কলড্রপে নাকাল মোবাইল গ্রাহক, পাঁচ বছরে ৬৬ হাজারের বেশি অভিযোগ

কলড্রপে নাকাল মোবাইল গ্রাহক, পাঁচ বছরে ৬৬ হাজারের বেশি অভিযোগ

মোবাইল ফোনে কল ঢুকলেও কথা শোনা যায় না, কথা বলতে বলতে সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, কখনো আবার কল রিসিভের তিন থেকে ১০ সেকেন্ডের মধ্যেই কেটে যায়। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় মোবাইল ব্যবহারকারীদের এমন ভোগান্তি নিত্যদিনের।

কলড্রপের কারণে একদিকে জরুরি কথাও ঠিকমতো বলা যাচ্ছে না, অন্যদিকে বারবার কল করায় বাড়ছে খরচ। ঘনবসতি, উঁচু ভবন, ব্যবহারকারীর তুলনায় বেতার তরঙ্গের স্বল্পতা ও প্রয়োজনীয় টাওয়ারের অভাবকে নেটওয়ার্ক সমস্যার অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন ভুক্তভোগীরা।

বিজ্ঞাপন

কারওয়ান বাজারের একটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে কর্মরত হাবিব ১০ বছর ধরে একটি মোবাইল অপারেটরের সিম ব্যবহার করছেন। তার অভিযোগ, অফিসের আশপাশে উঁচু ভবনের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার পর থেকে কলড্রপের সমস্যা প্রকট হয়েছে। মিরপুরে তার বাসার এলাকায়ও একই সমস্যায় পড়তে হয়।

গাবতলীর সোহেল, উত্তরার আরমান ও যাত্রাবাড়ীর মিজানসহ একাধিক গ্রাহকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কলড্রপের পাশাপাশি দুর্বল নেটওয়ার্ক, কথা অস্পষ্ট শোনা, কল আটকে যাওয়া এবং ‘নো নেটওয়ার্ক’ দেখানোর মতো সমস্যায় পড়ছেন তারা। অনেক সময় কল রিসিভ করার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এতে জরুরি যোগাযোগ ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি একই কথা বলতে বারবার কল করতে হচ্ছে।

জানা গেছে, ঘনবসতি এলাকায় কলড্রপের ঘটনা বেশি ঘটছে। কারণ, একসঙ্গে অনেকগুলো কল যখন নেটওয়ার্কে ঢোকে তখন তরঙ্গ পর্যাপ্ত পরিমাণ সেবা দিতে পারে না। পাশাপাশি মোবাইল অপারেটরগুলোর পুরোনো সিমে এ সমস্যা বেশি। এছাড়া আগে যে এলাকায় একটি টাওয়ার দিয়ে সব নেটওয়ার্ক কাভার সম্ভব হতো, ওই এলাকায় অনেক উঁচু ভবন হওয়ার কারণে এ সমস্যা আরো বেশি প্রকট হয়েছে।

এছাড়া মোবাইল অপারেটরদের বেতার তরঙ্গের (স্পেকট্রাম) স্বল্পতার কারণে কলড্রপের ঘটনা ঘটছে। এসব বিষয়ে গ্রাহকরা প্রায়ই বিটিআরসিতে অভিযোগ দিয়ে থাকেন। কলড্রপসহ একাধিক সেবা না পেয়ে গত পাঁচ বছরে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ রেগুলেটরি কমিশনে (বিটিআরসি) প্রায় ৬৬ হাজার গ্রাহকের অভিযোগ জমা পড়েছে।

মোবাইল ব্যবহারকারী ও একাধিক প্রযুক্তিবিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কলড্রপ নানা কারণে হতে পারে। তবে বেশি হয় তরঙ্গস্বল্পতার কারণে। এছাড়া মোবাইল হ্যান্ডসেটে সমস্যা, অপর্যাপ্ত টাওয়ার, ফাইবার সংযোগে বিঘ্ন এবং হ্যান্ডসেট বা সিমের সমস্যাসহ বিভিন্ন কারণে কলড্রপ হতে পারে।

তরঙ্গস্বল্পতায় বাড়ছে চাপ

বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) তথ্যানুযায়ী, দেশে মোবাইল গ্রাহকের সংখ্যা প্রায় ১৯ কোটি চার লাখ। এরমধ্যে ইন্টারনেট গ্রাহক ১৩ কোটি ৭৬ লাখ ৬০ হাজার। বিপুলসংখ্যক গ্রাহকের তুলনায় মোবাইল অপারেটরদের ব্যবহৃত বেতার তরঙ্গের পরিমাণ কম হওয়ায় নেটওয়ার্কের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।

তথ্যানুযায়ী, দেশে গড়ে প্রতি ১৩ লাখ মোবাইল গ্রাহকের বিপরীতে এক মেগাহার্টজ বেতার তরঙ্গ ব্যবহৃত হচ্ছে। একটি শীর্ষস্থানীয় অপারেটরের ক্ষেত্রে প্রতি এক মেগাহার্টজ তরঙ্গে গ্রাহকসংখ্যা ২০ লাখ পর্যন্ত। অথচ অন্যান্য দেশে প্রতি এক মেগাহার্টজ তরঙ্গে তিন থেকে চার লাখ গ্রাহককে সেবা দেওয়ার নজির রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

প্রয়োজনের তুলনায় সীমিত তরঙ্গ দিয়ে বিপুলসংখ্যক গ্রাহককে সেবা দেওয়ায় নেটওয়ার্কে চাপ তৈরি হচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে কলের মান ও মোবাইল ইন্টারনেটের গতিতে। বিটিআরসির কাছে অব্যবহৃত তরঙ্গ থাকলেও তা কীভাবে ও কত দ্রুত অপারেটরদের ব্যবহারের আওতায় আনা হবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

বিটিআরসির সাম্প্রতিক এক সভায় মোবাইল অপারেটরদের অতিরিক্ত লোয়ার-ব্যান্ড তরঙ্গ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বলে জানা গেছে। এজন্য ৮৮০ থেকে ৮৮৮.৪ মেগাহার্টজ এবং ৯২৫ থেকে ৯৩৩.৪ মেগাহার্টজ ব্যান্ড নির্ধারণ করা হয়েছে। লোয়ার-ব্যান্ড তরঙ্গ তুলনামূলকভাবে বেশি দূরত্বে পৌঁছাতে এবং ভবনের ভেতরে নেটওয়ার্ক কাভারেজ বাড়াতে সহায়তা করতে পারে।

পাঁচ বছরে ৬৬ হাজারের বেশি অভিযোগ

মোবাইল সেবার মান নিয়ে বিটিআরসিতে গ্রাহকদের অভিযোগের বড় অংশই নেটওয়ার্কের দুর্বলতা, কলড্রপ ও ইন্টারনেটের ধীরগতিসংক্রান্ত। গত সাড়ে পাঁচ বছরে দেশের চার মোবাইল অপারেটরের বিরুদ্ধে বিভিন্ন বিষয়ে ৬৬ হাজার ৭০৫টি অভিযোগ জমা পড়েছে। এর মধ্যে ৬৫ হাজার ৮৫৬টি নিষ্পত্তি করা হয়েছে বলে বিটিআরসি জানিয়েছে।

গত ১৯ আগস্ট বিটিআরসির এক গণশুনানিতে এসব তথ্য উঠে আসে। অভিযোগের মধ্যে সেবার মান নিয়ে অসন্তোষ যেমন রয়েছে, তেমনি ডেটার গতি, রিচার্জ, প্যাকেজ পরিবর্তন ও ভ্যালু অ্যাডেড সার্ভিস (ভ্যাস) নিয়েও অভিযোগ করেছেন গ্রাহকরা।

২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিটিআরসিতে বিভিন্ন বিষয়ে মোট ১১ হাজার ৪২৭টি অভিযোগ জমা পড়ে। এর মধ্যে সেবার মান নিয়ে অভিযোগ ছিল ৩,৫২৯টি। এছাড়া ডেটার গতি নিয়ে ৯২৬টি, বিবিধ বিষয়ে ১,৩৩১টি, ভ্যাস নিয়ে ৮১১টি, লাইসেন্সসংক্রান্ত ৭৯৮টি, রিচার্জ নিয়ে ৪৬৭টি, প্যাকেজ মাইগ্রেশন নিয়ে ৬৪৭টি এবং ডেটাসংক্রান্ত ৪৮১টি অভিযোগ নথিভুক্ত হয়।

গ্রাহকরা বিটিআরসির ১০০ নম্বর শর্টকোডে ফোন করে কিংবা ওয়েববক্স ও ই-মেইলের মাধ্যমে অভিযোগ জানাতে পারেন। অভিযোগ পাওয়ার পর তা সংশ্লিষ্ট অপারেটরের কাছে পাঠিয়ে ব্যাখ্যা চাওয়া এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া অনুসরণ করে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি।

কলড্রপের কারণ ও প্রতিকারের বিষয়ে জানতে বিটিআরসির চেয়ারম্যান এমদাদ উল বারীর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। মোবাইল অপারেটরদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব মোবাইল টেলিকম অপারেটরস অব বাংলাদেশের (এমটব) মহাসচিব লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) মোহাম্মদ জুলফিকারও গত বৃহস্পতিবার এ বিষয়ে কথা বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন।

টাওয়ার স্থাপনেও বাধা

দেশে বর্তমানে মোবাইল নেটওয়ার্কের জন্য প্রায় ৪৬ হাজার ৫৫০টি টাওয়ার রয়েছে। তবে গ্রাহকের চাহিদা পূরণ ও নেটওয়ার্কের কাভারেজ বাড়াতে আরো প্রায় ১৪ হাজার টাওয়ার প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

তবে অপারেটররা চাইলেই যেকোনো স্থানে টাওয়ার স্থাপন করতে পারে না। এজন্য লাইসেন্সধারী টাওয়ার প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়। স্থান নির্বাচন, অনুমোদন ও অবকাঠামোগত জটিলতার কারণে নতুন টাওয়ার স্থাপনে বিলম্ব হতে পারে। কোথাও কোথাও টাওয়ার স্থাপন নিয়ে বিভিন্ন পক্ষের আপত্তি ও বাধার মুখেও পড়তে হয় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, শুধু টাওয়ারের সংখ্যা বাড়ালেই সব কলড্রপের সমাধান হবে না। প্রয়োজন অনুযায়ী বেতার তরঙ্গ বরাদ্দ, বিদ্যমান নেটওয়ার্কের সক্ষমতা বৃদ্ধি, ফাইবার সংযোগ সচল রাখা এবং সিম ও নেটওয়ার্ক ব্যবস্থাপনার উন্নয়নও জরুরি।

গত ৩০ জুলাই রাজধানীর একটি হোটেলে গ্রামীণফোনের এক অনুষ্ঠানে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম মোবাইল অপারেটরদের কলড্রপ, নেটওয়ার্কের মান এবং ভয়েস ও ডেটা প্যাকেজের মূল্য নিয়ে গ্রাহকদের উদ্বেগ দূর করতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন