ফ্যামিলি কার্ডের নিয়োগ নিয়ে অসন্তোষ, বিভিন্ন অভিযোগ

ফ্যামিলি কার্ডের নিয়োগ নিয়ে অসন্তোষ, বিভিন্ন অভিযোগ
আমার দেশ গ্রাফিক্স

দরিদ্র পরিবারের জন্য সরকারের বহুল আলোচিত ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচি আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হওয়ার আগেই নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে দেশজুড়ে বিতর্ক দেখা দিয়েছে। কর্মসূচির তথ্য সংগ্রহকারী ও সুপারভাইজার নিয়োগে দলীয়করণ, স্বজনপ্রীতি, অনিয়ম ও পছন্দের প্রার্থীদের নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে বিভিন্ন জেলা-উপজেলায়। শুধু ফ্যামিলি কার্ড নয়, মসজিদের ইমাম-মুয়াজ্জিনদের মাসিক সম্মানী ভাতা দেওয়ার ক্ষেত্রেও রাজনৈতিক আনুগত্য ও স্থানীয় নেতাদের পছন্দ-অপছন্দকে গুরুত্ব দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

সারা দেশের প্রকাশিত নিয়োগ তালিকা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, দলীয়করণ, স্বজনপ্রীতি ও অনিয়মের মাধ্যমে বিএনপির দলীয় কর্মীরা স্থান করে নিয়েছেন তালিকায়। পাশাপাশি ঠাঁই হয়েছে ফ্যাসিস্ট হাসিনার দলীয় পদধারীদের পরিবার-স্বজনেরও। কোথাও আবার দলীয় চাপের কারণে চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ আটকে আছে। এসব অনিয়ম নিয়ে তৈরি হয়েছে চরম অসন্তোষ ও ক্ষোভ। এর প্রতিবাদে কোনো কোনো উপজেলায় ইউএনও অফিস ঘেরাও ও বিক্ষোভের ঘটনাও ঘটেছে। সব মিলিয়ে আগামী ১৬ আগস্ট ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের আগেই এর স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

বিজ্ঞাপন

চার বছরে এক কোটি ৬০ লাখ পরিবারকে অন্তর্ভুক্তির লক্ষ্য

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপির ৩১ দফা নির্বাচনি ইশতেহারে অসহায় ও দুস্থ পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়ার প্রতিশ্রুতি ছিল। সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর কর্মসূচিটি বাস্তবায়নে কার্যক্রম শুরু করে। পরিকল্পনা অনুযায়ী আগামী চার বছরের মধ্যে এক কোটি ৬০ লাখ পরিবারকে এ কর্মসূচির আওতায় আনার লক্ষ্য রয়েছে।

পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শেষে ১৬ আগস্ট ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবে সরকার। কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার লতিফাবাদ ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডে এদিন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কর্মসূচির উদ্বোধন করবেন। অক্টোবরের শেষ নাগাদ পর্যায়ক্রমে দেশের সব উপজেলা ও ইউনিয়নে এর কার্যক্রম শুরু হবে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তথ্য নিয়মিত হালনাগাদ করে প্রকৃত দরিদ্রদেরই এ সুবিধার আওতায় আনা হবে।

নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে ব্যাপক অভিযোগ

অভিযোগ পাওয়া গেছে, কিছু কিছু অঞ্চলে স্থানীয় বিএনপির পক্ষ থেকে সরবরাহ করা তালিকার ব্যক্তিরা নিয়োগ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে ব্যর্থ হয়েছেন। এ কারণে প্রভাবশালীদের চাপে খুলনাসহ বেশকিছু জেলায় গতকাল বুধবার বিকাল পর্যন্ত তালিকা প্রকাশ করতে পারেনি সংশ্লিষ্ট নিয়োগ কমিটি। এছাড়া কোথাও কোথাও বিজ্ঞপ্তিতে উল্লিখিত যোগ্যতা পূরণ না করেও পছন্দের প্রার্থীদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, কর্মসূচির স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে তিন স্তরের তদারকি ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। ইউনিয়নে প্রথম শ্রেণির সরকারি কর্মকর্তা তথ্য সংগ্রহ তদারকি করবেন। উপজেলা পর্যায়ে ইউএনওর নেতৃত্বে, জেলা পর্যায়ে জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বে এবং বিভাগীয় পর্যায়ে বিভাগীয় কমিশনারের নেতৃত্বে পৃথক কমিটি কাজ করবে। জাতীয় পর্যায়েও একটি কমিটি থাকবে, যার সভাপতি অর্থমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রী নিজেও নিয়মিত কর্মসূচির অগ্রগতি তদারকি করবেন। বর্তমানে তথ্য সংগ্রহকারী ও সুপারভাইজার নিয়োগ পরীক্ষা চূড়ান্ত হয়েছে। কিন্তু সব জেলায় ফলাফল প্রকাশ হয়নি। নিয়োগ পরীক্ষা নেওয়া হলেও সেখানে স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।

জানা গেছে, কিশোরগঞ্জের বাজিতপুর উপজেলার শিমুলতলা গ্রামের ছাত্রলীগ নেতা খালেদ হোসেন ফ্যামিলি কার্ডের তথ্য সংগ্রহকারী হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন। অনুরূপভাবে নওগাঁর বদলগাছী উপজেলার পিন্ডিরা গ্রামের শ্যামল চন্দ্র সাহার ছেলে নিষিদ্ধ রাজনৈতিক সংগঠন ছাত্রলীগের কর্মী অমিত কুমার সাহা তালিকায় স্থান পেয়েছেন।

এদিকে, সাতক্ষীরা সদরের বৈকারী ইউনিয়নের সিরাজুল ইসলামের ছেলে তৌফিক বিল্লাল এবং শিবপুর ইউনিয়নের রওশন আলীর ছেলে মোস্তাফিজুর রহমান সুপারভাইজার পদের চূড়ান্ত তালিকায় স্থান পেলেও তাদের বিরুদ্ধে ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠলে তাদের নিয়োগ বাতিল করা হয়। পরে বৈকারী ইউনিয়নের বিএনপিকর্মী আব্দুছ ছাকীর মেয়ে সাবরিনা নিশাত ও শিবপুরের বিএনপি সমর্থক আমিনুর রহমানের মেয়ে মাসুমা সুলতানা লতাকে প্রতিস্থাপন করা হয়।

তবে সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অর্ণব দত্ত দাবি করেন, দলীয় সম্পৃক্ততার কারণে কাউকে বাদ দেওয়া হচ্ছে না। আমাদের নির্দেশনাও নেই। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে জাল সনদ ও তথ্য গোপনের অভিযোগ প্রমাণ হওয়ায় বাতিল করা হয়েছে।

এদিকে, কলারোয়ায় কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ নেতা নাহিদ হাসান শাহীনের ঘনিষ্ঠ ২০২৪-এর নির্বাচনকালীন ছাত্রলীগ নেতা আহসান হাবিব সেতুকে চূড়ান্ত তালিকায় রাখা হয়েছে। এছাড়া কলারোয়া পৌর এলাকার আওয়ামী লীগকর্মী নাজমুল করিমের ছেলে সানবীন করিমের নামও রয়েছে। এ নিয়ে বিএনপি এবং ছাত্রদলের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছে।

এ বিষয়ে অভিযুক্ত আহসান হাবিব সেতুর সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, আমি আসলে ছাত্রদলের কর্মী। বিভিন্ন সময় তোলা ছবি ও কমিটির তালিকা ছড়িয়ে আমার মানহানি করা হচ্ছে।

সাতক্ষীরা জেলা সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপপরিচালক এসএম রফিকুল ইসলাম বলেন, দলীয় বিবেচনায় কাউকে বাদ দেওয়ার নির্দেশনা নেই। আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামায়াতÑএটা আমাদের দেখার বিষয় না। আমাদের নির্দিষ্ট নিয়মের মধ্যে থাকলে তাকে নেওয়া হবে।

তবে সাতক্ষীরার শ্যামনগরে অনিয়মের সব নজির ছাড়িয়ে গেছে। এ উপজেলায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ের অফিস সহায়ক ভূরুলিয়া ইউনিয়নের জলিলের স্ত্রী ও শ্যালিকার নাম তথ্য সংগ্রহকারীর তালিকায় রয়েছে। একই পরিবারের দুই সদস্য কীভাবে একই কর্মসূচিতে তথ্য সংগ্রহের দায়িত্ব পেলেন, তা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে জলিলের সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, তার শ্যালিকা কীভাবে তালিকায় স্থান পেয়েছেন, তা তার জানা নেই।

এদিকে, নূরনগর ইউপির আওয়ামী পরিবারের সদস্য তথ্য সংগ্রহকারী অমেদ আলীর ছেলে ফেরদাউস হোসেন, কৈখালী ইউপির মোশারফ হোসেনের ছেলে তথ্য সংগ্রহকারী মনির হোসেন, পদ্মপুকুর ইউপির জিএম আব্দুল্লাহর ছেলে সুপারভাইজার এম মুজাহিদুল ইসলাম এবং মুন্সীগঞ্জ ইউপির ভূপতি সরকারের ছেলে সুপারভাইজার অসীম কুমার সরকার। অপরদিকে, বিএনপি ও ছাত্রদলের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে, এমন ব্যক্তিরাও তথ্য সংগ্রহকারী ও সুপারভাইজার হয়েছেন। এদের মধ্যে রয়েছেনÑঈশ্বরীপুর ইউপির শাহাদাত মোল্লার ছেলে তথ্য সংগ্রহকারী আবু সাঈদ, রব্বানী মোল্লার ছেলে সুপারভাইজার সানাউল্লাহ কবির, বিএনপির সার্চ কমিটির সদস্য ও নূরনগর ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মোবারক হোসেন মন্টুর ছেলে সুপারভাইজার এসএম ইমরান হোসেন, মুর্শিদ আলমের ছেলে তথ্য সংগ্রহকারী সাগর হোসেন।

অভিযোগের বিষয়ে শ্যামনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তার বক্তব্য জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা ফোন না ধরায় বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। তাছাড়া ফুলছড়িতে ফ্যামিলি কার্ডের জন্য সুপারিশপ্রাপ্ত ৬৩ জন সুপারভাইজার ও তথ্য সংগ্রহকারীদের রাজনৈতিক পরিচয় পাওয়া গেছে। এরমধ্যে বিএনপি সমর্থিত ৩৩ জন, জামায়াত সমর্থিত ১৫ জন, আওয়ামী লীগ থেকে নব্য বিএনপি বনে যাওয়া ১০ জন এবং এনসিপির দুজন রয়েছেন। বাকি তিনজন দল-নিরপেক্ষ বলে জানা গেছে।

এছাড়া কিশোরগঞ্জের নিকলীতে ফ্যামিলি কার্ড শুমারিতে তথ্য সংগ্রহকারী ও সুপারভাইজার পদে নিয়োগে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ ওঠায় তালিকা থেকে ফ্যাসিস্টদের নাম বাদ দেওয়ার দাবিতে মানববন্ধন করেছেন বিএনপির একাংশের নেতাকর্মীরা। গতকাল বুধবার উপজেলা সদরের গার্লস স্কুলের মোড়ে এ মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। একই ভাবে চূড়ান্ত তালিকায় স্বজনপ্রীতি ও নিয়োগে অনিয়মের কারণে গত মঙ্গলবার গাইবান্ধার ফুলছড়ি ইউএনও অফিস ঘেরাও করেন সংক্ষুব্ধ বিএনপির একাংশের নেতারা। এর আগে গত সোমবার কুষ্টিয়ার কুমারখালী ইউএনও অফিস ঘেরাও করেন বিএনপি, এনসিপি নেতাকর্মীসহ সংক্ষুব্ধরা।

এদিকে, ফ্যামিলি কার্ডের নিয়োগকে ঘিরে দেশজুড়ে মানববন্ধন ও ঘেরাওয়ের খবর ছড়িয়ে পড়লে অনেক জেলা ও উপজেলায় নিয়োগ পরীক্ষার ফল প্রকাশ বন্ধ রাখা হয়েছে। খুলনার তিনটি উপজেলায় ফ্যামিলি কার্ড শুমারিতে সুপারভাইজার ও তথ্য সংগ্রহকারী নিয়োগ পরীক্ষার ফলাফল স্থগিত করা হয়েছে। এগুলো হলোÑদিঘলিয়া, পাইকগাছা এবং তেরখাদা। নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, উপজেলাগুলোয় স্থানীয় ও জেলা বিএনপির নেতারা তাদের পছন্দের প্রার্থীদের তালিকা পাঠিয়েছেন। কিন্তু তাদের বেশিরভাগই লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারেননি। যারা উত্তীর্ণ হয়েছেন, তাদের বাদ দেওয়া যাচ্ছে না। এসব জটিলতায় ফল প্রকাশ করা হচ্ছে না।

সারজিস আলমের অভিযোগ

এদিকে, জাতীয় নাগরিক পার্টির মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম মসজিদের ইমাম এবং মুয়াজ্জিনদের সম্মানী ভাতা বিষয়ে গতকাল একটি স্ট্যাটাস দিয়েছেন। এতে প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ করে তিনি লেখেনÑ

আপনি যখন মসজিদের ইমাম ও মুয়াজ্জিনদের সম্মানী ভাতার ব্যবস্থা করলেন, তখন আপনাকে ধন্যবাদ জানিয়েছি। কিন্তু এখন স্থানীয় পর্যায়ে যেটা শুরু হয়েছে, এর চেয়ে লজ্জাজনক কিছু হতে পারে না। গ্রামপর্যায়ে অধিকাংশ মসজিদের ইমাম-মুয়াজ্জিনরা কখনোই তেমন কোনো সম্মানী পেতেন না। যদি কিছু জায়গায় পেয়ে থাকেন, তবে সেটা অতিসামান্য। বছরের পর বছর ধরে আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে স্বেচ্ছাশ্রম হিসেবে তারা ইমাম-মুয়াজ্জিনের দায়িত্ব পালন করতেন।

আমরা ভেবেছিলাম যুগের পর যুগ ধরে যে মানুষগুলো এত কষ্ট করে এসেছেন, তাদের কাছে হয়তো এই রাষ্ট্রীয় সম্মানীটা পৌঁছাবে। কিন্তু বিএনপির স্থানীয় নেতারা এখন মসজিদগুলোকে দলীয়করণ আর লুটপাটের ক্ষেত্র হিসেবে নির্ধারণ করেছেন।

যে মসজিদগুলোর ইমাম এবং মুয়াজ্জিনকে সম্মানীর আওতায় আনা হচ্ছে সেখানে তারা নতুন করে বিএনপিপন্থি ইমাম-মুয়াজ্জিন দলীয়ভাবে নিয়োগ দেওয়া শুরু করেছেন! বছরের পর বছর ধরে যারা মহান আল্লাহ ও মসজিদের খেদমতে সময় দিয়েছেন, তাদের পর্যন্ত অপদস্থ করে জোরপূর্বক সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে! ধিক্কার! সময় থাকতে কঠোর নির্দেশনা দিন। অন্যথায় সাধারণ মুসল্লিরা এই হীন চেষ্টা প্রতিরোধ করবেন ইনশাল্লাহ।

[প্রতিবেদনে তথ্য দিয়েছেন খুলনা ব্যুরো, সাতক্ষীরা, শ্যামনগর, কুষ্টিয়া, নিকলী ও বাজিতপুর (কিশোরগঞ্জ), ফুলছড়ি (গাইবান্ধা) ও বদলগাছী (নওগাঁ) প্রতিনিধি]

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন