চট্টগ্রাম নগরীর আয়তন বাড়ানোর পরিকল্পনা

চট্টগ্রাম নগরীর আয়তন বাড়ানোর পরিকল্পনা
ছবি: সংগৃহীত

চট্টগ্রাম নগরীর আয়তন ১৫৫ বর্গ কিলোমিটার (কিমি) থেকে বাড়িয়ে ১২৫৫ বর্গ কিমি করার পরিকল্পনা করছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)। এ লক্ষ্যে ২৫ বছর মেয়াদি চট্টগ্রাম সিটি মাস্টারপ্ল্যানের ৯০ শতাংশ কাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে।

আগামী ২০৫০ সালের সম্ভাব্য জনসংখ্যাকে সামনে রেখে প্রণীত এই মহাপরিকল্পনা চূড়ান্ত করার আগে দুই মাসব্যাপী গণশুনানির মাধ্যমে নাগরিকদের মতামত নেওয়ার পাশাপাশি শতাধিক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা করছে সংস্থাটি। ডিসেম্বরের মধ্যে মাস্টারপ্ল্যানের গেজেট প্রকাশের কথা রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

সিডিএ সূত্রে জানা গেছে, এরই মধ্যে ৫০ প্রতিষ্ঠানকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। পর্যায়ক্রমে শতাধিক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে আমন্ত্রণ জানানো হবে। তারা সিডিএ কার্যালয়ে এসে গ্রুপভিত্তিক আলোচনা সভায় অংশ নেবেন। সেখানে কর্মকর্তারা মহাপরিকল্পনার বিভিন্ন দিক তুলে ধরার পাশাপাশি অংশগ্রহণকারীদের মতামত ও পরামর্শ গ্রহণ করবেন।

কর্মকর্তারা জানান, ২০৫০ সালের সম্ভাব্য জনসংখ্যাকে বিবেচনায় রেখেই মাস্টারপ্ল্যান তৈরি করা হচ্ছে। বর্তমানে পরিকল্পনার শেষ পর্যায়ের ত্রুটি-বিচ্যুতি যাচাই-বাছাই চলছে। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে মাস্টারপ্ল্যানের গেজেট প্রকাশ করা হবে।

গত ২ আগস্ট শুরু হওয়া গণশুনানি চলবে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। এ সময়ের মধ্যে নগরবাসী সিডিএ কার্যালয়ে এসে সরাসরি মতামত জানাতে পারবেন। পাশাপাশি ব্যস্ত নাগরিকদের জন্য অনলাইনে মতামত দেওয়ার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। সিডিএর ওয়েবসাইটের মাধ্যমে যে কেউ মাস্টারপ্ল্যান সম্পর্কে মতামত দিতে পারবেন।

সরেজমিনে সিডিএ ভবনের গণশুনানি কক্ষে গিয়ে দেখা যায়, পুরো মাস্টারপ্ল্যান বিভিন্ন ডিজিটাল ব্যানারের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হয়েছে। পুকুর, জলাশয় ও পাহাড় সংরক্ষণ, গ্রিন জোনে ভবন নির্মাণের বিধিনিষেধ এবং আগে থেকে বসতি থাকা পাহাড়ি এলাকায় কীভাবে ভবন নির্মাণ করা যাবে, সেসব বিষয়ও তুলে ধরা হয়েছে।

এদিকে গণশুনানিতে আসা অধিকাংশ ব্যক্তি নিজেদের জমির শ্রেণি নিয়ে জানতে চাইছেন। কেউ পাহাড়ি জমি, কেউ পুকুর বা জলাশয় শ্রেণিভুক্ত জমি সম্পর্কে তথ্য নিচ্ছেন। অনেকে মাস্টারপ্ল্যানের বিভিন্ন দিক নিয়ে আইনি মতামত দিচ্ছেন। আবার কেউ পুকুর ও জলাশয় সংরক্ষণ করলে সিডিএ থেকে কী ধরনের সুবিধা পাওয়া যাবে, সে বিষয়েও জানতে চাইছেন। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এসব প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছেন।

গণশুনানিতে অংশ নেওয়া কয়েকজন ধর্মীয় আবেগ-অনুভূতির বিষয় তুলে ধরে ভবনের নকশা অনুমোদনের দাবি জানিয়েছেন। তবে সিডিএ কর্মকর্তারা স্পষ্ট জানিয়েছেন, আইন ও মাস্টারপ্ল্যানের বাইরে কোনো নকশা অনুমোদন দেওয়া হবে না। বরং আইন ভঙ্গ হলে সেই ভবন ভেঙে দেওয়া হবে।

গণশুনানিতে বন্দর এলাকার মো. রশিদুল হক লিখেছেন, তাঁর জমিটি পুকুর শ্রেণিভুক্ত হলেও বহু আগে ভরাট করা হয়েছে। তিনি দাবি করেন, একসময় পৃথিবী পানির ওপর ছিল, পরে আল্লাহ মানুষকে বসবাসের জন্য স্থলের ব্যবস্থা করেছেন। অথচ সিডিএ তাকে ভবন নির্মাণের অনুমতি দিচ্ছে না।

কালুরঘাটের ববি আক্তার লিখেছেন, তাঁর জমিতে বর্তমানে কিংবা অতীতেও কোনো পুকুর ছিল না। তবু সিডিএ সেটিকে পুকুর হিসেবে দেখিয়ে ভবন নির্মাণের অনুমোদন দিচ্ছে না। উত্তর হালিশহরের নূর আহম্মদ চৌধুরী জানিয়েছেন, তার জমি আবাসিক এলাকায় হলেও মাস্টারপ্ল্যানে সেখানে সড়ক দেখানো হয়েছে। ফলে ভবন নির্মাণ নিয়ে তিনি শঙ্কায় রয়েছেন।

পাহাড়তলীর ছায়ানীড় আবাসিক এলাকার বাসিন্দা মো. শফিকুল ইসলাম এলাকাটিকে গ্রিন জোন থেকে বাদ দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

সিডিএ কর্মকর্তারা জানান, নতুন মাস্টারপ্ল্যানে মোট ভূমির ৩১.৯২ শতাংশ কৃষি, ০.৩২ শতাংশ বিমানবন্দর, ০.০৮ শতাংশ বাস ও ট্রাক টার্মিনাল, ২.৩২ শতাংশ বাণিজ্যিক এলাকা এবং ১৪.৪৮ শতাংশ পরিবেশগতভাবে সংবেদনশীল এলাকা হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি ৩৯ হাজার ৮৪৫টি পুকুর, দিঘি ও পাহাড় সংরক্ষণের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পাহাড়ি এলাকায় নতুন ভবনের নকশা অনুমোদন ও নির্মাণ নিষিদ্ধ রাখা হয়েছে।

তাদের তথ্য অনুযায়ী, ভবিষ্যৎ জনসংখ্যা প্রক্ষেপণ অনুসারে ২০৩১ সালে নগরের জনসংখ্যা হবে ৬৭ লাখ ৮৬ হাজার, ২০৪১ সালে ৭৭ লাখ ১২ হাজার এবং ২০৫০ সালে ৮৬ লাখ ৫৩ হাজার। এই জনসংখ্যার চাপ বিবেচনায় নিয়েই ২৫ বছর মেয়াদি মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে প্রকল্পের ৯০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে এবং আর্থিক অগ্রগতি হয়েছে ৬১ শতাংশ।

পরিকল্পনার অংশ হিসেবে আনোয়ারা উপজেলায় ‘ওয়ান সিটি টু টাউন’ মডেলে একটি স্যাটেলাইট সিটি গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে মূল নগরের ওপর চাপ কমিয়ে আশপাশে পরিকল্পিত উপশহর গড়ে তোলা হবে। চায়না ইকোনমিক জোনও এ মাস্টারপ্ল্যানের আওতায় রয়েছে।

এছাড়া জেলার আটটি উপজেলাকে পরিকল্পনার অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ভবিষ্যতের বিপুল জনসংখ্যার আবাসন নিশ্চিত করতে একাধিক পরিকল্পিত নগর গড়ে তোলার পাশাপাশি পর্যটন উন্নয়ন ও ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা সংরক্ষণের উদ্যোগ রাখা হয়েছে।

তাছাড়া ইউরোপিয়ান ক্লাব, হাতির বাংলো, অলি খাঁ মসজিদ, নন্দিরহাট জমিদার বাড়ি, হাটহাজারীর পাঁচকড়ি জমিদার বাড়ি এবং হাম্মাদিয়া জামে মসজিদ সংরক্ষণের জন্য মাস্টারপ্ল্যানে ১০ দফা সুপারিশ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

এ বিষয়ে সিডিএর উপ-প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ ও মাস্টারপ্ল্যান প্রকল্পের কর্মকর্তা প্রকৌশলী মো. আবু ঈসা আনসারী বলেন, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, পরিবেশ ও মানবাধিকার সংগঠন এবং বিভিন্ন এনজিওকে চিঠি দিয়ে আলোচনা সভায় অংশ নেওয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে। ইতোমধ্যে কেউ কেউ সাড়া দিয়েছেন। সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এই কার্যক্রম চলবে।

তিনি আরো জানান, এখন পর্যন্ত ম্যানুয়ালি ৪০০টি এবং অনলাইনে শতাধিক মতামত পাওয়া গেছে। প্রায় ৮০০ জন গণশুনানিতে অংশ নিয়েছেন। প্রাপ্ত মতামত যাচাই-বাছাই করে প্রয়োজনীয় সংযোজন-বিয়োজন করা হবে। চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশের আগে সংসদ সদস্য, মেয়র, জনপ্রতিনিধি ও সাংবাদিকদের সঙ্গে বৈঠক করা হবে। বাস্তবায়নের স্বার্থে কয়েকটি মৌলিক আইন সংশোধনের প্রয়োজন রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

এ বিষয়ে সিডিএ চেয়ারম্যান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেন বলেন, জনগণের মতামতের ভিত্তিতেই মাস্টারপ্ল্যান তৈরি করা হচ্ছে, যাতে কোনো ত্রুটি থাকলে তা সংশোধনের সুযোগ থাকে। তিনি বলেন, আমরা যুগোপযোগী ও বৈজ্ঞানিক মাস্টারপ্ল্যান করতে চাই। একই সঙ্গে সবাইকে সম্পৃক্ত করে এটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছি। আশা করছি, এতে ভালো ফল পাওয়া যাবে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...