ব্রহ্মপুত্রের ভাঙন রোধে স্থায়ী বাঁধের দাবি, রাজিবপুরে মানববন্ধন

ব্রহ্মপুত্রের ভাঙন রোধে স্থায়ী বাঁধের দাবি, রাজিবপুরে মানববন্ধন
ছবি: আমার দেশ

ব্রহ্মপুত্রের অব্যাহত নদীভাঙনের করালগ্রাস থেকে রাজিবপুর উপজেলার কোদালকাটি ইউনিয়নসহ বিস্তীর্ণ চরাঞ্চল রক্ষায় কুড়িগ্রামের উলিপুরের সাহেবের আলগা থেকে রাজিবপুরের মোহনগঞ্জ পর্যন্ত স্থায়ী নদীরক্ষা বাঁধ নির্মাণের জোর দাবি জানিয়েছেন এলাকার মানুষ।

একই সঙ্গে নদীভাঙন প্রতিরোধে দীর্ঘমেয়াদি ও কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানিয়ে মানববন্ধন ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

রোববার বিকেল ৫টায় ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে রাজিবপুর উপজেলার কোদালকাটি ইউনিয়নের পাইকান্টারী বল্লভপাড়া এলাকায় এ কর্মসূচির আয়োজন করে চর উন্নয়ন ও বাস্তবায়ন পরিষদ, রাজিবপুর উপজেলা শাখা।

নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত অসংখ্য নারী-পুরুষ, প্রবীণ, যুবক ও স্থানীয় বাসিন্দারা মানববন্ধনে অংশ নিয়ে তাদের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগের কথা তুলে ধরেন।

সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন চর উন্নয়ন ও বাস্তবায়ন পরিষদ, রাজিবপুর উপজেলা শাখার সভাপতি অধ্যাপক মোখলেছুর রহমান। প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন সংগঠনের কুড়িগ্রাম জেলা সভাপতি অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম বেবু।

তিনি বলেন, ‘চরের মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন ছাড়া কুড়িগ্রাম জেলার সার্বিক উন্নয়ন কখনোই সম্ভব নয়। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও যোগাযোগব্যবস্থার চরম দুর্বলতার কারণে চরাঞ্চলের মানুষ প্রতিনিয়ত বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। নাজুক শিক্ষাব্যবস্থার কারণে বাল্যবিবাহ আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে, যার কারণে প্রতিবন্ধী শিশু জন্মের ঝুঁকিও বাড়ছে। বর্তমানে কুড়িগ্রামে প্রতিবন্ধীর সংখ্যা প্রায় ১ লাখ।’

তিনি আরও বলেন, জাতিসংঘের অভিবাসন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী ব্রহ্মপুত্রের বন্যা ও নদীভাঙনের কারণে প্রতি বছর প্রায় ৫ হাজার পরিবার এক চর থেকে অন্য চরে স্থানান্তর হতে বাধ্য হয়।

গত পাঁচ বছরে সর্বস্ব হারিয়ে টিকে থাকতে না পেরে প্রায় ৬ হাজার পরিবার ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন শহরের বস্তিতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে।

সমাবেশে বক্তব্য দেন কুড়িগ্রাম জেলা উন্নয়ন ও বাস্তবায়ন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক এবং জেলা চর উন্নয়ন কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাংবাদিক সাইয়েদ আহমেদ বাবু।

তিনি বলেন, নদীবেষ্টিত কুড়িগ্রাম জেলায় ৪৫০ থেকে ৫০০ চর রয়েছে। এসব চরের মানুষ বছরের পর বছর নদীভাঙন, বন্যা, খরা ও নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে একপ্রকার যুদ্ধ করে বেঁচে আছেন।

তিনি বলেন, চরের মানুষের একটাই দাবি—নদীভাঙন রোধে কার্যকর ও স্থায়ী ব্যবস্থা। বিশ্বের অনেক উন্নয়নশীল দেশে নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে সরকার ক্ষতিপূরণ দেয়।

অথচ আমাদের দেশে বাড়ি-ভিটা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেলে সেই জমি সরকারি খাস হিসেবে গণ্য হয়। এটি অত্যন্ত দুঃখজনক। আমরা নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা এবং স্থায়ী নদীশাসনের উদ্যোগ গ্রহণে বর্তমান সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করছি।

সমাবেশ থেকে বক্তারা কুড়িগ্রামের উলিপুরের সাহেবের আলগা থেকে রাজিবপুরের মোহনগঞ্জ পর্যন্ত প্রস্তাবিত প্রায় সাড়ে ৮০০ কোটি টাকার স্থায়ী নদীভাঙন প্রতিরোধ প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নের জোর দাবি জানান।

একই সঙ্গে তারা অভিযোগ করেন, নদীভাঙন প্রতিরোধে পানি উন্নয়ন বোর্ড ও বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) কার্যকর ভূমিকার অভাব রয়েছে। তাই পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আদলে একটি পৃথক ‘চরবিষয়ক মন্ত্রণালয়’ গঠনের দাবি জানান বক্তারা।

তারা বলেন, দেশের ৩২টি জেলার ১০০টি উপজেলার প্রায় দেড় কোটি চর ও নদীপারের মানুষের জীবনমান উন্নয়নে বিশেষায়িত উদ্যোগ এখন সময়ের দাবি।

সমাবেশে আরও বক্তব্য দেন সংগঠনের জেলা যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবু দারদা হেলাল, ওয়াজেদ আলী ঝিনুক, চিলমারী উপজেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ফজলুল হক, রাজিবপুর উপজেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক আমিনুর রহমান মাস্টার, মোহনগঞ্জ ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আনোয়ারুল ইসলাম আনু, সাংবাদিক হাবিবুর রহমানসহ ভাঙনকবলিত এলাকার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।

কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান জানান, চলতি বর্ষা মৌসুমে ব্রহ্মপুত্র, ধরলা, তিস্তা, দুধকুমারসহ বিভিন্ন নদীর ৪২টি ভাঙন পয়েন্টে ২৪ কোটি টাকা ব্যয়ে ৫ লাখ ২২ হাজার বালুভর্তি জিওব্যাগ ফেলে জরুরি প্রতিরোধমূলক কাজ করা হয়েছে।

এছাড়া নতুন করে আরও ছয়টি পয়েন্টে ভাঙন দেখা দিয়েছে। বরাদ্দ পাওয়ামাত্রই সেখানে প্রতিরোধকাজ শুরু করা হবে।

জেলা প্রশাসক অন্নপূর্ণা দেবনাথ বলেন, নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ যাতে আরও দুর্ভোগে না পড়ে, সে বিষয়ে জেলা প্রশাসন সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে। তাৎক্ষণিক ভাঙন প্রতিরোধে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিবের মাধ্যমে ১ লাখ ৭৪ হাজার বালুভর্তি জিও ব্যাগের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

ব্রহ্মপুত্রের অব্যাহত ভাঙনে প্রতিদিনই হারিয়ে যাচ্ছে মানুষের বসতভিটা, আবাদি জমি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও জীবিকার শেষ সম্বল। তাই ভাঙনকবলিত মানুষের প্রত্যাশা—অস্থায়ী প্রতিরোধ নয়, দ্রুত বাস্তবায়ন হোক স্থায়ী নদীশাসন প্রকল্প; নিরাপদ হোক চরাঞ্চলের মানুষের জীবন, ফিরুক বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা।

এমএইচ

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন