বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জে পোশাক খাত

বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জে পোশাক খাত
এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক ফজলুল হক। ছবি: আমার দেশ

দেশের শীর্ষ বাণিজ্য সংগঠন ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফবিসিসিআই) প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সাবেক সভাপতি মো. ফজলুল হক। বিকেএমইএর নেতৃত্বে থাকাকালে দেশের তৈরি পোশাকশিল্প, বিশেষ করে নিটওয়্যার খাতের বৈশ্বিক ভাবমূর্তি ও প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন তিনি। দেশের রপ্তানি বাণিজ্য, শিল্পনীতি ও ব্যবসায়িক পরিবেশ উন্নয়নেও দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় এই উদ্যোক্তা। এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসকের দায়িত্ব ও পোশাকশিল্পের বর্তমান পরিস্থিতি, রপ্তানি সম্ভাবনা ও ভবিষ্যৎ করণীয় নিয়ে ‘আমার দেশ’-এর সঙ্গে কথা বলেছেন মো. ফজলুল হক। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সোহেল রহমান।

বিজ্ঞাপন

আমার দেশ : এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক হিসেবে আপনার ওপর যে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, সেটাকে কীভাবে দেখছেন?

ফজলুল হক : ১২০ দিনের মধ্যে একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে এফবিসিসিআইয়ের ব্যবসায়ী নেতৃত্ব ফিরিয়ে আনতে সরকার যে দায়িত্ব দিয়েছে, তা যথাযথভাবে পালনের সর্বোচ্চ চেষ্টা করব। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে ফেডারেশনের সদস্য, ব্যবসায়ী সমাজ ও সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সহযোগিতা প্রত্যাশা করছি।

আমার দেশ : আপনি যখন বিকেএমইএর সভাপতি ছিলেন, তখনকার পোশাক খাতের সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির কী পার্থক্য দেখছেন?

ফজলুল হক : প্রায় ১৬ বছর আগে দায়িত্ব ছাড়ার সময় দেশের মোট পোশাক রপ্তানি ছিল ১১ থেকে ১২ বিলিয়ন ডলার, এখন তা কয়েকগুণ বেড়েছে। সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে নিটওয়্যার খাতে। শক্তিশালী ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজের কারণে অধিকাংশ ফেব্রিক দেশে তৈরি হয়। ফলে মান নিয়ন্ত্রণ সহজ এবং ওভেনের তুলনায় ২০ থেকে ৩০ দিন পর্যন্ত লিড টাইম সাশ্রয় করা সম্ভব। তবে রানা প্লাজার পর কমপ্লায়েন্স, নিরাপত্তা ও কর্মপরিবেশের মান উন্নত হওয়ায় উদ্যোক্তাদের ব্যয়ও বেড়েছে।

আমার দেশ : বর্তমানে পোশাকশিল্পের বড় চ্যালেঞ্জগুলো কী?

ফজলুল হক : এটিকে শুধু সংকট নয়, বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ বলতে হবে। বৈশ্বিক বাজারে চাহিদা কমেছে। যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্কনীতি ও মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ অনিশ্চয়তা বাড়িয়েছে। জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয়ও বাড়ছে। উন্নত দেশের ভোক্তাদের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় পোশাকের চাহিদা কমছে। দেশের ভেতরে ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, উচ্চ সুদ, ডলার সংকট ও জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা রয়েছে। আন্তর্জাতিক মন্দা ও অভ্যন্তরীণ দুর্বলতার সম্মিলিত প্রভাবেই রপ্তানি প্রবৃদ্ধি কমেছে।

আমার দেশ : বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা ও নতুন বাজার সম্প্রসারণে করণীয় কী?

ফজলুল হক : শুধু শুল্ক নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকলে হবে না। ভারত, ভিয়েতনাম ও চীনের মতো প্রতিযোগী দেশগুলো মূল্য, বিপণন ও সেবায় এগিয়ে যাচ্ছে। আমাদের উৎপাদনশীলতা, মান ও দ্রুত সরবরাহে সক্ষমতা বাড়াতে হবে। নতুন বাজার তৈরিতেও ধারাবাহিক উদ্যোগ প্রয়োজন। বিকেএমইএর সভাপতি থাকাকালে জাপানকে লক্ষ্য করে প্রায় এক বছর সেমিনার, ব্যবসায়িক বৈঠক ও প্রতিনিধি দল বিনিময়ের পর ৬৩ জন জাপানি ক্রেতাকে বাংলাদেশে এনে বিজনেস ম্যাচমেকিং করা হয়েছিল। এর ফলে ওই বাজারে রপ্তানি বেড়েছে। তাই একসঙ্গে অনেক দেশে বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ না নিয়ে প্রতি বছর একটি বা দুটি সম্ভাবনাময় বাজারকে লক্ষ্য করে নিয়মিত কাজ করা উচিত।

আমার দেশ : উচ্চ সুদ, জ্বালানি সংকট ও উৎপাদন ব্যয়ের চাপ কীভাবে মোকাবিলা করা সম্ভব?

ফজলুল হক : প্রতিযোগী দেশগুলোর অনেক প্রতিষ্ঠান ৪ থেকে ৫ শতাংশ সুদে ঋণ পেলেও বাংলাদেশে উদ্যোক্তাদের প্রায় ১৫ শতাংশ সুদ দিতে হচ্ছে। এর সঙ্গে আমদানি, পরিবহন ও জ্বালানি ব্যয় যুক্ত হচ্ছে। নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎ না থাকলে সময়মতো উৎপাদন ও সরবরাহ করা কঠিন হয়, যা ক্রেতাদের আস্থায় প্রভাব ফেলতে পারে। তাই জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত, সুদের হার কমানো, বন্দর ও যোগাযোগ ব্যবস্থার দক্ষতা বাড়ানো এবং ব্যবসায়িক জটিলতা কমাতে হবে।

আমার দেশ : পোশাকশিল্পের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা কতটা?

ফজলুল হক : সম্ভাবনা অবশ্যই আছে। তবে সরকার ও উদ্যোক্তা—দুই পক্ষকেই সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। উৎপাদনশীলতা ও প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি উচ্চমূল্যের ও বৈচিত্র্যময় পণ্যে যেতে হবে। এলডিসি উত্তরণের পর শুল্কসুবিধা কমে আসতে পারে। তাই মুক্ত ও অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তির পাশাপাশি এখন থেকেই শিল্পের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। সমন্বিত প্রস্তুতি নিতে পারলে বাংলাদেশের পোশাকশিল্প বর্তমান চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে ভবিষ্যতে আরো শক্ত অবস্থানে ফিরতে পারবে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন