মিল-কারখানা এবং কালভার্টের মুখ বন্ধ করে দেওয়ায় বগুড়ার শেরপুরে অনিয়ম আর অপরিকল্পিত দখল হয়ে বছরের পর বছর স্থায়ী জলাবদ্ধতার শিকার হচ্ছেন ৯ গ্রামের মানুষ। চলতি বর্ষা মৌসুমে নেমে এসেছে অবর্ণনীয় দুর্ভোগ। পানি বের হওয়ার সব পথ বন্ধ হয়ে সৃষ্টি হয়েছে স্থায়ী এক জলাবদ্ধতা। ফলে প্রায় পাঁচ হাজার বিঘা জমি রয়েছে অনাবাদি।
জানা গেছে, বগুড়ার শেরপুর উপজেলার মির্জাপুর ইউনিয়নের মির্জাপুর, রামচরণমুকুন্দ, দড়িমুকুন্দ, কানাইকান্দর, রাজবাড়ী, হাতিগাড়া, আড়ংশাইল, মদনপুর ও কৃষ্ণপুর এই ৯টি গ্রামের চিত্র এখন প্রায় একই রকম। মসজিদ, বসতবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে চিরচেনা গ্রামীণ পথঘাট সবই পানির নিচে তলিয়ে আছে। ঘরবাড়িতে পানি ওঠায় পৈতৃক ভিটেমাটি ছেড়ে অনেকে বাধ্য হয়ে আশ্রয় নিয়েছেন অন্য জায়গায়।
পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছে অন্তত পাঁচ হাজার মানুষ। বন্ধ হয়ে গেছে কোমলমতি শিশুদের স্কুলে যাওয়া। থমকে গেছে দৈনন্দিন স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। হাঁস-মুরগি আর গবাদিপশু নিয়ে বিপাকে পড়েছেন কৃষক। আর এই বদ্ধ নোংরা পানিতে পথচলার ফলে ঘরে ঘরে ছড়িয়ে পড়ছে চর্মরোগসহ নানা পানিবাহিত রোগ। সবচেয়ে ক্ষতি হয়েছে স্থানীয় কৃষি খাতে। একসময় যে পাঁচ হাজার বিঘা জমিতে সোনার মতো ধান ফলত, এখন তা পরিত্যক্ত জমি। ওই জমিতে বিঘা প্রতি ২০ থেকে ২৫ মণ বোরো ধান উঠত। সেই বিস্তীর্ণ প্রান্তর আজ টানা পাঁচ বছর ধরে পানির নিচে পড়ে আছে। কৃষকরা আজ পুরোপুরি দিশাহারা। অনেকের মাটির দেয়ালের বাড়ি হওয়ায়, স্থায়ী জলাবদ্ধতার কারণে তা ভেঙে পড়েছে, আবার কারো ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে।
স্থানীয় কৃষক ফারুক, আশাদুল ও করিম ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, আমাদের ৬০ বিঘা জমি চার বছর ধরে পানির নিচে। প্রতি বছর প্রায় ২৫ লাখ টাকার ক্ষতি হচ্ছে। আমাদের মতো শতাধিক কৃষকের একই অবস্থা। পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা দ্রুত না হলে ভিটেমাটি বেচে নিঃস্ব হওয়া ছাড়া আর কোনো পথ থাকবে না। অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই কৃত্রিম জলাবদ্ধতার মূলে রয়েছে স্থানীয় রাস্তার দুই পাশের মিল-কারখানা এবং কালভার্টের মুখ বন্ধ করে দেওয়া। কালভার্টের পরের অংশে ব্যক্তিগত জমি উঁচু করে ভরাট করায়, অকেজো হয়ে পড়েছে পুরো পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা।
ব্র্যাক বটতলা এলাকার গুরুত্বপূর্ণ কালভার্টটির মুখ বন্ধ হয়ে যাওয়ায়, পুরো ৯টি গ্রামের পানি আটকে তৈরি হয়েছে এই স্থায়ী জলজট। বছরের পর বছর ধরে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ ও কৃষি বিভাগসহ প্রশাসনের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছেন ভুক্তভোগী গ্রামবাসীরা। কিন্তু আশ্বাস ছাড়া মেলেনি কোনো স্থায়ী কোনো সমাধান। মির্জাপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জাহিদুল ইসলাম কালভার্ট বন্ধ হওয়া এবং মিল-কারখানার কারণে পানিপ্রবাহ আটকে যাওয়ার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, স্থায়ী জলাবদ্ধতার বিষয়টি আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বারবার জানিয়েছি। আশা করছি, অতি দ্রুত একটি বিশেষ প্রকল্পের মাধ্যমে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা সম্ভব হবে।
এ ব্যাপারে শেরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাইদুজ্জামান বলেন, কালভার্টের মুখ বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণেই মূলত পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। উপজেলা প্রকৌশলী আব্দুল মজিদসহ, মির্জাপুর ইউপি চেয়ারম্যান এবং প্রতিনিধি দল ইতোমধ্যে এলাকাটি পরিদর্শন করেছেন। সরকারি প্রকল্প গ্রহণ করে হলেও অতিদ্রুত এই জলাবদ্ধতা নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

