আইসিটির অভিযোগপত্রে আলোচিতদের নাম না থাকায় জুলাইযোদ্ধাদের ক্ষোভ

আইসিটির অভিযোগপত্রে আলোচিতদের নাম না থাকায় জুলাইযোদ্ধাদের ক্ষোভ
আমার দেশ গ্রাফিক্স

জুলাই গণঅভ্যুত্থান চলাকালীন রাজশাহীতে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড ও সহিংসতার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটি) অভিযোগপত্রে কয়েকজনের নাম না থাকায় বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্রে ৩৮ জনের নাম অন্তর্ভুক্ত হলেও আলোচিত ব্যক্তিদের নাম অন্তর্ভুক্ত না থাকায় আন্দোলনকারী ও সংশ্লিষ্ট মহলে ক্ষোভ এবং হতাশা দেখা দিয়েছে।

স্থানীয় আন্দোলনকারীদের দাবি, বিশেষ করে সাবেক এমপি শফিকুর রহমান বাদশা, সাবেক এমপি ফজলে হোসেন বাদশা, সাবেক কাউন্সিলর তরিকুল আলম পল্টু, যুবলীগের রাজশাহী মহানগরীর সাবেক সভাপতি রমজান আলী, বোয়ালিয়া থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি আতিকুর রহমান কালু এবং নগর আওয়ামী লীগের নেতা মীর ইস্তিয়াক আহম্মেদ লেমনের নাম অভিযোগপত্রে নেই। এ নিয়ে সামাজিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে সমালোচনার ঝড় উঠেছে।

বিজ্ঞাপন

প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয়দের দাবি, চব্বিশের ৫ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলন চলাকালে প্রকাশ্যে অস্ত্র হাতে সহিংসতায় অংশ নেওয়ার অভিযোগে তরিকুল আলম পল্টুর নাম বিভিন্ন সময় আলোচনায় এসেছে। আলী রায়হান ও সাকিব আঞ্জুম হত্যা মামলার আসামি হিসেবে বর্তমানে কারাগারে থাকা পল্টু রাজশাহীর ছাত্র-জনতার আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এলাকা তালাইমারীর সাবেক কাউন্সিলর।

স্থানীয় কয়েকটি সূত্রের অভিযোগ, তিনি আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং এলাকায় দলটির সন্ত্রাসী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। আন্দোলনের সময় তার নেতৃত্বে একাধিক হামলার অভিযোগও রয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে ট্রাইব্যুনালের আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্রে পল্টুর নাম না থাকায় স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন ও বিস্ময় দেখা দিয়েছে।

পল্টু বর্তমানে কারাগারে থাকলেও পরিবারের সদস্য ও ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের মাধ্যমে এলাকায় রাজনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এলাকাবাসীর আশঙ্কা পল্টু আসন্ন রাজশাহী সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে সামনে রেখে তার পরিবারের সদস্যরা রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছেন।

মহানগরীর তালাইমারী এলাকার বাসিন্দা আক্তারুজ্জামান টেনি বলেন, জুলাই আন্দোলনের সময় পল্টুকে ছাত্র-জনতার ওপর হামলায় অস্ত্র হাতে দেখা গেছে। ৫ আগস্ট আলুপট্টি এলাকায় আলী রায়হান ও আনজুম নিহত হওয়ার আগেও তাকে অস্ত্র হাতে দেখা গেছে। এ সংক্রান্ত ভিডিও ফুটেজ রয়েছে। পল্টুর বিরুদ্ধে শাকিব ও আলী রায়হান হত্যা মামলায় আসামি হিসেবে নাম রয়েছে এবং অভিযোগপত্রেও তার নাম আছে। কিন্তু ট্রাইব্যুনালের অভিযোগপত্রে তার নাম না থাকায় আমরা হতাশ হয়েছি। আমরা চাই, তার নাম অন্তর্ভুক্ত করা হোক।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় রাজশাহীতে সংঘটিত হত্যাযজ্ঞের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে রাসিকের সাবেক মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটনসহ ৩৮ জনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র দাখিল করেছে প্রসিকিউশন। গত ৩০ জুলাই ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রারের কাছে অভিযোগপত্র জমা দেওয়া হয়। তদন্ত সংস্থার দীর্ঘ তদন্ত শেষে সংগৃহীত দালিলিক ও মৌখিক সাক্ষ্যপ্রমাণ পর্যালোচনা করে এই অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছে।

প্রসিকিউশনের অভিযোগ অনুযায়ী, ৫ আগস্ট রাজশাহী মহানগরীর বোয়ালিয়া থানার শেখেরচক এলাকার স্বচ্ছ টাওয়ারের বিপরীতে লবঙ্গ রেস্টুরেন্টের সামনে আন্দোলনকারী রায়হান আলীকে গুলি করে হত্যা করা হয়। একই দিনে শাহ মখদুম কলেজের সামনে নিহত হন আনজুম সাকিব। এছাড়া সালমান ওরফে শিমুলসহ অন্তত ৪৫ জন আহত হন।

এদিকে, অভিযোগপত্রে কয়েকজন আলোচিত ব্যক্তির নাম অন্তর্ভুক্ত না হওয়ায় তদন্তের পরিধি ও অভিযোগপত্রের স্বচ্ছতা নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে নানা আলোচনা শুরু হয়েছে।

তবে আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তদন্তে প্রাপ্ত সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতেই প্রসিকিউশন অভিযোগপত্র দাখিল করে থাকে। তদন্তের বিভিন্ন পর্যায়ে নতুন তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেলে ভবিষ্যতে সম্পূরক অভিযোগ বা আইনানুগ অন্যান্য পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগও বিদ্যমান।

গণঅভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থী অয়ন বলেন, অভিযোগপত্রে প্রকাশ্যে অস্ত্র নিয়ে হামলা চালানো কয়েকজন আওয়ামী সন্ত্রাসীর নাম না থাকায় আমরা হতাশ হয়েছি। বিশেষ করে শহীদ সাকিব আঞ্জুমকে আঘাত করা সাবেক কাউন্সিলর ও আওয়ামী লীগ নেতা তরিকুল আলম পল্টু এবং তার গঠিত কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা কীভাবে অভিযোগপত্র থেকে বাদ গেলেন, তা নিয়ে জুলাইযোদ্ধাদের মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে।

রাজশাহী বার অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ও বিএনপি নেতা পারভেজ তৌফিক জাহেদী বলেন, আমি এখনো অভিযোগপত্রটি দেখিনি। তবে জুলাই গণঅভ্যুত্থান ও ৫ আগস্টের ঘটনায় প্রকৃত অপরাধীরা যেন আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে বেরিয়ে যেতে না পারে, সেটাই আমরা চাই। যারা প্রকৃত অপরাধী, তাদের যেন আইনের আওতায় এনে যথাযথ শাস্তি নিশ্চিত করা হয়।

এ বিষয়ে রাজশাহী মহানগর জামায়াতের সাংগঠনিক সেক্রেটারি জসিম উদ্দিন সরকার বলেন, জুলাই আন্দোলনে শহীদ সাকিব আজম ও শহীদ আলী রায়হানরা সামনের সারিতে ছিলেন। আন্দোলনে হামলা ও গুলির ঘটনায় পুলিশ, ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীদের জড়িত থাকার ভিডিও ফুটেজ, সিসিটিভি ও অন্যান্য আলামত আমরা প্রশাসনের কাছে হস্তান্তর করেছি। কিন্তু এসব প্রমাণে অস্ত্র হাতে যাদের দেখা গেছে, তাদের কয়েকজনের নাম অভিযোগপত্রে না থাকায় আমরা বিস্মিত।

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) রাজশাহী মহানগরের আহ্বায়ক মোবাশ্বের আলী বলেন, ৫ আগস্টসহ জুলাই আন্দোলনে ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন এবং ভিডিও ফুটেজে যাদের সরাসরি ও আক্রমণাত্মক ভূমিকা দেখা গেছে, তাদের অনেককেই তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, কারো প্রভাব, সুযোগ-সুবিধা কিংবা অন্য কোনোভাবে এসব ব্যক্তিকে মামলার কার্যক্রম থেকে বাদ দেওয়া হয়ে থাকলে তা জুলাইয়ের আন্দোলনের চেতনার পরিপন্থী। আমরা এর তীব্র নিন্দা জানাই। একইসঙ্গে অভিযোগপত্রটি পুনরায় তদন্ত করে প্রকৃত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মামলায় অন্তর্ভুক্ত করে আইনগত কার্যক্রম শুরু করার দাবি জানাচ্ছি।

এনসিপির এই নেতা বলেন, কী কারণে বা কার স্বার্থে তাদের বাদ দেওয়া হয়েছে, তা খতিয়ে দেখা হবে। এ বিষয়ে পুলিশ কমিশনার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করব। শহীদ পরিবার ও মামলার বাদীদের সঙ্গেও কথা বলব। প্রয়োজন হলে আইনগতভাবে অভিযোগপত্র সংশোধন বা পুনঃতদন্তের উদ্যোগ নেওয়া হবে। জুলাই আন্দোলনে প্রকৃত অপরাধীরা যেন কোনোভাবেই আইনের আওতা থেকে বাদ না পড়ে, সেটিই আমাদের দাবি।

এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট আমিনুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, অভিযোগপত্রে কারো নাম অন্তর্ভুক্ত না হলেও পরবর্তীতে তদন্তে নতুন তথ্যপ্রমাণ পাওয়া গেলে তার নাম সংযুক্ত করার সুযোগ রয়েছে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন