ছুটির দিনেও বাসাবাড়িতে গ্যাস নেই। বিশেষ করে গত সপ্তাহে বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতার পরে কোনো কোনো এলাকায় একেবারেই বন্ধ রয়েছে গ্যাস সরবরাহ। গ্যাস সংকটে আবাসিক এলাকাগুলোতে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন বাসিন্দারা। দিনের পর দিন চুলা না জ্বললেও প্রতি মাসে বিল পরিশোধ করতে হচ্ছে। রাজধানী ছেড়ে নিজ নিজ এলাকায় চলে যাচ্ছেন অনেকে। বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দা এবং তিতাস কর্তৃপক্ষসহ বিভিন্ন সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
গ্যাস সংকট কমাতে দ্রুত সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে বলছেন জ্বালানি ও নগর উন্নয়ন বিশেষজ্ঞরা। একইসঙ্গে বিশেষ পরিস্থিতিতে সিএনজি স্টেশন, বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং আবাসিক এলাকার জন্য গ্যাস রেশনিংয়ের নীতিমালা কার্যকর করার বিষয়েও মতামত দিয়েছেন
আমার দেশকে।
গতকাল শুক্রবার চলমান গ্যাস সংকটের সমাধান ও গ্যাস ছাড়া বিল প্রদান করবেন না বলে হুমকি দিয়েছেন মোহাম্মদপুরের বিভিন্ন হাউজিংয়ের বাসিন্দারা। বছরের পর বছর ধরে যথাসময়ে গ্যাস না পাওয়া মোহাম্মদপুরসহ বিভিন্ন আবাসিক এলাকার নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার ছিল। কিন্তু ছুটির দিনেও সারাদিন চুলা না জ্বলায় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের নামে রাস্তায় মানববন্ধন করেছেন স্থানীয়রা। তারা অভিযোগ করেছেন, ‘জুমার নামাজের পর আমাদের বাড়িতে রান্না হওয়ার কথা। অথচ ঘরে গ্যাস নেই, রান্নাবান্না করা যাচ্ছে না।’
শুক্রবার (২৪ জুলাই) জুমার নামাজের পরে মোহাম্মদপুর আল্লাহ করিম মসজিদের সামনে আয়োজিত মানববন্ধনে স্থানীয়রা অভিযোগ করেন, ‘মোহাম্মদপুরের গ্যাস সংকটের স্থায়ী সমাধান, নিরবচ্ছিন্ন সেবা না দিয়ে বিল নেওয়ার ভোগান্তি বন্ধ করতে হবে। একইসঙ্গে তারা তিতাস কর্তৃপক্ষের গাফিলতি বন্ধ, অবৈধ গ্যাস সংযোগ বন্ধের দাবিও করেছেন।
মোহাম্মদপুর এলাকার বাসিন্দা তাসমিমা (৩০) জানান, আগে সারাদিন গ্যাস থাকত না, তবে সন্ধ্যার পর গ্যাস চলে আসত। আবার খুব সকালে গ্যাস পাওয়া যেত। এখন গভীর রাতেও গ্যাস আসে না। যারা সিলিন্ডার ব্যবহার করেন; তারা তো ঝামেলামুক্ত কিন্তু যারা তিতাস গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল তারাই চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন। এলপিজি সিলিন্ডার কিংবা অন্য উপায়ে রান্নার জন্য বাড়তি ব্যয়ও করতে হচ্ছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গ্যাস সংকটের কারণে সারা দিনেও চুলা জ্বলে না রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায়। মাসের পর মাস ধরে এ অবস্থা শুধু মোহাম্মদপুরেই নয়, ধানমন্ডি, কাঁঠালবাগান, রায়েরবাজার, মগবাজার রামপুরা, পশ্চিম রামপুরা, মহানগর প্রজেক্ট, মগবাজার নয়াটোলা এলাকা, মালিবাগ, মানিকনগর, বাসাবো, আরামবাগ, যাত্রাবাড়ী, আদর্শবাগ, বিবিরবাগিচা, পুরান ঢাকার করাতিটোলা, সুরীটোলা, স্বামীবাগ, টিকাটুলি, লালবাগ, ইসলামপুর, সূত্রাপুর, দয়াগঞ্জ ও কামরাঙ্গীরচর এলাকায় গ্যাসের চাপ সব সময় কম থাকে। সারাদিনে এসব বাসিন্দাদের অপেক্ষা করতে হয় কখন গ্যাসের চাপ বাড়বে আর চুলায় হাঁড়ি বসাবেন। একই চিত্র রাজধানীর উত্তর ঢাকাতেও দেখা গেছে। নতুন বাজার, ভাটারা, নদ্দা, বাড্ডা শেওড়াপাড়া, মিরপুর-১০, মীরপুর ১৩, কাজীপাড়া, রূপনগরসহ বিভিন্ন এলাকায়। এ বছরে গ্যাস সংকটের অভিযোগের তালিকায় যুক্ত হয়েছে ক্যান্টনমেন্টের আবাসিক ভবনগুলো, সেখানেও গত এক মাস ধরে টানা গ্যাস সংকট চলছে।
মীরপুর ১৩ নম্বরের বাসিন্দা মিনু বেগম (৪৯) জানান, ওই এলাকায় সারাবছর ধরেই গ্যাসের চাপ কম থাকে। কিন্তু গত সপ্তাহের জলাবদ্ধতার পরে গ্যাস একেবারেই আর আসছে না। যাদের নিজস্ব বাসাবাড়ি তারা তো বিকল্প খুঁজে বের করছেন কিন্তু ভাড়াটিয়াদের সমস্যাটা প্রকট। তাদের খাবার কিনে খেতে হচ্ছে।’
যেসব এলাকায় গ্যাস রয়েছে, সেখানেও স্বল্প চাপ থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বাসিন্দারা। নতুন বাজারের বাসিন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী খায়রুন্নেছা (২৩) বলেন, সারাদিনের সব কাজকর্ম বাদ দিয়ে এখন শুধু গ্যাসের চাপের অপেক্ষা করতে হচ্ছে। রান্নার কাজ ছাড়াও আরো বহু কাজ থাকে। মনে হয় সব কিছু থমকে যাচ্ছে গ্যাস সংকট, পানির সংকটে। শুধু রাজধানীই নয় ঢাকা, সাভার, গাজীপুর, নরসিংদী, ময়মনসিংহসহ অন্যান্য এলাকার বিভিন্ন কারখানাতেও ভয়াবহ গ্যাস সংকট দেখা দিয়েছে।’
গ্যাস সংকটের কারণ
গ্যাসের তীব্র সংকটের বিষয়ে জ্বালানি বিভাগ জানিয়েছে, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস তথা এলএনজির জন্য দেশে দুটি টার্মিনাল রয়েছে। এর একটি পরিচালনার দায়িত্বে সামিট গ্রুপ। অন্যটি মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জি। এ দুই টার্মিনাল এবং দেশীয় উৎস থেকে দেশের মোট গ্যাস সরবরাহ সক্ষমতা প্রায় ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট হলেও বর্তমানে দৈনিক ২ হাজার ৭০০ থেকে ২ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। এর অন্যতম কারণ একটি এলএনজি টার্মিনাল কারিগরি ত্রুটির কারণে বন্ধ রয়েছে। এর ফলে গত মঙ্গলবার থেকে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ কমেছে প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের। এতে আবাসিক থেকে শুরু করে সব খাতে বিরাজ করছে গ্যাসের তীব্র সংকট।
তীব্র গ্যাস সংকটের কারণ হিসেবে দৈনিক আমার দেশকে তিতাস জানিয়েছে, একটি এলএনজি স্টেশন পুরোপুরি বন্ধ থাকায় চাহিদার তুলনায় ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস এই মুহূর্তে কম সরবরাহ হচ্ছে’ আজ এবং আগামীকাল রোববারের মধ্যেই সব ঠিক হয়ে যাওয়ার আশাও প্রকাশ করেছে সংস্থাটি। শনিবার দুপুর থেকে এলএনজি চালু হলে আস্তে আস্তে গ্যাসের চাপ বাড়বে। আর পুরোপুরি সংকট কাটতে আরো দু-একদিন সময় লাগবে; কেননা গ্যাস চালু হলে তার প্রেসার বাড়তে সময় লাগে। আশা করছি দ্রুতই সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।
দ্রুত সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে বলছেন জ্বালানি ও নগর উন্নয়ন বিশেষজ্ঞরা
জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারের প্রতি একগুচ্ছ পরামর্শ দিয়ে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক এবং জ্বালানি ও টেকসই উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন বলেন, জ্বালানির আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে আনতে হবে দ্রুত। নিজস্ব জ্বালানি উৎপাদনের দিকে নজর দেওয়ার পাশাপাশি দক্ষতা বাড়াতে হবে। যদিও এর ফল পেতে কিছুটা বিলম্ব হবে, তারপরেও বসে থাকার সুযোগ নেই। যেসব খাতে দুর্নীতি হয়েছে, সেগুলো চিহ্নিত করে তা বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। কারণ, বিগত সরকার দেশে জ্বালানি উৎপাদন সক্ষমতা না বাড়িয়ে প্রায় পুরোটাই আমদানিনির্ভর করেছে শুধুমাত্র লুটপাটের উদ্দেশ্যে। বর্তমান সরকারকে এখান থেকে বেরিয়ে আসতে হবে ।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগ-এর অধ্যাপক এবং ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইপিডি)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. আদিল মুহাম্মদ খান আমার দেশকে বলেছেন, তীব্র গ্যাস সংকটের মূল কারণ ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে যান্ত্রিক ত্রুটি। উচ্চ আমদানিমূল্য ও বিপুল ভর্তুকির কারণে এলএনজির ওপর একক নির্ভরতা দেশের অর্থনীতির জন্য বড় বোঝা। বঙ্গোপসাগরে প্রায়ই ঘূর্ণিঝড় ও যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে ভাসমান টার্মিনাল বিকল হয়ে গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি ভেঙে পড়ে। আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম ও সরবরাহ অত্যন্ত অস্থির হওয়ায় দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা সবসময় ঝুঁকিতে থাকে। এই সংকট থেকে বাঁচতে আমদানি কমিয়ে স্থল ও সমুদ্রভাগে দেশীয় নতুন গ্যাস কূপ অনুসন্ধানে জোর দেওয়া জরুরি। দীর্ঘমেয়াদি টেকসই সমাধানের জন্য সৌর বা বায়ুবিদ্যুতের মতো নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার দ্রুত বাড়ানো প্রয়োজন। আবাসিক গ্রাহকদের অগ্রাধিকার দিতে রান্নার সময়ে যেমন সকাল ও দুপুরে আবাসিক এলাকায় গ্যাসের চাপ স্বাভাবিক রাখতে শিল্পকারখানার গ্যাস ব্যবহারে নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেওয়া দরকার। বিশেষ পরিস্থিতিতে সিএনজি স্টেশন, বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং আবাসিক এলাকার জন্য গ্যাস রেশনিংয়ের নীতিমালা কার্যকর করা দরকার।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম আমার দেশকে বলেন, ‘আমরা গত মাসখানিক ধরে আগের তুলনায় ভালো গ্যাস পাচ্ছিলাম। তবে গত তিন থেকে চারদিন হঠাৎ কমে গেছে। এতে উৎপাদনে বিশাল ক্ষতি হচ্ছে। বিশ্ববাজারে নিটওয়্যার রপ্তানিতে বাংলাদেশের প্রথম স্থানে যাওয়ার সুযোগ আছে। তবে এর জন্য গ্যাস-বিদ্যুৎ, আইনশৃঙ্খলা ও শ্রমিকদের অযাচিত দাবি এসব সমাধান করা উচিত। পাশাপাশি ব্যাংকিং খাতে সংস্কার করতে হবে। তাহলে এক নম্বরে যাওয়ার সুযোগ আছে।’
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


