জুলাই বিপ্লবের বীরকন্যা ফাতেমা

আমানুর রহমান

জুলাই বিপ্লবের বীরকন্যা ফাতেমা

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বারুদের ঝাঁঝালো গন্ধমাখা রাজপথে মৃত্যুভয় তুচ্ছ করে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন এক অকুতোভয় নারী—ফাতেমা রহমান বীথি। বৃষ্টির মতো টিয়ারগ্যাসের ধোঁয়া, ধেয়ে আসা শেল আর গুলির মুখেও নিজের জীবন বাজি রেখে তিনি বাঁচিয়েছেন অসংখ্য সহযোদ্ধার প্রাণ। গণআন্দোলনে এই নারীর অদম্য সাহসিকতা ও প্রতিরোধের রুদ্ধশ্বাস গল্প তুলে ধরেছেন আমানুর রহমান

জীবনের চরম ঝুঁকি নিয়ে টাঙ্গাইলের রাজপথে গণআন্দোলনে সক্রিয়ভাবে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেওয়ার প্রধান অনুপ্রেরণা কী ছিল?

বিজ্ঞাপন

আমি ২০১৮ সাল থেকেই রাজনৈতিকভাবে সক্রিয়। তবে জুলাই অভ্যুত্থানে আমার প্রধান অনুপ্রেরণা ছিল একটি বৈষম্যমুক্ত, ন্যায়ভিত্তিক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ার আকাঙ্ক্ষা। যখন দেখেছি মানুষের মতপ্রকাশের অধিকার সংকুচিত হচ্ছে, শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের ন্যায্য দাবির ওপর দমনপীড়ন চালানো হচ্ছে, তখন মনে হয়েছে—নীরব থাকা মানে অন্যায়ের কাছে আত্মসমর্পণ করা।

প্রতি মুহূর্তে জীবনের ঝুঁকি ছিল ঠিকই; কিন্তু স্বাধীনতা, ন্যায়বিচার এবং মানুষের অধিকার রক্ষার সংগ্রাম আর দায়িত্ববোধ সেই ঝুঁকির চেয়েও অনেক বড়। তাই ভয়কে নয়, দায়িত্ববোধ সামনে রেখেই টাঙ্গাইলের রাজপথে সক্রিয় থেকেছি এবং সহযোদ্ধাদের সঙ্গে আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ার চেষ্টা করেছি।

জুলাই-বিপ্লবের-বীরকন্যা-ফাতেমা-২

একদিকে ছাত্রলীগের হুমকি-হামলা, অন্যদিকে পুলিশের ব্যারিকেড—সব পেরিয়ে একজন নারী হিসেবে মিছিলে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেওয়ার অভিজ্ঞতা কেমন?

আমাদের সমাজব্যবস্থা এখনো অনেকাংশেই পুরুষতান্ত্রিক। কিন্তু ইতিহাসের প্রতিটি ন্যায্য আন্দোলন-সংগ্রামেই দেখবেন, পুরুষদের পাশাপাশি নারীরাও সামনের সারি থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন।

একজন নারী হিসেবে রাজপথের এই লড়াই আমার কাছে কেবল ব্যক্তিগত সাহসের পরীক্ষা ছিল না; বরং এটি ছিল সামাজিক বাধা অতিক্রমের এক অনন্য অভিজ্ঞতা। ছাত্রলীগের হুমকি-হামলা, পুলিশের ব্যারিকেড এবং গ্রেপ্তারের আশঙ্কার মধ্যেও সামনে থেকে নেতৃত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম এই বিশ্বাস থেকে যে, ন্যায্য দাবির আন্দোলনে ভয়কে জয় করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

নেতৃত্ব মানে তো শুধু সামনে দাঁড়িয়ে থাকা নয়; বরং সংকটের মুহূর্তে সহযোদ্ধাদের সাহস জোগানো, ঐক্য ধরে রাখা এবং আন্দোলনের লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত না হওয়া। নারী হিসেবে রাজপথে নেতৃত্ব দিতে গিয়ে নানা ধরনের চাপ ও ঝুঁকির মুখোমুখি হয়েছি, মামলারও শিকার হয়েছি। তবে এর পাশাপাশি অসংখ্য শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের অকৃত্রিম ভালোবাসা, সংহতি ও সহযোগিতাও পেয়েছি। এই অভিজ্ঞতা আমাকে আরো দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস জুগিয়েছে যে, গণতান্ত্রিক আন্দোলনে নারীর নেতৃত্ব কোনো ব্যতিক্রমী ঘটনা নয়, বরং এটি একটি স্বাভাবিক ও প্রয়োজনীয় বাস্তবতা। সাহস, দায়িত্ববোধ এবং মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা থাকলে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে যে কেউই নেতৃত্ব দিতে পারেন।

১৮ জুলাই পুলিশের টিয়ারগ্যাস ও গুলির মুখে যখন ভয়ে কেউ দরজা খুলছিল না, তখন প্রায় ৫০ নারী শিক্ষার্থীকে রক্ষা করে নিরাপদ আশ্রয়ে নিয়ে যাওয়ার মুহূর্তটির অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?

সেদিনের কথা মনে পড়লে এখনো গা শিউরে ওঠে। পুলিশ আচমকাই শিক্ষার্থীদের ওপর লাঠিচার্জ শুরু করে, সেইসঙ্গে টিয়ার গ্যাস আর গুলি ছুড়তে থাকে। আমাদের আশ্রয় দিতে ভয়ে যখন আশপাশের সব দোকানপাট বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছিল, তখন একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে একপ্রকার জোর করেই নারী শিক্ষার্থীদের নিয়ে আশ্রয় নিই। আমরা যখনই বের হওয়ার চেষ্টা করছিলাম, তখনই দুপাশ থেকে পুলিশ টিয়ার গ্যাস আর গুলি ছুড়ছিল। একপর্যায়ে পুলিশ সেখান থেকে সরে গেলে নারী শিক্ষার্থীদের নিরাপদে বাসায় পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করি। পাশাপাশি আহত পুরুষ সহযোদ্ধাদের চিকিৎসার জন্য দ্রুত হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থাও করি।

জীবন বাজি রেখে গুলিবিদ্ধ শিক্ষার্থীদের উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করানোর পর যখন অনেকেই ছাত্রলীগের ভয়ে চিকিৎসা না নিয়েই চলে যাচ্ছে—সে পরিস্থিতিতে আপনার অনুভূতি কেমন ছিল?

আহত সহযোদ্ধাদের হাসপাতালে পাঠানোর পর একপর্যায়ে খবর এলো—সেখানে ছাত্রলীগ হামলা চালাচ্ছে এবং আন্দোলনকারীদের খুঁজে বেড়াচ্ছে। ভয়ে অনেকেই চিকিৎসা না নিয়েই হাসপাতাল ছেড়ে চলে যাচ্ছিলেন। খবরটি পেয়ে দ্বিতীয়বার কিছু না ভেবেই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তৎক্ষণাৎ হাসপাতালের দিকে রওনা হই। সেখানে গিয়ে দেখি, পুরুষ সহযোদ্ধাদের পাশাপাশি অনেক নারী সহযোদ্ধাও আহত অবস্থায় কাতরাচ্ছেন। আমরা কয়েকজন মিলে জরুরি ভিত্তিতে তাদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করি।

সেদিনকার সেই ভয়াবহ অনুভূতির কথা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য প্রচণ্ড মানসিক জোর ও সাহসের প্রয়োজন ছিল, আমি কেবল নিজের কাঁধে থাকা দায়িত্বটুকু পালন করার চেষ্টা করেছি।

জুলাই-বিপ্লবের-বীরকন্যা-ফাতেমা-৩

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নারী আন্দোলনকারীদের সাহসী ভূমিকা ও আত্মত্যাগ কি বর্তমানে যথাযথ স্বীকৃতি পাচ্ছে?

আমার মতে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নারী আন্দোলনকারীদের সাহসী ভূমিকা ও আত্মত্যাগের স্বীকৃতি এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত হয়নি। আন্দোলনের সময় নারীরা যে শুধু অংশগ্রহণ করেছেন তা-ই নয়; তারা নেতৃত্ব দিয়েছেন, মিছিলের সামনের সারিতে থেকেছেন, সংগঠিত করেছেন, আহত ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন এবং জীবন বাজি রেখে গণতন্ত্র ও ন্যায়বিচারের দাবিতে রাজপথে লড়েছেন। কিন্তু আন্দোলন-পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন আলোচনা, গণমাধ্যম এবং রাজনৈতিক বয়ানে তাদের অবদান তুলনামূলকভাবে অনেক কম তুলে ধরা হয়েছে।

সবচেয়ে দুঃখজনক হলেও সত্য, অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে নারীদের যে মর্যাদা দেওয়ার কথা ছিল, তা দেওয়া হয়নি। উল্টো একটি কুচক্রী গোষ্ঠী নারীদের নানাভাবে গৃহবন্দি করার অপচেষ্টা চালিয়েছে। নারীদের ভয় দেখানো হয়েছে, অনলাইনে সাইবার বুলিংসহ নানাভাবে মানসিক হেনস্তা করা হয়েছে। নারীরাও যে রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী জায়গায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন—সেই ভয় থেকেই মূলত তাদের কোণঠাসা করার চেষ্টা করা হয়েছে বলে আমি মনে করি।

তবে আশার কথা হলো, সব নারী ঘরে ফিরে যাননি। অনেক নারীই অদম্য সাহসের সঙ্গে এখনো তাদের লড়াই জারি রেখেছেন, যা অন্য নারীদের জন্য অনুকরণীয় ও অনুপ্রেরণাদায়ক। নতুন বাংলাদেশ গড়ার যে স্বপ্ন জুলাই গণঅভ্যুত্থান দেখিয়েছে, তা বাস্তবায়ন করতে হলে নারী আন্দোলনকারীদের অবদানকে প্রাপ্য মর্যাদা দিতেই হবে। কারণ তাদের আত্মত্যাগ ও নেতৃত্ব এই আন্দোলনের অবিচ্ছেদ্য অংশ; এই ইতিহাস কোনোভাবেই আড়ালে ঢাকা পড়া উচিত নয়।

রক্তক্ষয়ী এই অভ্যুত্থান ও বিপুল আত্মত্যাগে যে নতুন বাংলাদেশের সূচনা হলো, এখন আপনার মূল প্রত্যাশাগুলো কী এবং নতুন প্রজন্মের প্রতি আহ্বান কী?

রক্তক্ষয়ী এই অভ্যুত্থান এবং অসংখ্য শহীদ ও আহত মানুষের আত্মত্যাগ আমাদের সামনে একটি ঐতিহাসিক দায়িত্ব তুলে ধরেছে। আমার প্রত্যাশা—নতুন বাংলাদেশ এমন একটি রাষ্ট্র হবে, যেখানে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে, গণতান্ত্রিক অধিকার নিশ্চিত হবে, অবাধ মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকবে এবং রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠান জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য থাকবে। এমন একটি বাংলাদেশ চাই, যেখানে ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্নীতি, বৈষম্য ও রাজনৈতিক প্রতিহিংসার পরিবর্তে ন্যায়বিচার, মানবিকতা এবং সমান অধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে। এজন্যই আমরা স্লোগান তুলেছিলাম—‘সংবিধানের মূলকথা, সুযোগের সমতা।’

নতুন প্রজন্মের প্রতি আমার আহ্বান—শুধু একটি আন্দোলনের স্মৃতি রোমন্থন করাই যথেষ্ট নয়; বরং সেই আন্দোলনের চেতনাকে বুকে ধারণ করে একটি ন্যায়ভিত্তিক, গণতান্ত্রিক ও বৈষম্যহীন রাষ্ট্র গঠনে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে। সচেতন নাগরিক হিসেবে সত্যের পক্ষে দাঁড়াতে হবে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও মানবিক চেতনা লালন করতে হবে। শহীদদের আত্মত্যাগের প্রকৃত সম্মান তখনই নিশ্চিত হবে, যখন আমরা প্রতিটি নাগরিক তার মর্যাদা, অধিকার, ন্যায্য হিস্যা ও ন্যায়বিচার পাওয়ার ব্যাপারে শতভাগ নিশ্চিত থাকবেন।

লেখক : শিক্ষার্থী, (স্নাতক), হাবিবুল্লাহ বাহার কলেজ, শান্তিনগর, ঢাকা

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন