নিরাপত্তাবেষ্টিত এলাকায় বারবার আগুন, বাড়ছে উদ্বেগ

কবিতা
কবিতা

নিরাপত্তাবেষ্টিত এলাকায় বারবার আগুন, বাড়ছে উদ্বেগ

আট মাসের ব্যবধানে আবারও আগুন লেগেছে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে। গত শুক্রবার রাতের এ ঘটনায় বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি না হলেও নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ও তদারকি নিয়ে। বিশেষ করে কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টিত এলাকায় বারবার অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা কেন ঘটছে—তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে সংশ্লিষ্ট মহলে।

এদিকে বিমানবন্দরের কার্গো এলাকায় আগুনের ঘটনা সন্দেহজনক বলে মনে করছেন তদন্তকারী কর্মকর্তারা। আগুনের ঘটনায় ডিএইচএলের পাঁচ কর্মীকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। এ ঘটনায় তদন্তকারীরা এর মধ্যে নানা অসংগতি পেয়েছেন।

বিজ্ঞাপন

জানা গেছে, গত শুক্রবার রাত ১১টা ২৫ মিনিটের দিকে বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজের ৯ নম্বর গেট-সংলগ্ন কুরিয়ার শেডে আগুনের সূত্রপাত হয়। কার্গো ভিলেজের এ অংশে আমদানি পণ্যের মজুত থাকে। প্রাথমিকভাবে শাহজালাল বিমানবন্দরের নিজস্ব ফায়ার ইউনিট আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু করে। পরে ফায়ার সার্ভিসের ছয়টি ইউনিট এবং বিমানবাহিনীর ঘাঁটি একে খন্দকারের সদস্যরা যোগ দেন।

ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক (অপারেশন ও মেইনটেন্যান্স) লেফটেন্যান্ট কর্নেল মাহমুদুল হাসান জানান, রাত ১১টা ৩৮ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। রাত একটা ৫ মিনিটে আগুন পুরোপুরি নির্বাপণ করা হয়। তিনি বলেন, কুরিয়ার অপারেশন অংশে থাকা একটি কন্টেইনারে আগুনের সূত্রপাত হয়। তবে আগুনের কারণ তাৎক্ষণিকভাবে বলা সম্ভব নয়। তদন্ত শেষে বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যাবে।

অগ্নিকাণ্ডের খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে যান বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী রশিদুজ্জামান মিল্লাত। তিনি ঘটনাকে গুরুত্ব দিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেন। তিননি সাংবাদিকদের বলেন, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, শর্টসার্কিট থেকে আগুনের ঘটনা ঘটতে পারে। তবে প্রশ্ন হলো, শর্টসার্কিট হবে কেন? আগের অগ্নিকাণ্ডের তদন্তেও একই কারণ উল্লেখ করা হয়েছিল। তাহলে কোথাও না, কোথাও গাফিলতি রয়েছে, সেটি স্বীকার করতে হবে। তিনি আরো বলেন, তদন্তে কারো অবহেলা বা দায়িত্বহীনতা পাওয়া গেলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে।

বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক রাগীব সামাদ বলেন, রাত সাড়ে ১১টার দিকে একটি কন্টেইনারের ভেতরে এবং পাশে আগুন দেখা যায়। খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব সংস্থা দ্রুত ব্যবস্থা নেয় এবং আগুন নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। তিনি জানান, অগ্নিকাণ্ডের কারণে বিমানবন্দরের ফ্লাইট পরিচালনায় কোনো বিঘ্ন ঘটেনি। তবে ব্যবসায়ীদের মধ্যে উদ্বেগ কাটেনি। তাদের প্রশ্ন, কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে থাকা কার্গো এলাকায় বারবার আগুন লাগছে কেন?

বিমানবন্দর সিঅ্যা্ন্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সহসভাপতি খায়রুল আলম ভূঁইয়া বলেন, এটি সাধারণ কোনো এলাকা নয়। এখানে শত শত কোটি টাকার আমদানি পণ্য সংরক্ষিত থাকে। চারদিকে নিরাপত্তাব্যবস্থা রয়েছে। তারপরও বারবার আগুন লাগছে। এর দায় কার, তা খুঁজে বের করতে হবে। তিনি বলেন, এক ঘটনার ক্ষত শুকানোর আগেই আরেকটি অগ্নিকাণ্ড ঘটল। এতে শুধু ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হন না, দেশের ভাবমূর্তিও ক্ষুণ্ণ হয়। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং দায়ীদের শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

সূত্র জানায়, অনেক সময় বিমানবন্দরে কর্তব্যরত নিরাপত্তাকর্মীরা রাতে ঠিকমতো ডিউটি করে না, ঘুমিয়ে পড়ে। আবার অসাবধানতাবশত কেউ সিগারেটের আগুনও ফেলতে পারে। সেটা থেকেও আগুন লাগতে পারে। তবে ইচ্ছাকৃতভাবে কেউ করেছে বলে মনে হয় না। যদি শর্টসার্কিট হয়, তাহলে এর দায় দায়িত্বরত সংস্থার ওপর বর্তায়। সিভিল অ্যাভিয়েশনের উচিত বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে দেখা এবং প্রয়োজনীয় সংস্কার করা।

গত ১৮ অক্টোবর শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের আমদানি কার্গো কমপ্লেক্সে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। সেদিন আগুন নিয়ন্ত্রণে ফায়ার সার্ভিসের ১৩টি স্টেশনের ৩৭টি ইউনিট কাজ করে। সেনাবাহিনী ও বিজিবির সদস্যরাও সহায়তা করেন। প্রায় ২৭ ঘণ্টা পর আগুন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসে। ওই ঘটনায় শত শত কোটি টাকার পণ্য ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার দাবি করেন ব্যবসায়ীরা। দেশি-বিদেশি বিভিন্ন সংস্থা ঘটনাটির তদন্তও করে।

সর্বশেষ অগ্নিকাণ্ডের পর আবারও সামনে এসেছে পুরোনো প্রশ্ন, নিরাপত্তায় ঘেরা বিমানবন্দরের কার্গো এলাকায় বারবার আগুন লাগছে কেন? তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের দিকেই এখন তাকিয়ে রয়েছে সংশ্লিষ্ট সবাই।

ডিএইচএলের পাঁচ কর্মীকে জিজ্ঞাসাবাদ

শাহজালালের কার্গো এলাকায় আগুনের ঘটনা সন্দেহজনক বলে মনে করছেন তদন্তকারী কর্মকর্তারা। এ ঘটনায় তদন্তকারীরা এরই মধ্যে নানা ধরনের অসংগতি পেয়েছেন। এ অসংগতির বিষয়ে গতকাল শনিবার সকাল থেকেই কুরিয়ার সার্ভিস প্রতিষ্ঠান ডিএইচএলের পাঁচ কর্মীকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে।

বিমানবন্দরের স্পর্শকাতর এ জায়গায় আবার অগ্নিকাণ্ডের বিষয়ে কথা হয় তদন্তের সঙ্গে জড়িত একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, গত বছরের ১৮ অক্টোবর ডিএইচএল কুরিয়ারের শেড থেকেই আগুনের সূত্রপাত হয়। গত শুক্রবার রাতেও একই শেড থেকে আবার আগুনের ঘটনা ঘটে। তারা আরো বলেন, হ্যাঙ্গার-সংশ্লিষ্ট ডিএইচএলের শেডের যে স্থানে আগুনটি লাগে, সেটি ছিল সিসিটিভি ক্যামেরার আওতার বাইরে। আগুন লাগার সামনের অংশে ছিল একটি বৈদ্যুতিক পিলার। তার নিচে কিছু তারও ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে ছিল। তদন্তকারীদের প্রশ্ন, সে তার থেকে শর্টসার্কিট হলে অবশ্যই স্পার্ক হওয়ার কথা। কিন্তু ঘটনার সময় তা হয়নি। এমনকি শর্টসার্কিট হলে বিদ্যুতের লাইটও বন্ধ হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু এগুলো কিছুই হয়নি।

তদন্তকারী কর্মকর্তারা বলছেন, যে স্থানটিতে আগুন লেগেছে তার কিছু দূরে সিগারেটের শেষের কয়েকটি অংশ পড়েছিল। তদন্তকারীদের প্রশ্ন ওই এলাকায় সিগারেট খাওয়াই নিষিদ্ধ। কিন্তু সিগারেট থেকে আগুন লাগলে তা থেকে ধোঁয়া বের হবে। পরে ধীরে ধীরে আগুন জ্বলবে। কিন্তু এক্ষেত্রে সেরকম কোনো ঘটনা ঘটেনি। হঠাৎ করে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলে ওঠে। সিটিটিভির ফুটেজ বিশ্লেষণ করে তারা বলেন, রাত তখন সাড়ে ১১টার কাছাকাছি। ঘটনাস্থলের কাছাকাছি স্থানে ডিএইচএলের একজন কর্মী উপস্থিত ছিলেন। যাকে সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে। ফুটেজ বিশ্লেষণ করে তারা দেখতে পেয়েছেন, তিনি মশারি টাঙিয়ে সেখানে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। একপর্যায়ে আগুন লাগার দেড়-দুই মিনিট তিনি খুবই শান্তভাবে দাঁড়িয়ে বিষয়টি দেখছিলেন। পরে আগুন ছড়িয়ে পড়লে তিনি বিষয়টি সবাইকে জানানোর জন্য ফোন করেন।

তদন্তকারীদের দাবি, রাতে ধূমপানের জন্য ওইদিকে কারো যাওয়ার কথা নয়, তাহলে আগুন কীভাবে লাগলো এবং তা ছড়াল। তাদের দাবি, বিষয়টি খুবই রহস্যের। আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে, কারো দ্বারা এটি সংঘটিত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। আর এ কারণে কয়েকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

জানা যায়, ডিএইচএলের ওই কন্টেইনারে বিভিন্ন মালামাল ছিল। এর মধ্যে কাপড়ের রোল, পেপার আইটেম, রাবার আইটেম, প্লাস্টিক আইটেমসহ নানারকম পণ্য ছিল। এসব পণ্য আজ রোববার নিলাম হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তার আগেই এমন ঘটনা নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

জানা যায়, পরপর দুটি আগুনই ডিএইচএলের শেড থেকে হওয়ায় এ প্রশ্ন আরো জোরাল হচ্ছে। কেন সেখান থেকেই বারবার আগুনের উৎপত্তি হচ্ছে। তার মানে অগ্নিনিরাপত্তায় তাদের চরম অবহেলা রয়েছে। নয়তো তারা ইচ্ছে করেই এ ধরনের ঘটনা ঘটাচ্ছে। বিমানবন্দরের ভাবমূর্তি বহির্বিশ্বে ক্ষুণ্ণ করতে সূক্ষ্মভাবে এসব কাজ করা হচ্ছে।

এ বিষয়ে ফায়ার সার্ভিসের মিডিয়া সেল কর্মকর্তা তালহা বিন জসিম বলেন, ঘটনাটি ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকেও তদন্ত করা হচ্ছে। তদন্তের পরই অগ্নিকাণ্ডের কারণ বলা যাবে।

বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক বলেন, তদন্ত হচ্ছে। কোথা থেকে আগুনের সূত্রপাত, তা আমরা দেখছি। পাশাপাশি কেউ ইচ্ছা করে আগুন লাগিয়েছে কি না, সেটিও তদন্তের মধ্যে রয়েছে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন