বাসায় দুজন সাংবাদিক এসেছে। সবার ইন্টারভিউ নেবে। রুনু ভীষণ এক্সাইটেড তাকে টিভিতে দেখা যাবে বলে। চুলে ঝুঁটি বেঁধে সুন্দর একটা ফ্রক পরে ড্রয়িং রুমে ঘুরঘুর করছে রুনু। আমি নীলু। কলেজে পড়ি। ফার্স্ট ইয়ারে। রুনু আমার ছোট বোন। মাত্র পাঁচ বছর বয়স তার। দুরন্ত, চঞ্চল আর ভীষণ মিশুক; আমার পুরো উল্টো। আমি নির্বিবাদী মানুষ, কোনো কিছুর আগে-পাছে থাকি না, যাকে বলে শান্তশিষ্ট, নম্র-ভদ্র, আমি সেরকমই কিছু একটা; বন্ধুদের ভাষায় নার্ড। অবশ্য বন্ধুবান্ধব আমার সেরকম নেই, সবার সঙ্গেই মিশি। আর এখন থেকে মনে হচ্ছে, আমি আরো চুপচাপ হয়ে যাব।
ড্রয়িং রুম থেকে রুনুর কথা শোনা যাচ্ছে। মেয়েটা এত মিষ্টি করে কথা বলে কীভাবে? শুনলেই আদর করতে ইচ্ছা করে। আমার ওসব নিয়ে কথা বলতে ইচ্ছা করছিল না, তাই ঘরে এসে দরজা লাগিয়ে বসে আছি।
গতকালকেই বাসায় এসেছি আমরা। আমরা বলতে মা, আমি আর রুনু। ময়মনসিংহে গিয়েছিলাম বাবার লাশ দাফন করতে। আমার দাদার বাড়ি ময়মনসিংহে, বাকৃবির কাছেই আমাদের বাসাটা। তার পেছনেই পারিবারিক কবরস্থান, বাবা এখন সেখানেই আছে। দুদিন ছিলাম দাদুবাড়িতে।
গোছানো, ছিমছাম, পুরোনো একটা বাড়ি আমাদের। তিয়াত্তরে দাদাজান এখানে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হয়ে আসেন। তখন কিছুদিন কোয়ার্টারেই ছিলেন, পরে জমি কিনে দোতলা বাংলোটা তৈরি করা হয়। বাবার জন্ম, বেড়ে ওঠা—সব এ বাড়িতেই। নিচতলায় বসার ঘর, মেহমানখানা আর লাইব্রেরি। আর ওপরতলায় আমাদের সবার শোবার ঘর। দোতলায় বাড়ির সামনের দিকে একটা বিশাল খোলা বারান্দা আছে, রেলিং বেয়ে মানিপ্ল্যান্টের গাছগুলো ঝুলে থাকে। বাবাই লাগিয়েছিল মানিপ্ল্যান্ট, বাবার প্রিয় গাছ। আমাদের ঢাকার বাসাও মানিপ্ল্যান্টে ছেয়ে গেছে, ঘরের সব কোণে বাবা এই গাছ লাগিয়েছিল।
বাবার দাফন-কাফনের সময় আমি ছাদে দাঁড়িয়েছিলাম। রুনুকে এসব দেখানো হয়নি, ওকে জলিল কাকা পার্কে নিয়ে গিয়েছিল। জলিল কাকা আমাদের বাড়ির দারোয়ান, বাবার জন্মের সময় থেকেই তিনি এখানে।
আমি কোনো কিছুই অনুভব করতে পারছিলাম না। শুধু বুঝতে পারছিলাম বাবা আর কখনো আসবে না, আর কখনো বাবার হাসি দেখব না। রুনু আর বাবার সঙ্গে বক্সিং-বক্সিং খেলতে পারবে না। আমি আর কোনোদিন শুনব না—‘নীলুমা, এক গ্লাস পানি খাওয়াবি?’ বাবা আমাকে কখনো নীলু বলে ডাকেনি, সবসময় শেষে একটা ‘মা’ থাকত। আর রুনুকে ‘বুড়ি’। আমি ছোটবেলায় আমার নামটাকে খুব অপছন্দ করতাম। মা বলত, নামটা নাকি বাবার দেওয়া। বাবা হুমায়ূন আহমেদের অনেক বড় ভক্ত। নীলু, বিলু, তিনু—এসব তার বইয়ের জাতীয় নাম, সেখান থেকেই আমাদের দুই বোনের নাম রেখেছেন বাবা।
আমার বাবা ব্যবসায়ী, একটা ডেভেলপমেন্ট ফার্ম আছে বাবার। আমরা থাকি বসুন্ধরায়, ই ব্লকে। মাত্র কিছুদিন হলো আমাদের ফ্ল্যাটটা কেনা হয়েছে। বাবা কত হইহই করে ঘর সাজাল! বাবার সবকিছুতেই তুমুল উৎসাহ। আর এদিকে মা ঠিক বাবার উল্টো—খুবই ঠান্ডা মেজাজের মানুষ, কোনো কিছু নিয়েই বেশি মাতামাতি মায়ের পছন্দ নয়।
মা বলে, আমি নাকি হয়েছি মায়ের মতো, কিন্তু পছন্দ করি বাবাকে। কথাটা সত্যি, আসলেই বাবা আমার প্রিয়। বাবার মৃতদেহ দেখে মাকে আমি বিলাপ করতে দেখিনি। খুব শান্তভাবে সব কাজ শেষ করেছে মা; চোখে পানি, কিন্তু মুখে কোনো শব্দ নেই—যেন বুক থেকে বেরিয়ে আসা শব্দগুলো পাথরচাপা দিয়ে রেখেছে। আচ্ছা, বাবার কি এখনই মরে যাওয়ার সময় হয়েছিল? হয়তো হয়েছিল, কে জানে?
আমি ইন্ট্রোভার্ট হলেও ঘরকুনো স্বভাবের নই, বাইরে বাইরে থাকতেই বেশি পছন্দ করি। এমনকি আন্দোলন শুরু হওয়ার পর থেকে আমি প্রায়ই বাইরে থাকি। যদিও সবসময় বাবা সঙ্গেই থাকত, তবে মাঝে মাঝে একাই বেরিয়ে যাই। আমি মিছিলে থাকি ঠিকই, কিন্তু স্লোগানের সঙ্গে গলা মেলাতে পারি না, খুব আড়ষ্টতা কাজ করে। সেদিন মিছিল থেকে ফেরার পথে বাবা আমাকে জিজ্ঞেস করছিল, ‘স্লোগান দিতে গিয়ে শরীরে কেমন একটা জোশ আসে না রে? একেবারে রক্ত গরম হয়ে যায়।’
—আমি দিই না।
—‘দিই না’ মানে? তাহলে তোকে নিয়ে আসি কী জন্য?
—আমি পারি না ওভাবে বলতে।
বাবা মুখ দিয়ে চুকচুক শব্দ করে, ‘তোর গলার যে এই হালত, কে জানত?’
আমি কিছু বলি না, শুধু হাসি। আমি মূলত শুকনো খাবার আর বেশি করে পানি সঙ্গে নিয়ে যাই, যদিও নিমেষেই সব শেষ হয়ে যায়।
প্রথম যেদিন বাবা আন্দোলনে যাওয়ার জন্য রেডি হচ্ছিল, আমি পেছন থেকে দাঁড়িয়ে দেখছিলাম। আমাকে দেখে বাবা বলল, ‘কিরে, যাবি নাকি?’
—ছাত্ররা আন্দোলন করছে, তুমি গিয়ে কী করবে?
—হুমম...
—কী হুম?
বাবা গলা ছেড়ে বলতে থাকে, ‘বিশ্বজোড়া পাঠশালা মোর, সবার আমি ছাত্র...’
—উফ বাবা, সত্যি করে বলো না?
—ভ্যাজর ভ্যাজর করিস না তো। গেলে ঝটপট রেডি হয়ে আয়, তোকে সময় দিলাম সাড়ে চার মিনিট।
আমি হাসি, বাবাও হাসে। রুনু কিছু বোঝে না, তাও হাসে।
বাবা নেই। আমি সারা রাত ঘুমাই না, ঘুমাতে পারি না। সারা বাসায় হাঁটি, বাবার টেবিলে বসে থাকি। বসুন্ধরায় প্রায় প্রতিদিন রাতেই ধরপাকড় চলছে, গোলাগুলির শব্দ শুনি। ভয় পাই না, পাথর হয়ে বসে থাকি। আবু সাঈদের কথা মনে পড়ে, চোখে ভাসে শান্ত, মুগ্ধ, আলামিন, সৈকত...। নাইমাকেও দেখি মাঝেমধ্যে।
নটর ডেম কলেজের সায়েন্স ফেস্টিভ্যালে গত বছর আইইউটির একটা ভাইয়া তার টিম নিয়ে এসেছিল। তারা বেশ কয়েকটা ড্রোন বানিয়েছে দেশীয় প্রযুক্তি দিয়ে, সেগুলো নিয়েই কথা বলছিল। বাবার সঙ্গে গিয়েছিলাম আমি। গতকাল দেখলাম সেও আর নেই। নামটা যেন কী? জাহিদ মনে হয়। আচ্ছা, হতেই তো পারে জাহিদের ঘরে একটা-দুটা ড্রোন এখনো টেবিলে, শেলফে সাজানো আছে। এখন থেকে হয়তোবা ওর মা গভীর রাতে সেসব ছুঁয়ে কাঁদবে, সেই কান্নার শব্দ জাহিদ শুনবে না। সেদিন প্রিজন ভ্যান থেকে কেউ একজন তার ছোট বোনের কথা বলে চিৎকার করে কাঁদছিল। আমি দূরেই দাঁড়িয়ে ছিলাম, পাথর হয়ে। কিচ্ছু করতে পারিনি আমরা।
রিয়া তো যুদ্ধে যায়নি, ঘরে থেকেই মরে গেল। ছোট্ট একটা বাচ্চা, রিয়ার ছবি দেখলে আমার রুনুর কথা মনে হয়। রুনুকে ডেকে কোলে নিই, ওর ঘন কোঁকড়া চুলে হাত বুলাই, বুকে চেপে ধরি। ইয়ামিনের কথা মনে পড়ে। ট্যাংক থেকে ওর লাশ ছুড়ে ফেলার দৃশ্যটা আমার চোখে হুল ফোটায়। তীব্র ব্যথায় আমি চোখ বন্ধ করে ফেলি।
রুনু আমার ঘরে বসে খেলছে। ও কখন এসেছে টের পাইনি।
—তারা চলে গেছে, রুনু?
—হুম।
রুনুর গম্ভীর উত্তর।
আজ আকাশ খুবই মেঘলা, বৃষ্টি হবে মনে হচ্ছে। আজকের কর্মসূচি ‘মার্চ ফর জাস্টিস’। ‘যাব কি যাব না’ করতে করতে রেডি হলাম। ভেবেছিলাম মাকে না বলেই বেরিয়ে যাব, কিন্তু দরজায় গিয়ে আবার ফিরে এলাম। মা ড্রয়িং রুমে বসে আছে, কোলের ওপর কোরআন শরিফ। আমি মাথা নিচু করে দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আছি, বাবার লাল মাফলারটা আমার গলায়—সেটা থেকে কেমন যেন বাবা-বাবা গন্ধ আসছে। মা খুব শান্ত চোখে আমার দিকে তাকাল, ঠান্ডা গলায় বলল, ‘ছাতাটা নিয়ে যাও, বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে।’
আমি ছাতা নিয়ে বের হই, কিন্তু মাথায় দিই না। রাস্তায় হাঁটতে থাকি, শরীর ভিজে যায় বৃষ্টির পানিতে। চোখের পানি ধুয়ে যায়। হ্যাঁ, অবশেষে আমি কাঁদছি। বাবাকে মনে করে কাঁদছি, বাবার জন্য কাঁদছি।
মাথায় বাজে বাবার শেখানো কবিতার লাইন—‘জাতির পতাকা আজ খামচে ধরেছে সেই পুরোনো শকুন...’
আমি সেই হিংস্র শকুনের মৃত্যুর প্রহর গুনতে গুনতে আরো জোরে পা চালাই।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

