সংসার সামলানোর পাশাপাশি গ্রামীণ নারীদের আত্মনির্ভরশীল করে তুলতে নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলার নারী উদ্যোক্তা রোকসানা আক্তার রেহানা। নিরাপদ কৃষি, জৈবসার উৎপাদন, ছাগল পালন, কুটিরশিল্প ও নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নে তার বহুমুখী উদ্যোগ ইতোমধ্যে এলাকায় প্রশংসা কুড়িয়েছে।
রোকসানা আক্তার রেহানার বাড়ি রায়পুর উপজেলার ১ নম্বর উত্তর চরআবাবিল ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের ঝাউডগী গ্রামে। তিনি রায়পুর সরকারি কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। এক ভাই ও চার বোনের মধ্যে তিনি তৃতীয়। শৈশব থেকেই পারিবারিক বিভিন্ন কাজে অংশগ্রহণ করে দায়িত্বশীলতার সঙ্গে সেগুলো সম্পন্ন করতেন। ছোটবেলা থেকেই তার মধ্যে নেতৃত্ব, পরিশ্রম ও সমাজের জন্য কাজ করার প্রবল আগ্রহ গড়ে ওঠে, যা আজ তাকে একজন সফল নারী উদ্যোক্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
সাংসারিক জীবনেও তিনি একজন সফল নারী। তিনি এক ছেলে ও এক কন্যাসন্তানের জননী। সংসারের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি সমাজের নারীদের আত্মনির্ভরশীল করে তুলতে নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন।
গৃহিণী হিসেবে সংসারের দায়িত্ব পালন করলেও নিজেকে ঘরের চার দেয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি তিনি। নারীদের স্বাবলম্বী করার প্রত্যয়ে স্থানীয় নারীদের নিয়ে নারী কৃষকদল গঠন করেন। উপজেলা যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের বিভিন্ন প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নারীদের দক্ষতা বৃদ্ধি করে আয়বর্ধক কাজে যুক্ত করার ক্ষেত্রেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন।
রোকসানা আক্তার রেহানা নারীদের বাড়ির আঙিনা ও পতিত জমি কাজে লাগিয়ে বিষমুক্ত সবজি চাষে উৎসাহিত করছেন। এর মাধ্যমে পরিবারের পুষ্টিচাহিদা পূরণের পাশাপাশি অতিরিক্ত আয়ের সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে। তিনি রাসায়নিক সারের পরিবর্তে জৈবসার ব্যবহারে সাধারণ মানুষকে উদ্বুদ্ধ করছেন।
শুধু উদ্বুদ্ধ করেই তিনি থেমে থাকেননি, নিজেই ভার্মি কম্পোস্ট জৈবসার উৎপাদনের একটি সফল মডেল গড়ে তুলেছেন। শুরুতে অনেকেই তার এই উদ্যোগ নিয়ে হাসি-তামাশা করলেও বর্তমানে তার উৎপাদিত জৈব সার কৃষকদের কাছে আস্থার প্রতীক হয়ে উঠেছে।
নারী উন্নয়নের অংশ হিসেবে উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিসের সহযোগিতায় তিনি ছাগল পালনভিত্তিক একটি প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেন। গ্রামের ৩০ জন নারীকে নিয়ে একটি ছাগল উৎপাদক দল গঠন করেন। প্রকল্পের আওতায় নারীদের প্রশিক্ষণ প্রদান এবং ছাগল পালনের উপযোগী শেড নির্মাণে সহায়তা করা হয়। এর ফলে অনেক নারী বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে ছাগল পালন করে স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ পেয়েছেন।
এছাড়া তিনি নারীদের সেলাই, কুটিরশিল্পসহ ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার বিভিন্ন কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করতে কাজ করছেন। তার প্রচেষ্টায় অনেক নারী আজ নিজেদের পরিবারের আর্থিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন।
রোকসানা আক্তার রেহানা বলেন, ‘প্রথমে আমি নিজেই কাজ শুরু করি। অনেকেই ভাবতেন আমি গোবর নিয়ে কী করছি। কিন্তু গোবর থেকে যে উন্নতমানের রাসায়নিক দ্রব্যমুক্ত জৈবসার উৎপাদন সম্ভব, তা আমি বাস্তবে দেখাতে সক্ষম হয়েছি। বর্তমানে এলাকার অনেক মানুষ এ বিষয়ে আগ্রহী হয়েছেন।
তিনি আরো বলেন, ‘উপজেলা কৃষি অফিসার মাজেদুল ইসলাম স্যার ও উপসহকারী কৃষি অফিসার আলমগীর শরীফ স্যারের সহযোগিতা ও অনুপ্রেরণা আমাকে অনেক দূর এগিয়ে যেতে সাহায্য করেছে। আমি তাদের প্রতি আন্তরিকভাবে কৃতজ্ঞ। আমার প্রত্যাশা, সবাই যেন বিষমুক্ত খাদ্য গ্রহণ করেন এবং রাসায়নিক সারের পরিবর্তে জৈবসার ব্যবহার করে নিরাপদ কৃষিব্যবস্থা গড়ে তোলেন।
ঝাউডগী গ্রামের বাসিন্দা নাজমা বেগম বলেন, ‘শুরুর দিকে রোকসানা আপার এসব কাজ দেখে অনেকেই হাসি-তামাশা করত। পরে যখন দেখলাম গোবর থেকে উন্নত মানের জৈবসার উৎপাদন হচ্ছে এবং তা কৃষিতে ভালো ফল দিচ্ছে, তখন আমাদের ধারণা বদলে যায়। তার এমন উদ্যোগকে আমরা সাধুবাদ জানাই। আমিও তার মতো একটি ভার্মি কম্পোস্ট প্রকল্প গড়ে তুলতে চাই।
রায়পুর উপজেলা কৃষি অফিসার কৃষিবিদ মো. মাজেদুল ইসলাম বলেন, ‘গ্রামাঞ্চলে এ ধরনের উদ্যোক্তা সৃষ্টি হওয়া সমাজের জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক। রোকসানা আক্তার রেহানার উদ্যোগ নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন, পরিবেশবান্ধব কৃষি এবং গ্রামীণ অর্থনীতি আরো শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। উপজেলা কৃষি অফিস সবসময় উদ্যোক্তাদের পাশে থাকবে এবং প্রয়োজনীয় সহযোগিতা প্রদান করবে।’
রায়পুর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. আতাউর রহমান বলেন, ‘১নং উত্তর চর আবাবিল ইউনিয়নের ছাগল উৎপাদক দলের সেক্রেটারি রোকসানা আক্তার রেহানা দীর্ঘদিন ধরে গ্রামাঞ্চলে নারী উন্নয়নে কাজ করছেন। তিনি নারীদের বিভিন্ন আয়বর্ধক কর্মকাণ্ডে উৎসাহিত করছেন এবং তাদের স্বাবলম্বী হওয়ার পথ দেখাচ্ছেন। সমাজের আরো নারী যদি এ ধরনের উদ্যোগে এগিয়ে আসেন, তাহলে নারীর ক্ষমতায়ন আরো বেগবান হবে এবং অবহেলিত নারী সমাজ অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী হয়ে উঠবে।’রোকসানা আক্তারের এই বহুমুখী উদ্যোগ শুধু নারী উন্নয়নেই নয়, নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন, পরিবেশবান্ধব কৃষি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং গ্রামীণ অর্থনীতির উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। তার সংগ্রাম, অধ্যবসায় ও সাফল্য গ্রামীণ নারীদের জন্য একটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। সমাজের অসংখ্য নারী তার পথ অনুসরণ করে স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন। নারী জাগরণ ও টেকসই উন্নয়নে রোকসানা আক্তার রেহানার মতো উদ্যোক্তারা নিঃসন্দেহে একটি উজ্জ্বল উদাহরণ।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


