জ্বালানি আমদানির চাপে ডলারের দর ফের ঊর্ধ্বমুখী

জ্বালানি আমদানির চাপে ডলারের দর ফের ঊর্ধ্বমুখী

জ্বালানি আমদানিতে ব্যয় বৃদ্ধির পাশাপাশি সরবরাহ আগের তুলনায় কমে যাওয়ায় দেশের বাজারে ডলারের দর ফের ঊর্ধ্বমুখী। দেড় মাস ধরে ব্যাংকগুলোকে ক্রমেই বেশি দামে ডলার কিনতে হচ্ছে। গত মে মাসে ডলারের দর ছিল ১২২ টাকা ৪৫ পয়সা। এখন তা বেড়ে প্রায় ১২৪ টাকায় দাঁড়িয়েছে।

বিজ্ঞাপন

এমন পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ব্যাংকগুলোকে ডলারের দর বেঁধে দিয়েছে। যদিও এই পরিস্থিতিতে বিনিময় হার বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দুই থেকে তিন টাকা পর্যন্ত অবমূল্যায়নের কথা বলেছেন অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকাররা।

ব্যাংকাররা জানান, জ্বালানি তেল ও গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির কারণে সরকারি পর্যায়ে এলসি খোলার পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এসব জ্বালানি আমদানির জন্য অতিরিক্ত ডলারের প্রয়োজন হওয়ায় বাজারে ডলারের চাহিদা বেড়েছে। এছাড়া গত দুই মাসে রেমিট্যান্স প্রবাহ প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার কমেছে। রেমিট্যান্স এলেও প্রত্যাশিত প্রবৃদ্ধি হয়নি। অন্যদিকে, রপ্তানি আয়ও কমেছে, কিন্তু আমদানি ব্যয় মোটামুটি আগের পর্যায়েই রয়েছে। ফলে ডলারের সরবরাহ কমলেও চাহিদা না কমায় বিনিময় হার ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে।

তারা বলেন, সরাসরি বিনিময় হার নির্ধারণের পরিবর্তে কেন্দ্রীয় ব্যাংক তার হাতে থাকা অন্যান্য টুলস ব্যবহার করতে পারে। নিত্যপ্রয়োজনীয় ছাড়া বিলাসী পণ্যের আমদানিতে মার্জিন সংক্রান্ত বিধিনিষেধ আরোপ করা যেত, যা ডলারের চাহিদা নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতো। বর্তমান পদ্ধতিতে বাজারে অতিরিক্ত হস্তক্ষেপ অব্যাহত থাকলে বৈদেশিক মুদ্রাবাজার আরো অস্থির হয়ে উঠতে পারে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ডলারের দাম বাড়ার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হলো আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি। বিশেষ করে বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৬০-৭০ ডলার থেকে বেড়ে প্রায় ৯০ ডলারে পৌঁছেছে। এতে জ্বালানি আমদানিতে ডলারের চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

তিনি বলেন, ডলারের বিনিময় হার আগে যা ছিল, তখন যে এলসিগুলো খোলা হয়েছিল, সেগুলোর বিপরীতে এখন তুলনামূলক বেশি দামে ডলার কিনে আমদানি বিল পরিশোধ করতে হচ্ছে। ফলে বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে এবং এর প্রভাব বিনিময় হারে পড়ছে।

ব্যাংকগুলোর তথ্য বলছে, চলতি বছরের জুন মাসের শুরুতে ব্যাংকগুলো প্রায় ১২৩ টাকায় ডলার কিনত। এরপর ১২ থেকে ২০ দিনের মধ্যে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১২৩ টাকা ৪০-৫০ পয়সায়। বর্তমানে কিছু ব্যাংক ১২৩ টাকা ৯০-৯৫ পয়সা পর্যন্ত দরে ডলার কিনছে। অথচ গত মে মাসে ব্যাংকগুলো ১২২ টাকা ৪৫ পয়সা দরে ডলার কিনেছিল।

বেসরকারি একটি ব্যাংকের ট্রেজারি বিভাগের একজন কর্মকর্তা বলেন, বর্তমানে বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে ডলারের চাহিদা সরবরাহের তুলনায় অনেক বেশি। বাজারে যে পরিমাণ ডলার রয়েছে, তা দিয়ে প্রকৃত চাহিদা পূরণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে জ্বালানি আমদানির পেমেন্ট বেড়ে যাওয়া এবং সরকারের কিছু খাতে বৈদেশিক মুদ্রার ব্যয় বৃদ্ধির কারণে বাজারে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে।

তিনি বলেন, সুদের হার কমানোর পর মুদ্রার মানে একটি স্বাভাবিক সমন্বয়ের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। একই সঙ্গে অন্যান্য দেশের মুদ্রার তুলনায় টাকার বিনিময় হার প্রত্যাশিতভাবে সমন্বয় না হওয়ায় বর্তমান পরিস্থিতি আরো জটিল হয়েছে। ডলারের বাজারে চাপ কমাতে প্রয়োজন হলে বাংলাদেশ ব্যাংক রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি করতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদে বাজারকে স্থিতিশীল রাখতে বিনিময় হারকে আরো বাজারভিত্তিক করার দিকেই যেতে হবে।

রাষ্ট্রায়ত্ত একটি ব্যাংকের ট্রেজারি বিভাগের প্রধান নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সরকারকে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি), বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) এবং সার আমদানির জন্য প্রতি মাসে প্রায় ৩০০ মিলিয়ন ডলার পরিশোধ করতে হতো। তবে গত কয়েক মাসে আমদানির পরিমাণ প্রায় একই থাকলেও ব্যয় প্রায় ১০০ মিলিয়ন ডলার বেড়ে গেছে। এর ফলে ডলারের বাজারে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে।

অন্যদিকে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে চলতি বছরের মে মাস পর্যন্ত টানা তিন বিলিয়ন ডলারের বেশি রেমিট্যান্স এলেও জুন মাসে তা কমে ২ দশমিক ৮১ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসে। এছাড়া জুলাই মাসে আসে ২ দশমিক ৮৫ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স।

দীর্ঘদিন ধরে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ায় এবং বাজার থেকে ডলার কেনায় দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩৬ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন ডলার, যা দিয়ে পাঁচ মাসের বেশি আমদানি বিল পরিশোধ সম্ভব। তবে ডলারের ওপর বর্তমান চাপের মধ্যে রিজার্ভ কতটা ধরে রাখা সম্ভব হবে, তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।

তথ্য অনুযায়ী, জ্বালানি তেলজাত পণ্য বা পেট্রোলিয়াম পণ্য ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে মে পর্যন্ত ৯ বিলিয়ন ডলার আমদানি হয়েছে, যা আগের অর্থবছরের একই সময় হয়েছিল ৪ দশমিক ৮০ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৮৫ শতাংশ।

জ্বালানি বিভাগ ও পেট্রোবাংলা সূত্র জানায়, গ্যাস অনুসন্ধান বন্ধ রেখে ঘাটতি মেটাতে মাত্র আট বছরে ২ লাখ ৪৫ হাজার কোটি টাকার উচ্চ মূল্যের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি করতে হয়েছে। আমদানি দায় মেটাতে গিয়ে জাতীয় বাজেটে টান পড়েছে। দেশে উৎপাদিত যে গ্যাসের দাম তিন থেকে চার টাকা, সেটা বিদেশ থেকে আমদানি করতে ব্যয় হচ্ছে ৬৮ থেকে ৬৯ টাকা। উচ্চ মূল্যের এলএনজি আমদানিকে কেন্দ্র করে দুর্নীতির বিশাল মাফিয়া সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর আহসান এইচ মনসুর বলেন, বাংলাদেশের রিজার্ভ সীমিত। তাই বাজার নিয়ন্ত্রণে রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি করা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। বরং বর্তমান রিজার্ভ ধরে রাখাই উচিত। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে ডলারের ওপর চাপ বাড়লে বিনিময় হারকে বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দুই থেকে তিন টাকা পর্যন্ত অবমূল্যায়নের সুযোগ দেওয়া যেতে পারে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন