দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির ভঙ্গুর অবস্থার মধ্যে কিছুটা আশাব্যঞ্জক ছিল রপ্তানি আয়। তবে সেই আশার জায়গাটিও এখন নড়বড়ে হয়ে উঠছে। বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জনে মুখ্য ভূমিকায় থাকা রপ্তানি খাত প্রবৃদ্ধি অর্জনে প্রতিমাসেই হোঁচট খাচ্ছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের শুরু থেকেই রপ্তানি বাণিজ্যে নেতিবাচক ধারা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। গত আগস্ট থেকে টানা আট মাস ধরে ধারাবাহিকভাবে কমেছে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানি, যা দেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন।
সবশেষ গত মার্চেও আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় রপ্তানি আয় কমেছে ১৮ শতাংশেরও বেশি। এ মাসে কমে যাওয়ার হার আগের আট মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে বাড়তি দামে জ্বালানি কিনতে দেশের রিজার্ভের ওপর চাপ বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে যখন বৈদেশিক মুদ্রা আয়ে গতি দরকার, তখন পণ্য রপ্তানির এ শ্লথ প্রবণতায় অর্থনীতির স্থিতিশীলতা নিয়ে দেখা দিয়েছে শঙ্কা।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) সবশেষ হালনাগাদ প্রতিবেদনে দেখা যায়, চলতি বছরের মার্চে রপ্তানির পরিমাণ ৩৪৮ কোটি ডলার। গত বছরের একই মাসে রপ্তানি আয় এসেছিল ৪২৫ কোটি ডলার। অর্থাৎ গত বছরের একই সময়ের তুলনায় রপ্তানি কমেছে ৭৭ কোটি ডলার, যা দেশীয় মুদ্রায় প্রায় ৯ হাজার ৩৯৫ কোটি টাকা।
ইপিবির তথ্যে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসের মধ্যে শুধু জুলাইয়ে রপ্তানি বেশি হয়েছে। এ মাসে রপ্তানি হয়েছে ৪৭৭ কোটি ডলার। যা গত বছরের একই মাসে ৩৮২ কোটি ডলার রপ্তানির তুলনায় প্রায় ২৫ শতাংশ বেশি। আগস্ট থেকেই পণ্য রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রবণতা শুরু। ওই মাসে রপ্তানি আয় দাঁড়ায় ৩৯২ কোটি ডলারে, যা ২০২৪ সালের একই সময়ের চেয়ে ২ দশমিক ৯৩ শতাংশ কম। এরপর সেপ্টেম্বরে রপ্তানি মূল্য দাঁড়িয়েছে ৩৬২ কোটি ডলার। আগের বছর একই সময়ে রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৩৮০ কোটি ডলার। অর্থাৎ, একই সময়ের তুলনায় রপ্তানি কমেছে চার দশমিক ৬১ শতাংশ। অক্টোবরে টানা তৃতীয় মাসের মতো কমে রপ্তানি আয়। এ মাসে বাংলাদেশ বিশ্ববাজারে ৩৬৩ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ৪১৩ কোটি ডলার। আয় হ্রাস পায় ৭ দশমিক ৪৩ শতাংশ। ওই বছরের শেষের দুই মাস নভেম্বর-ডিসেম্বরেও ইতিবাচক প্রবৃদ্ধিতে ফিরতে পারেনি রপ্তানি আয়। নভেম্বরে আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় রপ্তানি আয় কমে ৫ দশমিক ৫৪ শতাংশ। আর ডিসেম্বরে কমে ১৪ দশমিক ২৩ শতাংশ। এর মধ্যে নভেম্বরে রপ্তানি হয় ৩৮৯ কোটি ডলার আর ডিসেম্বরে ৩৯৭ কোটি ডলারেরও কিছু কম। নতুন বছর রপ্তানি প্রবৃদ্ধির প্রত্যাশায় শুরু হলেও এ খাতের দুর্দশা থাকে চলমান।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে দেশের রপ্তানি আয় শূন্য দশমিক পাঁচ শতাংশ কমে ৪৪১ কোটি ডলারে দাঁড়ায়, যেখানে গত বছরের একই সময়ে তা ছিল ৪৪৩ কোটি ডলার। ফেব্রুয়ারিতে রপ্তানি কমে ১২ শতাংশ। এতে দেখা যায় চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে আগের অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে রপ্তানি কমেছে চার দশমিক ৮৫ শতাংশ। এ সময় মোট রপ্তানি আয়ের পরিমাণ তিন হাজার ৫৩৯ কোটি ডলারের মতো। গত অর্থবছরের একই সময়ে যা ছিল তিন হাজার ৭৭২ কোটি ডলারেরও কিছু বেশি। অর্থাৎ গত বছরের একই সময়ের তুলনায় রপ্তানি কমেছে ২৩৩ কোটি ডলার, যা দেশীয় মুদ্রায় প্রায় ২৮ হাজার ৪৫৯ কোটি টাকা।
পতনের কবলে তৈরি পোশাক
তৈরি পোশাক খাত দেশের প্রধান রপ্তানি পণ্য। মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি আসে এ খাত থেকে। চলতি অর্থবছরে পোশাক রপ্তানিতে ধারাবাহিক ধস চলছেই। ইপিবির হিসাবে টানা আট মাস সময় ধরে পোশাক রপ্তানি কমছে। অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে তৈরি পোশাক খাতের রপ্তানি আয় দাঁড়িয়েছে দুই হাজার ৮৫৮ কোটি ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তিন হাজার ২৫ কোটি ডলারের তুলনায় পাঁচ দশমিক ৫১ শতাংশ কম। এ সময়ে নিটওয়্যার রপ্তানি ৬ দশমিক ৪২ শতাংশ কমে এক হাজার ৫১১ কোটি ডলারে এবং ওভেন পোশাক রপ্তানি ৪ দশমিক ৪৮ শতাংশ কমে এক হাজার ৩৪৭ কোটি ডলারে নেমেছে। শুধু মার্চে এ খাতে রপ্তানি কমেছে ১৯ দশমিক ৩৫ শতাংশ, আয় হয়েছে ২৭৮ কোটি ডলার। গত বছরের মার্চে এ পরিমাণ ছিল ৩৪৫ কোটি ডলারের মতো। অর্থাৎ একক পণ্য তৈরি পোশাক রপ্তানি কমেছে ৬৭ কোটি ডলার।
বহু বছর ধরে তৈরি পোশাক রপ্তানির শীর্ষ আসনটি চীনের দখলে থাকলেও পরের স্থানটি ছিল বাংলাদেশের। তবে বর্তমানে বাংলাদেশকে টপকে দ্বিতীয় স্থান দখল করে নিয়েছে ভিয়েতনাম।
ইপিবি ও ভিয়েতনামের জাতীয় পরিসংখ্যান দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর বাংলাদেশ বৈশ্বিক বাজারে তিন হাজার ৮৮২ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে। একই সময়ে ভিয়েতনাম রপ্তানি করেছে তিন হাজার ৯৬৪ কোটি ডলারের পোশাক। ফলে বাংলাদেশ তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বীর চেয়ে ৮২ কোটি ডলার কম আয় করেছে। অন্যদিকে, চায়না কাস্টমস স্ট্যাটিস্টিক্সের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের ডিসেম্বরে এককভাবে শীর্ষ রপ্তানিকারক দেশ চীনের মোট পোশাক ও পোশাক সংক্রান্ত আনুষঙ্গিক পণ্যের রপ্তানি ১৫ হাজার ১০০ কোটি ডলারেরও বেশি ছিল।
রপ্তানিকারকরা বলছেন, রপ্তানি পণ্য প্রস্তুত করতে অন্তত ৪০ শতাংশ কাঁচামাল আমাদের আমদানি করতে হয়। এতে সময় ও খরচ দুটোই বৃদ্ধি পায়। আমাদের মূল প্রতিদ্বন্দ্বী চীন আর ভিয়েতনামে এ প্রতিবন্ধকতা নেই। এ কারণে ক্রেতাদের প্রথম দুটি পছন্দের তালিকায় এখন চীন আর ভিয়েতনাম। বাংলাদেশের অবস্থান তিন নম্বরে। এ অবস্থায় আমাদের দ্রুত ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব না হলে স্থায়ী ক্ষতির সম্মুখীন হতে হবে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির শীর্ষ ১০ দেশের মধ্যে ৯ দেশে (যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, ইতালি, কানাডা, জাপান, নেদারল্যান্ডস ও ডেনমার্ক) রপ্তানি কমেছে। এর মধ্যে ব্যতিক্রম শুধু স্পেন। দেশটিতে পোশাক রপ্তানি বেড়েছে দুই শতাংশের মতো।
ইপিবির দেশভিত্তিক হালনাগাদ তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, শীর্ষ ১০ রপ্তানি বাজারের মধ্যে সবচেয়ে বড় পতন দেখা গেছে জার্মানিতে। চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে দেশটিতে রপ্তানি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ১৪ শতাংশ কমেছে। পরিমাণ কমেছে প্রায় ৫৩ কোটি ডলার। এ সময়ে জার্মানিতে রপ্তানি নেমে এসেছে ৩২৭ কোটি ডলারে, যেখানে আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ৩৮০ কোটি ডলার। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পতন হয়েছে ডেনমার্কে, যেখানে রপ্তানি কমেছে ১৩ দশমিক ৭২ শতাংশ। ফলে ৮০ কোটি ডলারের রপ্তানি কমে দাঁড়িয়েছে ৬৯ কোটি ডলারে। একই সময়ে ফ্রান্সেও রপ্তানি হ্রাস পেয়েছে ১২ দশমিক ২৬ শতাংশ, অর্থাৎ ১৬৫ কোটি ডলার থেকে কমে ১৪৫ কোটি ডলারে নেমে এসেছে। পরিমাণে বেশি রপ্তানি হয় এমন দেশের মধ্যে একক প্রধান বাজার যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি কম হয়েছে দুই দশমিক ৫৪ শতাংশ। দেশটিতে মোট রপ্তানি দাঁড়িয়েছে ৫৫৯ কোটি ডলারে, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ৫৭৪ কোটি ডলার। অন্যদিকে, যুক্তরাজ্যে রপ্তানি কমেছে এক দশমিক ৬১ শতাংশ। ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) থেকে বেরিয়ে যাওয়া এ দেশটিতে ৩৩০ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি হয়েছে, যেখানে আগের বছর একই সময়ে ছিল ৩৩৬ কোটি ডলার। ইতালিতে রপ্তানি কমেছে ১০ দশমিক ৬১ শতাংশ। এক দশমিক ১৭ বিলিয়ন থেকে কমে এক দশমিক চার বিলিয়ন ডলার হয়েছে। নেদারল্যান্ডসে রপ্তানি কমেছে শূন্য দশমিক ৮৫ শতাংশ। কানাডার রপ্তানি কমেছে শূন্য দশমিক ২৬ শতাংশ। জাপানে রপ্তানি কমেছে ৭ দশমিক ১১ শতাংশ।
বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার-উল আলম (পারভেজ) চৌধুরী বলেন, বিদেশি ক্রেতাদের মধ্যে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ পরিস্থিতি ও স্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। আগামী দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে জ্বালানিশূন্য হবে বাংলাদেশÑএমন আশঙ্কায় ক্রয়াদেশ ভারতসহ অন্য দেশে চলে যাচ্ছে। এতে দেশের অর্থনীতি ও বৈদেশিক মুদ্রার প্রধান উৎস তৈরি পোশাক খাত এক গভীর সংকটের মুখে পড়তে যাচ্ছে।
বিসিআই সভাপতি বলেন, বিশ্ববাজারে অস্থিরতা এবং বিদ্যুৎ সংকটসহ অভ্যন্তরীণ কিছু সীমাবদ্ধতার কারণে জুলাই-আগস্টের সম্ভাব্য ক্রয়াদেশ থমকে গেছে। এ সময়ে যে পরিমাণ অর্ডার আসার কথা ছিল, তা অত্যন্ত ধীর হয়ে গেছে। অনেক বড় ক্রেতা এরই মধ্যে নেতিবাচক বার্তা দেওয়া শুরু করেছে। তাদের টপ ম্যানেজমেন্ট বর্তমানে বাংলাদেশে নতুন অর্ডার দেওয়ার ক্ষেত্রে পিছু হটছে।
বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান আমার দেশকে বলেন, বৈশ্বিক পোশাক বাজারে ভিয়েতনামের দ্রুত অগ্রগতির পেছনে মূল চালিকাশক্তি তাদের দেশে চীনের মালিকানাধীন শিল্প স্থাপনা। চীনের ব্যবসায়ীরা সেখানে কারখানা স্থাপন করে রপ্তানি কার্যক্রম পরিচালনা করছে। তাই মোট পণ্য রপ্তানির হিসেবে তারা আমাদের থেকে এগিয়ে গেছে। ভিয়েতনামের কাঠামোগত সুবিধার কারণেও তারা অনেকটা এগিয়ে আছে। বিশেষ করে কাঁচামাল সংগ্রহে দক্ষতা তাদের বড় সুবিধা এনে দিয়েছে। ভিয়েতনাম চীন থেকে প্রায় এক সপ্তাহেই প্রয়োজনীয় কাঁচামাল সংগ্রহ করতে সক্ষম। যেখানে বাংলাদেশে একই প্রক্রিয়ায় প্রায় এক মাস পর্যন্ত সময় লাগে, ফলে লিড টাইম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়।
তিনি আরো বলেন, বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে রপ্তানি হ্রাসের পেছনে কয়েকটি অভিন্ন কারণ কাজ করছে। এর মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্ক আরোপ, প্রতিযোগী দেশগুলোর আগ্রাসী বাণিজ্য কৌশল, অভ্যন্তরীণভাবে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি। সর্বশেষ মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকট পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে।
মাহমুদ হাসান খান বলেন, শান্তিপূর্ণ নির্বাচন হলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে—এমন প্রত্যাশা ছিল। সে অনুযায়ী এপ্রিল বা মে মাস থেকে নতুন রপ্তানি আদেশ বাড়তে পারে এবং এর প্রতিফলন আগস্ট নাগাদ দেখা যাবে বলে ধারণা করা হয়েছিল। তবে মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা সেই সম্ভাবনাকে অনিশ্চিত করে দিয়েছে। বর্তমান বাস্তবতায় রপ্তানি খাতে ইতিবাচক প্রবণতা কবে ফিরবে, তা নির্দিষ্ট করে বলা কঠিন।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম আমার দেশকে বলেন, চলমান পরিস্থিতিতে দেশের রপ্তানি কার্যক্রম বিঘ্নিত হচ্ছে। রপ্তানি আদেশে ব্যাপকভাবে ভাটা পড়েছে। আমাদের কাছে জুন পর্যন্ত রপ্তানি আদেশ আছে। এরপর জুলাই থেকে নতুন আদেশ সংগ্রহের কাজ করছি। সামগ্রিকভাবে রপ্তানি আদেশ ৩০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।
তিনি বলেন, ইইউভুক্ত দেশগুলোতে পোশাকের রপ্তানি কমে যাওয়ার প্রধান কারণ চীন ও ভারতের আগ্রাসী রপ্তানি নীতি। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে অনেক বেশি শুল্কের কারণে তারা কম দামে ইইউতে রপ্তানি করছে। এ কারণে সেখানে বাংলাদেশের রপ্তানি কমছে। মধ্যপ্রাচ্যে জ্বালানি সংকটের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে আমাদের উৎপাদন কার্যক্রমে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গ্যাসের চাপ কমে যাওয়া এবং ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে অনেক কারখানাকে ডিজেলচালিত জেনারেটর ব্যবহার করতে হচ্ছে। কিন্তু জেনারেটর চালাতে প্রয়োজনীয় ডিজেলও সহজে পাওয়া যাচ্ছে না। পর্যাপ্ত ডিজেল না পাওয়ায় উৎপাদন প্রক্রিয়া ব্যাহত হচ্ছে।
তিনি আরো বলেন, হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ থাকায় মধ্যপ্রাচ্যের বাজারে পোশাক রপ্তানি কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে রপ্তানিতে বিকল্প পথ হিসেবে আটলান্টিক মহাসাগর ঘুরে জাহাজ চলাচল করছে। এতে গন্তব্যে পৌঁছাতে প্রায় ১০ দিন অতিরিক্ত সময় লাগছে। এছাড়াও এর সঙ্গে বাড়তি পরিবহন খরচ যুক্ত হচ্ছে।
অন্যান্য রপ্তানি পণ্যেও বিপর্যয়
গুরুত্বপূর্ণ অন্যান্য শীর্ষ খাতভিত্তিক রপ্তানি পণ্যেও বিপর্যয় স্পষ্ট হয়ে উঠছে। ইপিবির সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশের দ্বিতীয় বৃহৎ রপ্তানি খাত চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যে মার্চে আয় হয়েছে আট কোটি ৭৯ লাখ ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় সাত শতাংশ কম। তবে চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে এ খাত থেকে মোট আয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ৮৮ কোটি ডলার।
অন্যদিকে বাংলাদেশের রপ্তানিমুখী শিল্পের তৃতীয় অবস্থানে থাকা প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যে মার্চে নিম্নগতি লক্ষ্য করা গেছে। এ খাতে রপ্তানি হয়েছে সাড়ে ছয় কোটি ডলারের পণ্য, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ কম। জুলাই থেকে মার্চ পর্যন্ত মোট রপ্তানি হয়েছে প্রায় ৭৩ কোটি ডলার, যা পূর্ববর্তী অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ৯ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।
চতুর্থ শীর্ষ খাত হোম টেক্সটাইলেও পতনের ধারাবাহিকতা রয়েছে। মার্চে এ খাত থেকে আয় হয়েছে সাত কোটি ৯২ লাখ ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ২০ শতাংশ কম। চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে মোট রপ্তানি দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬৭ কোটি ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় কমেছে দশমিক ৭৩ শতাংশ।
এদিকে পঞ্চম অবস্থানে থাকা পাট ও পাটজাত পণ্য খাতে মার্চে রপ্তানি আয় হয়েছে প্রায় পৌনে সাত কোটি ডলার। এ খাতেও আগের বছরের তুলনায় পতনের হার প্রায় সাড়ে ১৩ শতাংশ। জুলাই–মার্চ সময়ে মোট আয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬২ কোটি ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় এক দশমিক ৩০ শতাংশ কম।
রপ্তানিতে ইরান যুদ্ধের প্রভাব
ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যুদ্ধ অনিশ্চয়তায় ফেলেছে বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্যকে। আকাশসীমা বন্ধ, গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে অস্থিরতা এবং আন্তর্জাতিক শিপিং খাতে অতিরিক্ত চার্জ আরোপের কারণে পণ্য পরিবহন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। যুদ্ধ শুরুর পর মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশ আকাশসীমা বন্ধ করে দেওয়ায় রপ্তানি কার্যক্রমে তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়েছে।
ইপিবির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে মার্চ—এ ৯ মাসে মধ্যপ্রাচ্যের বাজারে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানি দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬৬ কোটি ৩৪ লাখ ডলার। এর মধ্যে একক দেশ হিসেবে সর্বোচ্চ রপ্তানি হয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাতে, যেখানে রপ্তানির পরিমাণ প্রায় ২৮ কোটি ১১ লাখ ডলার। এরপরেই রয়েছে সৌদি আরব, দেশটিতে রপ্তানি হয়েছে প্রায় ২৫ কোটি ১৬ লাখ ডলারের পণ্য। অন্যদিকে কুয়েতে রপ্তানি হয়েছে প্রায় দুই কোটি ডলার, আর সংঘাতপূর্ণ ইরানে গেছে ৮১ লাখ ডলারের পণ্য। এ অঞ্চলে বর্তমানে তৈরি পোশাক রপ্তানি পুরোপুরি বন্ধ।
মধ্যপ্রাচ্য বাংলাদেশের কৃষিপণ্যের অন্যতম বড় বাজার। দেশের মোট সবজি রপ্তানির প্রায় ৬০ শতাংশ ওই অঞ্চলে যায়। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, কাতারসহ বিভিন্ন দেশে বছরে কয়েক কোটি ডলারের কৃষিপণ্য পাঠানো হয়। যুদ্ধের কারণে বিমান চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এসব পণ্যের রপ্তানি কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বিশ্ববাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি অচল হয়ে যাওয়ায় জ্বালানি সরবরাহের পাশাপাশি পণ্য পরিবহন বিঘ্নিত হয়েছে। ফলে সারা বিশ্বেই রপ্তানি বাণিজ্যে বড় ধাক্কা লেগেছে। মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা দ্রুত নিরসন না হলে বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে থাকবে। আকাশপথ ও সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহন স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত ক্ষতির ঝুঁকি থেকেই যাবে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

