দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) জমছে অভিযোগের পাহাড়। তবে কমিশন না থাকায় সেগুলোর নিষ্পত্তি ও মামলা গ্রহণের প্রক্রিয়া কার্যত ধীরগতির। গত পাঁচ মাসে কমিশনে জমা পড়েছে চার হাজার ৩১২টি অভিযোগ। অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, ক্ষমতার অপব্যবহার, বড় প্রকল্পে দুর্নীতি, জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন, অর্থ পাচার ও ব্যাংক ঋণ আত্মসাতের মতো গুরুতর অভিযোগ। তবে কমিশনের চেয়ারম্যান ও কমিশনার নিয়োগ না হওয়ায় অধিকাংশ অভিযোগ অনুসন্ধানের অপেক্ষায় রয়েছে।
গত ৩ মার্চ দুদকের চেয়ারম্যান আবদুল মোমেন এবং দুই কমিশনার মিঞা মুহাম্মদ আলী আকবার আজিজী ও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) হাফিজ আহসান ফরিদ পদত্যাগ করেন। এরপর পাঁচ মাস পেরিয়ে গেলেও নতুন চেয়ারম্যান ও কমিশনার নিয়োগ হয়নি। এতে কমিশনের নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ, নতুন অনুসন্ধান শুরু, মামলা অনুমোদন, চার্জশিট দাখিল, সম্পদ বিবরণী চাওয়া, দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞার আবেদন এবং সম্পদ জব্দের মতো গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমের গতি কমে গেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। তবে ইতোমধ্যে দুদকে সচিবের পদায়নে সংস্থাটির কর্মকর্তারা আশা করেছেন, চেয়ারম্যান নিয়োগে এর কার্যক্রমে আরো গতি বাড়বে।
দুদকের তথ্য অনুযায়ী, কমিশনহীন দুদকে চলতি বছরের মার্চে এক হাজার ১২, এপ্রিলে ৭২১, মে মাসে ৮২৪, জুনে ৯১৩ এবং জুলাইয়ে ৮৪২টি অভিযোগ জমা পড়েছে। অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে প্রায় এক ডজন অভিযোগ গ্রহণ করছে কমিশনের অভিযোগ শাখা।
সূত্র জানায়, ফেব্রুয়ারিতে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর জমা পড়া অভিযোগের অধিকাংশই দুর্নীতির মাধ্যমে কাঁড়ি কাঁড়ি করে অর্থ আয়ের। এছাড়া চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, বড় উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়ম, সরকারি সম্পদ দখল, অবৈধ প্লট বরাদ্দ, মানি লন্ডারিং, সুইজারল্যান্ডে অর্থ পাচার, কানাডায় সম্পদ গড়ে তোলা, শেয়ারবাজারে কারসাজি এবং সরকারি-বেসরকারি ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়ে আত্মসাতের অভিযোগও রয়েছে।
গত ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর দুদকের চেয়ারম্যান পদ শূন্য রয়েছে। এ কারণে নথিভুক্ত অভিযোগগুলো তদন্ত করতে পারছে না কমিশন। পাশাপাশি কমিশনের নীতিগত সিদ্ধান্তগুলোও বড় আকারে বন্ধ রয়েছে। অভিযোগ আসার পর অনুসন্ধান শুরু, ব্যাপকহারে তদন্ত শুরু করা, দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞার আবেদন, আদালতে হিসাব জব্দের আবেদন, সম্পদের হিসাব বিবরণী চাওয়া, নতুন মামলা গ্রহণ, চার্জশিট দাখিলের কাজের গতি কমে গেছে। ফলে দুর্নীতিবাজদের আইনের আওতায় আনতে পারছে না সরকার।
জানা গেছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ২০২৫ সালের ১০ ডিসেম্বর দুদকের চেয়ারম্যান হিসাবে আবদুল মোমেনকে এবং কমিশনার হিসেবে সাবেক জেলা জজ মিঞা মুহাম্মদ আলি আকবার আজিজী এবং ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) হাফিজ আহসান ফরিদকে নিয়োগ দেওয়া হয়। চেয়ারম্যান ও কমিশনাররা দুই মাস দায়িত্ব পালনের পর ৩ মার্চ পদত্যাগ করেন। এখনো চেয়ারম্যান ও দুই কমিশনারের নিয়োগ হয়নি। তবে আগের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, সাতটি কমিশনের মধ্যে মাত্র তিনটি তাদের পূর্ণ মেয়াদ শেষ করতে পেরেছে। বাকি চারটি কমিশনকে মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই দায়িত্ব ছাড়তে হয়েছে।
দুদকের একাধিক কর্মকর্তা জানান, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর কমিশনের অনুসন্ধান ও তদন্ত কার্যক্রমে গতি এসেছিল। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ১৩ হাজারের বেশি অভিযোগের ভিত্তিতে তিন হাজারের মতো ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান তদন্ত, মামলা বা চার্জশিটের আওতায় আসে। এসব মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার বোন রেহানা, পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয় ও শেখ রেহানার মেয়ে টিউলিপ ছাড়াও আওয়ামী লীগ সরকারের মন্ত্রী ও এমপির বিরুদ্ধে অনুসন্ধান ও মামলা হয়। দুদকের আবেদনের পর আদালত প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ জব্দ ও অবরুদ্ধ করার আদেশ দেয়।
সূত্র জানায়, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে দুদকে জমা পড়া ১৩ হাজার ৮৭৭টি অভিযোগের মধ্যে দুই হাজার ৫৩৬টি অভিযোগ অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেয় কমিশন। ওই বছর ৫৯৪টি মামলা দায়ের এবং ৪১৩টি মামলায় চার্জশিট দাখিল করা হয়। এছাড়া ৪৩২ জনকে সম্পদের হিসাব দাখিলের নোটিস দেওয়া হয়।
তবে নতুন সরকার আসার পর কমিশনের কার্যক্রমে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। মূলত দুদকে চেয়ারম্যান নিয়োগ হলে ব্যাপকহারে বদলি ঘটনা ঘটে থাকে। কমিশনের মধ্যে বদলির আতঙ্ক রয়েছে। এজন্য অনেক কর্মকর্তা আগ্রহ সহকারে কাজ না করায় কাজের স্তূপ জমা পড়েছে। নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগ হলে কাজের গতি বাড়বে বলে দুদকের একাধিক কর্মকর্তা দাবি করেছেন।
দুদকের কর্মকর্তারা বলছেন, কমিশন না থাকলেও অভিযোগ গ্রহণের কাজ অব্যাহত রয়েছে। তবে নীতিগত অনুমোদনের অভাবে তদন্ত ও মামলা কার্যক্রম প্রত্যাশিত গতিতে এগোচ্ছে না। ফলে অভিযোগকারীরা ভোগান্তিতে পড়ছেন। এ বিষয়ে দুদকের উপপরিচালক (জনসংযোগ) আকতারুল ইসলাম বলেন, দুদকে অভিযোগ এলে সেগুলো নিয়ম অনুযায়ী গ্রহণ ও নথিভুক্ত করা হচ্ছে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় থাকলে দুদক সক্রিয় থাকে না—এই সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন



