দৌড়াতে দৌড়াতে হঠাৎ সে চিত হয়ে পড়ে গেল পৌরসভার মুখখোলা নোংরা ড্রেনের কিনারে, যেখানে মানুষের মুতের উৎকট ঝাঁঝাল গন্ধ। গুলিটা বোধহয় কোমর বরাবর ঢুকে গেছে তার। এমন আচমকা বুলেট এসে শরীরের মধ্যে আঘাত করল যে কিছুই বুঝে উঠতে পারল না রক্তিম। একবার ঝাঁকুনি দিয়েই পড়ে গেল সে।
পা দুটোতে কোনো শক্তি পাচ্ছে না। মনে হচ্ছে অসাড় হয়ে গেছে। চিত হয়ে শুয়ে থাকার কারণে সে আকাশ দেখতে পাচ্ছে। আকাশে নানা রঙের খেলা। কখনো নীল, কখনো সাদা, কখনো ধূসর।
যখন সে এগিয়ে যাচ্ছিল তার বাঁ পাশে ছিল জগলু ও মহিম। ডান পাশে পলক ও আতাউর। পেছনে ছিল নঈম, মিজান আরো অনেকে।
সবার সঙ্গে গভীরভাবে মেশার সুযোগ হয়নি রক্তিমের। তবে যতটুকু মিশেছে এদের একেকজনের সাহস দেখে অবাক হয়ে গেছে সে। কোনোদিন মা-বাবা, ভাই-বোন ও আত্মীয়-স্বজনের কথা ভেবে মন খারাপ করেনি কেউ। কিংবা আমি মরে গেলে কী হবে সংসারের, কে ধরবে হাল—এসব ভাবনাও কখনো তাদের বিচলিত করেনি। তারা চেয়েছিল এই দুঃশাসন থেকে মুক্তি। তাদের ভাবনায় ছিল নতুন এক বাংলাদেশ।
রক্তিমের মা নেই। নেই মানে নেই। তার স্মৃতিও কিছু নেই। তাকে জন্ম দিয়েই মারা যায় তার মা। বছর না পেরুতেই তার বাবা বিয়ে করেন। সে বড় হতে লাগল সৎমায়ের কাছে।
সৎমায়ের বহু নিষ্ঠুরতার গল্প সে শুনেছে। মনে মনে আতঙ্কিতও হয়েছে। কিন্তু তার জীবনে এরকম কিছুই ঘটেনি। নতুন মা রানু বেগম তাকে আপন ছেলের মতোই ভালোবেসেছে। স্নেহ করেছে।
এরকম ঘটে না। কিন্তু রক্তিমের জীবনে সত্যিই ঘটেছে। বাবার বিয়ের বছরখানেকের মাথায় ছোট ভাই অনির জন্ম। পরম আশ্চর্যের বিষয় রানু বেগম দুজনকেই মায়ের স্নেহে বড় করতে লাগলেন। তিনি দুজনকে কখনোই আলাদা করে দেখেননি। বাবা বাজার থেকে কিছু নিয়ে এলে দুজনই সমান ভাগ পেত। বাড়িতে বড় মাছ রান্না হলে মা দুজনকেই একই রকমের মাছ দিতেন। ঈদের সময় দুজন একই রকমের জামা-প্যান্ট পেত। মায়ের জাদুকরী মমতায় কেউ বুঝতেই পারেনি এরা সৎভাই।
তখন ওদের হাই স্কুলের জীবন। এক বছরের ছোট-বড় হলেও দুজন একই ক্লাসে পড়ত। একদিন খেলার মাঠে কে যেন বলেছিল, ‘রক্তিম ভালো পড়া পারে না কেন জানিস?’
অনি জিজ্ঞেস করেছিল, ‘কেন পারে না?’
‘কারণ রক্তিম তোর আপন ভাই নয়। রক্তিম তোর সৎভাই। রক্তিমের মা তো কবেই মরে গিয়েছে,’ সে বলেছিল।
অনি ছিল যেমন মেধাবী তেমন দুষ্টু। এ কথা শোনার সঙ্গে সঙ্গে তার মাথায় রক্ত উঠে গিয়েছিল। সে টিনের স্কেল দিয়ে মেরে তার আঙুল কেটে দিয়েছিল। মায়ের কাছে এসে কাঁদতে কাঁদতে বলেছিল, ‘মা, রক্তিম আমার আপন ভাই নয়! পিনু বলেছে রক্তিমের নাকি আরেকটা মা ছিল!’
মা অনির চোখ মুছিয়ে দিয়ে বলেছিল, ‘কে বলেছে রক্তিম তোর আপন ভাই নয়! পিনু কিছুই জানে না। তোরা দুজনই আমার ছেলে।’ তারপর মা উপদেশ দিয়ে বলেছিল, ‘তোরা আর পিনুর সঙ্গে খেলবি না।’
তারপর রক্তিম আস্তে আস্তে বিষয়টা বুঝে গিয়েছিল। জেনে গিয়েছিল। না জেনে উপায়ই বা কী! হাজারো মুখ চারদিকে। রানু বেগম কি পারে সব মুখ বন্ধ করতে! তার পর থেকে রক্তিমের ভেতরে একধরনের হতাশা তৈরি হয়েছিল। ভেতরে ভেতরে একধরনের কেমন যেন শূন্যতা অনুভব করত সে। মনে মনে জন্মদাত্রী মাকে সে খুঁজে বেড়াত। তার মা কি লম্বা ছিল, না বেঁটে ছিল; ফর্সা ছিল, না কালো ছিল; তার মা কি শাড়ি পরত, না ম্যাক্সি পরত। কিন্তু মায়ের কোনো স্মৃতি তার কাছে নেই। মায়ের গল্প কেউ তাকে কখনো করেনি।
অনি গত বছর স্কলারশিপ নিয়ে বিদেশ চলে গেল। মাঝে মাঝে ফোন করে এখনো। কথা হয়। দেশের কথা জিজ্ঞাসা করে। ক্যাম্পাসের রাজনীতির কথা জিজ্ঞাসা করে। মাঝে মাঝে রক্তিমকে সতর্ক করে উপদেশ দেয়, ভাইয়া, তোমাদের কিছু একটা করা উচিত। তোমরা চোখ-কান খোলা রেখে রাজনীতি করো। তোমরা তো বাঁচবা না। তোমাদের তো বাঁচতে দেবে না ওরা। ক্ষমতার জন্য ওরা সবকিছুই করতে পারে। বুলেট ওদের কাছে পানির চেয়েও সস্তা।
বেশ অনেকক্ষণ অজ্ঞান হয়ে পড়ে থাকল রক্তিম। তারপর চোখ খুলে আবার আকাশ দেখল। আকাশে তখন অনেক মুখের ভিড়। হঠাৎ অনির কথা মনে পড়ে গেল তার। অনি যেন কোন দেশে থাকে এখন! আমেরিকা, কানাডা, ইতালি? দেশ নিয়ে তার কত ভাবনা ছিল। চিন্তা ছিল। অথচ সে বিদেশ চলে গেল ক্যারিয়ার গড়তে। সে কি জানে তার ভাই রক্তিম এখন গুলি খেয়ে পড়ে আছে পৌরসভার নোংরা ড্রেনের কিনারে।
রক্তিমের মনে হয় তাকে উদ্ধার করতে কেউ না কেউ অবশ্যই আসবে। সে বিশ্বাস করে কেউ না কেউ তাকে এখান থেকে নিয়ে যাবে। সে হয়তো আবারও বেঁচে উঠবে।
তারপর অনেকটা সময় পেরিয়ে গেল। তাকে উদ্ধার করতে কেউ এলো না। জগলু, মহিম, আতাউর ওরা কোথায়! সবাই কি ভুলে গেল তার অস্তিত্ব। ঠিক সেই সময়ে প্রচণ্ড তৃষ্ণা অনুভব করল রক্তিম। একটু যদি পানি পাওয়া যেত! কে দেবে পানি! এ কি সত্যিই কারবালার প্রান্তর! প্রচণ্ড তৃষ্ণায় যখন সে মরিয়া হয়ে উঠল, ঠিক তখনই সহপাঠী বীথির কথা মনে পড়ল তার। মানুষের মৃত্যুর সময় কি তবে প্রিয় মুখ মনে পড়ে! পড়ে মনে হয়। কীভাবে কীভাবে যেন বীথির সঙ্গে গভীর বন্ধুত্ব হয়ে গিয়েছিল। তারপর বহুদিন একসঙ্গে পথহাঁটা—প্যারিস রোড, ইবলিস চত্বর, শহীদ মিনার, লাইব্রেরি, পশ্চিমপাড়া, পদ্মাপাড়, টি-বাঁধ। কত কত স্মৃতি! কিন্তু এসব স্মৃতি এখন কেন মাথার মধ্যে ভেসে ভেসে আসছে!
এক সপ্তাহ আগে বাড়িতে গেল বীথি; বলল, ‘চলে আসব দু-এক দিনের মধ্যেই।’ কিন্তু এলো তো না! কী করছে সে এখন! আর কি দেখা হবে না ওর সঙ্গে! কথা হবে না কোনোদিন! প্রিয় কণ্ঠস্বর আর কি শোনা হবে না এ জীবনে!
মিছিলের সকলেই ফিরে যেতে পারল। সে কেন পারল না! সবাই কি সত্যিই ফিরে যেতে পেরেছে! খুব দূর থেকে ভায়োলিনের সুরের মতো ভেসে আসছে মানুষের কোলাহল। চোখের সামনে নীল নীল আকাশ উড়ে উড়ে যাচ্ছে। কত কথা কত ছবি ভেসে উঠছে মনের মধ্যে। আবার কেটে যাচ্ছে সুর তাল লয়। সে আবার হারিয়ে যাচ্ছে অন্ধকারে। যেন বা আলো-ছায়ার খেলা চলছে মাথার মধ্যে। হঠাৎ পাশের বাড়ির মিরাজের কথা ভেসে উঠল মনের পর্দায়। ছেলেটা লেখাপড়ায় কত ভালো ছিল! অনেক স্বপ্ন ছিল তার মনের মধ্যে। কত ভালো রেজাল্ট করত সে! পাড়ার মাঠে একসঙ্গে কত ক্রিকেট খেলেছে ওরা। ভালো ব্যাটিং করত মিরাজ। অথচ শীতের কুয়াশামাখা এক সকালে হঠাৎ সে ট্রেনে কাটা পড়ে মরে গেল।
একটু কাত হওয়ার চেষ্টা করল রক্তিম। পারল না। শরীরের কিছু একটা যেন হারিয়ে গেছে তার। কিন্তু কী হারিয়ে গেছে, সে বুঝতে পারল না। সে যেন কীসের শূন্যতা অনুভব করল দারুণভাবে।
চোখ খুলে দেখার চেষ্টা করল রক্তিম। চোখের সামনে পাতলা কুয়াশার মতো ঝাপসা আলো। পিঠের নিচে তরল কিছু অনুভব করল। আঙুল দিয়ে দেখার চেষ্টা করল। পারল না। চোখ বন্ধ করে ফেলল। মায়ের কথা মনে পড়ল তার। মায়ের কোনো স্মৃতি তার কাছে নেই। বাড়িতে মায়ের কোনো ছবি ছিল না। হয়তো বাবা ইচ্ছে করেই রাখেননি, কিংবা অন্য কিছু। রক্তিম ঠিক জানে না। সে যতবারই মায়ের কথা মনে করার চেষ্টা করল, ততবারই রানু বেগমের ছবি ভেসে উঠল তার মনের পর্দায়।
রক্তিমের মনে হলো কে যেন তার নাম ধরে ডাকছে—রক্তিম, রক্তিম। সে স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে সেই ডাক, কিন্তু কণ্ঠটা ঠিক কার সে চিনতে পারছে না। সে চোখ খুলে তাকানোর চেষ্টা করল একবার, কিন্তু পারল না। চোখের সামনে কালো পর্দা দুলে উঠছে। আকাশ আর দেখা যাচ্ছে না। আকাশ ঢেকে যাচ্ছে কালো পর্দায়।
তার বন্ধুরা কি সত্যিই আর খোঁজ করবে না তার! কেউ কি জীবন বাজি রেখে খুঁজতে আসবে না তাকে! নিতে আসবে না কেউ! এ রকম কি হয় কখনো! সহযোদ্ধারা তাকে ফেলে পালিয়ে গেল সবাই!
ভেতরটা আস্তে আস্তে শান্ত হয়ে আসছে। মেঘের ভেলায় ভেসে যাচ্ছে মন। কোথায় যেন হারিয়ে যাচ্ছে সে। আর ঠিক তখনই সে শুনল তার কানের খুব কাছে চুড়ির টুংটাং শব্দ। টুংটাং, টুংটাং।
সে ফিসফিস করে বলল, কে?
কোনো উত্তর এলো না।
একটুক্ষণ অপেক্ষা করে সে আবার বলল, কে?
এবারও কোনো উত্তর এলো না। একটা মেয়েলি গন্ধ এলো নাকে। সে স্পষ্ট করে ডাকল, কে তুমি?
এবারও কোনো উত্তর নেই। নতুন কেনা শাড়ির খসখস শব্দ শুনল সে। শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে চিৎকার করে সে বলল, কে তুমি?
কপালে এবার কার যেন নরম হাতের স্পর্শ পেল সে। স্নিগ্ধ মোলায়েম মেয়েলি পরশ। রক্তিমের মনে হলো এ হাত নিশ্চয় তার মায়ের। তারপর মনে হলো হয়তো বীথির।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


