ঘরের ভেতর আব্বু চিন্তিত চেহারায় হাঁটছেন। শঙ্কিত কণ্ঠে বারবার জানতে চাইছেন—
‘কই যাবি? সত্যি করে বল।’
খানিকটা বিরক্ত হয়েই বললাম, ‘আর কতবার বলব, আব্বু! সারার কলেজের ফরম তুলতে যাচ্ছি। আজই শেষ দিন।’
কিন্তু বিষয়টি আব্বু সহজভাবে নিতে পারলেন না। তিনি বললেন, ‘পাশেই শহীদ মিনার। ভুলেও ওদিকে যাবি না। এক কাজ কর, তোর মাকে সঙ্গে নিয়ে যা।’
উপায়ান্তর না পেয়ে সারা, আমি এবং আম্মু—তিনজন একসঙ্গে বের হলাম। আম্মু যে কিছুই বুঝতে পারছিলেন না, তা নয়। তিনি আমার প্রকৃত উদ্দেশ্য জানতেন। তবু হয়তো নির্ভয়ে ছিলেন। তার বিশ্বাস ছিল, তিনি সঙ্গে থাকলে আমার ওপর যত বিপদই আসুক, আমাকে রক্ষা করতে পারবেন।
চিটাগাং রোড থেকে বাসে উঠে চারপাশের রাস্তার দিকে তাকালাম। চারদিকে শুনশান নীরবতা। মাঝেমধ্যে দু-একটি গাড়ি ছুটে যাচ্ছে। এর মধ্যেই হঠাৎ কী হলো বুঝে ওঠার আগেই বাসের হেলপার চিৎকার করে ড্রাইভারকে বললেন, ‘গাড়ি ঘুরান!’ এরপর যাত্রীদের উদ্দেশে বললেনÑ‘আপনারা দয়া করে নেমে যান। গাড়ি বাঁচাইতে না পারলে আমার চাকরি যাইব। রাস্তা পার হয়ে অন্য গাড়িতে উঠে বাসায় চলে যান। আজ আর বাইরে থাকবেন না।’
আমরা তখন সবে সাইনবোর্ড এলাকা পার হয়েছি। তড়িঘড়ি করে সবাই বাস থেকে নামতেই দেখি সামনে বিশাল এক মিছিল। বাসের অধিকাংশ যাত্রী উল্টোপথে ফিরে গেলেও আমি এগোতে শুরু করলাম সামনের দিকে। আম্মু কয়েকবার আমার হাত টেনে বললেন, ‘ওদিকে যাওয়ার দরকার নেই। ঝামেলায় পড়বি।’
আমি শান্ত গলায় বললাম, ‘ঝামেলা ওরা করছে না। ঝামেলা করছে তারা, যারা ছাত্রদের পাখির মতো গুলি করে মারছে। এখন আর পেছনে যাওয়ার উপায় নেই। সামনে এগোতেই হবে।’
আম্মু তখন কী অনুভব করেছিলেন জানি না। তবে তিনি আমার হাত আরো শক্ত করে ধরে এগোতে লাগলেন।
ঠিক তখনই পেছন থেকে অল্পবয়সী একটি মেয়ে আমাকে জিজ্ঞেস করল, ‘আপু, আপনি কি শহীদ মিনারে যাচ্ছেন? লংমার্চ টু ঢাকাতে যোগ দেবেন?’
আমি বললাম, ‘হ্যাঁ।’
সে বলল, ‘আপু, আমিও যাব। ভয় পেয়ে মাঝপথ থেকে বাসায় ফিরতে বের হইনি। আমি কি আপনাদের সঙ্গে যেতে পারি?’
ছোট্ট মেয়েটির সাহস দেখে আমার ভেতরটা কেমন যেন হয়ে গেল। পাশে দাঁড়িয়ে আম্মু নীরবে চোখ মুছছিলেন।
আমরা একসঙ্গে সামনে এগিয়ে চললাম। সামনের মিছিলে যারা ছিল, তারা আমাদের অপরিচিত কেউ নয়। সবাই যেন আমাদেরই আপনজন। কিন্তু সেই মিছিলের সামনেই ব্যারিকেড দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল একদল অমানুষ। যেকোনো মুহূর্তে বন্দুক থেকে গুলি ছুটে আসতে পারত। তবু মৃত্যুভয়কে দুপায়ে মাড়িয়ে আমরা এগিয়ে চললাম।
স্লোগানে স্লোগানে উত্তাল জনতার সামনে সেদিন সরকারি দলের সেবকদের আর দাঁড়িয়ে থাকার সাহস হয়নি। হাঁটতে হাঁটতে আমরা মাতুয়াইল পার হয়ে গেলাম। মানুষের বুকের সমস্ত ক্ষোভ তখন স্লোগানের ভাষায় বিস্ফোরিত হচ্ছিল।
মাতুয়াইল এলাকায় পৌঁছাতেই পুলিশ আন্দোলন ছত্রভঙ্গ করার উদ্দেশ্যে ধেয়ে এলো। মুহূর্তেই চারদিকে ছোটাছুটি শুরু হয়ে গেল। সবাই যে যার মতো ছড়িয়ে পড়ল। আমি কোথাও যেতে পারলাম না। মাঝ রাস্তাতেই দাঁড়িয়ে রইলাম। মনে হচ্ছিল, আমি বুঝি একাই রয়ে গেলাম।
কিন্তু কয়েক মিনিটের মধ্যেই চারপাশে আবার ভেসে এলো বিপ্লবীদের পায়ের শব্দ, স্লোগানের বজ্রধ্বনি। সেই ধ্বনি যেন বুকের ভেতর এক অদম্য সাহস জাগিয়ে তুলল। মনে হলো, এই বুকে এখন গুলি লাগলেও আর হার মানব না।
এরই মধ্যে খেয়ালই করিনি, আমার আম্মু আর ছোট বোন কোথায়। চারদিকে তাকিয়ে দেখি, এই বিশাল মিছিলে তারা আমারও আগে দাঁড়িয়ে গলা উঁচু করে স্লোগান দিচ্ছেন—
‘লেগেছে রে, লেগেছে, রক্তে আগুন লেগেছে।’
সেদিনের চেয়ে সুন্দর দৃশ্য আমার জীবনে দ্বিতীয়টি আছে বলে মনে হয় না।
অবশেষে আমরা সেই দীর্ঘ পথ পেরিয়ে শহীদ মিনারে পৌঁছালাম। সেখানে তখন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা মানুষের ঢল। মনে হচ্ছিল, পুরো বাংলাদেশের মানুষ নেমে এসেছে রাজপথে।
আর সেই জনসমুদ্রের প্রতিটি মানুষ যেন আমারই পরিচিত কেউ আমার ভাই, কেউ আমার বোন, কেউ বন্ধু, কেউ মা, কেউ বাবা।
শহীদ মিনারজুড়ে বিপ্লবীদের পদচারণে উচ্চারিত হয়েছিল স্বৈরাচারের পতনের ডাক। সেই ডাক বিফলে যাওয়ার ছিল না। ইতিহাস সাক্ষী, স্বৈরাচারের পতন ঘটেছে। মানুষ আবার স্বাধীনতার স্বাদ ফিরে পেয়েছে। প্রমাণ হয়েছে, এই জাতি মাথা নোয়ানোর জাতি নয়। যতবার স্বৈরাচার জন্ম নেবে, ততবারই এই জাতি তাকে ক্ষমতার আসন থেকে নামিয়ে আনবে।
জুলাই শুধু একটি মাস নয়; আমার কাছে এটি সাহস, ঐক্য, আত্মত্যাগ এবং মানুষের অদম্য প্রতিরোধের এক জীবন্ত স্মৃতি। সেদিনের প্রতিটি পদক্ষেপ আজও মনে করিয়ে দেয়Ñ স্বাধীনতা শুধু অর্জনের বিষয় নয়, তা রক্ষা করার জন্যও বারবার রাজপথে দাঁড়াতে হয়।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

