জুলাইয়ের এক দুপুরে

নেয়ামত ইমাম

জুলাইয়ের এক দুপুরে

মৃত্যুর মাত্র কয়েকটি মুহূর্ত আগে আমি হাঁটু মুড়ে এখানে বসেছিলাম। ঠিক এখানে, আড়াআড়ি টানা যুগল বৈদ্যুতিক তারের নিচে, ‘মায়ের চুলা’ রেস্টুরেন্ট থেকে মাত্র কয়েক গজ দূরে, নয়ন মিয়ার দর্জিঘরের একেবারে সামনে। সেদিন আমার পায়ের নিচের পিচঢালা রাস্তাটি বেশ গরম ছিল। গরম ছিল দুপুরের সূর্য, ধুলা মেশানো বাতাস, আমার শিরা-উপশিরায় প্রবাহিত রক্ত। এমনকি সাদা গেঞ্জিটি, যেটি আমি তখন পরে ছিলাম একটানা চার দিন, যেটি পরে আমি ঘুমিয়েছি রাস্তার কিনারে, খিলক্ষেতের মাংস বিক্রেতার মাচায়, রামপুরার অচেনা গৃহকর্মী খালাম্মার বাসায়, খিলগাঁওয়ের তালতলায় কোনো রকমে বেঁচে থাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া বাইশ বছর বয়সি এক গ্রামীণ বন্ধুর অন্ধকারময় মেসে। গরম ও ঘামে ভেজা ছিল এটি। গলার কাছে ছেঁড়া। পকেট সামনে ঝোলা। বুকে লেখা—‘মানি না।’ পিঠে, ইংরেজিতে—‘নো।’

আমার সামনে ছিল একটি লাল রঙের খালি ধাতব তেলের ড্রাম, যেটি গড়াতে গড়াতে আমি এতটুকু এগিয়েছি, বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছি আমার বন্ধুদের কাছ থেকে—যারা আমার সঙ্গে একই অবিনশ্বর স্লোগান দিচ্ছিল, আকাশ-পাতাল কাঁপিয়ে গলায় রক্ত তুলে জুলাইয়ের সেই সকাল কিংবা তার আগের রাত কিংবা আগের দিন কিংবা তারও আগে থেকে বলছিল, ‘তুমি কে? আমি কে? রাজাকার! রাজাকার!’ এই সাধারণ ড্রাম ছিল আমার নিশ্ছিদ্র ঢাল। আমি বিশ্বাস করি আমাকে লক্ষ করে গুলি ছোড়া হলে যত তীক্ষ্ণই হোক না কেন সে গুলি এর লোহার গোলাকার ও মসৃণ তলে পিছলে গিয়ে হয় আমার মাথার ওপর দিয়ে উড়ে গিয়ে পড়বে পাশের কোনো ডোবায়, নয়তো নিস্তব্ধ হবে রাস্তায়, গরম পিচের নিচে, আমার সামনে। আমি থাকব অনাহত।

বিজ্ঞাপন

এভাবে একসময় আমি পৌঁছে যাব পুলিশের সারির কাছে, তাদের ওপর ছুড়ে মারব আমার হাতের মুঠোয় বন্দি বহুকোণী রুক্ষ পাথর দুটি। ক্ষুদ্র বা সামান্য মনে হলেও ফুটপাতের কিনারে একটি গর্তে পাওয়া এই পাথরগুলোই ছিল আমার অস্ত্র, আমার অস্তিত্বের প্রমাণ। তবে আমি জানতাম, আমার মূল অস্ত্র ছিল আমার বিশ্বাস। আমি জানতাম, এই সংগ্রাম, এই প্রতিরোধ, যাতে অংশগ্রহণ করছে দেশের সকল স্তরের মানুষ, যা বৃথা যেতে পারে না। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি চিরজীবন আমি অবহেলা, অপমান ও বৈষম্য মাথায় নিয়ে এদেশে বসবাস করব না, এই সংগ্রাম একদিন শেষ হতে হবে, এই অত্যাচার একদিন অবশ্যই বন্ধ হবে। বিশ্বাসের চেয়ে বড় অস্ত্র আর কী হতে পারে! দিনের পর দিন নীরবে বসে, নির্ঘুম রাতে অন্ধকারের দিকে পলকহীনভাবে তাকিয়ে, ক্ষুধা ও তৃষ্ণার কাছে মাথা নত না করে আমি এই মহাকাব্যিক বিশ্বাসকে আরো শানিত করেছি, নিতান্ত অস্থিরভাবে আজকের মতো একটি দিনের জন্য নিজেকে তিল তিল করে প্রস্তুত করেছি।

আমি এক হাতে একটু একটু করে ড্রামটি সামনের দিকে ঠেলে দিই এবং হাঁটু ও কনুইয়ে ভর করে এর পিছু পিছু এগোই। মাত্র কয়েকটি ইঞ্চি দূরত্ব এগোবার পর পেছনের দিকে তাকাই—দেখি আমার বন্ধুরা আসছে কি না। তারা আসছে, অবশ্যই, কেন নয়। তারাও যে বিশ্বাস করে এই অভ্যুত্থানে এবং একই দৃঢ় আত্মবিশ্বাসসহ। প্রায় দেড় দশক ধরে তারাও যে একই কালো, দিগন্তবিস্তারী ও নৃশংস বৈষম্যের শিকার। আমি তাদের অনাবৃত বক্ষগুলো দেখি, দেখি স্লোগান দিতে গিয়ে কীভাবে তাদের শ্বাসনালি ফুলে ওঠে, লাল হয়ে যায় তাদের চোখগুলো। দেখি তাদের মাথার চারপাশে পরম যত্নে বাঁধা লাল-সবুজের অতি প্রিয় পতাকা। তাদের নাম আমি জানি না। আগে আমাদের কখনো দেখা হয়েছে বলেও মনে পড়ে না। কিন্তু তাতে কী! এই পতাকা আমাদের একটি বিশাল, অপরিহার্য ও অভঙ্গুর বন্ধুত্বে বেঁধে দিয়েছে, আমাদের মধ্যে এনে দিয়েছে এক অভাবনীয় ঐক্য।

আমরা এগিয়ে যাচ্ছি একই উদ্দেশ্যের দিকে। তাদের মধ্যে রয়েছে ঘোমটা পরা কেউ। কারো প্রলম্বিত ঘন দাড়ি গলার প্রকোষ্ঠ ছাপিয়ে নেমে গেছে বুকের মাঝামাঝি। কারো নাকের নাকফুল রোদে ঝলসে ওঠে, আঁচলে ঘরের চাবি, হাতে ঝাড়ু, পানির বোতল। কারো পিঠে স্কুলের ব্যাগ, তাতে ঘুড়ির নাটাই বা রুটি বেলার পুরোনো কাঠের বেলন। কারো চেহারা পচা ডালিমের মতো কালো, বিষাদক্লিষ্ট, একা; কিন্তু নত নয়। কারো সবগুলো দাঁত পড়ে গেছে, তাই মুখ খুললে মুখের ভেতর সারা জনমের অন্ধকার দেখা যায়।

তাদের মধ্য থেকে কোনো ঢাল ছাড়াই কয়েকটি ছেলে আমার খুব কাছাকাছি চলে আসে। বয়স আমার বয়সের অর্ধেকের বেশি হবে না। রাস্তা থেকে যেকোনো কিছু কুড়িয়ে তারা সামনের দিকে ছুড়ে মারে, তারপর দৌড়ে পিছিয়ে যায়, তবে তা শুধু আবার আসার জন্য, আরো কয়েক পা সামনে এগোবার জন্য। না, এই বয়সে তাদের খেলাধুলা করার কথা থাকলেও তারা কিন্তু এখন খেলছে না। তাদের চেহারায় কাঠিন্য। তারা সত্যিই জানে কী ঘটছে এবং ঠিক কেন তা ঘটছে। সুতরাং খেলার সময় কোথায়! কিংবা হয়তো খেলছে তারা, যে খেলায় হার-জিত জীবন বা মৃত্যুকে নির্দেশ করে, যে খেলায় তাদের অবশ্যই অংশগ্রহণ করতে হবে, অন্য কোনো পথ খোলা নেই। এই ৫৬ হাজার বর্গমাইল এলাকায় পালাবার মতো শান্ত জায়গা তাদের জন্য নেই।

তাদের পেছনে কেউ দিগন্ত থেকে দিগন্তে, কী অনাবিল সাবলীলতায়, কী রকম আদিম আক্রোশে সড়ক বিভাজকের ওপরে দাঁড়িয়ে ওড়ায় আমাদের জাতীয় পতাকা; একজন নয়, দুজন নয়, কয়েকজন। দ্বিতীয় লোকটি কি আমার ছোট ভাই, যে মাত্র একাদশ শ্রেণিতে কলায় ভর্তি হয়েছে এবং যে যে কোনো ন্যায়সংগত ব্যাপারে মিছিলে না গিয়ে থাকতে পারে না, বাবার শত নিষেধ থাকা সত্ত্বেও? আমাকে কিছু না জানিয়েই কি তবে আজ সে চলে এসেছে এখানে, আমার খুব কাছে? কেন নয়, ভাই বলে কথা। তাকে তো হতে হবে আমার মতোই। এতে আশ্চর্য হবার কী আছে! তবে কেউ তাকে সাইয়্যিদ নামে ডাকছে কেন? সে-ই বা সে ডাকে সাড়া দিচ্ছে কেন? আমার ছোট ভাইয়ের নাম যে নাজমুল! মোহাম্মদ নাজমুল আলম! গ্রাম: বিলধলী! পোস্ট অফিস: পাক ফতেপুর!

পতাকা ওড়াতে ওড়াতে সে তাদের দিকে এগিয়ে যায়, কারো হাতে তুলে দেয় পতাকাটি। তখন কাউকে বলতে শোনা যায়, ‘আরো ওপরে ওড়া, সাইফুল, আরো ওপরে। আকাশে তুলে দে। যেখানে আর কোনোদিন কোনো পতাকা পৌঁছায়নি।’ পতাকার বাহক তখন পায়ের আঙুলের ওপর দাঁড়িয়ে পতাকাটি কয়েক ইঞ্চি ওপরের দিকে তোলে। তাতেও পেছনের দিকে থাকা কর্কশ গলার স্বরের কে যেন খুশি হয় না। সে বলে: ‘আরো ওপরে, সাইফুল, আরো ওপরে—সারা দেশের মানুষ দেখুক; সারা জগতের মানুষ দেখুক।’ লোকটির হাত থেকে একজন বড়সড় শরীরের লোক নির্ঝঞ্ঝাটে পতাকাটি চেয়ে নেয়, পতাকাটি সে কমপক্ষে এক ফুট বেশি ওপরে তোলে। এবার অন্য এক বক্তা বলে, প্রতিজ্ঞা ও সাহসের ভাষায়—‘আরো ওপরে, রহিমুল, আরো ওপরে। একেবারে আকাশে তুলে দে। স্বর্গ থেকে যাতে এই পতাকা দেখা যায়।’

তার পেছনে টিয়ার গ্যাসের সাদা ধোঁয়ার ভেতর দেখি কয়েকশ মানুষ জড়ো হয়ে আছে। কত অগোছালো তারা, কেউ বসা, কেউ দৌড়াচ্ছে, কেউ নিজেকে রক্ষা করবার জন্য দাঁড়িয়ে আছে বৈদ্যুতিক খামের আড়ালে। কিন্তু কত সুন্দর ও নিষ্পাপ, কত প্রত্যাশিত একাগ্রচিত্ত! কত শক্তিমান! আমার মতো তারাও এগোচ্ছে। সামনের দিকে কেউ দিচ্ছে টায়ারে আগুন। কেউ পাশের বাড়ির কাঠের বেড়া ভেঙে হাতে নিচ্ছে একহাতি লাঠি। কেউ জামা খুলে ঘোরাচ্ছে মাথার ওপর; বলছে, ‘গুলি কর রে, গুলি কর! বাঁইচা আছি, গুলি কর!’ ও মা! এগুলো যে আমার কথা! আমার স্লোগান! সে এসব জানল কী করে! সত্যি, সে কি তবে ঢুকে গেছে আমার মস্তকে, আমার অনুভূতির রন্ধ্রে রন্ধ্রে! তা কী করে সম্ভব!

হয়তো সে আমার মস্তকে ঢোকেনি, কিন্তু তার মস্তকে ঢুকে পড়েছে তারা যারা তার সঙ্গে সঙ্গে আওড়াচ্ছে—‘গুলি কর রে, গুলি কর!’ আমার বুঝতে কষ্ট হয় না যে তারা এগোচ্ছে বলেই আমি এগোচ্ছি এবং আমি এগোচ্ছি বলেই তারা এগোচ্ছে। আমরা একে অন্যের ওপর নির্ভরশীল। তারাই তো কিছুক্ষণ আগে আমার দিকে বাড়িয়ে দিয়েছে এই লাল ড্রাম, তারপর শ্রদ্ধাভরে, হাত জোড় করে বলেছে, ‘যান, এই দেশকে আবার স্বাধীন করুন।’ না, স্পষ্ট করে মনে পড়ছে না। আমিই হয়তো তাদের হাত থেকে কেড়ে নিয়েছিলাম তা; বলেছিলাম, ‘আমাকে সামনে যেতে হবে, ভাঙতে হবে এই ব্যারিকেড, এই দেশকে আবার স্বাধীন করতে হবে।’ কেউ আমাকে টেনে ধরতে চাইলে তাকে আমি কাঁধে ধরে দূরে সরিয়ে দিয়েছিলাম; বলেছিলাম, ‘এটা আমার কাজ। হ্যাঁ, হ্যাঁ, এটা আমার কাজ। দয়া করে বাধা দেবেন না। আপনি আপনার কাজ খুঁজে নিন।’

আমার চোখের দিকে তাকিয়ে তখন সে গভীর ও অতুলনীয় কী যেন বোঝে। সাত-পাঁচ না ভেবে ড্রামটি সে আমার দিকে বাড়িয়ে দেয়, আস্তে করে আমার পিঠ চাপড়ে দেয়। তখন আমি হাঁটু মুড়ে বা রাস্তায় শুয়ে হাঁটু ও কনুইয়ে ভর করে সামনের দিকে এগোতে থাকি, হাতের মুঠোয় ধরা থাকে আমার অতি প্রিয় বহুকোণী পাথর দুটি। মাথা সামান্য তুলে কখনো আমি ড্রামের ওপর দিয়ে সামনের দিকে তাকাই, জানি আরো প্রায় ২০০ গজ যেতে হবে, যেখানে রয়েছে গরম পানির ট্রাক, অস্থিরচিত্ত পুলিশের সারি, তাদের পাশাপাশি হেলমেট ও পুলিশের ভেস্ট পরে বন্দুক ও রামদা হাতে আমাদের একাংশ, যারা আমাদের সার্বভৌমত্বকে বিকিয়ে দেওয়ার এক আদিম উল্লাসে মেতে উঠেছে, বিগত কয়েকটি বছরে স্বাধীন দেশে সবরকমে আমাদের করেছে বহিঃশত্রুর দাস। যেখান থেকে আমাদের দিকে উড়ে আসছে মুহুর্মুহু গুলি। তাদের কাছে পৌঁছাতে হয়তো আমার কয়েক মিনিট সময় লাগবে। কিংবা কয়েক ঘণ্টা। সমস্যা নেই। এই মহান কাজে আমি আমার সারাটি জীবন দিয়ে দিতে পারি।

ঠিক আমার অচেনা ভাই-বোনদের মতো, যারা গতকাল শহীদ হয়েছে পাবনায়, নারায়ণগঞ্জে, খাগড়াছড়িতে, কিশোরগঞ্জে ও জয়পুরহাটে বা শহীদ হয়েছে তার আগের দিন বা তারও আগের দিন এদেশের যে কোনো জেলায়, উপজেলায়, কোনো নাম-না-জানা গ্রামে কিংবা বাজারে। এই প্রতিরোধে নেমে তারা তো তাদের জীবনের একাংশ শুধু উৎসর্গ করেনি, উৎসর্গ করেছে পুরো জীবন। আমাকেও তাই করতে হবে।

হঠাৎ একটি গুলি এসে আমার কয়েক গজের মধ্যে দাঁড়ানো একটি ছেলের বুকে লাগে। আহ্‌! হায়রে! হায়রে হায়! ছেলেটি গড়িয়ে পড়ে রাস্তায়, গরম পিচের ওপর। তার মুখের ভাষা মাঝপথে ফুরিয়ে যায়। পেন্সিলের মতো সরু তার ছোট বাহু দুটি গড়িয়ে পড়ে দুপাশে। কাউকে তখন নিঃসহায় ও পাগলের মতো পেছন থেকে কান্নাভেজা কণ্ঠে ডাকতে শোনা যায়—‘সেলিম! সেলিম! আল্লাহ গো!’ একজন অকুতোভয় লোক দৌড়ে এসে তাকে কোলে করে নিয়ে যেতে চেষ্টা করলে কয়েকটি পা চলার পর সেও গুলিবিদ্ধ হয় এবং লুটিয়ে পড়ে রাস্তায়। তাতে ‘রাজাকার! রাজাকার!’ স্লোগানটি আরো কয়েকবার উচ্চারিত হয়, দিক থেকে দিকে তার প্রতিধ্বনি ছড়িয়ে পড়ে। না, কেউ কাঁদে না। কেউ ছেলেটির জন্য শোক প্রকাশ করে না। পতাকাবাহীরা আরো সক্রিয় হয়।

সবাই যেন জানে প্রতিরোধ সফল না হলে এই গুলি কখনো থামবে না। যারা একবার প্রাণ নিতে শিখে যায়, তারা কখনো স্বেচ্ছায় থামতে চায় না। নিতান্ত রুক্ষ হাতে তাদের থামিয়ে দিতে হয়। মুখে স্লোগান নিয়ে এবার কয়েকজন লোক সামনের দিকে আসে, আসে পতাকাবাহীরাও। তারা বাহুতে বা কাঁধে করে গুলিতে নিহতদের উদ্ধার করে নিয়ে যায়। তখন আমার চোখের সামনে রাস্তার ওপর পড়ে থাকে থোকা থোকা রক্ত, সূর্যের প্রখর তাপে সে রক্ত দ্রুত শুকাতে থাকে, কালো হতে থাকে।

আমি সামনের দিকে তাকাই। ঠিক এ সময়ে আমার বাহু থেকে কয়েক ইঞ্চির মধ্যে একটি গুলি এসে পড়ে, বিকট শব্দ করে দ্বিতীয় গুলি পড়ে ড্রামের ওপর। ভয়ে আমার অন্তরাত্মা শুকিয়ে যায়, চোখ বন্ধ হয়ে আসে। আমি আমার পিঠের ওপর শুয়ে পড়ি, ড্রামটির আড়ালে থেকে পরবর্তী গুলি থেকে নিজেকে রক্ষা করবার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করি। আমাকে এখন গুলিবিদ্ধ হলে চলবে না। যেতে হবে আরো দুইশ গজ। এই অভ্যুত্থানের সফলতা এখন আমার ওপর নির্ভর করছে, নির্ভর করছে বিশ কোটি মানুষের ভবিষ্যৎ। আমার নিঃশ্বাস বেড়ে যায়, হাত-পা ও বুক শক্ত হয়ে আসে।

পুরোনো গেঞ্জি পরা একজন লোক আমার দিকে এগিয়ে আসে। গেঞ্জিটি গলার কাছে ছেঁড়া, পকেট সামনে ঝোলা। মনে হয় দুদিন আগে তাকে আশুলিয়ায় মরে যেতে দেখেছি, দেখেছি এর কয়েক দিন আগে মির্জাপুরে, পুলিশের গাড়ির ভেতরে হাতকড়া পরানো অবস্থায় সে বিমর্ষভাবে বসেছিল, কিংবা মানিকগঞ্জের বান্দুটিয়া বাজারে যেখানে পিঠের চামড়া তুলে তাকে কাদার মধ্যে ফেলে গিয়েছিল কেউ। এখানে সে কবে এসেছে? এখানে তার কী কাজ? সে হয়তো ভাবে পুলিশের সারির কাছে পৌঁছানোর কাজে আমি খুব বেশি সময় নষ্ট করে ফেলছি, আমার ওপর নির্ভর করে বসে থাকলে তার চলবে না, যেজন্য সে আমার হাত থেকে ড্রামটি কেড়ে নিয়ে যেতে চায়।

আমাদের কাছাকাছি আরেকটি গুলি এসে পড়লে আমি তাকে আমার পাশে টেনে নিই, ড্রামের বিপরীতে তাকে পিচঢালা গরম রাস্তার ওপর শুইয়ে দিতে চেষ্টা করি। শক্ত লোক, তাজা পেশি, লম্বা হাড়, নিঃশ্বাস নেয় ষাঁড়ের মতো গোঁৎ গোঁৎ করে, অনেক শক্তি রাখে। তাকে থামানো আমার কাজ নয়। অথবা হয়তো সে তেমন শক্ত নয়, কিন্তু আমার ওপর রাগান্বিত বলে এই মুহূর্তে তার শক্তি কয়েকগুণ বেড়ে যায়। ড্রামের ওপর থেকে আমার একটি হাত ছাড়িয়ে নিতে তার খুব বেশি বেগ পেতে হয় না। তবে আমার দ্বিতীয় হাতটি ছাড়িয়ে নেওয়ার আগেই ঘাড়ে গুলি লাগায় সে আমার পাশে লুটিয়ে পড়ে।

আমি গভীর যন্ত্রণা ও ঘৃণার সঙ্গে বুঝতে পারি, গুলিটি সামনের দিক থেকে বা পুলিশের সারি থেকে আসেনি, এসেছে রাস্তার পাশের পাঁচতলাবিশিষ্ট একটি আবাসিক ভবনের ছাদ থেকে, যেখানে দুজন পুলিশ সদস্য আমাদের দিকে বন্দুক তাক করে দাঁড়িয়ে আছে। আমি শুনি কেউ ডাকছে, ‘রবিউল! রবিউল!’ কেউ বলছে, ‘রবিউল চাচা! রবিউল চাচা!’ তা হয়তো হবে লোকটির নাম, বা ভিড়ের মধ্যে অন্য কারো নাম, যে একইভাবে গুলিবিদ্ধ হয়েছে এবং একই গতিতে এখন নিথর হয়ে গেছে। এ রকম একটি অবস্থায় এ রকম একটি স্থানে এ রকম নিয়ন্ত্রণহীন ও রক্তপিপাসু দস্যুদের বন্দুকের সামনে পড়ে কে বেঁচে আছে বা মরে গেছে, তা সঠিকভাবে নির্ণয় করা কি এতই সহজ? গুলির সঙ্গে সঙ্গে শোরগোল বেড়ে যায় বলে আর কারো ডাক শোনা যায় না। হয়তো কেউ আবারও তাকে একই নামে ডাকে, কিংবা ডাকে অন্য নামে; কিন্তু আমি সে ডাক শুনতে পাই না, কারণ আমি তাকিয়ে থাকি পাঁচতলার ছাদের দিকে। আমার মাথার ভেতর তখন ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠতে থাকে—পথজুড়ে বিশাল ব্যারিকেড তৈরি করে দাঁড়িয়ে থাকা পুলিশের সারির দিকে আমার হাতে ধরা বহুকোণী দুটি পাথর নিক্ষেপ করার সুযোগটি ধীরে ধীরে স্তিমিত হয়ে যাচ্ছে।

ওপরের দিকে তাকিয়ে আমি যেন স্পষ্টভাবে দেখতে পাই ট্রিগার টানার পর একটি বুলেট যাতে ছোট ছোট অক্ষরে ‘মৃত্যু’ শব্দটি লেখা একজন পুলিশের বন্দুকের দেড় ফুট লম্বা ধাতব নল ঘেঁষে বেরিয়ে আসছে, নলের মাথায় একটু ধোঁয়া তৈরি করে ধূলিময় বাতাস ও প্রখর সূর্যালোক ভেদ করে ঘুরতে ঘুরতে ভবনের পঞ্চম তলা, চতুর্থ তলা এবং এর পরের তিনটি তলার পর্বতসমান দূরত্ব অতিক্রম করে জগতের সব কদাচার ও অশুদ্ধতা বুকে নিয়ে ধেয়ে আসছে ঠিক আমার অপ্রশস্ত কপালের দিকে। আমি এতটা আবিষ্ট হয়ে যাই যে গরম রাস্তার ওপর আমি সরে যেতে পারি না, নিজেকে একটি ইঞ্চিও নাড়াতে পারি না—না সামনে না পেছনে, না ডানে বা বাঁয়ে, যার ফলে গুলিটি ঠিক আমার কপালের মধ্যস্থল দিয়ে অনুপ্রবিষ্ট হয়ে সামান্য একটি শব্দ করে রাস্তার বুকে গিয়ে নিস্তব্ধ হয়।

শব্দটি শোনার পর আমি আর স্মরণ করতে পারি না যুগল বৈদ্যুতিক তারের নিচে অবস্থিত রাস্তাটি কোথায় এবং এর ঠিক কোথায় আমি শায়িত; আমি কি পাবনায়, নাকি নারায়ণগঞ্জে, নাকি খাগড়াছড়িতে, নাকি কিশোরগঞ্জে, নাকি জয়পুরহাটে, নাকি বাড্ডায় বা আশুলিয়ায়—গত কয়েক দিনে যেখানে আমি অনেক মৃত্যু দেখেছি। আমি স্মরণ করতে পারি না কয়েকটি মুহূর্ত আগে আমি কোথায় ছিলাম, ঠিক কখন আমি এই জায়গায় পৌঁছার জন্য পথে নেমেছি, বা এটাই আমার প্রথম মৃত্যু কি না। আমার মুখ দিয়ে রক্ত বেরিয়ে আসে, আরো রক্ত আমার পাঁজর বেয়ে নেমে যায় রাস্তায়, থোকা থোকা রক্ত। রোদের তাপে সে রক্ত দ্রুত কালো হয়, মিশে যেতে চায় গরম পিচের সঙ্গে।

তারপর আমার পা দুটি নিস্তেজ হয়ে আসে, বাহুগুলোয় কোনো শক্তি থাকে না। স্লোগান বা গোলাগুলির শব্দও আমার কাছ থেকে হারিয়ে যেতে থাকে একসময়। কয়েকটি ধোঁয়াটে মুহূর্ত পার হওয়ার পর যারা দল বেঁধে আমার মুখের ওপর ঝুঁকে থাকে, তারা চিৎকার করে কিছু বলে যেন এবং বাহুতে ধরে যেন আমাকে টেনে বসাতে চেষ্টা করে। আমি ঈর্ষার সঙ্গে, যন্ত্রণার সঙ্গে, মুগ্ধতার সঙ্গে তাদের মাথার চারপাশে চমৎকারভাবে প্যাঁচানো লাল-সবুজের পতাকাটি দেখি এবং সব শব্দ হারিয়ে যাওয়ার পর এবং সব দৃশ্য শেষবারের মতো ধবধবে সাদা হয়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার আগে অনুভব করি কেউ একজন অগাধ মমত্বসহ আমার হাতে গুঁজে দিচ্ছে এক টুকরো কাপড়; হয়তো একটি পতাকা, লাল-সবুজের পতাকা।

তা ঘটে আমার মৃত্যুর মাত্র কয়েকটি মুহূর্ত আগে এবং ঘটে এখানেই, এই গরম, পিচঢালা রাস্তার ওপর, নয়ন মিয়ার দর্জিঘরের একেবারে সামনে, ‘মায়ের চুলা’ রেস্টুরেন্ট থেকে মাত্র কয়েক গজ দূরে, আর কোথাও নয়। অবশ্য আমি তা সম্পূর্ণ নিশ্চিত করে বলতে পারব না, কারণ এমন বিশাল অর্থবহ ও স্মরণীয় ঘটনা যে বাড্ডায় বা যাত্রাবাড়ীতে বা সাভারের বাসস্ট্যান্ডে বা চুয়াডাঙ্গায় কিংবা নরসিংদীতে আমার সঙ্গে বা অন্য কারো সঙ্গে ঘটেনি বা ঘটবে না, এ বছর বা আগামী বছর, কিংবা তার পরের বছর, কিংবা তারও পরে, যখন মানুষ মানুষের ওপর হামলা করবে, মানুষ মানুষকে প্রতারিত করবে বা বৈষম্যের দেয়াল তুলে দেবে মানুষের মধ্যে, তা নিশ্চিত করে বলা কারো পক্ষে সম্ভব নয়।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন