সারা দেশে বেড়েছে খুন, সাত মাসে ২০৭৬ হত্যা

সারা দেশে বেড়েছে খুন, সাত মাসে ২০৭৬ হত্যা

সারা দেশে আশঙ্কাজনকহারে বেড়েছে খুনাখুনি। রাজনৈতিক কোন্দল, দখল, চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ, ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব, এলাকায় আধিপত্য বিস্তার, আন্ডারওয়ার্ল্ডে আধিপত্যের লড়াই, এলাকাভিত্তিক উঠতি সন্ত্রাসীদের তৎপরতা, মাদক কারবার নিয়ন্ত্রণ, কিশোর গ্যাংয়ের দ্বন্দ্ব, জমি দখল এবং পারিবারিক-সামাজিক কলহ থেকে ঘটছে খুনের ঘটনা। এতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে তৈরি হয়েছে উদ্বেগ।

সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে কিছুটা অস্বস্তিতে রয়েছে সরকার। অপরাধীরা দিনে দিনে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিজে ঢাকা ও ঢাকার বাইরে গিয়ে মাঠ পর্যায়ে পুলিশকে সক্রিয় করাসহ একাধিক উদ্যোগ নিয়েছেন। তা সত্ত্বেও খুনাখুনি রোধ করা যাচ্ছে না।

বিজ্ঞাপন

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্যমতে, গত জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত অর্থাৎ সাত মাসে ঢাকাসহ সারা দেশে খুন হয়েছে ২,০৭৬ জন। আইনশৃঙ্খলার অবনতি হওয়ার কারণে খোদ পুলিশসহ বিভিন্ন সংস্থায় উদ্বেগ রয়েছে। বিশেষ করে ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবে ফ্যাসিস্ট হাসিনার পতনের পর খুনাখুনি বেড়েছে।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর কারাগার থেকে একাধিক শীর্ষ সন্ত্রাসী জামিনে মুক্তি পেয়েছে। কেউ আবার নতুন করে দেশে ফিরেছে। বিদেশে যারা এতদিন নিষ্ক্রিয় ছিল তারা নতুন করে সরব হয়ে দেশে থাকা তাদের অনুগত লোকজনকে দিয়ে আধিপত্য বিস্তার করছে। এতে প্রতিদ্বন্দ্বী গ্রুপগুলোর মধ্যে হানাহানিতে পরিস্থিতি আরো জটিল হয়েছে। আন্ডারওয়ার্ল্ডের লড়াই এখন প্রকাশ্যে চলে এসেছে। দুপক্ষই খুনাখুনিতে জড়াচ্ছে।

এছাড়া ফেব্রুয়ারির পর দেশে নতুন করে রাজনৈতিক মেরূকরণের পর রাজনৈতিক খুনও বেড়েছে। গত সাত মাসে সারা দেশে রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে ৭৫ জন খুনের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ৯০ শতাংশ বিএনপির নেতাকর্মী।

পুলিশ বলছে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর পুলিশ ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টায় আছে। তারা সামাজিক খুনাখুনি রোধে মাঠে কাজ করছেন। পাশাপাশি খুনের ভিকটিমের দ্রুত মামলা নেওয়া ও আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান চালাচ্ছেন এবং তাদের গ্রেপ্তার করছেন। এছাড়া পুলিশ সদর দপ্তরে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের নিয়ে একাধিকবার বৈঠক করেছেন আইজিপি। তিনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় রেঞ্জ ডিআইজি ও জেলার এসপিদের বিভিন্ন নির্দেশনা দিয়েছেন।

এ বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া ও জনসংযোগ) এএইচএম শাহদাত হোসাইন আমার দেশকে জানান, ‘আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার যেকোনো প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।’

জানতে চাইলে অপরাধ বিজ্ঞানী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক তৌহিদুল হক জানান, বিচারহীনতা ও দীর্ঘসূত্রতার কারণে খুনের ঘটনা বাড়ছে। এছাড়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যক্রমে শিথিলতা বা ধীরগতি থাকলে অপরাধীরা সেই সুযোগ নিচ্ছে। অপরাধের সঙ্গে জড়িতদের রাজনৈতিক বা অন্য পরিচয় বিবেচনা না করে দ্রুত আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার তাগিদ দেন তিনি।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত ৫ জানুয়ারি চট্টগ্রামের রাউজানে পূর্ব গুজরা ইউনিয়নে নিজ বাড়ির সামনে জানে আলম সিকদার (৫১) নামের এক যুবদল নেতাকে মুখোশধারী দুর্বৃত্তরা গুলি করে হত্যা করে। গত ২৮ এপ্রিল রাজধানীর নিউমার্কেট এলাকায় শীর্ষ সন্ত্রাসী খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটনকে গুলি করে হত্যা করা হয়। গত ৭ মে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে তালাবদ্ধ ঘর থেকে বর্ষা আক্তার (২০) নামে এক গার্মেন্ট কর্মীর গলাকাটা লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। বর্ষার স্বামী মামুন তার আগের স্ত্রীর সঙ্গে এবং একাধিক নারীর সঙ্গে সম্পর্ক রাখায় বর্ষা বাধা দিলে তাকে নৃশংসভাবে খুন করা হয়।

জানা গেছে, পারিবারিক কলহকে কেন্দ্র করে গত ৮ মে খাগড়াছড়ির মানিকছড়িতে কোদালের আঘাতে মাহিনুর আক্তার (২৪) নামে এক গৃহবধূকে হত্যা করা হয়। গত ৮ মে চট্টগ্রাম নগরের বায়েজিদ এলাকায় প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয় হাসান রাজু নামে এক যুবককে। এ সময় চোখে গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হয় ১১ বছর বয়সি শিশু রেশমি।

গত ৯ মে ময়মনসিংহের মুক্তাগাছায় আন্দালিব সাদমান রাফি নামে এক শিশুকে অপহরণের পর হত্যা করা হয়। গত ৯ মে ঘটে গাজীপুরের কাপাসিয়ার রাউৎকোনা গ্রামে শারমিন আক্তার, তার তিন সন্তান মীম খানম, উম্মে হাবিবা ও ফারিয়া এবং রসুল মিয়াসহ পাঁচজনের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, আর্থিক লেনদেন, পরকীয়া এবং পারিবারিক কলহের জেরে শারমিনের স্বামী ফোরকান মিয়া এ হত্যাকাণ্ড ঘটায়।

গত ১৩ জুন চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার এক জনাকীর্ণ বাজারে যুবদল নেতা মাসুদুল হক চৌধুরীকে প্রকাশ্য দিবালোকে গুলি করে হত্যা করা হয়।

জানা গেছে, গত ৬ আগস্ট ঢাকার সবুজবাগ থানাধীন বাগানবাড়ী কালভার্ট এলাকায় এক নারীর খণ্ডিত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। পরে জানা যায়, ২১ বছর বয়সি ওই নারীর নাম ছুরাইয়া আক্তার। ২০ আগস্ট খুলনার বটিয়াঘাটায় এলাকায় এক নারীর লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। গত ২২ আগস্ট রাতে রংপুর নগরের কামালকাছনা এলাকার মাছুয়াপাড়ায় একটি বাড়ির দ্বিতীয়তলা থেকে একই পরিবারের চারজনের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।

পুলিশ সদর দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে ঢাকাসহ সারা দেশে খুন হয়েছে ২৮৭ জন, ফেব্রুয়ারিতে ২৫০, মার্চে ৩১৭, এপ্রিলে ২৮৮, মে মাসে ৩১০, জুনে ৩২৬ জন ও জুলাই মাসে ২৯৮টি খুনের ঘটনা ঘটেছে। গত সাত মাসে মোট খুন হয়েছে ২,০৭৬ জন। ২০২৬ সালের জুলাই মাসে ২৯৮টি খুনের ঘটনার মধ্যে গণপিটুনিতে ২১ জন ও রাজনৈতিক সহিংসতায় ১১ জন নিহত হয়েছে। প্রত্যেকটি ঘটনায় সংশ্লিষ্ট থানায় খুনের মামলা হয়েছে বলে পুলিশ সদর দপ্তর সূত্রে জানা গেছে।

পুলিশ সদর দপ্তর সূত্রে আরো জানা গেছে, ২০২৫ সালের জুলাই মাসে সারা দেশে খুনের ঘটনা ঘটেছিল ৩৬২টি। ২০২৫ সালের জুন মাসে খুন হয়েছিল ৩৪৪ জন।

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ঢাকার মধ্যে মোহাম্মদপুরের অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের মধ্যেও খুনাখুনি চলছে। সেখানে দিন দুপুরে ঘটছে ছিনতাই। এছাড়া ঢাকার বাইরে খুলনা এলাকায় দেখা যায় খুনের ছড়াছড়ি। পুলিশের একাধিক দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানান, পুলিশের টহল আগের চেয়ে বেড়েছে। নিয়মিত আসামি ধরছে পুলিশ। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর আসামি ধরতে গিয়ে পুলিশ হামলার শিকার হয়েছিল। এই পরিস্থিতির উন্নতি ঘটছে। এছাড়া পুলিশের রাতের টহলও বেড়েছে।

সূত্র জানায়, গণঅভ্যুত্থানের পর মামলার তদন্ত করার জন্য থানার একজন এসআই ঘটনাস্থল ও ভিকটিমের বাসায় যেতে ভয় পেতেন। সেই পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। খুনের মামলা তদন্ত করছে পুলিশ।

তবে পুলিশের একটি সূত্র জানিয়েছে, রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলে সামাজিক ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে খুনাখুনি বাড়ে। তারা সেটি নিয়ন্ত্রণের জন্য কাজ করছেন। এক্ষেত্রে তারা অপরাধীকে ছাড় দিচ্ছেন না। কে কোন দলের সেটি দেখছেন না। অপরাধ নিয়ন্ত্রণে তারা কাজ করছেন।

অবৈধ অস্ত্র ব্যবহারের শঙ্কা

সাম্প্রতিক সময়ে খুনাখুনিতে অবৈধ অস্ত্র ব্যবহারের আশঙ্কা করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এজন্য অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে মনোনিবেশ করেছে পুলিশ, র‌্যাবসহ আইন অন্যান্য সংস্থা। বিশেষ করে জুলাই বিপ্লবের সময় পুলিশের বিভিন্ন থানা ও ব্যারাক থেকে অস্ত্র লুটের ঘটনা ঘটে। ওই লুণ্ঠিত অস্ত্র ও গোলাবারুদের একটি বড় অংশ এখনো উদ্ধার হয়নি। পুলিশ জানায়, বাহিনীর ১,৩১১টি অস্ত্র এখনো উদ্ধার করা যায়নি। খোয়া যাওয়া অস্ত্রগুলোর মধ্যে রয়েছেÑএসএমজি, চায়না রাইফেল ও পিস্তলসহ অন্যান্য অস্ত্র। সেগুলো সন্ত্রাসীদের হাতে চলে গেলে রাজনৈতিক সহিংসতা বাড়ার পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে।

সূত্র জানায়, এসব অস্ত্র উদ্ধারে কোনো সিভিলিয়ান সহযোগিতা করলে পুলিশের পক্ষ থেকে একাধিকবার পুরস্কারের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এখনো এসব অস্ত্র উদ্ধার হয়নি। অস্ত্র উদ্ধারের জন্য তারা অভিযান চালাচ্ছে। পুলিশ সূত্র বলছে, খোয়া যাওয়া অস্ত্র উদ্ধার করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ এসব অস্ত্র কোনোভাবে উগ্রবাদীদের হাতে গেলে সেটির পরিস্থিতি সামাল দেওয়া খুব ভয়াবহ হবে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন