তথ্য গোপন ও অভিনব কৌশলে দেশের বিভিন্ন বন্দর দিয়ে বিলাসবহুল গাড়ি আমদানির ঘটনা বাড়ছে। রেঞ্জ রোভার, লেক্সাস, টয়োটা ও বিএমডব্লিউর মতো দামি গাড়িগুলো ব্যবহৃত যন্ত্রাংশ, গিয়ারবক্স ও পুরোনো পেট্রোল ইঞ্জিনের চালান হিসেবে আমদানি করা হচ্ছে। কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের (সিআইআইডি) সাম্প্রতিক অভিযানে এক সপ্তাহেরও কম সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ১১টি বিলাসবহুল গাড়ি ও গাড়ির খণ্ডিত অংশ আটক করা হয়েছে।
এ ঘটনায় তোলপাড় শুরু হয়েছে দেশজুড়ে। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, জব্দ হওয়া গাড়িগুলোর সম্ভাব্য বাজারমূল্য ৩০ কোটি টাকার বেশি।
কাস্টমস কর্মকর্তারা বলছেন, পূর্ণাঙ্গ গাড়ি আমদানিতে উচ্চহারে শুল্ককর, পুরোনো ও রিকন্ডিশন্ড গাড়ি আমদানিতে বিধিনিষেধ এবং অন্যান্য আমদানি সংক্রান্ত জটিলতা এড়াতেই একটি চক্র বিলাসবহুল গাড়িগুলোকে কেটে টুকরো টুকরো করে সেগুলোকে যন্ত্রাংশ ঘোষণা দিয়ে আমদানি করছে। দেশে আনার পর বিভিন্ন ওয়ার্কশপে নিয়ে জোড়া লাগিয়ে তৈরি করা হচ্ছে পূর্ণাঙ্গ গাড়ি। আটক হওয়া গাড়িগুলো তিন হাজার থেকে সাড়ে চার হাজার সিসি পর্যন্ত।
কাস্টমস সূত্র জানায়, দুই হাজার সিসির উপরে গাড়িগুলো বিলাসি আইটেম হিসেবে চিহ্নিত। প্রকারভেদে এসব গাড়ির শুল্ক ২৫০ থেকে ৩০০ শতাংশ পর্যন্ত। যন্ত্রাংশ হিসেবে আমদানি করায় নামমাত্র শুল্ক দিয়ে কৌশলে গাড়িগুলো ছাড় করে নিচ্ছে প্রতারক চক্রটি।
কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের (সিআইআইডি) যুগ্ম পরিচালক সাগর সেন জানান, পূর্ণাঙ্গ গাড়িকে ছোট ছোট অংশে ভাগ করে যন্ত্রাংশ হিসেবে আমদানি করা হচ্ছে। পরে দেশে এনে সেগুলো জোড়া লাগিয়ে আবার গাড়িতে রূপান্তর করা হয়।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, পূর্ণাঙ্গ গাড়ির ক্ষেত্রে গাড়ির ধরন ও ইঞ্জিন ক্ষমতার ওপর নির্ভর করে শুল্ককর অনেক বেশি হওয়ায় আমদানিকারকরা এলসি ও আমদানি নথিতে যন্ত্রাংশ দেখিয়ে এসব চালান আনছেন। তিনি বলেন, এভাবে কোটি টাকার শুল্কের পরিবর্তে মাত্র কয়েক লাখ টাকা পরিশোধের চেষ্টা করা হচ্ছে। এ ধরনের আমদানির সঙ্গে জড়িত প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। একই সঙ্গে দেশে গাড়ির যন্ত্রাংশ জোড়া লাগিয়ে বিক্রির মাধ্যমে ক্রেতাদের প্রতারিত করা হচ্ছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
১২ কোটি টাকার তিন গাড়ি
সিআইআইডি সূত্রে জানা যায়, মঙ্গলবার জাপান থেকে চট্টগ্রাম বন্দরের পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল (পিসিটি) দিয়ে লেক্সাস এলএক্স ৬০০, লেক্সাস এসসি ৪৩০ ও বিএমডব্লিউ এম৫ মডেলের গাড়ির খণ্ডিত অংশ আমদানি করা হয়। শুল্ক-করসহ এসব গাড়ির মোট মূল্য প্রায় ১২ কোটি টাকা বলে জানিয়েছে কাস্টমস।
চালানে পণ্যগুলো ‘পুরোনো গাড়ির যন্ত্রাংশ, গিয়ারবক্সসহ ব্যবহৃত পেট্রল ইঞ্জিন’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল। ঢাকার ক্রাউন অটোমোবাইল সার্ভিসেস নামের একটি প্রতিষ্ঠান চালানটি আমদানি করে। কাস্টমসের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ৮ হাজার কেজি ওজনের এসব পণ্য যন্ত্রাংশ হিসেবে ঘোষণা করায় শুল্কায়নযোগ্য মূল্য দাঁড়িয়েছে মাত্র ২৫ থেকে ৩০ লাখ টাকা। কিন্তু একই পণ্য পূর্ণাঙ্গ গাড়ি হিসেবে শুল্কায়ন করা হলে মূল্য প্রায় ৯ কোটি টাকা পর্যন্ত হতে পারে।
কাস্টমসের আনুপাতিক হিসাব অনুযায়ী, লেক্সাস এলএক্স ৬০০-এর শুল্কায়ন মূল্য প্রায় পাঁচ কোটি টাকা, বিএমডব্লিউ এম৫-এর তিন কোটি টাকা এবং লেক্সাস এসসি ৪৩০-এর প্রায় ৪০ থেকে ৫০ লাখ টাকা হতে পারে। ফলে যন্ত্রাংশের পরিবর্তে গাড়ি হিসেবে শুল্কায়ন করলে সরকারের আদায়যোগ্য রাজস্বের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়।
মোংলাতেও একই কৌশল
এর আগে গত বৃহস্পতিবার মোংলা বন্দরে একই আমদানিকারকের মিথ্যা ঘোষণায় আনা বিলাসবহুল গাড়ির একটি চালান আটক করে কাস্টমস। এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, চালানে থাকা প্রতিটি গাড়ির মূল্য এক কোটি টাকার বেশি। কাস্টমস সূত্র জানায়, সাড়ে চার কোটি থেকে পৌনে সাত কোটি টাকা পর্যন্ত বাজারমূল্যের চারটি গাড়ির চালানে যন্ত্রাংশ দেখিয়ে মাত্র ছয় লাখ ১০ হাজার টাকা শুল্ক পরিশোধের চেষ্টা করা হয়েছিল। অর্থাৎ পূর্ণাঙ্গ গাড়ির বদলে যন্ত্রাংশ হিসেবে ঘোষণা করায় শুল্ককর পরিশোধের পরিমাণে বিপুল পার্থক্য তৈরি হয়েছে। এ ঘটনায় মিথ্যা ঘোষণা, শুল্ক ফাঁকি ও আমদানি সংক্রান্ত বিধি লঙ্ঘনের বিষয় তদন্ত করছে কাস্টমস।
চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে গাড়ি জব্দ
একই সময়ে চট্টগ্রাম নগরের রহমতগঞ্জ এলাকা থেকে আরো একটি বিলাসবহুল গাড়ি জব্দ করে কাস্টমস গোয়েন্দা অধিদপ্তর। গাড়িটির বাজারমূল্য কয়েক কোটি টাকা হতে পারে বলে ধারণা করছেন কর্মকর্তারা।
এছাড়া রাতে কক্সবাজারের একটি হোটেলের পার্কিং এলাকা থেকেও তিনটি গাড়ি জব্দ করা হয়। কর্মকর্তারা জানান, গাড়িগুলোর ক্রয় ও আমদানি-সংক্রান্ত বৈধ কাগজপত্র দেখাতে না পারায় এগুলো জব্দ করা হয়েছে। এভাবে অল্প সময়ের মধ্যে চট্টগ্রাম, মোংলা ও কক্সবাজারে একাধিক বিলাসবহুল গাড়ি আটকের ঘটনায় আমদানি ব্যবস্থাপনা ও কাস্টমস নজরদারি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
বাংলাদেশ রিকন্ডিশন্ড ভেহিক্যালস ইম্পোর্টার্স অ্যান্ড ডিলার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বারভিডা) সেক্রেটারি জেনারেল রিয়াজুর রহমান জানান, গাড়ি ভেদে ৮০ থেকে ৭০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করা হয়। সেজন্য দেশে গাড়ি আমদানি কমেছে, বিলাসবহুল গাড়ির সংকট তৈরি হয়েছে। এই সুযোগে একটি সিন্ডিকেট মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে এসব গাড়ি আমদানি করছে।
তিনি বলেন, সরকার বিলাসবহুল গাড়ির শুল্ককে আরেকটু সহনীয় পর্যায়ে নিয়ে এলে জালিয়াতির মাধ্যমে শুল্ক ফাঁকির বিষয়টা কমে যাবে। তখন বৈধ পথে গাড়িগুলো আসবে, সরকার রাজস্ব হারাবে না। দু-একটি চালান ধরা পড়ছে, কিন্তু এটা বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। একটি গোষ্ঠী কোটি কোটি টাকা রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে নিয়মিতই গাড়ি বের করে আনছে বলে মনে করেন এই ব্যবসায়ী নেতা।
যেভাবে ফাঁকি দেওয়ার চেষ্টা
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, একটি পূর্ণাঙ্গ গাড়িকে সরাসরি আমদানি করলে ইঞ্জিনের ক্ষমতা ও গাড়ির ধরন অনুযায়ী উচ্চহারে শুল্ককর দিতে হয়। কিন্তু একই গাড়িকে কয়েকটি অংশে ভাগ করে পুরোনো যন্ত্রাংশ হিসেবে ঘোষণা করলে শুল্কের পরিমাণ অনেক কমে যায়। এক্ষেত্রে গাড়ির সামনের অংশ, পেছনের অংশ, ছাদ বা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অংশ আলাদা করে কন্টেইনারে আনা হয়। বাইরে থেকে এগুলোকে ব্যবহৃত গাড়ির যন্ত্রাংশ মনে হলেও দেশে আনার পর গ্যারেজে জোড়া লাগিয়ে পূর্ণাঙ্গ গাড়িতে রূপ দেওয়ার সুযোগ থাকে।
কাস্টমস কর্মকর্তারা বলছেন, শুধু পণ্যের নাম বা ঘোষণার ওপর নির্ভর না করে খণ্ডিত অংশগুলো পরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে। এসব অংশের মধ্যে মূল গাড়ির মৌলিক বৈশিষ্ট্য রয়েছে কি না। আন্তর্জাতিক কাস্টমস বিধির জেনারেল রুলস ফর দ্য ইন্টারপ্রিটেশন অব দ্য হারমোনাইজড সিস্টেম অনুযায়ী খণ্ডিত অবস্থায় আমদানি করা কোনো পণ্যের মধ্যে মূল পণ্যের মৌলিক বৈশিষ্ট্য একই রকম হলে সেটিকে সম্পূর্ণ পণ্য হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ রয়েছে।
এই বিধির আলোকে গাড়ির খণ্ডিত অংশ পরীক্ষা করছে কাস্টমস।
সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) চট্টগ্রাম মহানগরের সভাপতি অ্যাডভোকেট আখতার কবীর চৌধুরী বলেন, এত বড় অঙ্কের শুল্ক ফাঁকির ঘটনা সামনে আসার পর বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা দরকার। তার অভিযোগ, এ ধরনের অনিয়ম দীর্ঘদিন ধরে ঘটতে পারে এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তা ও আমদানিকারকদের একটি অংশের যোগসাজশ থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। প্রতিটি ঘটনা নিরপেক্ষ তদন্ত দরকার।
তিনি বলেন, তথ্য গোপন করে বিলাসবহুল গাড়ি আমদানির ঘটনায় আমদানিকারকের সম্পদ ও আয়-ব্যয়ের তথ্যও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। প্রকৃত মূল্য গোপন করার পেছনে কর ফাঁকির পাশাপাশি অর্থ পাচারের উদ্দেশ্য থাকতে পারে। বিলাসবহুল গাড়িকে যন্ত্রাংশে রূপ দিয়ে আমদানির এ প্রবণতা শুধু রাজস্ব ক্ষতির বিষয় নয় এর সাথে আমদানি নীতিমালা লঙ্ঘন, ভুয়া ঘোষণা এবং সম্ভাব্য অর্থপাচারের মতো বিষয়ও জড়িত থাকতে পারে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

