বাঁশখালীতে এক দশকে হাতির আক্রমণে মারা গেছেন ১৩ জন কৃষক। এ সময়ে ১৫টি হাতির মৃত্যু হয়েছে। হাতির আক্রমণে ক্ষতিগ্রস্ত ৪৫ কৃষককে দেওয়া হয়েছে ১৯ লাখ টাকার চেক।
বুধবার (১২ আগস্ট) বিশ্ব হাতি দিবস-২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত র্যালি ও আলোচনা সভায় এ তথ্য উপস্থাপন করেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
আবাসস্থল সংকটের কারণে লোকালয়ে বাড়ছে বন্য হাতির বিচরণ। আবাসস্থল ও চলাচলের পথ সংকুচিত হওয়ায় বিভিন্ন এলাকায়ও দেখা মিলছে বন্য হাতির।
হাতি সংরক্ষণ ও এর আবাসস্থল রক্ষায় জনসচেতনতা বাড়াতে প্রতি বছর বিশ্বব্যাপী দিবসটি পালিত হয়। একদিকে বন উজাড় ও আবাসস্থল ধ্বংস, অন্যদিকে হাতির চলাচলের করিডর দখল হয়ে যাওয়ায় বাঁশখালীসহ বিভিন্ন অঞ্চলে সংকুচিত হচ্ছে বন্য হাতির বিচরণক্ষেত্র। ফলে খাবার ও নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে লোকালয়ে ঢুকে পড়ছে হাতির পাল। এতে বাড়ছে মানুষ ও হাতির সংঘাত, ঘটছে প্রাণহানির ঘটনাও। বন বিভাগ ও হাতি গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম এলাকায় একসময় ১২টি হাতির করিডর ছিল। এর মধ্যে বেশ কয়েকটি করিডর দখল, বন উজাড় এবং বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে হাতির স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। বন ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে হাতির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। একটি পূর্ণবয়স্ক হাতি প্রতিদিন প্রায় ১৫০ থেকে ২০০ কেজি খাবার গ্রহণ করে। কিন্তু বিভিন্ন এলাকায় পাহাড় ও বন কেটে বসতি ও নানা স্থাপনা নির্মাণের ফলে খাবারের সংকট বাড়ছে এবং হাতির আবাসস্থল ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। খাবার ও নিরাপদ বিচরণের জায়গা হারিয়ে বন্য হাতিরা বাধ্য হয়ে লোকালয়ে চলে আসছে।
হাতি গবেষকদের মতে, পুরোনো চলাচলের পথ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বন্য হাতির বিচরণ বেড়েছে। বিশেষ করে বাঁশখালী, সাতকানিয়া, আনোয়ারা, বোয়ালখালী, লোহাগাড়াসহ বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকায় হাতির পাল দেখা যাচ্ছে। লোকালয়ে হাতির মুখোমুখি হয়ে গত কয়েক বছরে বেশ কয়েকজনের প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে।
বাঁশখালী জলদী বন বিভাগের রেঞ্জ অফিসের কর্মকর্তা মোহাম্মদ ফোরকান বলেন, লোকালয়ে হাতির উপস্থিতির কারণে আতঙ্কের পাশাপাশি মানুষ ও হাতির মুখোমুখি সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটছে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) চট্টগ্রাম বিভাগীয় সমন্বয়ক মনিরা পারভীন বলেন, মানুষ ও হাতির সংঘাত কমাতে হলে হাতির আবাসস্থল সংরক্ষণ, চলাচলের করিডর দখলমুক্ত রাখা এবং বন উজাড় বন্ধে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। একই সঙ্গে জরুরি ভিত্তিতে স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে হাতি সংরক্ষণে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. মনজুরুল কিবরিয়া বলেন, বিভিন্ন এলাকায় অপরিকল্পিত অবকাঠামো ও শিল্পকারখানা নির্মাণের ফলে মানুষ-হাতির দ্বন্দ্ব তৈরি হচ্ছে। মূলত মানুষই হাতির জায়গা দখল করে স্থাপনা নির্মাণ করছে। হাতি তাদের নিজেদের জায়গায় ফিরে আসছে। এ সমস্যা সমাধানে পরিকল্পিতভাবে উন্নয়ন ও শিল্পকারখানা নির্মাণ করতে হবে, যাতে মানুষ ও হাতির দ্বন্দ্ব এড়ানো যায়।
চট্টগ্রাম বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ কর্মকর্তা দীপান্বিতা ভট্টাচার্য বলেন, বন্য হাতির আক্রমণে ক্ষতিগ্রস্তদের বন বিভাগের পক্ষ থেকে নির্ধারিত নিয়মে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হচ্ছে। বন্য হাতিকে জোর করে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। হাতিরা স্বাভাবিকভাবেই তাদের নিরাপদ আবাসস্থলে ফিরে যাবে। তিনি স্থানীয় বাসিন্দাদের হাতির চলাচলের সময় সতর্কতা অবলম্বন এবং বন্য হাতির হাত থেকে নিজেদের নিরাপদ রাখতে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান।
এদিকে বুধবার সকালে বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ, চট্টগ্রামের উদ্যোগে নাপোড়া শেখেরখীল উচ্চ বিদ্যালয়ের হলরুমে এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। এর আগে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ থেকে একটি র্যালি বের করা হয়।
আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা, প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ বিভাগের কর্মকর্তা দীপান্বিতা ভট্টাচার্য। প্রধান অতিথি ছিলেন বাঁশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রুহুল আমিন।
বাঁশখালী ইকোপার্কের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. ইসরাইল হকের সঞ্চালনায় সভায় বক্তব্য দেন সরকারি আলাওল কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ মো. আজিজুর রহমান, নাপোড়া শেখেরখীল উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. জাহাঙ্গীর আলম, উপজেলা প্রাণিসম্পদ সম্প্রসারণ দপ্তরের কর্মকর্তা ডা. শাহজাদা জুলকার নাইন, উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিম, সাংবাদিক শিব্বির আহমদ রানা ও প্রকাশ বড়ুয়া।
সভায় বক্তারা বলেন, হাতি বাংলাদেশের জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক পরিবেশের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বন ও হাতির আবাসস্থল রক্ষা, হাতি-মানুষের সংঘাত কমানো এবং স্থানীয় জনগণের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। হাতির নিরাপদ বিচরণক্ষেত্র নিশ্চিত করতে বন সংরক্ষণ ও অবৈধ দখল রোধেও গুরুত্বারোপ করেন তারা।
অনুষ্ঠানে বন্যহাতির আক্রমণে ক্ষতিগ্রস্ত ৪৫ জন কৃষকের মধ্যে সরকারি অনুদান হিসেবে মোট ১৯ লাখ ১৫ হাজার টাকার চেক বিতরণ করা হয়। এ ছাড়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিভাগভিত্তিক চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতায় বিজয়ীদের পুরস্কার এবং শতাধিক শিক্ষার্থীর মাঝে বিভিন্ন ধরনের ফলদ গাছের চারা বিতরণ করা হয়।
অনুষ্ঠানে বনকর্মী, শিক্ষক, সংবাদকর্মী, সমাজকর্মী, স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি ও শিক্ষার্থীরা উপস্থিত ছিলেন।
উল্লেখ্য, বাঁশখালীতে গত এক দশকে বন্য হাতির আক্রমণে অন্তত ১২ থেকে ১৩ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। একই সময়ে বিভিন্ন কারণে প্রায় ১৪ থেকে ১৫টি বন্যহাতিরও মৃত্যু হয়েছে। বর্তমানে উপজেলার বনাঞ্চলে আনুমানিক ১৫ থেকে ২০টি বন্যহাতি বিচরণ করছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

