ঔদ্ধত্য ছিল সীমাহীন। ক্ষমতার অপব্যবহার ছিল অকল্পনীয়। পা পড়েনি মাটিতে। ধরাকে সরাজ্ঞান করতেন। অসংখ্য গুম-খুনে মানবাধিকার করেছেন পদদলিত। লুট করেছেন রাষ্ট্রের অঢেল সম্পদ। রক্ষা পায়নি সংখ্যালঘুদের জমিজমা, বাড়ি-ঘরও। চলাফেরায় ছিলেন সম্রাটের প্রতিভূ। দম্ভ আর অহংকারে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে পর্যন্ত তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেছেন। নজিরবিহীন এক প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তার নাম বেনজীর। অবশেষে পাকড়াও হয়েছেন মধ্যপ্রাচ্যের ভোগবিলাসের শহর দুবাইতে।
পুলিশ সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, দুবাই সিটি পুলিশ বেনজীর আহমেদকে গ্রেপ্তার করেছে। এ বিষয়ে ১২ জুন পাঠানো একটি চিঠির মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। দুবাই থেকে দীর্ঘদিন ধরে তুরস্কে ঢোকার চেষ্টা করছিলেন তিনি। এছাড়াও তিনি ইউরোপে ঢোকারও চেষ্টা করছিলেন। র্যাবের ডিজি থাকার কারণে আমেরিকার নিষেধাজ্ঞা থাকায় ইউরোপে ঢুকতে পারেননি তিনি। নিষেধাজ্ঞা থাকায় তিনি ব্যাংকে অ্যাকাউন্টও খুলতে পারেননি। হুন্ডির মাধ্যমে টাকা লেনদেন করতেন বলে জানা গেছে। আওয়ামী লীগ সরকার ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত বেনজীর আহমেদ অবসরের পরও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা সুবিধা ভোগ করেছেন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, তাকে গাড়িসহ ছয় সদস্যের একটি সাদা পোশাকধারী পুলিশ দল নিরাপত্তা দিত। পাশাপাশি তার জন্য দুজন সশস্ত্র দেহরক্ষী এবং বাসভবনে তিনজন নিরাপত্তাকর্মী নিয়োজিত ছিলেন।
বিতর্কিত এই কর্মকর্তা পুলিশের দায়িত্ব পালনকালে বিরোধী দলকে নিষ্ঠুরভাবে দমন, জমি দখল, আয়-বহির্ভূত সম্পদ অর্জন, পাসপোর্ট কেলেঙ্কারিসহ বহু অপকর্মের ঘটনা ঘটিয়েছেন। সরকারের আস্থাভাজন হওয়ার কারণে তার কোনো বিতর্কিত ঘটনা নিয়ে কেউ মুখ খোলার সাহস পায়নি। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে এবং সাংবাদিক সম্মেলনে ঔদ্ধত্যপূর্ণ বক্তব্য দিয়ে বিরোধীদলকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করতেন তিনি। ডিএমপি কমিশনারের দায়িত্ব পালনকালে রাজারবাগ হাসপাতালে আহত পুলিশ কর্মকর্তাদের দেখতে গিয়ে ছাত্রশিবির দেখামাত্রই গুলির নির্দেশ দিয়েছিলেন বেনজীর। তার ওই বক্তব্য গোটা দেশে আলোচনার ঝড় তুলেছিল।
সূত্র জানায়, নির্ধারিত ফ্লাইটে দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ট্রানজিটে নামার পর অন্য যাত্রীর মতোই ইমিগ্রেশন ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার আওতায় আসেন তিনি। বিমানবন্দরের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (এআই) ক্যামেরা তার মুখমণ্ডল স্ক্যান করে। স্ক্যানের তথ্য আন্তর্জাতিক অপরাধীদের তথ্যভান্ডারের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হলে বেনজীর আহমেদের নামে থাকা ইন্টারপোল সতর্কতা সংকেত (নোটিস) সামনে আসে। এরপর দুবাই পুলিশের ইন্টারপোল সমন্বয় শাখা বিষয়টি যাচাই করে এবং কিছু সময়ের মধ্যেই তাকে আটক করে। পরে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
জানা গেছে, তিনি দীর্ঘদিন দুবাই শহরের আল কারামার একটি বাসায় বসবাস করতেন। পরিবারের সদস্যরা ঢাকা ও দুবাইয়ে যাতায়াতের মধ্যে ছিলেন। তবে বেনজীরের বড় মেয়ে দেশেই রয়েছেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ গতকাল জাতীয় সংসদে বলেন, গত ১২ জুন সংযুক্ত আরব আমিরাত কর্তৃপক্ষ ই-মেইলের মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকারকে বেনজীরের গ্রেপ্তারের বিষয়টি জানিয়েছে।
দুর্নীতি, মানবতাবিরোধী অপরাধসহ বহু মামলায় অভিযুক্ত বেনজীর আহমেদকে ধরতে ২০২৫ সালের ১১ এপ্রিল আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোলের মাধ্যমে রেড নোটিস জারি করা হয়েছিল। সে কথা তুলে ধরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ওই রেড নোটিসের ভিত্তিতেই বেনজীরকে সংযুক্ত আরব আমিরাত পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। তিনি বর্তমানে সেখানে আটক আছেন। আবুধাবির এনসিবি (ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো) জানিয়েছে, ইউএই ফেডারেল ল অনুযায়ী গ্রেপ্তারের দিন থেকে ৩০ দিনের মধ্যে কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ অনুরোধ পাঠাতে হবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, বেনজীরের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪২০, ৪৬৭, ৪৬৮, ৪৭১ ও ১০৯ ধারা, দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ২৬(২) ও ২৭ ধারা এবং বাংলাদেশ পাসপোর্ট অর্ডার, ১৯৭৩-এর ১১ ধারায় মামলা ও বিচারিক কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
বেনজীরের গ্রেপ্তারের ঘটনাকে ‘বাংলাদেশ পুলিশের একটি ঐতিহাসিক সাফল্য’ হিসেবে বর্ণনা করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এর মাধ্যমে আমরা বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসতে সক্ষম হব। পাশাপাশি এর মাধ্যমে আমরা জাতিকে আশ্বস্ত করতে চাই যে, অপরাধী যত শক্তিশালীই হোক না কেন, আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বিবৃতির সময় সংসদ সদস্যদের টেবিল চাপড়ে সমর্থন জানাতে দেখা যায়।
২০২০ সালের এপ্রিল থেকে ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশ পুলিশের মহাপরিদর্শক ছিলেন বেনজীর। তার আগে ২০১৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২০ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ছিলেন র্যাবের মহাপরিচালক। তারও আগে ছিলেন ডিএমপি কমিশনার। ২০২২ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর তিনি অবসরে যান। ১৯৮৮ সালে পুলিশের চাকরিতে যোগ দেন এই কর্মকর্তা।
আওয়ামী লীগ আমলের শেষদিকে ২০২৪ সালের মার্চে অজ্ঞাত ইস্যুতে হাসিনা সরকারের এক প্রভাবশালী গোষ্ঠীর সঙ্গে বেনজীরের টক্কর বাঁধে। শুরু হয় তার বিরুদ্ধে তদন্ত। তোলপাড় সৃষ্টি হয়। সেই প্রেক্ষাপটে ওই বছরের ২২ এপ্রিল বেনজীরের বিষয়ে ওঠা অভিযোগের তদন্ত করে দুই মাসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে নির্দেশ দেয় হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ। একই দিনে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) জানায়, বিষয়টি নিয়ে তারা অনুসন্ধান শুরু করেছে।
পরে দুদকের আবেদনে বেনজীর, তার স্ত্রী ও তিন মেয়ের স্থাবর সম্পদ ক্রোকের আদেশ দেয় ঢাকা মহানগরের জ্যেষ্ঠ বিশেষ জজ আদালত। তাদের নামে থাকা ব্যাংক হিসাব এবং বিভিন্ন কোম্পানিতে তাদের নামে থাকা শেয়ারও অবরুদ্ধ করার আদেশ আসে।
এর মধ্যেই খবর আসে, বেনজীর তার স্ত্রী-কন্যাদের নিয়ে আগেই দেশত্যাগ করেছেন। পরে বেনজীর নিজেও বোট ক্লাবের সভাপতির পদ থেকে পদত্যাগের জন্য দেওয়া চিঠিতে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বিদেশে থাকার কথা বলেন।
চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে আরো অনেকের মতো বেনজীরের বিরুদ্ধে তদন্ত গতি পায়। তার এবং তার পরিবারের বিরুদ্ধে এক ডজনের বেশি দুর্নীতির মামলা করে দুদক। এছাড়া বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুম, খুনে তার সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ নিয়েও তদন্ত শুরু হয়।
এতসব অভিযোগ মাথায় নিয়ে বিদেশে পালিয়ে থাকা সাবেক এই পুলিশপ্রধানকে ধরতে গত বছরের ২২ এপ্রিল ইন্টারপোলের মাধ্যমে ‘রেড নোটিস’ জারি করা হয়।
বেনজীরের বিরুদ্ধে যত অভিযোগ
সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, শত শত কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং মানি লন্ডারিংয়ের মতো (অর্থপাচার) গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।
বিভিন্ন সময়ে সংবাদমাধ্যমের অনুসন্ধানী রিপোর্ট উঠে আসে, বেনজীরের প্রায় এক হাজার ৪০০ বিঘা জমির ওপর নির্মিত ‘সাভানা ইকো রিসোর্ট প্রাইভেট লিমিটেড’-এর তথ্য। এ ছাড়া পুলিশের সাবেক এই প্রভাবশালী শীর্ষ কর্মকর্তা তার স্ত্রী ও দুই মেয়ের নামে গড়ে তুলেছেন সম্পদের পাহাড়। অনুসন্ধানে দেশের বিভিন্ন এলাকায় তাদের নামে অন্তত ছয়টি কোম্পানির খোঁজ মেলে।
গাজীপুরের ‘ভাওয়াল রিসোর্ট অ্যান্ড স্পা’ নামের একটি রিসোর্টের মালিকানায় যুক্ত বেনজীর। ডিএমপি কমিশনার হিসেবে প্রভাব খাটিয়ে রিসোর্টের ২৫ শতাংশ শেয়ারের মালিকানা নেন তিনি। বন কর্মকর্তারা জানান, ভাওয়াল রিসোর্টের ভেতরে ও প্রবেশমুখে বন বিভাগের ৬.৭৩ একর জমি রয়েছে। অর্থাৎ বনের বিশাল এই জমি দখল করে গড়ে তোলা হয়েছে ভাওয়াল রিসোর্ট।
বন বিভাগের তথ্যমতে, ভাওয়াল রিসোর্টের দখল করা জমির মধ্যে রয়েছে ৪ নম্বর বরইপাড়া মৌজার ৩, ২৭৯ ও ২৭১ নম্বর সিএস দাগে ১১ বিঘা। বেনজীরের ক্ষমতার দাপটে সবাই ছিলেন নির্বিকার, নিরূপায়।
বেনজীরের স্ত্রী জীশান মীর্জার আয়ের কোনো উৎস না থাকলেও দেশের বিভিন্ন স্থানে রয়েছে তার নামে ২৪০ বিঘা জমি। অনুসন্ধানে উঠে আসে, রাতারাতি গৃহিণী থেকে ব্যবসায়ী বনে যাওয়া জীশান মীর্জার সম্পদের পরিমাণ স্বামীর চেয়ে প্রায় ১৩ গুণ বেশি।
শাপলা গণহত্যার মাস্টারমাইন্ড
২০১৩ সালের ৫ মে মতিঝিল শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে শেখ হাসিনার সরাসরি নির্দেশে গণহত্যার ছক তৈরি করেছিলেন বেনজীর আহমেদ। তৎকালীন ডিএমপি কমিশনার হিসেবে এই গণহত্যা পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সরাসরি তদারকি ও ভূমিকা রাখেন তিনি। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার তদন্তে এসব তথ্য উঠে এসেছে বলে জানিয়েছেন চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম।
গত ১২ মার্চ এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় বেনজিরের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। শাপলা চত্বর গণহত্যার ঘটনায় এপর্যন্ত ৫৮ জন শহীদের পরিচয় শনাক্ত করা হয়েছে বলে জানায় ট্রাইব্যুালের তদন্ত সংস্থা। এর মধ্যে শাপলা চত্বরেই ৩২ জন শহীদের পরিচয় শনাক্ত করা হয়েছে। এই মামলার তদন্ত এখনো চলমান। ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে পলাতক সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর, সাবেক আইজিপি হাসান মাহমুদ খন্দকারসহ অনেকে এই মামলার আসামি।
গুমের মামলায়ও আসামি
আওয়ামী লীগ সরকার আমলে র্যাবের টিএফআই সেলে গুম করে রাখার ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের আরেকটি মামলায়ও বেনজীর আসামি। এ মামলায় মোট আসামি ১৭ জন। এর মধ্যে ১২ জন সেনা কর্মকর্তা। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ এ মামলায় এখন সাক্ষ্যগ্রহণ চলছে।
দুদকের মামলা-চার্জশিট ও আদালতের পরোয়ানা
২০২৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর দুদকের পক্ষ থেকে অবৈধ সম্পদ অর্জন ও তথ্য গোপনের অভিযোগে বেনজীর ও তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। বেনজীর আহমেদ, তার স্ত্রী ও দুই মেয়ের বিরুদ্ধে পৃথক চারটি মামলা রয়েছে দুদকে। এসব মামলায় তাদের বিরুদ্ধে ৭৪ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন ও সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগ আনা হয়েছে। দীর্ঘ অনুসন্ধান শেষে গত বছরের ৩০ নভেম্বর আদালতে তার বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করে দুদক।
মামলার তথ্য অনুসারে, বেনজীর ৯ কোটি ৪৪ লাখ টাকা জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন এবং দুই কোটি ৬২ লাখ টাকা সম্পদের তথ্য গোপন করেছেন। তার স্ত্রী জীশান মীর্জার ৩১ কোটি ৬৯ লাখ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন এবং ১৬ কোটি এক লাখ টাকার তথ্য গোপন করেছেন। তাদের বড় মেয়ে ফারহীন রিশতা বিনতে বেনজীর আট কোটি ৭৫ লাখ টাকার এবং ছোট মেয়ে তাহসীন রাইসা বিনতে বেনজীর পাঁচ কোটি ৫৯ লাখ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন করেছেন।
এছাড়া বেনজীর আহমেদ ও তার স্ত্রী-সন্তানদের নামে ঢাকার গুলশানে চারটি ফ্ল্যাট, ৩৩টি ব্যাংক হিসাব, ১৯টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও তিনটি বিও হিসাব (শেয়ার ব্যবসার বেনিফিশিয়ারি ওনার্স অ্যাকাউন্ট) এবং ৩০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্রের সন্ধান পায় দুদক। দুদকের আবেদনে এসব সম্পদ জব্দ করার আদেশ দেয় আদালত।
দুদকের মামলায়ই গত বছরের ১০ ফেব্রুয়ারি বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের মাধ্যমে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির আদেশ দেয় ঢাকার আদালত। অভিযোগপত্র গ্রহণের পর চলতি বছরের মার্চ মাসে ঢাকার একটি বিশেষ আদালত তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে। এরপর মে মাসে তার অনুপস্থিতিতেই আদালতে অভিযোগ গঠন করা হয়।
অর্থ পাচারের মামলা
বেনজীর আহমেদ ও তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে অর্থপাচারের অভিযোগও রয়েছে। ১১ কোটি ৩৪ লাখ টাকা পাচারের অভিযোগে বেনজীর আহমেদ, তার স্ত্রী ও দুই কন্যাসহ চারজনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুদক। গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে দুদকের কর্মকর্তারা বলেন, ১১ কোটি ৩৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা ঋণের পর কোথাও বিনিয়োগের তথ্য পাওয়া যায়নি। এ টাকা তুলে নেওয়ার পরপরই তিনি বিদেশ চলে যান।
যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা
২০২১ সালের ডিসেম্বরে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর ও ট্রেজারি বিভাগ র্যাবের সাবেক ও বর্তমান সাত কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়, যার মধ্যে বেনজীর আহমেদের নামও ছিল।
গত ২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে তার বিশাল অবৈধ সম্পদের খতিয়ান গণমাধ্যমে আসার পর থেকেই তিনি সপরিবারে আত্মগোপনে চলে যান। ধারণা করা হচ্ছিল, তিনি বাংলাদেশ ছেড়ে মধ্যপ্রাচ্য বা ইউরোপের কোনো দেশে আশ্রয় নিয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে তার সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত এবং ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ করার নির্দেশ দেয় আদালত।
বেনজীর আহমেদ ২০২০ সালের এপ্রিল থেকে ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পুলিশের আইজি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এর আগে তিনি র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) মহাপরিচালক এবং ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
কতটি পাসপোর্ট
দুবাইয়ে গ্রেপ্তার পুলিশের সাবেক আইজি বেনজীর আহমেদের কাছে একাধিক দেশের পাসপোর্ট পাওয়া গেছে। বাংলাদেশ ছাড়াও তার কাছে পর্তুগালের পাসপোর্ট রয়েছে। এছাড়া তার কাছে তুরস্কের পিআর এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে বসবাসের অনুমতিপত্র আছে বলে জানা গেছে।
দায়িত্ব থাকতেই পাসপোর্ট কেলেঙ্কারি শুরু করেন এ গুণধর পুলিশ কর্মকর্তা । সরকারি চাকরিতে থাকা অবস্থায় সে তথ্য গোপন করে বেসরকারি চাকরিজীবী হিসেবে পাসপোর্ট নিয়েছিলেন বেনজীর। এ কাজটি তিনি করেন ২০১৬ সালে, তখন তিনি র্যাবের মহাপরিচালক।
বেসরকারি চাকরিজীবী পরিচয়ে তিনি পাসপোর্ট নবায়নের আবেদন করলে তখন আপত্তি জানিয়েছিল পাসপোর্ট অধিদপ্তর। র্যাব সদর দপ্তরে চিঠিও দেওয়া হয়েছিল। জবাবে র্যাব সদর দপ্তরের তৎকালীন অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) আবদুল জলিল মণ্ডল অবিলম্বে বেনজীরের পাসপোর্ট প্রতিস্থাপনের অনুরোধ করে চিঠি দেন। এর ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বেনজীরকে পাসপোর্ট দেওয়া হয়। ছবি তোলা ও আঙুলের ছাপ নেওয়া হয় তার বাসায় গিয়ে। এটা সরকারি চাকরিবিধি ও পাসপোর্ট আইনে অপরাধ হলেও বেনজীরের কিছুই হয়নি।
আলোচিত দেশত্যাগ
দুদকের অনুসন্ধান শুরুর দুই সপ্তাহের মধ্যেই দেশ ছাড়েন সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, সাধারণ যাত্রীদের জন্য প্রযোজ্য নিরাপত্তা তল্লাশির অনেক ধাপ এড়িয়ে ২০২৪ সালের ৪ মে রাতে পুলিশ সদস্যদের সহায়তায় তিনি নির্বিঘ্নে বিদেশগামী ফ্লাইটে ওঠেন। প্রায় দুই বছর পর দুবাইয়ে তার গ্রেপ্তারের খবর সামনে আসার পর আবারও আলোচনায় এসেছে সে বহুল আলোচিত দেশত্যাগের ঘটনা। তদন্তে উঠে আসে, ওই রাতে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে তিনি দুবাইয়ের উদ্দেশ্যে দেশ ছাড়েন।
ওই সময়ের বিমানবন্দরের সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণে দেখা যায়, কয়েকজন পুলিশ সদস্যের সহায়তায় তিনি নির্বিঘ্নে বিমানবন্দরের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করেন। রাত ১১টা ৪০ মিনিটের দিকে সিঙ্গাপুর এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইটে তিনি ঢাকা ত্যাগ করেন।
ফুটেজে দেখা যায়, নিরাপত্তা তল্লাশির জন্য যাওয়ার সময় বেনজীর আহমেদের সামনে ছিলেন ইউনিফর্ম পরা এক পুলিশ সদস্য এবং সাদা পোশাকের এক নারী পুলিশ সদস্য। তার পেছনেও ছিলেন আরেক ইউনিফর্মধারী পুলিশ সদস্য। দেশ ছাড়ার সময় তার সঙ্গে পরিবারের কোনো সদস্য ছিলেন না। তার পরনে ছিল সোনালি রঙের হাফ শার্ট, গাঢ় রঙের প্যান্ট ও কালো জুতা।
সর্বশেষ নিরাপত্তা তল্লাশির ফুটেজে দেখা যায়, সেখানে দায়িত্বরত আনসার সদস্যের শারীরিক তল্লাশি ছাড়াই তিনি চেকপয়েন্ট অতিক্রম করেন। সাধারণ যাত্রীদের ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক নিরাপত্তা তল্লাশির বিধান থাকলেও বেনজীর আহমেদের ক্ষেত্রে তা অনুসরণ করা হয়নি বলে ফুটেজে দেখা যায়।
এছাড়া ইমিগ্রেশন ও নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা তার পাসপোর্টে প্রয়োজনীয় সিল ও আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে পাসপোর্ট এবং লাগেজ তার কাছে হস্তান্তর করেন। দেশ ছাড়ার আগে উপস্থিত কয়েকজন পুলিশ সদস্যকে হাত নেড়ে বিদায় জানাতেও দেখা যায় তাকে।
তিন রাজত্ব
পুলিশ বাহিনীর অন্যতম প্রভাবশালী কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত বেনজীর আহমেদ ২০২০ সালের এপ্রিল থেকে ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আইজিপির দায়িত্ব পালন করেন। এর আগে তিনি ২০১৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২০ সালের এপ্রিল পর্যন্ত র্যাবের মহাপরিচালক ছিলেন। এছাড়া তিনি ডিএমপির কমিশনার হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। তার বাড়ি গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায়।
অবসরের পরও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা
আওয়ামী লীগ সরকার ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত বেনজীর আহমেদ অবসরের পরও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা সুবিধা ভোগ করেন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, তাকে গাড়িসহ ছয় সদস্যের একটি সাদা পোশাকধারী পুলিশ দল নিরাপত্তা দিত। পাশাপাশি তার জন্য দুজন সশস্ত্র দেহরক্ষী এবং বাসভবনে তিনজন নিরাপত্তাকর্মী নিয়োজিত ছিলেন।
ভুয়া পিএইচডি অর্জন
আইজিপি হয়ে বেনজীর আহমেদ ২০১৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) থেকে ডক্টরেট ডিগ্রি নেন। এরপর থেকে তিনি নামের আগে ‘ডক্টর’ শব্দটি ব্যবহার করা শুরু করেন। তবে ডক্টরেট ডিগ্রি নেওয়ার প্রোগ্রামে ভর্তির যোগ্যতাই তার ছিল না। শর্ত শিথিল করে তাকে ভর্তির সুযোগ দেওয়া হয়েছিল।
বেনজীর আহমেদ ডক্টরেট ডিগ্রি নেন ঢাবির ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের ডক্টর অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (ডিবিএ) প্রোগ্রাম থেকে। সেখানে ভর্তির জন্য স্নাতক ডিগ্রি থাকতে হয়। শিক্ষাজীবনের সব পাবলিক পরীক্ষায় কমপক্ষে ৫০ শতাংশ নম্বর পেতে হয়। বেনজীরের তা ছিল না। জুলাই অভ্যুত্থানের পর বেনজীর আহমেদের ডক্টরেট ডিগ্রি স্থগিত করে ঢাবি প্রশাসন।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন



বোরকা নিয়ে সংসদে সরকারি দলের এমপির আপত্তিকর বক্তব্য
পাঠ্যবই মুদ্রণে এনসিটিবিতে ফের সক্রিয় আওয়ামী সিন্ডিকেট