ব্যবসায়িক খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় ও প্রভাবশালী নারীব্যক্তিত্ব রুপালী হক চৌধুরী চতুর্থবারের মতো ফরেন ইনভেস্টরস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ফিকি) সভাপতি হয়েছেন। বহুজাতিক শিল্পগোষ্ঠীর তিনি প্রথম বাংলাদেশি নারী ব্যবস্থাপনা পরিচালক। সম্প্রতি বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগ, সরকারের নানা সংস্কারসহ বিভিন্ন বিষয়ে আমার দেশ-এর মুখোমুখি হন তিনি। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন মেহেদী হাসান
আমার দেশ : দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে বিনিয়োগ মন্দা চলছে, এর পেছনে আসলে কী কারণ থাকতে পারে?
রুপালী হক : দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ—এ দুটি বিষয় নিয়েই বলি। কোভিডের পর থেকে আমাদের অর্থনৈতিক অবস্থা যে খারাপের দিকে যাচ্ছিল, সেটা কাটিয়ে উঠলাম। মনে করেছি আমরা হয়তো এগিয়ে যেতে পারব; আমাদের কনজিউমার রেসপন্স ও অন্যান্য সূচকও ভালো ছিল। কিন্তু তারপরই শুরু হলো ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ, যেটা আমাদের সবচেয়ে বেশি আঘাত করেছে। বিশেষ করে ডলারের বিপরীতে টাকার যে অবমূল্যায়ন, এটা হঠাৎ করেই আমাদের সবাইকে পেছনে ফেলে দেয়। আমাদের মুদ্রাস্ফীতি হলো, অভ্যন্তরীণ খরচসহ সবকিছুর দাম একের পর এক বাড়াতে হলো। কারণ, আমরা বুঝতে পারছিলাম না এই অবমূল্যায়নটা কোথায় গিয়ে থামবে। প্রতি ডলার ৮৬-৮৭ টাকা থেকে উঠতে উঠতে এখন ১২৩ টাকার উপরে এসে একটু স্থিতিশীল হয়েছে। ফলে আমাদের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বড় শিল্প মালিকরা কোনোমতে ব্যাংকের সঙ্গে সমঝোতা করে বা হাই রেটে ডলার কিনে এলসি খুলতে পারলেও ছোটরা একদমই পারেনি। ফলে এ খাতের সঙ্গে যুক্ত অনেকেই স্থবির হয়ে পড়েছিল। এরপর এলো অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। অনেক বড় বড় প্রজেক্টের কাজ এখন থেমে আছে। হয়তো অনেকে দুর্নীতির কথা বলবে, আমি সেটাকে চ্যালেঞ্জ করছি না; দুর্নীতি অবশ্যই ছিল। কিন্তু তার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের কনস্ট্রাকশনের কাজগুলোও বন্ধ হয়ে গেল, যেখানে অনেক লোক কাজ করত। সবাই একটা স্থিতিশীল অবস্থার জন্য অপেক্ষা করছে; কিন্তু কোনো অর্থনীতি দেড় বছরের জন্য বন্ধ থাকতে পারে না। সরকারের অনেক প্রকল্প এখন স্থগিত হয়ে আছে। বিশেষ করে যে প্রকল্পগুলোর ৬০ থেকে ৭৫ শতাংশ কাজ হয়ে গেছে, সেগুলো শেষ না করলে খরচ করা অর্থ অর্থনীতিতে কোনো প্রভাব ফেলবে না।
আমার দেশ : দেশে কি ছোট উদ্যোক্তারাই বেশি চাপে পড়ে গেছেন?
রুপালী হক : ছোটরাই সব সময় চাপে থাকে। তবে রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের ফ্যাক্টরি এবং প্রতিষ্ঠানের ওপর যে আঘাত এসেছে, তাতে অনেক বেকারত্ব তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব অনেক সুদূরপ্রসারী। এছাড়া ব্যাংক সেক্টরও টালমাটাল অবস্থায় ছিল। গ্রাহকরা সাফার করেছেন, বিশেষ করে ছোট ব্যবসায়ীরা। ক্যাপিটাল সংকটের কারণে অনেক ব্যাংক গ্রাহকদের পাঁচ হাজার টাকার বেশি দিতে পারছে না।
আমার দেশ : এসব সমস্যা কী দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলবে?
রুপালী হক : সঠিক ব্যবস্থা না নিলে সমস্যা দীর্ঘমেয়াদি হবে। তবে বাজেটে ইনভেস্টমেন্ট ও ডিরেগুলেশনের যে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে, তা ভালো। সংস্কারগুলো দ্রুত করা গেলে দেড়-দুবছরের মধ্যে আমরা উন্নতির দিকে ফিরতে পারি।
আমার দেশ : বাজেটে বৈদেশিক বিনিয়োগ জিডিপির ২ দশমিক ৭ শতাংশে নিয়ে যাওয়ার যে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে, তা কি সম্ভব?
রুপালী হক : জিডিপি শূন্য দশমিক ৩৬ শতাংশ থেকে ২ দশমিক ৭ শতাংশে নিয়ে যাওয়া এক বছরে সম্ভব হবে বলে মনে হয় না। নতুন নতুন কোম্পানি না এলে এবং বর্তমানে যারা স্থবিরতায় আছে, তারা সচল না হলে এটা বাস্তবায়নে অনেক সময় নেবে।
আমার দেশ : জ্বালানি সংকট বড় বাধা হিসেবে দেখা দেবে কি না?
রুপালী হক : আমাদের দেশে প্রচুর জ্বালানি সংকট রয়েছে। গ্যাসের চাহিদা অনুযায়ী ৩০ শতাংশ ঘাটতি আছে। এলএনজি সুবিধা তৈরি করতেও দু-তিন বছর সময় লাগবে। গ্যাসের চাহিদা মিটে গেলে টেক্সটাইলসহ আরো অনেক শিল্প-কারখানা ঘুরে দাঁড়াবে। এখন অনেক পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো এলসি সমস্যা কিছুটা কমলেও এখন সুদহার অনেক বেশি; ১২ থেকে ১৪ শতাংশ। ঋণ নিয়ে ব্যবসা করে লভ্যাংশ বের করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
আমার দেশ : বিনিয়োগে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমাতে বিনিয়োগ আইন-২০২৬ অনুমোদন হয়েছে। লাইসেন্স, সনদ, রেজিস্ট্রেশন—সবকিছু এক ছাতার মধ্যে আনা হবে বলে জানিয়েছে সরকার। এ ব্যাপারে আপনার মতামত…
রুপালী হক : আমাদের কর্মপদ্ধতি সহজ করতে হবে। যেমন, ম্যানুফ্যাকচারিংয়ের জন্য লাইসেন্স একবার করলে দুই থেকে তিন বছরের জন্য মেয়াদ থাকা উচিত, যাতে বারবার অনুমোদনের জন্য ছুটতে না হয়। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) বা অন্যান্য সংস্থাকে কাজের পূর্ণ ক্ষমতা দিতে হবে। দেখা যায়, রাস্তা করতে এলজিআরডিকে বা বিদ্যুৎ সংযোগের জন্য পিডিবিকে তাদের অনুরোধ করতে হয়, যাদের অগ্রাধিকারের জায়গা আলাদা। এই সমন্বয়হীনতার কারণে ছোটখাটো জিনিসের জন্য বড় বিনিয়োগ আটকে থাকে।
আমার দেশ : বিনিয়োগের ক্ষেত্রে অন্যান্য দেশের তুলনায় আমাদের অবস্থা কেমন?
রুপালী হক : কম্বোডিয়ায় জনশক্তির সংকট থাকলেও তারা বেশ এগিয়ে রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে জনশক্তি থাকার পরও অনেক পিছিয়ে। শুধু জনশক্তি দিয়ে সব বিনিয়োগ আসবে না। আমাদের গ্যাস সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে গেছে। এছাড়া আমাদের ফিসক্যল পলিসি ক্রমাগত পরিবর্তন হয়। পলিসির প্রেডিক্টেবিলিটি খুব গুরুত্বপূর্ণ, যেমন আগামী পাঁচ বছরের জন্য ট্যাক্স স্ট্রাকচার কী থাকছে। এছাড়া ক্যাপিটাল মার্কেট গ্রো করতে হবে।
আমার দেশ : দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক অবস্থা নিয়ে আপনার পর্যবেক্ষণ…
রুপালী হক : বাংলাদেশের মানুষ খুব রেজিলিয়েন্ট। এত ইকোনমিক ডিপ্রেশনের মধ্যেও মানুষ হাসিমুখে কাজ চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। তবে আমাদের টাকাটা জমিয়ে না রেখে বিনিয়োগের মাধ্যমে মাল্টিপ্লায়ার ইফেক্ট (বহুমাত্রিক প্রভাব) আনা উচিত। টাকা ব্যাংকে ফেলে রাখলে কেউ উপকৃত হয় না। আবার ব্যাংক সেক্টরের কন্ট্রোল সিস্টেম ভালো করা উচিত, যাতে দুর্নীতি কমে। এখন লোন নিতে গেলে ব্যক্তিগতভাবে অনেক কাগজ দিতে হয়। এরকম হলে বড় লোনগুলো কমপ্লায়েন্স ছাড়া কীভাবে হবে!
আমার দেশ : আপনাদের চ্যালেঞ্জগুলো কী কী?
রুপালী হক : ফিকিতে ৩৫ দেশের অন্তত ২০০ কোম্পানি আছে, যারা ২২ ক্যাটাগরিতে কাজ করছে। আমাদের নলেজ আছে; কারণ আমরা অনেক দেশ একসঙ্গে আছি। বাংলাদেশে সে অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে চাই। তবে রাজনৈতিক মতাদর্শ ও পরিচালনা পর্ষদের মধ্যে একটা মেলবন্ধন করতে হবে। ১৯টি আইন দ্বারা একটি কোম্পানি চলে, সেসব জায়গায় লজিস্টিক্স ও পোর্টসহ কোথায় কী সমস্যা—তা আমরা সচিত্র তুলে ধরছি। আমরা যেহেতু কমপ্লায়েন্ট কোম্পানি, তাই আমাদের সব আইন মেনেই চলতে হয়। একবার দুর্নীতির ‘প্যান্ডোরার বাক্স’ খুলে গেলে তা শেষ করা যাবে না। ওদিকে আমরা যাব না। সুতরাং আমরা ক্লিন থাকতে চাই এবং আইন মেনে চলতে চাই।
আমার দেশ : ক্যাপিটাল মার্কেট নিয়ে কিছু বলুন…
রুপালী হক : ক্যাপিটাল মার্কেটকে উন্নত করতে হবে, যাতে আইডিয়ার ওপর ভিত্তি করে নতুন কোম্পানিগুলো ক্যাপিটাল রেইজ করতে পারে। এছাড়া আমাদের কাজ খুব দ্রুত করতে হবে। সরকারি কর্মকর্তা এবং ব্যবসায়ীদের মধ্যে পরস্পরকে দোষারোপ করার সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে। কর্মকর্তারা বলেন ব্যবসায়ীরা ভ্যাট-ট্যাক্স দেন না। কিন্তু ট্যাক্স নেট কেন বাড়ছে না—সেটা নিজেদেরও প্রশ্ন করা উচিত।
আমার দেশ : এই ব্যর্থতা থেকে উত্তরণের উপায় কী?
রুপালী হক : আমরা একে ব্যর্থতা বলে ছেড়ে দিতে চাই না, আমরা সহযোগিতা করতে চাই। যেমন, এনবিআর চেয়ারম্যানের ইচ্ছা আছে ট্যাক্স বেস বাড়ানোর। সেজন্য শুধু ম্যানপাওয়ার নয়, অটোমেশনও দরকার। অনেক কোম্পানি ব্যবসা শনাক্তকরণ নম্বর (বিন) নিলেও মার্কেটে ইনঅ্যাক্টিভ। আমাদের দেশে ব্যাংক ইনসলভেন্সি আইন না থাকায় কোম্পানি বন্ধ করা যায় না। আমাদের প্রসেস স্ট্রং করতে হবে এবং অটোমেশন আনতে হবে; যাতে ভোক্তা, রিটেলার ও ইনভেস্টরদের কর্মপদ্ধতি স্মুথ এবং ফেসলেস হয়।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


