স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু তার ‘দ্য ডিসকভারি অব ইন্ডিয়া’ গ্রন্থে মোহন দাস করম চাঁদ গান্ধীকে (এম কে গান্ধী) নিয়ে এমন এক পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছিলেন, যাতে সে সময়ের মানুষের ব্যাপক অনুভূতির প্রতিফলন ঘটেছিল। সেটি ছিল এমন এক অনুভূতি, যা অনেকেই অনুভব করলেও এতটা স্পষ্টভাবে আগে কেউ বলতে পারেননি। নেহরুর কথাগুলো কিছুটা নিজের ভাষায় বললে দাঁড়ায়Ñ‘ব্রিটিশ শাসনাধীন ভারতে প্রধান অনুভূতিটিই ছিল ভয়। এক সর্বব্যাপী, দমনমূলক ও শ্বাসরুদ্ধকর ভয়। পুলিশের ভয়, আমলাতন্ত্রের ভয়, দমনমূলক আইন ও কারাগারের ভয়... আর তারপরই এলেন গান্ধী... যেন হঠাৎ করেই মানুষের কাঁধ থেকে ভয়ের সেই কালো চাদর বা ছায়া সরে গেল।’
আমি এভাবেই লেখাটি শুরু করছি ঠিকই, কিন্তু তার মানে এই নয় যে, আমি বিজেপির শাসনকে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের সমতুল্য মনে করছি। কারণ, ব্রিটিশ শাসকরা তো আর ভারতীয়দের ভোটে নির্বাচিত ছিলেন না। আবার গান্ধী ও বর্তমান সময়ের সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুকের মধ্যেও সমতা টানার কোনো ইচ্ছা আমার নেই। আমি নেহরুর সেই বর্ণনাকে একটি রাজনৈতিক রূপক হিসেবে ব্যবহার করছি। এটি সর্বজনবিদিত যে, নির্বাচিত সরকারও ভিন্নমত দমন, ভিন্নমতাবলম্বীদের হুমকি, সর্বব্যাপী নজরদারি এবং যেকোনো মূল্যে আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টার মাধ্যমে ভয়ের এক ব্যাপক পরিবেশ তৈরি করতে পারে। গত এক দশক বা তার কিছু বেশি সময় ধরে চলা বিজেপি শাসনেও এই বৈশিষ্ট্যগুলো আছে। বিজেপি তার নির্বাচনি জয়কে সমাজ এবং অনির্বাচিত প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর পূর্ণ কর্তৃত্ব বা আধিপত্য বিস্তারের বৈধতা হিসেবে কাজে লাগাচ্ছে।
দিল্লির যন্তর মন্তর এবং ভারতের অন্যান্য স্থানে শিক্ষার্থীদের এবারের বিক্ষোভ সেই বিজেপি সরকারের তৈরি করা ‘ভয়ের কালো ছায়া’ বা চাদরটিকে সরিয়ে দিয়েছে। যদিও এই বিক্ষোভের সূচনা হয়েছিল শিক্ষা সংস্কারের দাবিকে কেন্দ্র করে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা নরেন্দ্র মোদি সরকারের কর্মপদ্ধতির বিরুদ্ধে এক তীব্র সমালোচনায় পরিণত হয়। শাসকরা এই হুমকির প্রকৃতি বুঝতে পেরে শুরুতেই তা দমন করতে বলপ্রয়োগ শুরু করেন। কিন্তু পুলিশের পেলেট গান কিংবা পেরেক-বসানো লাঠি শিক্ষার্থীদের ভয় দেখিয়ে চুপ করাতে পারেনি। বিক্ষোভকারীদের সংখ্যা ক্রমাগত বাড়তে থাকে এবং সেই জনস্রোত হয়ে ওঠে অন্তহীন। শেষ পর্যন্ত দেশের যুবসমাজের ওপর আঘাত হানার মতো দুঃসাহস আর সরকারের হয়নি না, সরকার নতিস্বীকার করল।
এক অভূতপূর্ব সূচনা
বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে শিক্ষার্থীদের সাহস ও মেরুদণ্ড সোজা রাখার আরেকটি দিকও উল্লেখযোগ্য। এই বিক্ষোভ চলাকালে শারীরিক নির্ভীকতার পাশাপাশি ভার্চুয়াল জগতেও তারা অসীম সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় সোশ্যাল মিডিয়ায় বিজেপির একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল। শিক্ষার্থীরা সেই বাস্তবতাকে উল্টে দিয়েছে। তাদের সমালোচনার ভাষা ছিল বিদ্রুপ, উপহাস ও রসবোধে (যার কোনো কোনোটি ছিল ধৃষ্টতাপূর্ণও) ভরপুর, ঠিক যেভাবে হিন্দুত্ববাদী জাতীয়তাবাদী মহল বছরের পর বছর ধরে এই অনলাইন কৌশলগুলো ব্যবহার করে আসছে।
বিজেপির শক্তিশালী সোশ্যাল মিডিয়ার ক্ষমতা শেষ পর্যন্ত অকার্যকর হয়ে পড়ে। আন্দোলনকারীদের ‘দেশবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া, তাদের আন্দোলনকে বিদেশি শক্তির অর্থপুষ্ট বলা এবং তাদের ভাষাকে ‘ভারতীয় সংস্কৃতি’র অবমাননা হিসেবে তুলে ধরার মতো যেসব চিরাচরিত অপবাদ বা কৌশল ব্যবহার করা হতো, সেগুলো আর ধোপে টেকেনি। এমনকি তথাকথিত ‘গোদি মিডিয়ার (সরকারঘেঁষা গণমাধ্যম) যেসব টেলিভিশন উপস্থাপক ও প্রতিবেদক ক্লান্তিহীনভাবে বিজেপি সরকারের যুগান্তকারী মহিমা প্রচার করেন, তারাও শিক্ষার্থীদের রোষানল এড়াতে পারেননি। হিন্দুত্ববাদী জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক কৌশলের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা ‘বয়ান নিয়ন্ত্রণ’-এর ক্ষমতা যেন পুরোপুরি ধূলিসাৎ হয়ে গেল।
কিন্তু ভয়ের পরিবেশ কি চিরতরে কেটে গেছে? ‘হ্যাঁ’ বলাটা হবে চরম অবিবেচকের কাজ। পরিস্থিতি অনুকূলে এলেই বিজেপি সম্ভবত পাল্টা আঘাত হানবে। তারা মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় বিশ্বাসী নয়। বরং বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা ডানপন্থি পপুলিস্ট বা জনতুষ্টিবাদী দলগুলোর মতোই বর্তমান বিজেপি মতপ্রকাশের স্বাধীনতা শুধু নিজেদের জন্যই সীমাবদ্ধ রাখতে এবং প্রতিপক্ষ ও ভিন্নমতাবলম্বীদের স্বাধীনতা খর্ব করতে চায়। কখনো কখনো তারা তা করে অত্যন্ত নির্মমভাবে। তবে আপাতত ভিন্নমত পোষণের বা সমালোচনার পরিসর যে নিঃসন্দেহে তৈরি হয়েছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
সিজেপি ও ছাত্রদের এই আন্দোলন এরই মধ্যে এমন কিছু অর্জন করেছে, যা অভূতপূর্ব। শিক্ষা কখনোই ভারতের জাতীয় রাজনীতির চালিকাশক্তি হয়ে ওঠেনি। শিক্ষা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সেমিনার কক্ষে, ইংরেজি ভাষার সংবাদপত্রে এবং নোবেলজয়ী অমর্ত্য সেনের ‘সামর্থ্য’ (Capabilities)-বিষয়ক বিখ্যাত তত্ত্ব নিয়ে আয়োজিত সম্মেলনে বিভিন্ন সময়ে আলোচনা হয়েছে। কিন্তু তা কখনোই কোনো গণআন্দোলন বা নির্বাচনি প্রচারকে পরিচালিত করেনি। ১৯৭৪-৭৫ সালের বিখ্যাত ‘জেপি’ আন্দোলনের মূল চালিকাশক্তি শিক্ষার্থীরা ছিল ঠিকই, কিন্তু এই আন্দোলনটি শিক্ষাকেন্দ্রিক ছিল না, বরং বেকারত্ব, মুদ্রাস্ফীতি ও দুর্নীতিই ছিল এর মূল কারণ।
অবশ্য এ ক্ষেত্রে দুটি আংশিক ব্যতিক্রমও রয়েছে। বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে ভারতের সমাজ সংস্কারক, দার্শনিক ও আধ্যাত্মিক নেতা নারায়ণ গুরু কেরালার এজাভা সম্প্রদায়ের মধ্যে বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন ‘শিক্ষার মাধ্যমে আলোকিত হও এবং সংগঠনের মাধ্যমে শক্তিশালী হয়ে ওঠো’ এই স্লোগান সামনে রেখে। আর দলিতদের মুক্তির লক্ষ্যে বি আর আম্বেদকরের রাজনীতির মূল স্লোগানও ছিলÑ‘শিক্ষিত হও, সংগঠিত হও ও আন্দোলন গড়ে তোলো’।
তবে আম্বেদকরের জীবদ্দশার তুলনায় বর্তমানে তার প্রভাব অনেক বেশি। মূলত মহারাষ্ট্রেই গণরাজনীতির ওপর আম্বেদকরের প্রভাব বিশেষভাবে অনুভূত হয়েছিল। সামগ্রিকভাবে বিচার করলে দেখা যায়, ভারতের নির্বাচনি ও আন্দোলনভিত্তিক রাজনীতি কখনোই শিক্ষা-সংক্রান্ত বিষয়গুলো কেন্দ্র করে গড়ে ওঠেনি বা পরিচালিত হয়নি। সেদিক থেকে বিবেচনা করলে শিক্ষা বিষয়ে ভারতের রাজনৈতিক জড়তা বা স্থবিরতা কাটাতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সাড়া জাগানো একটি আন্দোলন হিসেবে সিজেপি হয়তো বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
এরপর কী
বর্তমান পরিস্থিতির বাইরে গণতন্ত্রের ওপর এর সুদূরপ্রসারী প্রভাবের ক্ষেত্রে আসল বিষয়টি হলো সিজেপির আন্দোলনের এই উদ্দীপনা কীভাবে নির্বাচনি ও দলীয় রাজনীতিকে প্রভাবিত করবে। বিজেপিকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে, তাদের পুরোনো মিত্ররা নীরব রয়েছে এবং নতুন মিত্ররা হয়তো ভাবছে, কোনো দ্বিধা-সংকোচ ছাড়াই পক্ষ পরিবর্তন করাটা আদৌ ভালো কোনো সিদ্ধান্ত ছিল কি না। তবে কংগ্রেস এবং সমাজবাদী পার্টি (এসপি) এই আন্দোলন থেকে স্পষ্টভাবেই লাভবান হয়েছে। বিশেষ করে, রাহুল গান্ধী, যাকে সাম্প্রতিক বিধানসভা নির্বাচনের পর আবার অকার্যকর বলে খারিজ করে দেওয়া হয়েছিল, তিনি অনেকটাই নিজের হারানো অবস্থান ফিরে পেয়েছেন।
দিল্লির রাস্তায় অবস্থান কর্মসূচির স্থান থেকে পুলিশ যখন রাহুল গান্ধীকে টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছিল এবং তার মুখ দিয়ে রক্ত ঝরছিল, সেই দৃশ্যটি ছিল এই আন্দোলনের অন্যতম এক মর্মস্পর্শী ও জোরালো ছবি। শুরুতে তার অবস্থান যা-ই থাকুক না কেন, শেষ পর্যন্ত এই আন্দোলনের প্রতি তার সমর্থন ছিল নির্ভীক ও অবিচল। ভারতের তরুণ সমাজ নিশ্চয়ই বিষয়টি লক্ষ করেছে।
দলীয় রাজনীতির ক্ষেত্রে একটি তাৎক্ষণিক প্রশ্ন হলোÑআগামী দিন ও মাসগুলোয় সংসদীয় কৌশলের ওপর এই আন্দোলনের কী প্রভাব পড়বে? সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়বে এমন গুরুত্বপূর্ণ সব আইনি বিল নিয়ে বিতর্ক ও ভোটাভুটি হওয়ার কথা রয়েছে পার্লামেন্টে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নির্বাচন। এই আন্দোলন কি উত্তরপ্রদেশের আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে কোনো প্রভাব ফেলবে, যেখানে কংগ্রেস ও এসপি জোটবদ্ধ হয়ে লড়ছে? উত্তরপ্রদেশে বিপুলসংখ্যক তরুণ জনগোষ্ঠী রয়েছে, সেখানকার শিক্ষাব্যবস্থা বিপর্যস্ত এবং কর্মসংস্থানের পরিস্থিতি দেশের অন্যান্য স্থানের মতোই শোচনীয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বরং আরো খারাপ। বিশাল আয়তন ও গুরুত্বের কারণে উত্তরপ্রদেশের ঘটনাপ্রবাহ প্রায়ই জাতীয় পর্যায়ে প্রভাব ফেলে। আগামী দিনের জাতীয় রাজনীতি ও নির্বাচনি ফল যা-ই হোক না কেন, এবারের এই ছাত্র আন্দোলনের দুটি উল্লেখযোগ্য ও তাৎক্ষণিক ফল আবার উল্লেখ করা প্রয়োজন। জনমতের ওপর একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তারের যে পথে বিজেপি এগিয়ে যাচ্ছিল, তাতে বড় ধরনের ছেদ পড়েছে বা ফাটল তৈরি হয়েছে এবং এত দিন ভয়ের যে কালো ছায়া দেশকে গ্রাস করেছিল, তা আপাতত সরে গেছে।
দ্য প্রিন্ট অবলম্বনে মোতালেব জামালী
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

