঞ্জুরের ষড়যন্ত্র এবং বিশেষ করে ঘটনার দিন তা বাস্তবায়নের পরিকল্পনা সম্পর্কে আগাম সতর্ক করতে রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ব্যর্থতাই ছিল রাষ্ট্রপতির ব্যক্তিগত নিরাপত্তাকে মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে ফেলার প্রধান কারণ, যা শেষ পর্যন্ত মর্মান্তিক পরিস্থিতিতে তার প্রাণহানি ঘটায়।

দেশের প্রধান দুই গোয়েন্দা সংস্থাই কমিশনকে জানায় যে, তারা চট্টগ্রামের জিওসি মেজর জেনারেল মঞ্জুরের বিদ্রোহী প্রবণতা সম্পর্কে আগেই রাষ্ট্রপতিকে সতর্ক করেছিল। কিন্তু রাষ্ট্রপতি বিষয়টি আমলে নেননি। তবে এ সতর্কবার্তা আগের। ঘটনার আগের দিন কিংবা রাষ্ট্রপতি চট্টগ্রামে আসার পর যে এমন ঘটনা ঘটবে, তা গোয়েন্দা সংস্থাগুলো জানায়নি। ঘটনার রাতে দেড়টায় হামলাকারী দলটি গঠন করা হয়।

সার্কিট হাউস পরিস্থিতি ও লাশ লুকিয়ে ফেলা

১৯৮১ সালের ৩০ মে ভোর থেকে ১ জুন ভোররাত পর্যন্ত চট্টগ্রাম শহর অবরুদ্ধ অবস্থায় ছিল। ঘটনার রাতে ঝড়বৃষ্টি হচ্ছিল। মধ্যরাতের পর অন্তত একটি ব্যক্তিগত গাড়ি কোনো ধরনের তল্লাশি ছাড়াই সার্কিট হাউসের মূল ফটক দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করেছিল এবং সারারাত মূল ফটক পুরোপুরি খোলা ছিল। রাতে সার্কিট হাউসের প্রধান লোহার ফটক খোলা রাখা ছিল একটি বড় ভুল। পুরোপুরি খোলা ফটকটিই যে বড় ধরনের নিরাপত্তাঝুঁকি, তা কারো মাথায় আসেনি দেখে কমিশন বিস্ময় প্রকাশ করে। ফটকটি বন্ধ না রাখার কোনো কারণই ছিল না। যানবাহনগুলো কোনো বাধা ছাড়াই সার্কিট হাউস পোর্টিকার কাছে এসে পৌঁছায়। হামলাকারীরা ভোর পৌনে ৪টায় গুলি চালাতে দ্রুত গাড়ি থেকে নেমে পড়ে এবং তাদের কয়েকজন কোনো ধরনের বাধা বা প্রতিবন্ধকতা ছাড়াই মূল সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠে যায়, সেখানে রাষ্ট্রপতি জিয়া অবস্থান করছিলেন ৪ নম্বর কক্ষে। প্রহরীদের হাতে বিদ্রোহী বিপথগামীদের একজনও আহত না হওয়ার বিষয়টিও কমিশনকে বিস্মিত করেছে। হামলার সময় দায়িত্বরত পুলিশ বিভিন্ন অস্ত্র থেকে ২০০ রাউন্ড গুলি ছোড়ার কথা বলা হলেও এ বিষয়ে কমিশনের কোনো সন্দেহ নেই যে, এই ২০০ রাউন্ড গুলির বেশির ভাগই এলোপাতাড়ি এবং খুব সম্ভবত অনুপ্রবেশকারীরা চলে যাওয়ার পরই এসব গুলি ছোড়া হয়েছিল। পুলিশ কর্মকর্তা কমিশনকে জানান, হামলাকারীদের উন্নতমানের অস্ত্রের বিপরীতে পুলিশ বাহিনীর হাতে থাকা অস্ত্রগুলো ছিল বেশ পুরোনো এবং হামলা প্রতিহত করার ক্ষেত্রে সেগুলো কাজে আসেনি। এ যুক্তি মেনে নেওয়া কঠিন। এটি সত্য, বাইরে থেকে হামলা শুরু হয়েছিল হ্যান্ড লাঞ্চার দিয়ে সার্কিট হাউসে রকেট নিক্ষেপ এবং জিএফ রাইফেল থেকে গ্রেনেড ছোড়ার মাধ্যমে। কিন্তু ভবনের ভেতর হামলা চালানো হয়েছিল এসএমজি দিয়ে। পুলিশের হেড কনস্টেবল ও প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্টের প্রহরীদের কাছেও একই অস্ত্রÑঅর্থাৎ এসএমজি ছিল। কমিশন মনে করে, সামান্য দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়ে সিঁড়ির মধ্যে কয়েকজন প্রহরী মোতায়েন করা হলে কৌশলগত সুবিধা কাজে লাগিয়ে সার্কিট হাউসের দোতলা যথেষ্ট ভালোভাবে সুরক্ষিত রাখা সম্ভব ছিল। আসলে হামলাকারীদের বিরুদ্ধে কার্যত কোনো প্রতিরোধই গড়ে তোলা হয়নি।

হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হওয়ার পর সকাল সাড়ে ৮টায় দুটি সামরিক জিপ ও অস্ত্রসজ্জিত একটি ভ্যান সার্কিট হাউসে পৌঁছে। সেখান থেকে তিনজন মেজর ও ১০-১৫ জন সিপাহি নেমে লাশ পাহারারত দুই এনএসআই কর্মকর্তার মুখোমুখি হন এবং রাষ্ট্রপতির গোপন নথিপত্র, ব্রিফকেস বিষয়ে জানতে চান। তারা দোতলায় উঠে রাষ্ট্রপতির ব্যক্তিগত জিনিসপত্র সুটকেসে রেখে তা নিচে নামিয়ে আনেন। হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত মেজর মোজাফফরও ওই দলে ছিল। এরা কয়েকজন সিপাহির সহযোগিতায় রাষ্ট্রপতি জিয়া ও দুই নিহত কর্মকর্তার লাশ নিচে নামিয়ে আনে। বিদ্রোহীরা একসময় রাষ্ট্রপতির লাশ নিয়ে যায় এবং অজ্ঞাত স্থানে দাফন করে। লাশ বিপথগামীরা নিয়ে যাওয়ার পর স্থানীয় কর্তৃপক্ষের কাছে কোনো তথ্যই ছিল না, সেটি কোথায় নেওয়া হয়েছে বা কোথায় সমাহিত করা হয়েছে। ১ জুন ১৯৮১ সালে বিদ্রোহী সরকারের পতনের পর চট্টগ্রাম সেনানিবাসের ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট সেন্টারের কমান্ডিং অফিসার ব্রিগেডিয়ার আজিজুল ইসলাম রাষ্ট্রপতির লাশের সন্ধান শুরু করেন। তিনি জানতে পারেন কাপ্তাই সড়কের কোথাও লাশ দাফন করা হয়েছে। এরপর চট্টগ্রামে বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমির কমান্ড্যান্ট ব্রিগেডিয়ার হান্নান শাহ, পুলিশ ও এনএসআই সদস্যরা রাঙ্গুনিয়া উপজেলায় রওনা হন এবং কাপ্তাই সড়কের পাশে পাথরঘাটা গ্রামের একটি পাহাড়ের ঢালে কবরের সন্ধান পান। ময়নাতদন্তের পর জিয়াউর রহমানের লাশ বিমানবাহিনীর পরিবহন উড়োজাহাজে ঢাকায় আনা হয় এবং প্রথমে রাষ্ট্রপতি ভবন ও পরে জাতীয় সংসদ ভবনে নেওয়া হয়। ২ জুন ১৯৮১ সালে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ের বিশাল জানাজা শেষে দুপুরে লাশ কবরে নামানো হয়। এ সময় তিন বাহিনীর কন্টিনজেন্ট সশ্রদ্ধ ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে ছিল, সেনাবাহিনীর বিউগলবাদকরা ‘লাস্ট পোস্ট’ বাজান, তিন বাহিনীর প্রধান রাষ্ট্রপতিকে স্যালুট জানান এবং সেখানে উপস্থিত বিপুল শোকার্ত জনতা আবেগ ও অশ্রুসিক্ত নয়নে দেশের জনপ্রিয় রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে শেষ শ্রদ্ধা জানান।

কমিশনের কাছে কয়েকজন সাক্ষীর সাক্ষ্য

জিয়া হত্যাকাণ্ডের পর তৎকালীন নৌবাহিনী প্রধান ও দুই প্রতিমন্ত্রী ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। সেনাপ্রধান এরশাদ কমিশনকে জানান, সকালে রাষ্ট্রপতির লাশ সুরক্ষিত রাখার বিষয়টি তার মাথায় এসেছিল। কিন্তু চট্টগ্রাম গ্যারিসন বিদ্রোহ করেছে বিষয়ে তার কাছে নিশ্চিত তথ্য থাকায় এবং বিদ্রোহ দমন না হওয়া পর্যন্ত লাশ সুরক্ষিত রাখার বিষয়টি বিবেচনার বাইরে ছিল। নৌবাহিনী প্রধান জানান, রাষ্ট্রপতির ব্যক্তিগত সচিব লে. কর্নেল মাহফুজ তার কাছে কোনো সাহায্য চাননি। রাষ্ট্রপতির সফরসঙ্গী প্রতিমন্ত্রী সৈয়দ মহিবুল হাসান বলেন, লে. কর্নেল মাহফুজকে তিনি ঢাকার সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। মাহফুজ তাকে জানিয়েছেন, সামরিক সচিব হেলিকপ্টার পাঠাচ্ছেন। স্থানীয় সেনাবাহিনীর কাছ থেকে কোনো সাড়া না পাওয়ায় তাদের আশঙ্কা হয় সেনাবাহিনী নিজেই এই হত্যাকাণ্ড ঘটনার সঙ্গে জড়িত। তাই তিনি ডা. একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর সঙ্গে সার্কিট হাউস ছেড়ে চলে যান। তাদের মনে হয়েছিল সেখানে থাকা সমীচীন নয়।

চট্টগ্রামে অবস্থানরত প্রতিমন্ত্রী এল কে সিদ্দিকী সকাল ৭টা ৪৫ মিনিটে সার্কিট হাউসে আসেন। তিনি কমিশনকে জানান, লেফটেন্যান্ট কর্নেল মাহফুজ তাকে বলেছিলেন, ঢাকায় বিষয়টি জানানো হয়েছে। নিরাপত্তার কারণে তাকে সার্কিট হাউস ছেড়ে চলে যেতেও বলা হয়েছিল।

তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী শামসুল হুদা চৌধুরী কমিশনকে জানান, ঢাকায় মন্ত্রিসভায় রাষ্ট্রপতির লাশ নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। তবে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) এএসএম মুস্তাফিজুর রহমান কমিশনকে জানান, রাষ্ট্রপতির লাশ উদ্ধার করার বিষয়ে ঢাকায় মন্ত্রিসভা কোনো সিদ্ধান্ত নিয়েছিল বলে তার মনে পড়ে না।

রাষ্ট্রপতির সামরিক সচিব মেজর জেনারেল সাদিকুর রহমান চৌধুরী কমিশনকে জানান, রাষ্ট্রপতিকে ক্ষমতাচ্যুত করার বিষয়ে মেজর জেনারেল মঞ্জুরের উচ্চাভিলাষ সম্পর্কে ডিজিএফআই অবগত ছিল এবং সেই তথ্য রাষ্ট্রপতিকে জানানোও হয়েছিল। তবে রাষ্ট্রপতি দৃশ্যত সেই সতর্কবার্তা আমলে নেননি।

জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) মহাপরিচালক এস এ হাকিম কমিশনকে জানান, মঞ্জুরের বিষয়ে তারা রাষ্ট্রপতিকে বারবার সতর্ক করেছিলেন। প্রতিবেদনে বলা হয়, ডিজিএফআইয়ের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাব্বত জান চৌধুরীকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, তবে কমিশনের প্রশ্নের জবাবে জেনারেল স্বীকার করেন যে চট্টগ্রামে তার সংস্থা ব্যর্থ হয়েছিল। কেননা ষড়যন্ত্রকারীদের তৎপরতা সম্পর্কে তারা আগাম সতর্কবার্তা পায়নি।

কমিশন দেখেছে, সার্কিট হাউসে হাউস গার্ড হিসেবে ২৬ জন কনস্টেবল, ছয়জন হাবিলদার, একজন সুবেদার ও দুজন বিউগলবাদক মোতায়েন ছিলেন। এছাড়া বাইরের নিরাপত্তাবেষ্টনীতে তিনজন কনস্টেবল ও সাদা পোশাকে আরো তিনজন কনস্টেবল ছিলেন। পুরো দলের দায়িত্বে ছিলেন একজন ইন্সপেক্টর।

প্রতিবেদনে বা হয়, ‘উল্লিখিত পুলিশি নিরাপত্তাব্যবস্থার পাশাপাশি প্রয়াত ক্যাপ্টেন আশরাফুল হাফিজ খানের নেতৃত্বে প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্টের ১১ জন সিপাহি, একজন নায়েক, একজন হাবিলদার ও একজন নায়েব সুবেদারের একটি দলও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সার্কিট হাউসে মোতায়েন ছিল। দলটি ২৮ মে ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে এসেছিল।’

কনস্টেবলদের কাছে ছিল থ্রি নট থ্রি রাইফেল আর হেড কনস্টেবলের কাছে ছিল সাব-মেশিনগান অথবা রিভলভার। বাইরের প্রহরীদের কাছে ছিল সেলফ-লোডিং রাইফেল। অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্টের দলটি লাইট মেশিনগান ও সাব-মেশিনগানে সজ্জিত ছিল। ক্যাপ্টেন হাফিজের কাছে ছিল তার নিজস্ব রিভলভার। এতসংখ্যক নিরাপত্তাকর্মী থাকা সত্ত্বেও রাষ্ট্রপতিকে নিরাপত্তা দিতে তারা ব্যর্থ হন।

লেখক : সরকারের প্রধান তথ্য কর্মকর্তা; সাবেক সাধারণ সম্পাদক, জাতীয় প্রেস ক্লাব

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন