একজন রোগীর ক্যানসারের চিকিৎসা চলছে প্রায় তিন বছর। কিন্তু রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসার অগ্রগতি মূল্যায়নে প্রয়োজনীয় পিইটি বা পেট সিটি স্ক্যান পরীক্ষার সুবিধা চট্টগ্রামে ছিল না ওই সময়ে। শেষ পর্যন্ত চিকিৎসার নানা ধাপ পেরিয়ে মৃত্যুবরণ করেন সেই ক্যানসার রোগী। তার ছেলে ইয়াসিন বলেন, ‘চট্টগ্রামে পেট সিটি স্ক্যান পরীক্ষা না থাকায় মাকে নিয়ে ঢাকায় যেতে হয়েছিল। অসুস্থ অবস্থায় দূরের শহরে পরীক্ষা করানো আমাদের জন্য খুবই কষ্টকর ছিল।’
ইয়াসিনের মায়ের মতো চট্টগ্রামের ক্যানসার রোগীদের দীর্ঘদিনের এ ভোগান্তি কমাতে এবার চট্টগ্রামেই চালু হচ্ছে আধুনিক পজিট্রন ইমিশন টোমোগ্রাফি-কম্পিউটেড টোমোগ্রাফি পেট সিটি স্ক্যান পরীক্ষা। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের পাশে ইনস্টিটিউট অব নিউক্লিয়ার মেডিসিন অ্যান্ড অ্যালায়েড সায়েন্সেস (ইনমাস) ক্যানসার নির্ণয়ের অত্যাধুনিক পেট সিটি ল্যাব স্থাপনের কার্যক্রম গ্রহণ করেছে। এ ল্যাব স্থাপনের কাজ এখন প্রায় শেষ পর্যায়ে। আগামী দুই থেকে আড়াই মাসের মধ্যে এ পরীক্ষা চালুর আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
চমেক হাসপাতাল সূত্র জানায়, চট্টগ্রামে ক্যানসার রোগীর সংখ্যা প্রায় চার লাখ। প্রতিদিন গড়ে ১২০ জনের মতো ক্যানসার রোগী চিকিৎসার জন্য চমেক হাসপাতালে আসেন। বিপুলসংখ্যক রোগীর জন্য চট্টগ্রামে পেট সিটি পরীক্ষার সুযোগ না থাকায় এতদিন তাদের ঢাকায় যেতে হতো।
চমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ তসলিম উদ্দিন জানান, বর্তমানে বেসরকারিভাবে পেট সিটি স্ক্যান পরীক্ষা করতে ৬০-৭০ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ হয়। চমেক হাসপাতালে সরকারি ব্যবস্থাপনায় পরীক্ষা চালু হলে এর খরচ অর্ধেকেরও কম হতে পারে।
তিনি বলেন, পেট সিটি স্ক্যান পরীক্ষার ল্যাব স্থাপনের কাজ এখন শেষ পর্যায়ে রয়েছে। আগামী দুই-আড়াই মাসের মধ্যে চমেক হাসপাতালে এ পরীক্ষা চালু হবে বলে আশা করছি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ইনমাসে পেট সিটি স্ক্যান ল্যাবের পাশাপাশি স্থাপন করা হচ্ছে সাইক্লোট্রন মেশিন। এ মেশিনে পেট সিটি পরীক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় রেডিও আইসোটোপ উৎপাদন করা হবে। ভবনের নিচে নির্মিত বিশেষ বাংকারে যন্ত্রপাতি স্থাপন ও সংযোজনের কাজ চলছে। প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগের প্রক্রিয়াও শেষ পর্যায়ে রয়েছে।
পেট সিটি স্ক্যানের মাধ্যমে শরীরে ক্যানসার কোথায় রয়েছে এবং তা অন্য কোনো অঙ্গে ছড়িয়ে পড়েছে কি না, তা শনাক্ত করা যায়। একই সঙ্গে ক্যানসারের চিকিৎসা কতটা কার্যকর হচ্ছে এবং রোগী চিকিৎসায় সাড়া দিচ্ছেন কি না, সেটিও মূল্যায়ন করা সম্ভব। এছাড়া শরীরের ক্ষতিগ্রস্ত বা অস্বাভাবিক টিস্যু শনাক্ত করতেও এ পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ।
পরীক্ষার সময় রোগীকে তেজস্ক্রিয় গ্লুকোজ জাতীয় উপাদান ইনজেকশনের মাধ্যমে দেওয়া হয়। শরীরের কোষগুলো এটি শোষণ করার পর বিশেষ স্ক্যানারের মাধ্যমে তেজস্ক্রিয়তার মাত্রা শনাক্ত করে ক্যানসারের অবস্থান ও সক্রিয়তা নির্ণয় করা হয়। পুরো প্রক্রিয়ায় সাধারণত এক-দুই ঘণ্টা সময় লাগে।
চট্টগ্রামে এ সুবিধা না থাকায় রোগীদের ঢাকায় গিয়ে পরীক্ষা করাতে হতো। এতে পরীক্ষার খরচের পাশাপাশি যাতায়াত, থাকা-খাওয়া ও অসুস্থ রোগী নিয়ে চলাচলের বাড়তি ব্যয় বহন করতে হতো স্বজনদের। অনেক ক্ষেত্রে শারীরিক অসুস্থতা ও আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে রোগীরা সময়মতো পরীক্ষা করাতে পারতেন না।
চিকিৎসকরা জানান, পেট সিটি স্ক্যান পরীক্ষা সম্ভব না হলে রোগীর প্রয়োজন অনুযায়ী সিটি স্ক্যান, এমআরআই, আলট্রাসনোগ্রাম বা এক্সরের মতো পরীক্ষা করা হয়। এসব পরীক্ষায় টিউমারের আকার, গঠন ও অবস্থান সম্পর্কে তথ্য পাওয়া গেলেও ক্যানসার কোষের বিপাকীয় সক্রিয়তা এবং শরীরের বিভিন্ন অংশে রোগ ছড়িয়ে পড়ার বিষয়টি সব সময় একইভাবে নির্ণয় করা সম্ভব হয় না। এক্ষেত্রে পেট সিটি পরীক্ষা চিকিৎসকদের রোগীর অবস্থা সম্পর্কে আরো স্পষ্ট ধারণা দিতে পারে। তবে কোন রোগীর জন্য কোন পরীক্ষা প্রয়োজন, তা সংশ্লিষ্ট ক্যানসার বিশেষজ্ঞরাই নির্ধারণ করে থাকেন।
ইনমাস চট্টগ্রাম সূত্রে জানা যায়, পেট সিটি স্ক্যান ও সাইক্লোট্রন সুবিধা স্থাপনের জন্য ২০১৯-২০ অর্থবছরে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন প্রায় ১০৬ কোটি টাকার একটি প্রকল্প গ্রহণ করে। প্রকল্পের আওতায় ছয়তলা ভবন, মলিকুলার ল্যাব, সাইক্লোট্রন এবং পেট সিটি মেশিন স্থাপনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
ইনমাস চট্টগ্রামের পরিচালক অধ্যাপক ডা. পবিত্র কুমার ভট্টাচার্য বলেন, ‘সাইক্লোট্রন সুবিধাসহ পেট সিটি ল্যাব স্থাপনের কাজ চলছে। প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ইতোমধ্যে চলে এসেছে। যন্ত্রপাতি স্থাপন ও অন্যান্য কাজ শেষ হলেই পরীক্ষার কার্যক্রম শুরু করা হবে।’
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

