অকৃতকার্যই শেষ কথা নয়, শিখতে হবে ব্যর্থতাকে জয় করা

অকৃতকার্যই শেষ কথা নয়, শিখতে হবে ব্যর্থতাকে জয় করা

প্রবাদ আছেÑ‘অকৃতকার্য কৃতকার্যের চাবিকাঠি’। তারপরও অনেক কোমলমতি শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হওয়া মেনে নিতে পারে না। পরীক্ষার ফল প্রকাশের দিনটি যেকোনো শিক্ষার্থীর জীবনে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করার কথা। অথচ সে দিনটিতেই চাঁপাইনবাবগঞ্জের হালিমা খাতুন তরিকা, রাজশাহীর কারিনা পাল আর কুষ্টিয়ার ভেড়ামারার তানিয়া খাতুনের পরিবারে নিয়ে এলো চিরঅন্ধকারের বার্তা। এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর যেখানে দেশের লাখো ঘরে উদযাপনের আলো জ্বলছিল, সেখানে নিমিষে নিভে গেল তিনটি তাজা প্রাণ। এছাড়া দেশের আরো কয়েক জায়গায় পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়ে ঝরে পড়ার খবর পাওয়া গেছে।

রাজশাহীর বাগমারায় বিজ্ঞান বিভাগে দুটি বিষয়ে অকৃতকার্য হয়ে চরম বিষাদে আত্মহননের পথ বেছে নেন কারিনা। চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জে অন্যান্য বিষয়ে সফল হলেও কেবল ইংরেজিতে অকৃতকার্য হওয়ার তীব্র কষ্ট সহ্য করতে না পেরে বিষপান করে হালিমা। আর কুষ্টিয়ার ভেড়ামারায় একই হতাশায় তানিয়া খাতুন বেছে নেয় আত্মহননের পথ। এ তিনটি অকাল প্রস্থান সমস্বরে আমাদের এক নির্মম সামাজিক বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয় যে, একটি পরীক্ষার ফল কি জীবনের চেয়েও বড়? কখনই তা হতে পারে না। বরং জীবনকে সুন্দরভাবে গড়ে তোলার জন্যই পড়ালেখা বা এত আয়োজন। তাই একবার অকৃতকার্য হওয়া মানে হেরে যাওয়া কিংবা শেষ কথা নয়; বরং কঠিন অধ্যবসায়ের মাধ্যমে বারবার চেষ্টা করতে হবে। একবার না পারলে হতাশ হওয়া যাবে না, দৃঢ় মনোবল নিয়ে পড়ালেখায় মনোনিবেশ করতে হবে।

বিজ্ঞাপন

তানিয়া কুচিয়ামোড়া গ্রামের প্রবাসী আক্তারুল ও কবিতা খাতুন দম্পতির কন্যা। সে বাহাদুরপুর মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের ২০২৬ সালের এসএসসি শিক্ষার্থী ছিল। পরীক্ষায় গত বছরও অকৃতকার্য হয়েছিল সে।

স্থানীয় ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, সোমবার চলতি সালের এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হলে সে পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়। পরে রাত ১০টার দিকে ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করে তানিয়া।

আমাদের সামাজিক ও শিক্ষাব্যবস্থায় এসএসসি পরীক্ষাকে শুধু একটি প্রাতিষ্ঠানিক মূল্যায়ন হিসেবেই দেখা হয় না; কোনো কোনো সময় এটিকে বানিয়ে ফেলা হয় সন্তানের যোগ্যতা, মর্যাদা ও সামাজিক সম্মানের চূড়ান্ত মাপকাঠিও। ফল প্রকাশের দিন সকাল থেকেই চারপাশে শুরু হয় ‘জিপিএ-৫ পেয়েছ তো?’, ‘অমুকের সন্তান তো এত পেয়েছে, তোমার কম কেন?’Ñএ জাতীয় এক প্রতিযোগিতার মহোৎসব। কৈশোরের কোমল ও সংবেদনশীল মন এই তুলনামূলক আলোচনা ও সামাজিক লজ্জাকে সহ্য করতে পারে না। তাদের কাছে সাময়িক একাডেমিক পিছিয়ে পড়াকে জীবনের চূড়ান্ত ব্যর্থতা বলে মনে হতে শুরু করে। ফলে পরিবার ও সমাজের প্রত্যাশার অদৃশ্য চাপে পিষ্ট হয়ে অনেক সময় তারা হারিয়ে ফেলে বেঁচে থাকার মৌলিক ইচ্ছাটুকু। অথচ ভালো রেজাল্টের চেয়ে ভালো মানসিকতা ও মানবিক মানুষ হওয়া জরুরি।

একটি পাবলিক পরীক্ষায় খারাপ করা বা অকৃতকার্য হওয়া মানেই শেষ গন্তব্য নয়। শিক্ষাব্যবস্থায় মানোন্নয়ন পরীক্ষা, পুনঃনিরীক্ষণ বা পুনরায় অংশ নেওয়ার মতো একাধিক বৈধ পথ খোলা থাকে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার নির্দিষ্ট কোনো ধাপে থমকে যাওয়া বহু মানুষ পরবর্তী সময়ে মেধা ও পরিচর্যায় সমাজের শীর্ষে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করেছেন। কিন্তু সেই ভুল শুধরে ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য জীবনটা টিকিয়ে রাখা তো প্রথম ও প্রধান শর্ত।

পরীক্ষায় অকৃতকার্য বা ফল খারাপ হওয়া কোনো অপরাধ নয়, বরং এটি সন্তানের জন্য সবচেয়ে সংকটময় মুহূর্ত। এমন সময়ে বকাঝকা, শাসন বা প্রতিবেশীর সন্তানের সঙ্গে তুলনা না করে পরিবারকে হতে হবে প্রধান আশ্রয়স্থল। ‘কত পেয়েছ’Ñএই কঠিন প্রশ্নের আগে অভিভাবকের মুখ থেকে আসা উচিত সহজ একটি বাক্যÑ‘আমরা তোমার পাশেই আছি। যা হয়েছে, তা নিয়ে হতাশ না হয়ে আগামীতে ভালো করার জন্য নিজেকে প্রস্তুত কর।’

সন্তান যখন চরম হতাশা প্রকাশ করে বা নিজেকে শেষ করে দেওয়ার ইঙ্গিত দেয়, সেটিকে কোনোভাবেই হালকাভাবে নেওয়া যাবে না। তাকে এক মুহূর্তের জন্যও একাকী না রেখে মানসিকভাবে বিশ্বস্ততা তৈরি করতে হবে এবং প্রয়োজনে পেশাদার মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হতে হবে। একইভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোরও সামাজিক দায়িত্ব রয়েছে। ফলাফলের দিন কেবল কৃতকার্যদের নিয়ে উদযাপনের মানসিকতা থেকে বেরিয়ে এসে যারা কাঙ্ক্ষিত ফল পায়নি, তাদের কাউন্সেলিং ও পরবর্তী সহজ পথের দিশা দেওয়া জরুরি।

কারিনা, হালিমা ও তানিয়ার মৃত্যু কেবল তিনটি পরিবারের ব্যক্তিগত শোকের গল্পই নয়; এটি পুরো সমাজের জন্য এক তীব্র অনুশোচনা ও সতর্কবার্তা। আমাদের সন্তানদের শুধু জয়ী হতে শেখালে চলবে না, ব্যর্থতার পর ধুলো ঝেড়ে কীভাবে আবার উঠে দাঁড়াতে হয়, সেই শিক্ষা দিতে হবে। কারণ পরীক্ষার ফল আবার সংশোধন করা যায়, একটি বছর পিছিয়ে গেলে তা পুনরুদ্ধারও করা সম্ভব; কিন্তু ঝরে যাওয়া একটি অমূল্য জীবন কোনোদিন আর ফিরিয়ে আনা যায় না।

এসআর

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন