এলপিজি সংকটের কারণ ও বাজার পরিস্থিতি জানতে জেলা প্রশাসকদের কাছে জরুরি তথ্য চেয়ে ১৩ দিনেও সাড়া পায়নি জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয় সূত্র আমার দেশকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। এরই মধ্যে আগামী বৃহস্পতি ও শুক্রবার সারা দেশে এলপিজি সিলিন্ডার বিক্রিসহ সব ধরনের সেবা বন্ধ রাখার হুমকি দিয়েছেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। এতে এলপিজি সংকটের মধ্যে নতুন করে ভোগান্তির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সরকারের সূত্রগুলোর দাবি, চাহিদার তুলনায় গত কয়েক মাসে অতিরিক্ত তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) আমদানি হয়েছে। এরপরও গ্রাহকদের কিনতে হচ্ছে নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি টাকায়। কোথাও কোথাও সরকার নির্ধারিত ১,৮৩৭ টাকার ১২ কেজির সিলিন্ডার ২,৫০০ টাকায়ও মিলছে না।
হঠাৎ বাজার থেকে এভাবে এলপিজির সিলিন্ডার উধাও হয়ে যাওয়ার ঘটনায় চিন্তিত সরকারও। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) কার্যকারিতা ও আইন প্রয়োগের দুর্বলতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তারা। অন্যদিকে বিইআরসি বলছে, রেগুলেটরি বডি হিসেবে তারা কেবল নির্দেশনাই দিতে পারে, বাস্তবায়নের দায়িত্ব সরকারের। এদিকে পারস্পরিক সমন্বয়হীনতার কথা বলছেন এ খাতের বিশেষজ্ঞরা।
এলপিজিকে বর্তমানে দৈনন্দিন জীবনের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় উপকরণ হিসেবে উল্লেখ করে জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলেন, এটি কোনো বিলাসী পণ্য নয়, দু-চার দিন ব্যবহার না করলেও চলবে। প্রাত্যহিক জীবনের অন্যতম এ চালিকাশক্তি নিয়ে সরকারের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি রয়েছে বলে অভিমত তাদের।
তারা বলেন, এ বিষয়ে গুরুত্বারোপ করে সরকারের নীতিনির্ধারক, আমদানিকারক ও সরবরাহকারীসহ সবাইকে নিয়ে যে ধরনের সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজন ছিল, সেটা হয়নি। এছাড়াও মূল্য নিয়ন্ত্রণ ও বাজার তদারকির ক্ষেত্রে বিইআরসিকে আইন যেভাবে ক্ষমতা দিয়েছে, তারা সেটা প্রয়োগেও ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জ্বালানি খাত আগের চিহ্নিত লুণ্ঠনকারী অলিগার্ক শ্রেণির বৃত্তেই বন্দি হয়ে আছে। তারা জনগণের পাশাপাশি সরকারকেও জিম্মি করে ফেলেছে। এমন অবস্থায় দেশের জ্বালানি খাতে জরুরি অবস্থা ঘোষণার করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য সরকারকে পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
জ্বালানি বিভাগের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, এলপিজি আমদানিকারকদের সঙ্গে সরকার একাধিকবার সভা করেছে। প্রতিবারই দেশে এলপিজির সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে বলে জানান তারা। ডিলার, ডিস্ট্রিবিউটর ও খুচরা ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে অতিরিক্ত দামে গ্রাহকদের কাছে বিক্রি করছে বলেও অভিযোগ তাদের।
তিনি বলেন, এ পরিপ্রেক্ষিতে গত ৩০ সেপ্টেম্বর জ্বালানি ও বিদ্যুৎ বিভাগ জেলা প্রশাসকদের সঙ্গে বৈঠক করে। বৈঠকে নিজ নিজ জেলার এলপিজি পরিস্থিতি নিয়ে জরুরি ভিত্তিতে একটি নির্দিষ্ট ছকে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়। লিখিত ওই নির্দেশনায় বলা হয়েছে, এলপিজির বাজারমূল্য তদারকির লক্ষ্যে জেলা প্রশাসন কর্তৃক চলমান কার্যক্রমের তথ্য জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগে পাঠাতে অনুরোধ করা হলো। এর সঙ্গে এলপিজি সিলিন্ডারের বাজারমূল্য পরিস্থিতির তথ্যও চাওয়া হয়। তবে বারবার তাগাদা দিয়েও মাঠের তথ্য আনা সম্ভব হচ্ছে না বলে জানান ওই কর্মকর্তা।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় সূত্র জানিয়েছে, জ্বালানি পরিস্থিতির বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী বেশ গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছেন। এরই অংশ হিসেবে বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিয়ে বৈঠক করে বিশেষ নির্দেশনা দিয়েছেন। এলপিজি সংকটসহ বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের সব ধরনের সমস্যা দূর করতে নানা পদক্ষেপ নেওয়ারও নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
দাম যা চায়, তাই পান দোকানদাররা
দফায় দফায় দাম বাড়ানো আর এলপিজির বাজার নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ার জন্য নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিইআরসির ব্যর্থতাকে বড় করে দেখছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা। তবে বিইআরসির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দাম বাড়িয়েও বাজার নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হচ্ছে না। মূলত আমদানি ও সরবরাহকারীদের (অপারেটর) প্রস্তাব অনুযায়ীই গত আট মাসে ৩৫ শতাংশ দাম বাড়ানো হয়েছে বলেও জানান তারা।
বিইআরসির দেওয়া তথ্যমতে, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে প্রতি কেজি এলপিজির দাম ছিল ১১৩ টাকা। সে সময় ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ছিল ১,৩৫৬ টাকা। গত ৪ অক্টোবর প্রতি কেজি এলপিজির দাম নির্ধারণ করা হয় ১৫৩ টাকা। এতে ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম দাঁড়ায় ১,৮৩৭ টাকা।
দাম বাড়ানোর পাশাপাশি বিইআরসি ব্যবসায়ীদের প্রতি বিশেষ সতর্কতাও জারি করেছে। এতে বলা হয়, নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দরে এলপিজি বিক্রি করা দণ্ডনীয় অপরাধ। সরকারকে তদারকি জোরদার করে কালোবাজারি, মজুতদারি ও অতিরিক্ত মুনাফাখোরদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ারও নির্দেশনা দেয় সংস্থাটি।
তবে তাদের এ নির্দেশনা কেউ শোনেনি। যেদিন ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ১,৮৩৭ টাকা নির্ধারণ করা হয়, তার আগেও আড়াই হাজার টাকায় পাওয়া যায়নি রান্নাঘরের অতি প্রয়োজনীয় এ পণ্যটি। আবার খুচরা ব্যবসায়ীদের অগ্রিম টাকা দেওয়ার পরও সিলিন্ডার না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার গ্রাহকরা।
রাজধানীর মাতুয়াইল এলাকার বাসিন্দা আরমান হোসেন আমার দেশকে বলেন, লাইনে গ্যাস নেই। রান্নায় এলপিজিই একমাত্র ভরসা। সিলিন্ডারের গ্যাস শেষ হয়ে যাওয়ার পর কয়েকটি দোকানে গিয়েও গ্যাস পাইনি। তিন দিন চেষ্টার পর অতিরিক্ত ৬০০ টাকা দিয়ে একটি সিলিন্ডার পেয়েছি। এখন প্রয়োজনের তুলনায় রান্না কম করছি। একবেলা রান্না করে দুবেলা খাবার খাই। কিন্তু এতেও সামাল দিতে পারছি না।
যাত্রাবাড়ী এলাকার লোকমান হোসেন বলেন, এলপিজি সিলিন্ডারের দাম এখন দোকানদার যেটা চাইবে, সেটাই দিতে হবে। তারা চায়, আমরাও দিই। অতিরিক্ত টাকা না দিলে তো আর পাওয়া যাবে না।
দোকান বন্ধ রাখার হুমকি ব্যবসায়ীদের
এদিকে তথ্য চাওয়া ও তল্লাশির নামে সরকার হয়রানি করছে দাবি করে এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি আগামী ১৫ ও ১৬ অক্টোবর দেশজুড়ে সব সিলিন্ডারের দোকান বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছে। গতকাল সোমবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের সভাপতি সেলিম খান বলেন, গ্যাস সিলিন্ডারের দাম ও সাপ্লাই নিয়ে বারবার হয়রানির শিকার হচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। এর প্রতিবাদে আগামী বৃহস্পতি ও শুক্রবার সব দোকান বন্ধ থাকবে। এলপি গ্যাস ব্যবসায়ীদের যেসব দাবি দাওয়া আছে, সেগুলো মানা না হলে আরো কঠোর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দেন তিনি।
সমিতির সাধারণ সম্পাদক নাসিরুদ্দিন নাসিম বলেন, শুধু পাঁচটি কোম্পানির হাতে এলপি সিলিন্ডার গ্যাসের বিপণন জিম্মি। তাদের হাত ধরে স্বৈরাচারী কায়দায় এলপি গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধি করা হচ্ছে। এতে সাধারণ ভোক্তাদের পাশাপাশি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
তাদের দাবির মধ্যে রয়েছে-সিলিন্ডারপ্রতি কমিশন ১৫০ টাকা অথবা বিক্রয়মূল্যের সাত শতাংশ নির্ধারণ করা, কোনো কোম্পানি এক মাসে একাধিকবার মূল্য সমন্বয় করতে চাইলে তা বিইআরসির ঘোষণার মাধ্যমে করা, দীর্ঘদিন ধরে গ্যাস সরবরাহে অক্ষম কোম্পানির সিলিন্ডার সরকারিভাবে অথবা সংশ্লিষ্ট কোম্পানির মাধ্যমে পুনরায় গ্যাস ভরার ব্যবস্থা করা, কোম্পানির চালানে প্রকৃত দাম লেখা, কোম্পানির পক্ষ থেকে ন্যায্য পরিবহনভাড়া দেওয়া, সব ধরনের কাগজপত্র ঠিক থাকার পরও গ্যাস সিলিন্ডার বহনকারী পিকআপ বা ট্রাকের বিরুদ্ধে পুলিশের হয়রানি ও মামলা বন্ধ করা এবং ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মাধ্যমে জরিমানা আরোপ বন্ধ করা।
চাহিদার চেয়ে বেশি আমদানির পরও সংকট
বিইআরসি’র তথ্যানুযায়ী, দেশে প্রতি মাসে দেড় লাখ টন এলপি গ্যাসের চাহিদা রয়েছে, যার ৮০ শতাংশ রান্নার কাজে, ১২ শতাংশ শিল্পে এবং আট শতাংশ গাড়ির জ্বালানি অটোগ্যাস হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এলপিজির প্রায় ৯৮ শতাংশই বেসরকারি উদ্যোক্তাদের দখলে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত আগস্টে দেশে এক লাখ ৫৭ হাজার ৭৬০ টন এলপিজি আমদানি করা হয়। সেপ্টেম্বরে আসে দেড় লাখ টনের বেশি। দেশে মোট ২৯টি এলপিজি কোম্পানি চালু থাকলেও সেপ্টেম্বরে আমদানি করেছে মাত্র ১০টি কোম্পানি। জ্বালানি বিভাগের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মাত্র চারটি কোম্পানি দেশের মোট এলপিজি বাজারের ৬৮ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করছে।
দেশে পর্যাপ্ত এলপিজি আছে বলেও দাবি আমদানি ও সরবরাহকারীদের। গত ৩ সেপ্টেম্বর সচিবালয়ে জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ এবং বাণিজ্যমন্ত্রী আবদুল মোক্তাদির বাংলাদেশ এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশনের (লোয়াব) সঙ্গে বৈঠক করেন। দেশে পর্যাপ্ত এলপি গ্যাস রয়েছে এবং কোথাও কোনো সংকট নেই বলেও ওই বৈঠকে ব্যবসায়ী নেতারা সরকারের দুই মন্ত্রীকে আশ্বস্ত করেন। আমদানি ও সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে সরকারের পক্ষ থেকে ব্যবসায়ীদের সব ধরনের সহযোগিতারও প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়।
জ্বালানিমন্ত্রী বলেন, দেশে এলপি গ্যাসের সরবরাহ স্বাভাবিক থাকা সত্ত্বেও কেন এলপিজির ঘাটতির কথা শোনা যাচ্ছে এবং কেন বেশি দাম নেওয়া হচ্ছে, সে বিষয়ে তথ্য ও প্রমাণসহ প্রতিবেদন পাঠাতে জেলা প্রশাসকদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তথ্য পাওয়ার পর আমদানিকারক ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বৈঠক করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কোনো এলাকায় সরবরাহ কম পাওয়া গেলে সেখানে সরবরাহ বাড়াতে পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
জনগণের দুর্ভোগকে পুঁজি করে বিইআরসি অসাধু ব্যবসায়ীদের জনগণের পকেট কাটার সুযোগ করে দিচ্ছে বলে মনে করেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক এম শামসুল আলম। আমার দেশকে তিনি বলেন, ২০২১ সালের আগে ব্যবসায়ীরা ইচ্ছামতো দামে এলপিজি বিক্রি করতেন। আদালতের আদেশে দাম নির্ধারণের ক্ষমতা পায় বিইআরসি। ব্যবসায়ীদের চাপের মুখে আশপাশের দেশগুলোর চেয়ে বাড়তি দাম নির্ধারণ করে দেয় তারা। এরপরও সেটা কার্যকর করতে পারে না। বাজার নিয়ন্ত্রণে বিইআরসিকে আইনে পর্যাপ্ত ক্ষমতা দেওয়া হলেও তারা সেটা কার্যকর করছে না।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


