পল্লবীতে শাটার ফেলে ব্যবসায়ীর ওপর হামলা, আতঙ্কে স্থানীয়রা

পল্লবীতে শাটার ফেলে ব্যবসায়ীর ওপর হামলা, আতঙ্কে স্থানীয়রা

রাজধানীর পল্লবীর আদর্শনগরে ফার্মেসিতে ঢুকে ব্যবসায়ীর ওপর হামলার পর ওই এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। ঘটনার এক সপ্তাহ পার হলেও এখনো থানায় মামলা করেননি ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী আফজাল হোসেন। পরিবার এবং নিজের নিরাপত্তাহীনতার কথা জনিয়েছেন তিনি। গণমাধ্যমকর্মীদেরও এড়িয়ে চলছেন। এমনকি স্থানীয়রাও গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে কথা বলছেন না। তারাও আতঙ্কে রয়েছেন। সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে দেখা যায়, পল্লবী এলাকায় অপরাধপ্রবণতা বেড়ে গেছে।

ঘটনাটি ঘটে গত ৩০ সেপ্টেম্বর পল্লবীর ২২ তলা গার্মেন্টের পেছনে আদর্শনগর এলাকার আদনান ফার্মেসিতে। গতকাল বুধবার সরেজমিন অনুসন্ধানে জানা যায়, ঘটনার দিন দুপুর ২টার দিকে চারটি অটোরিকশায় করে ১০-১২ জনের একটি দল সেখানে আসে। দুটি অটোরিকশা আসে গার্মেন্টের পূর্ব পাশ দিয়ে আদর্শনগরের দিক থেকে, দুটি আসে ফার্মেসির বিপরীত পাশের সড়ক দিয়ে। সবার মুখে মাস্ক ছিল। তাদের মধ্যে চারজন দোকানে ঢুকে মুহূর্তের মধ্যে শাটার নামিয়ে দেয়। এরপরই শুরু হয় হামলা।

বিজ্ঞাপন

সন্ত্রাসীদের একজন আফজালের মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে রাখে এবং আরেকজন এলোপাতাড়ি কোপাতে থাকে। এতে আফজালের শরীরে মারাত্মক জখম হয়। হামলার পর তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে অন্তত ২৫টি সেলাই লাগে। পরে ওই ঘটানর ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে পুলিশ তিনজনকে গ্রেপ্তার করে।

আফজাল জানান, তিনি কিছু বুঝে ওঠার আগেই একজন তার মাথায় পিস্তল ঠেকায়। আরেকজন চাপাতি বা রামদাজাতীয় ধারালো অস্ত্র দিয়ে তাকে কোপাতে থাকে। হামলার আকস্মিকতায় হতভম্ব হয়ে পড়েন তিনি। কর্মচারীরা প্রাণভয়ে দোকান থেকে বেরিয়ে যান। ভেতরে আটকেপড়া আফজালকে হামলাকারীরা কোনো কথা বলার সুযোগও দেয়নি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া প্রায় দুই মিনিটের ভিডিওতেও দেখা য়ায়, মুখোশধারী কয়েক ব্যক্তি ওই দোকানির ওপর আক্রমণ করছে। তাদের মধ্যে একজন ধারালো অস্ত্র দিয়ে কোপাচ্ছে, অন্যজন আগ্নেয়াস্ত্র দেখিয়ে ভয় দেখাচ্ছে। হামলার সময় দোকান থেকে কিছু নেওয়ার চেষ্টার দৃশ্যও দেখা যায়।

নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন আফজাল

হামলায় আফজালের বাম হাত, হাতের পেশি ও পিঠসহ শরীরের বিভিন্ন অংশ জখম হয়েছে। শুধু বাম হাতেই প্রায় ২০টি সেলাই দিতে হয়েছে। সব মিলিয়ে ২৫টির মতো সেলাই লেগেছে তার শরীরে। প্রাথমিকভাবে স্থানীয় হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার পর বর্তমানে বাসায় বিশ্রামে আছেন আফজাল। কিন্তু মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন।

প্রায় ২০ বছর ধরে ওই এলাকায় বসবাস

করছেন আফজাল। আদনান ফার্মেসির প্রায় ৫০ গজ দূরেই তার বাসা। ওই দিনের হামলার পর থেকে গণমাধ্যমের সঙ্গেও কথা বলতে ভয় পাচ্ছেন তিনি। গতকাল দুপুরে ওই এলাকায় গিয়ে আফজালের মোবাইল নম্বর সংগ্রহ করে আমার দেশ-এর পরিচয় দিয়ে যোগাযোগের পর প্রথমে কথা বলতে রাজি হননি তিনি। প্রায় এক ঘণ্টা অপেক্ষার পর ঘটনাস্থলের পাশের পান্নু শেখের চায়ের দোকানে এসে কিছু সময় কথা বলেন। যাওয়ার সময়ও বারবার সংবাদ প্রকাশ না করার অনুরোধ করেন। আহত হাতের ব্যান্ডেজ দেখিয়ে আফজাল বলেন, এত আঘাতের পরও তিনি প্রাণে বেঁচে আছেন। কিন্তু পত্রিকায় খবর প্রকাশ হলে আবার হামলা হতে পারে—এই ভয় তাকে তাড়া করছে। পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তা নিয়েও তিনি উদ্বিগ্ন।

আতঙ্কে নীরব পুরো এলাকা

ওই ঘটনার পর আতঙ্কে দিন পার করছেন পুরো এলাকার মানুষ। স্থানীয়রা গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে রাজি হচ্ছেন না। গতকাল ওই এলাকায় গেলে স্থানীয়রা সরাসরি কথা বলতে চাননি। ঘটনা জানা থাকলেও এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা লক্ষ করা গেছে তাদের মধ্যে।

পল্লবীতে সাম্প্রতিক চাঁদাবাজি, অস্ত্রের মহড়া ও সন্ত্রাসী গ্রুপের তৎপরতা নিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতার তথ্যও সামনে এসেছে। পুলিশ বলছে, মামুন-মশিউর নাম ব্যবহার করে একটি গ্রুপ এলাকায় চাঁদাবাজি, জমি দখলসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়াচ্ছে। কিন্তু এদের গডফাদারকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কেন বের করছে না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা।

দুই লাখ টাকা চাঁদা দাবি

হামলার কারণ নিয়ে আফজাল ও স্থানীয়রা কোনো কথা বলতে চাননি। তবে পরে পুলিশ ও তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জনিয়েছে, দুই লাখ টাকা চাঁদা চাওয়াকে কেন্দ্র করেই হামলার ঘটনা ঘটে। পুলিশের দাবি, চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানানোয় ওই হামলা হয়েছে। এলাকায় খোঁজ নিয়ে অন্য একটি ক্লু পাওয়া গেছে। জানা গেছে, আদর্শনগর ও আশপাশে অন্তত ১২টি ওষুধের দোকান রয়েছে। এর মধ্যে আদনান ফার্মেসিতে তুলনামূলক বেশি বেচাকেনা হয়। ফলে ওই ঘটনার সঙ্গে ব্যবসায়িক বিরোধের কোনো যোগসূত্র আছে কি না, সে প্রশ্নও উঠেছে। তবে তদন্তসংশ্লিষ্টরা চাঁদার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়েই কার্যক্রম এগিয়ে নিচ্ছেন।

ভিডিও ভাইরালের পর সক্রিয় পুলিশ

ঘটনার পাঁচ দিন পার হলেও আফজাল থানায় কোনো অভিযোগ করেননি। কিন্তু হামলার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি পুলিশের নজরে আসে। তখন পল্লবী থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে যায় এবং আহত ব্যবসায়ীর সঙ্গে যোগাযোগ করে। পরে ভিডিও, সিসিটিভি ফুটেজ ও অন্যান্য তথ্য বিশ্লেষণ করে ঘটনার সঙ্গে জড়িত তিনজনকে গ্রেপ্তার করে ডিবি।

গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন—মো. জনি, মো. পারভেজ ও হারুন। জনি ও পারভেজকে বাউনিয়া বাঁধ এলাকায় অন্য একটি ঘটনায় অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য এবং ভিডিও-সিসিটিভি বিশ্লেষণের সূত্র ধরে হারুনকে শনাক্ত করা হয়। গ্রেপ্তার তিনজনের কাছ থেকে একটি ৯ এমএম বিদেশি পিস্তল, দুটি ম্যাগাজিন ও আট রাউন্ড গুলি উদ্ধার করে পুলিশ। তাদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা থাকার তথ্যও দিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

ডিবির মিরপুর বিভাগ বলছে, হামলার সঙ্গে মিরপুরের সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোর দ্বন্দ্বের যোগসূত্র রয়েছে। তদন্তে শীর্ষ সন্ত্রাসী মামুন-মশিউর গ্রুপের অনুসারীদের নাম এসেছে। ওই ঘটনায় জনি, পারভেজ, হারুন, রিয়াজ, বাবুসহ কয়েকজনকে শনাক্ত করা হয়েছে। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, এদের মধ্যে কয়েকজন কাশেমের নির্দেশে কাজ করছে। ওই ঘটনায় জড়িত বাকিদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন