এক নজরে খলিফা আবু বকর

এক নজরে খলিফা আবু বকর
ফাইল ছবি

মহানবী মুহাম্মদ (সা.)-এর ইন্তেকালের পর মুসলিম উম্মাহ বহুমুখী সংকটের সামনে পড়ে। একদিকে শোকাহত মুসলিম সমাজ, অন্যদিকে আরবের বিভিন্ন গোত্রের বিদ্রোহ, জাকাত অস্বীকার, ভণ্ড নবীদের উত্থান এবং নবগঠিত রাষ্ট্রের অস্তিত্বকে ঘিরে অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত নাজুক। ঠিক এ সময়েই খেলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করেন আল্লাহর রাসুল (সা.)-এর ঘনিষ্ঠ সঙ্গী আবু বকর (রা.)। মাত্র দুই বছর তিন মাসের শাসনকাল হলেও দৃঢ় নেতৃত্ব, বিচক্ষণতা ও অবিচল নীতির মাধ্যমে তিনি খেলাফত রাষ্ট্রকে প্রতিষ্ঠিত করেন। ধর্মদ্রোহ ও রাষ্ট্রদ্রোহ দমনের মাধ্যমে আরব উপদ্বীপে কেন্দ্রীয় কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠা, পবিত্র কোরআন সংকলনের ঐতিহাসিক উদ্যোগ, দক্ষ প্রশাসন গড়ে তোলা এবং ইরাক ও শামে মুসলিম বিজয়ের ভিত্তি গড়ার মতো যুগান্তকারী পদক্ষেপ ছিল তার শাসনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তাই তার শাসনকালকে শুধু প্রথম খলিফার শাসন বললে পূর্ণ মূল্যায়ন হয় না; বরং এটি ছিল খেলাফত রাষ্ট্রকে টিকিয়ে রাখা, সুসংহত করা এবং ভবিষ্যৎ বিশ্বশক্তিতে পরিণত হওয়ার জন্য একটি দৃঢ় ভিত্তি নির্মাণের যুগ। অল্প কথায় খলিফা আবু বকর (রা.)-এর জীবন ও খেলাফতের সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরেছেন মাহমুদ আহমাদ ও আবদুল মান্নান গালিব

বিজ্ঞাপন

জন্ম (হিজরি-পূর্ব ৫০ সন) : আবু বকর (রা.) হিজরি-পূর্ব প্রায় ৫০ সনে (প্রায় ৫৭৩ খ্রিষ্টাব্দে) মক্কায় জন্মগ্রহণ করেন। অধিকাংশ ঐতিহাসিকের মতে, তিনি হাতির ঘটনার (আমুল ফিল) প্রায় দুই বছর কয়েক মাস পরে জন্মগ্রহণ করেন। সে হিসেবে তিনি মহানবী (সা.)-এর চেয়ে প্রায় দুই বছর কয়েক মাসের ছোট ছিলেন। তার নাম আবদুল্লাহ। আবু বকর ছিল তার উপনাম বা কুনিয়াত।

ইসলামগ্রহণ (হিজরি-পূর্ব ১৩ সন) : হিজরি-পূর্ব ১৩ সনে, মহানবী (সা.)-এর নবুওয়াত লাভের পরপরই ৩৭ বছর বয়সে আবু বকর (রা.) ইসলাম গ্রহণ করেন। তিনি স্বাধীন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষদের মধ্যে সর্বপ্রথম নবীজির দাওয়াতে সাড়া দেন।

দাসমুক্তির মাধ্যমে ইসলামের সেবা (হিজরি-পূর্ব ১৩-১০ সন) : ইসলাম গ্রহণের পর মক্কায় দুর্বল ও নির্যাতিত মুসলিমদের মুক্ত করতে আবু বকর (রা.) নিজের সম্পদ ব্যয় করেন। তিনি আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে বহু নির্যাতিত দাস ও দাসীকে ক্রয় করে মুক্তি দেন। তাদের মধ্যে সবচেয়ে প্রসিদ্ধ ছিলেন বিলাল ইবন রাবাহ (রা.); তিনি ইসলাম গ্রহণের কারণে উমাইয়া ইবনে খালাফের নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন। এভাবে নিজের সম্পদ ব্যয় করে তিনি ইসলামের প্রথম যুগে অসহায় মুসলিমদের রক্ষা এবং ইসলামের শক্তি বৃদ্ধি করতে অসামান্য অবদান রাখেন।

মদিনায় হিজরত (১ হিজরি) : ১ হিজরি সনে মক্কায় মুসলিমদের ওপর নির্যাতনের মাত্রা বেড়ে যাওয়া ও দাওয়াতের পথ চরমভাবে সংকুচিত হয়ে পড়লে আল্লাহতায়ালা নবীজি (সা.)-কে হিজরতের অনুমতি দেন। তখন তিনি ঘনিষ্ঠ সঙ্গী আবু বকর (রা.)-কে সঙ্গে নিয়ে মদিনার (তৎকালীন ইয়াসরিব) উদ্দেশে যাত্রা করেন। পথে সাওর গুহায় অবস্থানসহ নানা প্রতিকূলতা অতিক্রম করে রবিউল আউয়াল মাসের ১২ তারিখ (প্রচলিত মতে; অন্য মতও রয়েছে) মদিনায় পৌঁছান। এই হিজরতের মাধ্যমে ইসলামি সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থার ভিত্তি স্থাপিত হয় এবং ইসলামের ইতিহাসে এক নতুন যুগের সূচনা হয়।

বদর যুদ্ধ (২ হিজরি) : ২ হিজরির রমজান মাসের ১৭ তারিখ মদিনার মুসলিমদের সঙ্গে মক্কার মুশরিক কুরাইশদের প্রথম বৃহৎ যুদ্ধ বদরে সংঘটিত হয়। এ যুদ্ধে মুসলিমরা বিজয় অর্জন করে। আবু বকর (রা.) শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত নবীজি (সা.) অন্যতম প্রধান সহচর হিসেবে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। যুদ্ধের সময় নবীজি (সা.) যখন আল্লাহর কাছে বিজয়ের জন্য দোয়া ও মোনাজাতে নিমগ্ন ছিলেন, তখন আবু বকর (রা.) তার পাশে থেকে তাকে সান্ত্বনা ও সাহস জোগান। যুদ্ধের ময়দানেও তিনি বীরত্বের সঙ্গে লড়াই করেন। বিজয়ের পর যুদ্ধবন্দিদের বিষয়ে তিনি মহানবী (সা.)-এর সামনে ক্ষমা ও দয়ার নীতি অবলম্বনের পরামর্শ দেন।

হুদাইবিয়ার সন্ধি (৬ হিজরি) : ৬ হিজরি সনে সাহাবিদের নিয়ে নবীজি (সা.) ওমরাহ পালনের উদ্দেশ্যে মক্কার দিকে রওনা হলে হুদাইবিয়ায় কুরাইশদের সঙ্গে একটি শান্তিচুক্তি সম্পাদিত হয়। চুক্তির কিছু শর্ত আপাতদৃষ্টিতে মুসলিমদের জন্য কঠিন মনে হওয়ায় অনেক সাহাবি উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। কিন্তু আবু বকর (রা.) দৃঢ়ভাবে নবীজির সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেন এবং সাহাবিদের বলেন, ‘তিনি আল্লাহর রাসুল। আল্লাহ কখনো তাকে ব্যর্থ করবেন না।’ তার এই দূরদর্শিতা পরবর্তীকালে সত্য প্রমাণিত হয় এবং হুদাইবিয়ার সন্ধি ইসলামের প্রসারে এক যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করে।

মক্কা বিজয় (৮ হিজরি) : ৮ হিজরির রমজান মাসে নবীজি (সা.) ১০ হাজার সাহাবিকে সঙ্গে নিয়ে শান্তিপূর্ণভাবে মক্কা বিজয় করেন। এ অভিযানে আবু বকর (রা.) অন্যতম প্রধান সাহাবি হিসেবে অংশগ্রহণ করেন। মক্কা বিজয়ের দিন তিনি বৃদ্ধ ও দৃষ্টিহীন পিতা আবু কুহাফাকে নবীজির কাছে নিয়ে এলে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। এটি আবু বকর (রা.)-এর জীবনের এক আনন্দঘন স্মরণীয় ঘটনা।

তাবুক অভিযানে সর্বস্ব দান (৯ হিজরি) : ৯ হিজরিতে রোমানদের সম্ভাব্য আক্রমণ মোকাবিলার জন্য তাবুক অভিযানের প্রস্তুতিকালে নবীজি (সা.) সাহাবিদের দানের আহ্বান জানান। তখন আবু বকর (রা.) সব সম্পদ আল্লাহর রাস্তায় দান করে দেন। নবীজি (সা.) জিজ্ঞেস করলেন, ‘পরিবারের জন্য কী রেখে এসেছেন?’ তিনি উত্তর দিলেন, ‘আল্লাহ ও তাঁর রাসুলকে রেখে এসেছি।’ তার এই ত্যাগ ইসলামের ইতিহাসে দানের এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে আছে।

আমিরুল হজ (৯ হিজরি) : ৯ হিজরিতে আবু বকর (রা.)-কে নবীজি (সা.) মুসলিমদের প্রথম আমিরুল হজ (হজ পরিচালনার দায়িত্বে) নিযুক্ত করেন। তার নেতৃত্বে প্রায় তিন শতাধিক মুসলিম হজ পালন করেন। এ নিয়োগ আবু বকর (রা.)-এর প্রতি মহানবী নবীজি (সা.)-এর গভীর আস্থা ও নেতৃত্বের স্বীকৃতি বহন করে।

বিদায় হজ (১০ হিজরি) : ১০ হিজরিতে নবীজি (সা.) জীবনের একমাত্র পূর্ণাঙ্গ হজ আদায় করেন। এটি ইতিহাসে বিদায় হজ নামে পরিচিত। এ হজে আবু বকর (রা.) নবীজির সঙ্গে হজ পালন করেন এবং আরাফার ময়দানসহ বিভিন্ন স্থানে তার ঐতিহাসিক ভাষণ প্রত্যক্ষ করেন।

নবীজির অসুস্থতায় ইমামতি (১১ হিজরি) : ১১ হিজরিতে নবীজি (সা.)-এর শেষ অসুস্থতার সময় তিনি নামাজে ইমামতি করার জন্য আবু বকর (রা.)-কে নির্দেশ দেন। নবীজির অসুস্থতা বেড়ে গেলে তিনি ধারাবাহিকভাবে মুসল্লিদের ইমামতি করেন। একদিন নবীজি কিছুটা সুস্থবোধ করলে মসজিদে এসে আবু বকর (রা.)-এর বাম পাশে বসেন। তখন তিনি নবীজির অনুসরণ করে ইমামতি করেন এবং মুসল্লিরা তার অনুসরণে নামাজ আদায় করেন। এ ঘটনা আবু বকর (রা.)-এর প্রতি নবীজি (সা.)-এর গভীর আস্থা ও নেতৃত্বের মর্যাদার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত।

মহানবী (সা.)-এর ইন্তেকাল ও আবু বকর (রা.)-এর খেলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ (১১ হিজরি ৬৩২ খ্রিষ্টাব্দ)

১২ রবিউল আউয়াল, ১১ হিজরি (৮ জুন ৬৩২ খ্রি.) মহানবী মুহাম্মদ (সা.) ইন্তেকাল করলে মুসলিম উম্মাহ গভীর শোক ও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে। এ সময় আবু বকর (রা.) সুরা আলে-ইমরানের ১৪৪ নম্বর আয়াত তিলাওয়াত করে মুসলমানদের বাস্তবতা মেনে নেওয়ার আহ্বান জানান। তাঁর দৃঢ় নেতৃত্বে পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হয়ে আসে।

১২ রবিউল আউয়াল, ১১ হিজরি : মদিনার বানু সাঈদার প্রাঙ্গণে আনসার ও মুহাজিরদের মধ্যে পরবর্তী খলিফা নির্বাচন বিষয়ে আলোচনা হয়। সেখানে আবু বকর (রা.) খলিফা নির্বাচিত হন এবং উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) সর্বপ্রথম তার হাতে খেলাফতের বায়াত হন এবং উপস্থিত সাহাবির অধিকাংশও তাকে নবীজির খলিফা হিসেবে মেনে নেন।

১৩ রবিউল আউয়াল, ১১ হিজরি (প্রচলিত মতে) : মসজিদে নববিতে মুসলিমদের সাধারণ বায়াতের মাধ্যমে আবু বকর (রা.) আনুষ্ঠানিকভাবে ইসলামের প্রথম খলিফার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। একই দিনে তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণে তিনি ন্যায়বিচার, জবাবদিহি ও আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আনুগত্যকে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি হিসেবে ঘোষণা করেন।

শামে উসামা (রা.)-এর বাহিনী প্রেরণ (১১ হিজরি/৬৩২ খ্রিষ্টাব্দ)

নবীজি (সা.)-এর ইন্তেকালের পর আরবজুড়ে বিদ্রোহের আশঙ্কা দেখা দেয়। অনেক সাহাবি শামের উদ্দেশে প্রেরণের জন্য প্রস্তুত উসামা ইবনে জায়েদের বাহিনীর অভিযান স্থগিত রাখার পরামর্শ দেন। কিন্তু আবু বকর (রা.) দৃঢ়ভাবে ঘোষণা করেন, ‘আল্লাহর কসম! যদি হিংস্র জন্তু এসে আমাকে ছিঁড়ে খায়, তবু রাসুলুল্লাহ (সা.) যে বাহিনী অভিযানে পাঠিয়েছিলেন, তাদের যাত্রা আমি বাতিল করব না।’

তিনি নবীজি (সা.)-এর নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করে উসামার বাহিনী শামে পাঠিয়ে দেন। এ অভিযানের ফলে সীমান্তে মুসলিম রাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতার বার্তা পৌঁছে যায় এবং অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহীদের মনোবলেও বড় ধরনের প্রভাব পড়ে।

ধর্মদ্রোহ ও রাষ্ট্রদ্রোহের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা (১১-১২ হিজরি/৬৩২-৬৩৩ খ্রিষ্টাব্দ)

নবীজি (সা.)-এর ইন্তেকালের পরই আরবের বিভিন্ন গোত্রে ব্যাপক অস্থিরতা দেখা দেয়। কেউ ইসলাম ত্যাগ করে, জাকাত দিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে ধর্মদ্রোহ করে, আবার কেউ মদিনার অধীনতার বাইরে গিয়ে গোত্রীয় স্বাধীনতা ঘোষণা করে রাষ্ট্রদ্রোহে লিপ্ত হয়। একই সময়ে তুলাইহা আলআসাদি, সাজাহ বিনতুল হারিস, মুসাইলিমা আলকাজজাব এবং ইয়েমেনে আসওয়াদ আনসির মতো নবুয়াতের মিথ্যা দাবিদার লোকদের অনুসারীরাও সক্রিয় হয়ে ওঠে। এ সংকট মুসলিম রাষ্ট্রের অস্তিত্বের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকিতে পরিণত হয়।

উমর (রা.) ও অন্য অনেক সাহাবি জাকাত অস্বীকারকারীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের বিষয়ে প্রথমদিকে সতর্ক অবস্থান নিলেও আবু বকর (রা.) ছিলেন আপসহীন। তিনি ঘোষণা করেন, ‘আল্লাহর কসম! যারা নামাজ ও জাকাতের মধ্যে পার্থক্য করবে, আমি তাদের বিরুদ্ধে অবশ্যই যুদ্ধ করব। রাসুলুল্লাহকে যে রশি (বা উট বাঁধার দড়ি) তারা দিত, এখন যদি তা দিতেও অস্বীকার করে, তাহলেও আমি তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করব।’

১১-১২ হিজরি (৬৩২-৬৩৩ খ্রিষ্টাব্দ) আবু বকর (রা.) একাধিক সেনাবাহিনী গঠন করে বিদ্রোহী গোত্র ও ভণ্ড নবীদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করেন। এসব অভিযানে খালিদ ইবনে ওয়ালিদ মুখ্য ভূমিকা পালন করেন। বুজাখা, বুতাহ, ইয়ামামাসহ বিভিন্ন যুদ্ধে বিদ্রোহীরা পরাজিত হয়; তুলাইহা পলায়ন করে, সাজাহর অনুসারীরা ছত্রভঙ্গ হয় এবং পরবর্তীকালে ইয়ামামার যুদ্ধে মুসাইলামা নিহত হয়। এসব বিজয়ের মাধ্যমে আরব উপদ্বীপে মুসলিম রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয় এবং পরবর্তী ইরাক ও শাম বিজয়ের ভিত্তি সুদৃঢ় হয়।

কোরআন সংকলনের উদ্যোগ (১২ হিজরি/৬৩৩ খ্রিষ্টাব্দ)

১২ হিজরি (৬৩৩ খ্রিষ্টাব্দ) ইয়ামামার যুদ্ধে অনেক হাফেজ সাহাবি শাহাদতবরণ করলে কোরআনের সংরক্ষণ নিয়ে উদ্বেগ দেখা দেয়। এ প্রেক্ষাপটে উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) কোরআনকে একত্রে সংকলনের প্রস্তাব দেন। এই কার্যক্রম শুরু করার ক্ষেত্রে প্রথমে আবু বকর (রা.) কিছুটা দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন। তার বক্তব্য ছিলÑ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) যে কাজ করেননি, আমি তা কীভাবে করব?’ কিন্তু বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করে তিনি প্রস্তাবটি গ্রহণ করেন।

এরপর ওহি লেখক জায়েদ ইবনে সাবিতের নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করা হয়। লিখিত নথি, সাহাবিদের মুখস্থ পাঠ এবং কঠোর যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে কোরআনের আয়াতগুলো একত্রে সংকলিত হয়। এই সংকলিত মুসহাফ প্রথমে আবু বকর (রা.)-এর কাছে, পরে উমর (রা.)-এর কাছে এবং তার ইন্তেকালের পর হাফসা (রা.)-এর কাছে সংরক্ষিত ছিল। এই উদ্যোগের ওপর ভিত্তি করেই পরবর্তীকালে উসমান (রা.)-এর শাসনামলে ‘মানক মুসহাফ’ (Standardized Mushaf) প্রস্তুতের ভিত্তি রচনা হয় এবং বিশুদ্ধ পদ্ধতিতে কোরআন সংরক্ষণ করা সম্ভব হয়।

মুসলিম রাষ্ট্রের সীমান্ত সম্প্রসারণ ও খলিফার পররাষ্ট্রনীতি (১২-১৩ হিজরি/৬৩৩-৬৩৪ খ্রিষ্টাব্দ)

ধর্মদ্রোহ প্রতিরোধ যুদ্ধের মাধ্যমে আরব উপদ্বীপে শান্তি ও কেন্দ্রীয় কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর আবু বকর (রা.) মুসলিম রাষ্ট্রের সীমান্ত সম্প্রসারণে মনোনিবেশ করেন। তার লক্ষ্য ছিল একদিকে আরবের উত্তর সীমান্তকে নিরাপদ করা, অন্যদিকে পারস্যের সাসানী ও রোমান (বাইজেন্টাইন) সাম্রাজ্যের ক্রমাগত হুমকি মোকাবিলা করা। তার খেলাফতকালেই ইরাক ও শামে মুসলিম বিজয়ের ভিত্তি স্থাপিত হয়।

ইরাক অভিযান : মহররমের ১২ হিজরি সনে (প্রায় মার্চ ৬৩৩ খ্রিষ্টাব্দ) আবু বকর (রা.) খালিদ ইবনে ওয়ালিদকে সাসানী পারস্যের অধীন ইরাক অভিযানের দায়িত্ব দেন। অল্প সময়ের মধ্যেই মুসলিম বাহিনী ধারাবাহিক সাফল্য অর্জন করে। সফর ১২ হিজরিতে উবুল্লা অঞ্চলে অভিযান পরিচালিত হয়। এরপর রবিউল আউয়াল ১২ হিজরিতে ইরাকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হীরা বিজিত হয়। পরবর্তী মাসগুলোয় উল্লাইস, আইনুত তামারসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ স্থানে মুসলিম বাহিনী বিজয় অর্জন করে। এসব বিজয়ের ফলে ফোরাত উপত্যকার বিস্তীর্ণ অঞ্চল মুসলিম রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে আসে এবং পারস্য সাম্রাজ্যের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় বড় ধরনের ধাক্কা লাগে।

শাম অভিযান : ইরাক অভিযানের পাশাপাশি ১৩ হিজরির শুরুতে (৬৩৪ খ্রিষ্টাব্দ) আবু বকর (রা.) বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে শামে চারটি পৃথক বাহিনী প্রেরণ করেন। তিনি আবু উবাইদা ইবনুল জাররাহকে হোমস, ইয়াজিদ ইবনে আবু সুফিয়ানকে দামেস্ক, শুরাহবিল ইবনে হাসানাকে জর্ডান এবং আমর ইবনুল আসকে ফিলিস্তিন অভিমুখে পাঠান। পরে বিভিন্ন ফ্রন্টে বাইজেন্টাইন প্রতিরোধ শক্তিশালী হয়ে উঠলে তিনি খালিদ ইবনে ওয়ালিদকে ইরাক থেকে শামে চলে আসার নির্দেশ দেন। মরুভূমি অতিক্রম করে তার দ্রুত শামে পৌঁছানো ইসলামের সামরিক ইতিহাসের অন্যতম উল্লেখযোগ্য কৌশলগত অভিযান হিসেবে বিবেচিত হয়।

আজনাদাইনের যুদ্ধ (জুমাদাল উলা ১৩ হিজরি /৩০ জুলাই ৬৩৪ খ্রিষ্টাব্দ) : ১৩ হিজরির জুমাদাল উলায় (৩০ জুলাই ৬৩৪ খ্রিষ্টাব্দ) ফিলিস্তিনের আজনাদাইন প্রান্তরে মুসলিম বাহিনী ও বাইজেন্টাইন সেনাবাহিনীর মধ্যে প্রথম বৃহৎ সংঘর্ষ সংঘটিত হয়। খালিদ ইবনে ওয়ালিদ (রা.)-এর নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনী এই যুদ্ধে বিজয় অর্জন করে। অনেক ঐতিহাসিকের মতে, আবু বকর (রা.)-এর ইন্তেকালের সময় বা তার অল্প আগে এই বিজয়ের সংবাদ মদিনায় পৌঁছেছিল। আজনাদাইনের এই বিজয় পরবর্তীকালে দামেস্ক, জেরুজালেম এবং সমগ্র শাম অঞ্চলে মুসলিম বিজয়ের ভিত্তি স্থাপন করে এবং আঞ্চলিক শক্তি থেকে খেলাফত রাষ্ট্রকে আন্তর্জাতিক শক্তিতে রূপান্তরের পথ সুগম করে।

উত্তরসূরি নির্বাচন (১৩ হিজরি/৬৩৪ খ্রিষ্টাব্দ)

জমাদাল আখিরা ১৩ হিজরিতে (আগস্ট ৬৩৪ খ্রিষ্টাব্দ) অসুস্থ হয়ে পড়লে আবু বকর (রা.) মুসলিম উম্মাহর ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নিয়ে ভাবতে শুরু করেন। তার প্রধান উদ্বেগ ছিল মুসলিম উম্মাহর ঐক্য ও রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা। নবীজি (সা.)-এর ইন্তেকালের পর নেতৃত্বের প্রশ্নে যে সংকট তৈরি হয়েছিল, তার পুনরাবৃত্তি তিনি চাননি। তাই তিনি উত্তরসূরি নির্বাচনের বিষয়ে জ্যেষ্ঠ সাহাবিদের সঙ্গে পরামর্শ শুরু করেন। আবদুর রহমান ইবন আউফ, উসমান ইবনে আফফান প্রমুখ সাহাবির সঙ্গে আলোচনা করে তিনি উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-কে খিলাফতের জন্য সবচেয়ে যোগ্য ব্যক্তি হিসেবে মনোনীত করেন। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, রিদ্দাহ যুদ্ধের পর পারস্য ও বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে চলমান অভিযান এবং অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা রক্ষায় দৃঢ়, ন্যায়পরায়ণ ও অভিজ্ঞ নেতৃত্বের প্রয়োজন। সেই বিবেচনায় তিনি উমর (রা.)-এর হাতে নেতৃত্ব অর্পণ করেছিলেন। রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নিশ্চিত করতে তার এই সিদ্ধান্ত ছিল সময়োপযুক্ত।

খলিফার ইন্তেকাল (২২ জমাদাল আখিরা ১৩ হিজরি/২৩ আগস্ট ৬৩৪ খ্রিষ্টাব্দ)

২২ জমাদাল আখিরা ১৩ হিজরি (২৩ আগস্ট ৬৩৪ খ্রিষ্টাব্দ) আবু বকর (রা.) ৬৩ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন। তিনি প্রায় দুই বছর তিন মাস খেলাফত রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব পালন করেন। মৃত্যুর আগে তিনি স্ত্রী আসমা বিনতে উমাইস (রা.)-কে তাকে গোসল দেওয়ার অসিয়ত করেন। তার জানাজায় ইমামতি করেন উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)।

তার অসিয়ত অনুযায়ী তাকে নবীজি (সা.)-এর রওজা মোবারকে, নবীজি (সা.)-এর পাশেই দাফন করা হয়। ইসলামের প্রথম খলিফা হিসেবে আবু বকর (রা.) জীবদ্দশায় যেমন মহানবী (সা.)-এর নিকটতম সঙ্গী ছিলেন, তেমনি মৃত্যুর পরও তারই সান্নিধ্যে চিরনিদ্রায় শায়িত হন।

খেলাফত রাষ্ট্রের সাফল্য ও ব্যর্থতা

মাত্র দুই বছর তিন মাসের খেলাফত। তাই খলিফা আবু বকর (রা.) শাসনামলকে উমর (রা.)-এর ১০ বছরের খেলাফতের সঙ্গে একই মানদণ্ডে বিচার করা ন্যায্য নয়। আবু বকর (রা.) এমন একসময় রাষ্ট্রের দায়িত্ব গ্রহণ করেন, যখন খেলাফত রাষ্ট্রের অস্তিত্বই হুমকির মুখে। তার প্রথম কাজ নতুন প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা ছিল না; বরং রাষ্ট্রকে টিকিয়ে রাখা এবং আবার সুসংহত করা ছিল তার প্রধান দায়িত্ব।

রিদ্দাহ যুদ্ধ, জাকাত অস্বীকারকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান, কোরআন সংকলনের উদ্যোগ এবং ইরাক-শাম বিজয়ের সূচনা, এসবই ছিল ভবিষ্যৎ খেলাফত রাষ্ট্রের ভিত্তি নির্মাণের পদক্ষেপ। তিনি মানুষের যোগ্যতা মূল্যায়নেও ছিলেন অসাধারণ দূরদর্শী। খালিদ ইবনে ওয়ালিদ, আবু উবাইদা ইবনুল জাররাহ, আমর ইবনুল আস, মুসান্না ইবনে হারিসার মতো দক্ষ ব্যক্তিদের যথাযথ দায়িত্ব দিয়ে তিনি রাষ্ট্রকে সংকট থেকে উত্তরণের পথে এগিয়ে নেন।

মিসরীয় ইতিহাসবিদ মুহাম্মদ হুসাইন হাইকাল যথার্থই মন্তব্য করেছেন, আবু বকর (রা.) ও উমর (রা.)-এর খেলাফতকে একই মানদণ্ডে মূল্যায়ন করা ঠিক নয়। কারণ উমর (রা.) যে সুসংহত রাষ্ট্রের দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন, তার ভিত্তি নির্মিত হয়েছিল আবু বকর (রা.)-এর হাতেই। আধুনিক অনেক গবেষকও তার খেলাফতকে ‘Survival and Consolidation’ (রাষ্ট্রকে টিকিয়ে রাখা ও সুসংহত করার পর্যায়) হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তাই তার সবচেয়ে বড় সাফল্য নতুন সাম্রাজ্য নির্মাণ নয়; বরং খেলাফত রাষ্ট্রকে সংকট থেকে রক্ষা করে ভবিষ্যৎ বিস্তারের জন্য দৃঢ় ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করা।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন