অর্থনৈতিক নীতি ও সূচক সমন্বয়ের উদ্যোগ

অর্থনৈতিক নীতি ও সূচক সমন্বয়ের উদ্যোগ
ছবি: এআই

দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে গতিশীলতা আনা এবং নীতি বাস্তবায়নে বড় ধরনের সমন্বয়ের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। অর্থ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক, আইডিআরএ, পরিসংখ্যান ব্যুরো, এনবিআর ও বিএসইসির মতো আর্থিক খাতের প্রধান প্রতিষ্ঠানগুলো যাতে একই বার্তা নিয়ে কাজ করে এবং অর্থনৈতিক সূচকগুলোর হালনাগাদ তথ্য সমন্বিতভাবে পাওয়া যায়, সে লক্ষ্যে একটি নতুন কাঠামো তৈরির কাজ শুরু হয়েছে। এর মাধ্যমে সরকারের অর্থনৈতিক লক্ষ্য ও বাস্তব অর্জনের মধ্যকার ব্যবধান কমিয়ে নীতি প্রণয়ন আরো কার্যকর করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

বিজ্ঞাপন

সম্প্রতি সচিবালয়ে অর্থ বিভাগে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করতে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সচিবদের নিয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন।

বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, এটি মূলত একটি কার্যকর সমন্বয় কমিটির মতো কাঠামো হিসেবে কাজ করবে। যদিও এর আনুষ্ঠানিক নাম, সুনির্দিষ্ট কাঠামো ও কার্যপরিধি এখনো চূড়ান্ত করা হয়নি, তবে এ উদ্যোগের উদ্দেশ্য কেবল অর্থনীতির সূচকগুলোর বর্তমান অবস্থা পর্যালোচনা করাই নয়; বরং সরকারের ঘোষিত বিভিন্ন অর্থনৈতিক লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে বাস্তব অগ্রগতি কতদূর হলো, তা নিয়মিত হিসাব করা হবে।

জানা গেছে, দেশে বর্তমানে কী পরিমাণ কর্মসংস্থান হয়েছে, তার সম্পূর্ণ পরিসংখ্যান এক জায়গায় পাওয়ার সুযোগ নেই। সেটি নিশ্চিত করতে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রকৃত চিত্র মূল্যায়নে নির্দিষ্ট কিছু খাতের ওপর ত্রৈমাসিক (কোয়ার্টারলি) রিপোর্টিংয়ের ব্যবস্থা করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। পিকেএসএফের মতো বড় ফাউন্ডেশন এবং সরকারি ও বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর অর্থায়নের ফলে প্রতি প্রান্তিকে (কোয়ার্টার) ঠিক কত কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে, তার নিয়মিত রিপোর্ট দিতে হবে। পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে দেশের সব বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ঋণ বিতরণ এবং তার বিপরীতে নতুন কত কর্মসংস্থান বা চাকরি সৃষ্টি হচ্ছে, তার ত্রৈমাসিক প্রতিবেদন জমা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।

এ বিষয়ে অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর আমার দেশকে বলেন, কাঁচামাল আমদানির তথ্য দিয়ে যেমন সামগ্রিক বিনিয়োগের গতিপ্রকৃতি অনুমান করা যায়, তেমনি এই তিন খাত (ফাউন্ডেশন, সরকারি-বিশেষায়িত ব্যাংক এবং বেসরকারি ব্যাংক) থেকে নিয়মিত কর্মসংস্থানের রিপোর্ট পাওয়া গেলে দেশের শ্রমবাজার ও প্রকৃত বিনিয়োগের সঠিক চিত্র স্পষ্ট হয়ে উঠবে। সে উদ্যোগই নেওয়া হচ্ছে।

বৈঠকে সরকারের অর্থনৈতিক লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নের অগ্রগতি পর্যালোচনার পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি, বাজেট বাস্তবায়ন, প্রবৃদ্ধি, রাজস্ব আদায়, খেলাপি ঋণ ও রপ্তানি আয়ের মতো প্রধান প্রধান সূচকগুলোর হালনাগাদ তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। তবে পর্যালোচনার সময় প্রয়োজনীয় তথ্য এক জায়গায় সমন্বিতভাবে না পাওয়ার বিষয়টি উঠে আসে। ফলে সংশ্লিষ্ট সব দপ্তর ও বিভাগকে তথ্য হালনাগাদ রাখার কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। মূলত সরকারের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের অগ্রগতি পরিমাপ এবং নির্ধারিত লক্ষ্য ও বাস্তব অর্জনের মধ্যকার ব্যবধান দূর করতেই এই সমন্বিত কাঠামো তৈরির চিন্তা করা হচ্ছে।

পর্যালোচনার ক্ষেত্রে মূল্যস্ফীতি, রাজস্ব আদায়, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, রপ্তানি, আমদানি, রেমিট্যান্স, বিনিয়োগ, বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ, কর্মসংস্থান এবং প্রবৃদ্ধির মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোকে বিশেষভাবে বিবেচনায় রাখা হবে।

এদিকে নির্বাচিত সরকার দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নেওয়ায় অর্থনীতিতে কিছুটা কর্মচাঞ্চল্য ফিরলেও সামষ্টিক অর্থনীতি এখনো পুরোপুরি ঝুঁকিমুক্ত নয় বলে মনে করছে অর্থ বিভাগ। জ্বালানি সংকটের কারণে আমদানির চাপ অব্যাহত রয়েছে এবং মূল্যস্ফীতির চাপও এখনো উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, আগস্টে সার্বিক মূল্যস্ফীতি সামান্য কমে ৮ দশমিক ২৬ শতাংশে নামলেও সাধারণ মানুষের জীবনে তার বড় কোনো স্বস্তি আসেনি। এছাড়া গত অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ১৪ শতাংশে আটকে থাকায় প্রবৃদ্ধির ধারা এখনো শ্লথ রয়েছে।

বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে কিছুটা স্বস্তি মিললেও বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ ঐতিহাসিক নিম্নতম স্তরে নেমে যাওয়ায় বিনিয়োগে স্থবিরতা বিরাজ করছে। উচ্চ সুদহার, ব্যবসার ব্যয় বৃদ্ধি এবং নীতি-অনিশ্চয়তার কারণে নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। প্রতি বছর নতুন করে প্রায় ১৩-১৪ লাখ মানুষ শ্রমবাজারে প্রবেশ করায় কর্মসংস্থানের চাপ ক্রমেই বাড়ছে। পাশাপাশি ব্যাংকিং খাতের খেলাপি ঋণ, তারল্য সংকট এবং রাজস্ব আদায়ের ধীরগতির মতো বহুবিধ চ্যালেঞ্জও মোকাবিলা করতে হচ্ছে নীতিনির্ধারকদের।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন