গণতন্ত্রের পুনরুত্থান ও সম্প্রীতির আবাহনে বাংলা নববর্ষ বরণ

মাহমুদুল হাসান আশিক

গণতন্ত্রের পুনরুত্থান ও সম্প্রীতির আবাহনে বাংলা নববর্ষ বরণ
ছবি: রফিকুর রহমান রেকু

জীর্ণ পুরাতনকে বিদায় জানিয়ে নতুন এক ভোরের প্রত্যাশায় জেগে উঠেছিল বাংলাদেশ। রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে উৎসবমুখর পরিবেশে উদযাপিত হয়েছে বাঙালির প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখ। গত দেড় দশকের রাজনৈতিক অচলায়তন আর বৈষম্যের দেয়াল ভেঙে নতুন বৈষম্যহীন ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের স্বপ্ন নিয়ে শুরু হলো বঙ্গাব্দ ১৪৩৩।

মঙ্গলবার ভোরের রক্তিম সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গেই রমনার বটমূলে ছায়ানটের শিল্পীদের সুরের মূর্ছনায় সূচিত হয় দিনব্যাপী এই উৎসব। তবে এবারের বর্ষবরণ কেবল আনন্দ-উচ্ছ্বাসে সীমাবদ্ধ ছিল না; জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে এবারের বৈশাখে মিশে ছিল রাজনৈতিক মুক্তি, ন্যায়বিচার এবং সাংস্কৃতিক পরিচয়ের নতুন এক গভীর সংকল্প। ইসলামপন্থি বিভিন্ন দল ও সংগঠনের ব্যতিক্রমী কিছু আয়োজন এবারের পহেলা বৈশাখ উদযাপনে ভিন্ন মাত্রা যোগ করে।

বিজ্ঞাপন

পহেলা বৈশাখের মূল আকর্ষণ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) চারুকলা অনুষদ আয়োজিত শোভাযাত্রায় এবার এসেছে পরিবর্তনের ছোঁয়া। দীর্ঘ দেড় দশক পর ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’র বিতর্ক কাটিয়ে এর নতুন নাম দেওয়া হয়েছে ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’। এবারের শোভাযাত্রার মূল প্রতিপাদ্য ছিল ‘নববর্ষের ঐকতান, গণতন্ত্রের পুনরুত্থান’।

সকাল ঠিক নয়টায় ঢাবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলামের নেতৃত্বে চারুকলা প্রাঙ্গণ থেকে শুরু হওয়া এই বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রায় অংশ নেন সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরীসহ বিশিষ্টজনরা। লাল ঝুঁটির বিশালাকার মোরগ ছিল এবারের শোভাযাত্রার প্রধান মোটিফ, যা নতুন দিনের জাগরণ ও আলোর বার্তা বহন করছিল। এছাড়া শান্তি ও সম্প্রীতির প্রতীক হিসেবে ‘শান্তির পায়রা’, বাঙালির লোকজ সংগীতের ধারক ‘বেহালা’, শক্তি ও ঐতিহ্যের প্রতীক ‘হাতি’ এবং গতি ও সাহসের প্রতীক ‘ঘোড়া’র মোটিফগুলো মানুষের দৃষ্টি কেড়েছে।

শোভাযাত্রাটি রাজু ভাস্কর্য ও দোয়েল চত্বর হয়ে বাংলা একাডেমি প্রদক্ষিণ করে পুনরায় চারুকলায় গিয়ে শেষ হয়। অংশগ্রহণকারীদের হাতে ছিল ঐতিহ্যবাহী নাটাই-ঘুড়ি, হাতপাখা, চরকি ও নানা রঙের মুখোশ। তবে উৎসবের আড়ালে প্রতিবাদের কণ্ঠস্বরও ছিল স্পষ্ট। বাউলদের ওপর হামলার প্রতিবাদ ও সাংস্কৃতিক আগ্রাসন রুখে দেওয়ার প্ল্যাকার্ড হাতে অনেককেই গণজোয়ারে শামিল হতে দেখা গেছে।

গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতি ও রাজনৈতিক সক্রিয়তা

এবারের বৈশাখের অনুষ্ঠানে রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণ ছিল চোখে পড়ার মতো। বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও আমার বাংলাদেশ পার্টিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল শোভাযাত্রা ও বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে নববর্ষকে স্বাগত জানায়।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্বদানকারী শক্তি এনসিপি বাংলামোটর এলাকায় বর্ণিল মেলার আয়োজন করে। এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ উৎসব উদ্বোধন করে বলেন, ‘আমরা এই নববর্ষে দেশে ন্যায়-ইনসাফ প্রতিষ্ঠার প্রতিজ্ঞা করছি’। তাদের শোভাযাত্রায় ‘সম্প্রীতির ধ্বনিতে উচ্চারিত হোক স্বাধীন বাংলাদেশ’ স্লোগান সম্বলিত প্ল্যাকার্ড নজর কেড়েছে।

অন্যদিকে, বিএনপির সাংস্কৃতিক সংগঠন জাসাস রাজধানীর বিভিন্ন পয়েন্টে গান ও নাচের মাধ্যমে উৎসব উদযাপন করে। জাতীয় সাহিত্য সাংস্কৃতিক সংসদ-দেশীয় সাংস্কৃতিক সংসদও জাতীয় প্রেস ক্লাব থেকে রমনা পর্যন্ত বিশাল শোভাযাত্রা বের করে, যেখানে কৃষকের লাঙল-জোয়াল, জেলের জাল ও গ্রামীণ ঐতিহ্যের নানা উপকরণ প্রদর্শিত হয়। জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এই আয়োজনে সংহতি প্রকাশ করেন।

উৎসবের প্রাণকেন্দ্র ঢাবি

পুরো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা এদিন পরিণত হয়েছিল উৎসবের কেন্দ্রবিন্দুতে। ডাকসুর আয়োজনে হালখাতা প্রদর্শনীর পাশাপাশি বায়োস্কোপের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা হয়েছিল জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বীরত্বগাথা। ছাত্রদলের পুতুলনাচ, নাগরদোলা ও ঐতিহ্যবাহী লাঠিখেলা দেখতে মানুষের উপচেপড়া ভিড় ছিল। সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট ও যুব ফ্রন্ট যৌথভাবে সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনবিরোধী গান ও কবিতার আয়োজন করে উৎসবের মাঝে লড়াইয়ের সুর ধরে রাখে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি আবাসিক হলে পান্তা-ইলিশের প্রথাগত ভোজের পাশাপাশি আয়োজন করা হয়েছিল কাবাডি ও মোরগ লড়াইয়ের মতো লোকজ খেলার। উপাচার্য অধ্যাপক ড. এবিএম ওবায়দুল ইসলাম বলেন, ‘বাংলা নববর্ষ এখন বাঙালির আত্মপরিচয়ের প্রতীক। এই সাংস্কৃতিক শিকড়কে ধারণ করেই আমাদের প্রজন্মকে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে।’

নিরাপত্তা ও জনআকাঙ্ক্ষা

উৎসব ঘিরে যে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে ঢাবি ও রমনা এলাকায় ছিল নজিরবিহীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা। পুলিশ, র‍্যাব ও সোয়াতের বিশেষ দল পুরো ক্যাম্পাস নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে ফেলে। মেলায় আসা সাধারণ মানুষের মতে, দীর্ঘ বছর পর এক ধরনের মানসিক স্বস্তি ও ভীতিমুক্ত পরিবেশে তারা উৎসবে যোগ দিতে পেরেছেন।

ইডেন মহিলা কলেজের একদল শিক্ষার্থী বলেন, আজ মনে হচ্ছে আমরা জাতি হিসেবে এক। ধর্ম-বর্ণের ঊর্ধ্বে উঠে মানুষে-মানুষে যে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন, আজ সেটিই ফুটে উঠেছে। ঢাকার বাইরে থেকেও অসংখ্য মানুষ এদিন রাজধানীতে ছুটে আসেন পটুয়া নাজিরের আঁকা ১০০ ফুট দীর্ঘ পটচিত্র আর বৈশাখী মেলার আনন্দ ভাগ করে নিতে।

২০১৬ সালে ইউনেস্কোর বিশ্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের স্বীকৃতি পাওয়া এই উৎসব এখন আর কেবল ক্যালেন্ডারের একটি দিন নয়, বরং এটি বাঙালির অস্তিত্বের লড়াই ও মিলনের মোহনা। ১৪৩৩ বঙ্গাব্দের প্রথম দিনে দেশজুড়ে ছিল একটাই প্রার্থনাÑ ভেদাভেদ ভুলে গড়ে উঠুক এক মানবিক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ। সব গ্লানি মুছে গিয়ে আলোর পথে যাত্রা করুক আগামীর সোনার বাংলা।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন