দুই নারী শহীদের উপাখ্যান

মারিয়া মেহজাবিন

দুই নারী শহীদের উপাখ্যান

২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে গৌরবময় ও স্বতঃস্ফূর্ত গণবিপ্লব। এটি রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে গ্রামীণ জনপদ পর্যন্ত দেশের সর্বস্তরের, সব ধর্মের মানুষকে এক কাতারে দাঁড় করিয়েছিল স্বৈরশাসক হাসিনার পতনের দাবিতে। আর সর্বস্তরের মানুষের জেগে ওঠার এই লড়াইয়ে নারীদের বলিষ্ঠ অংশগ্রহণ ছিল অনস্বীকার্য। তাদের অকুতোভয় অংশগ্রহণ আন্দোলনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। জুলাই বিপ্লবে নারীদের অবদান ছিল বহুমাত্রিক। শুরু থেকেই তারা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছেন, নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং আন্দোলনে সহযোদ্ধা ভাইদের আড়াল করে রাখাসহ নানা কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে আন্দোলনকে বেগবান করতে সহায়তা করেছেন। স্বৈরাচারীর ‘দেখামাত্র গুলি’ নীতি এতটাই নির্মম ছিল যে, তা যেমন রাজপথের লড়াকু তরুণীদের স্তব্ধ করে দিতে চেয়েছিল, তেমনি ঘরের নিরাপদ বারান্দা কিংবা ছাদে অবস্থানরত নিষ্পাপ শিশু ও

মা-বোনদেরও প্রাণ কেড়ে নিয়েছে। ২৪-এর ডিসেম্বর মাসে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে আমরা ১০ জন নারী শহীদের পরিচয় জানতে পারি। তারা হলেন— মায়া ইসলাম (৬০), শাহিনুর বেগম (৫৫), নাছিমা আক্তার (২৪), মেহেরুন নেছা (২২), লিজা আক্তার (২১), সুমাইয়া আক্তার (২০), নাঈমা সুলতানা (১৯), নাফিসা হোসেন মারওয়া (১৭), রিতা আক্তার (১৭) ও রিয়া গোপ (৬)। তাদের মধ্য থেকে

বিজ্ঞাপন

আজ আমরা দুজন নারী শহীদের বীরত্বগাথা ও অবিস্মরণীয় অবদান তুলে ধরার চেষ্টা করছি।

নাঈমা সুলতানা
নাঈমা সুলতানা

নাঈমা সুলতানা

জুলাইয়ের প্রথম নারী শহীদ ১৬ বছর বয়সি নাঈমা সুলতানা। সে ছিল মাইলস্টোন স্কুলের বিজ্ঞান বিভাগের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী। নাঈমাদের পরিবার উত্তরার ৭ নম্বর সেক্টরের একটি বাসায় ভাড়া থাকত। বাবা ছিলেন একজন পল্লী চিকিৎসক। তিনি গ্রামের বাড়ি ও ঢাকার মধ্যে যাতায়াত করতেন। শুধু নাঈমার পড়াশোনার জন্যই মা সন্তানদের নিয়ে ঢাকায় থাকতেন।

নাঈমার অবসর কাটত আঁকাআঁকি করে। কোটা সংস্কার আন্দোলনের শুরুতে সে বাসায় বসে খাতায় নানা স্লোগানসংবলিত প্রতিবাদী ছবি এঁকে সময় কাটিয়েছে। মারা যাওয়ার আগের দিন, ১৮ জুলাই ২০২৪, উত্তরায় পুলিশের গুলিতে প্রায় ৩০ জন ছাত্র-জনতা নিহত হন। ওইদিন রাতে নাঈমা আন্দোলনের পোস্টার আঁকছিল এবং মায়ের সঙ্গে গল্প করছিল। একপর্যায়ে সে মাকে বলল, ‘আম্মু, ধরো আমি যদি আন্দোলনে গিয়ে মারা যাই, তুমি মানুষকে কী বলবা?’ মাকে জবাব দেওয়ার সুযোগ না দিয়ে আবার নিজেই বলে উঠল, ‘বলবা যে শহীদ হয়েছে। আমার মেয়ে শহীদ হয়েছে।’

১৯ জুলাই ২০২৪, শুক্রবার। তাদের বাসা থেকে একটু দূরে উত্তরা আধুনিক মেডিকেলের সামনে ছাত্র-জনতার সঙ্গে পুলিশ এবং তাদের সহযোগী ছাত্রলীগ-যুবলীগের নেতাকর্মীদের সংঘর্ষ বাধে। একপর্যায়ে অস্ত্রধারী ছাত্রলীগ নেতাকর্মী ও কিছু পুলিশ আশপাশের গলিতে ঢুকে এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়তে থাকে। আনুমানিক বিকাল ৪টার দিকে নাঈমা তার রুমে বসে ‘বয়কট ছাত্রলীগ’, ‘কোটা সংস্কার চাই’সহ নানা স্লোগানসংবলিত প্রতিবাদী পোস্টার রঙিন কালিতে আঁকছিল। একটু পর বাসার সামনে চিৎকার-চেঁচামেচির শব্দ শুনে সে দৌড়ে বারান্দায় আসে। তার বাসার নিচে তখন আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে পুলিশ গুলি ছুড়ছিল। সে হাতে থাকা মোবাইলে ভিডিও অন করে নিচের দিকে তাক করতেই তাকে লক্ষ্য করে পুলিশ গুলি ছোড়ে। গুলির আঘাতে মুহূর্তেই মেঝেতে লুটিয়ে পড়ে নাঈমা।

নাঈমার মাথার এক পাশ দিয়ে গুলি ঢুকে অন্য পাশ দিয়ে বেরিয়ে যায়। মেঝেতে তার মস্তিষ্কের অংশ ছিটকে পড়ে। গুলি লাগার সঙ্গে সঙ্গে ‘মা’ বলে চিৎকার করে ওঠে নাঈমা। পেছনের রুমে থাকা মা ও বড় বোন তার চিৎকার শুনে দৌড়ে বারান্দায় এসে দেখেন, নাঈমা মেঝেতে লুটিয়ে পড়েছে। মাথা থেকে রক্ত ঝরছে। সারা বারান্দায় ছড়িয়ে গেছে তার রক্ত। মেয়ের এ অবস্থা দেখে মা জ্ঞান হারান। বোনের কান্নার আওয়াজে আশপাশের ফ্ল্যাটের বাসিন্দা ও নিচে থাকা ছাত্ররা এসে নাঈমাকে ধরে উত্তরা আধুনিক মেডিকেলে নিয়ে যান। কিন্তু তার আগেই পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নেয় নাঈমা।

সেদিন রাতেই নাঈমার মরদেহ নেওয়া হয় চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার আমুয়াকান্দা গ্রামে, তাদের গ্রামের বাড়িতে। পথে পুলিশের নানা হয়রানির শিকার হতে হয় পরিবারকে। মরদেহ কোথা থেকে এসেছে, কীভাবে মৃত্যু হয়েছে, কোথায় নেওয়া হচ্ছে—এমন নানা প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয় তাদের। পরদিন সকাল সাড়ে ৯টায় জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয় নাঈমাকে। মাইলস্টোনের মেধাবী ছাত্রী নাঈমা পড়ালেখায় খুব ভালো ছিল। প্রতিদিন তার ডায়েরি লেখার অভ্যাস ছিল। বড় বোন প্রতিবছর জন্মদিনে কীভাবে তাকে সারপ্রাইজ দেন এ কথাও পাওয়া যায় নাঈমার ডায়েরিতে। বেঁচে থাকলে সে এ বছর ২৫-এ জুলাই ১৭ বছরে পা রাখত। জুলাইয়েই মায়ের কোলজুড়ে পৃথিবীতে এসেছিল নাঈমা, সেই জুলাইয়েই তাকে হারালো। প্রতিবছর জুলাই এলে তার পরিবারের দুঃসহ যন্ত্রণা আরো বেড়ে যায়।

রিতা আক্তার
রিতা আক্তার

রিতা আক্তার

রিতা আক্তার, বয়স মাত্র ১৭ বছর। স্বপ্ন ছিল ডাক্তার হয়ে দরিদ্র বাবা-মায়ের অভাব-অনটন ঘোচাবে। কিন্তু স্বপ্নপূরণের আগেই তাকে পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে হলো। জয়পুরহাটের কালাই উপজেলার পুনট ইউনিয়নের তালখুর গ্রামে রিতাদের বাড়ি। বাবা আশরাফ আলী একজন রিকশাচালক, মা রেহেনা বিবি গৃহিণী। তিন ভাই-বোনের মধ্যে রিতা ছিল মেজো। বড় ভাই খুব বেশি পড়াশোনা করেননি; তিনি দিনমজুরের কাজ করেন। ছোট ভাই মাত্র প্রাথমিকের গণ্ডি পেরিয়েছে। পড়াশোনায় ভালো হওয়ায় রিতাই ছিল পরিবারের একমাত্র আশা-ভরসা।

অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় বাবা-মা অদম্য রিতাকে বাল্যবিয়ে দিতে চাইলে সে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয়, সে বিয়ে করতে চায় না। বড় হয়ে ডাক্তার হতে চায়। বাবা-মাকে উপার্জন করে খাওয়াতে চায়। পরিবারের হাল ধরতে চায়। তাই মেয়েকে ভালোভাবে পড়াশোনার সুযোগ করে দিতে বাবা-মা সাধ্যমতো সব চেষ্টা করেছেন। মা রেহেনা বাসাবাড়িতে কাজ করে যে আয় করতেন, সেই টাকা দিয়েই মেয়ের পড়ালেখার খরচ চালাতেন।

গ্রামের মাদরাসা থেকে দাখিল পাস করার পর উচ্চমাধ্যমিকে শহুরে প্রতিষ্ঠানে পড়ালেখা করানোর জন্য বাবা সপরিবারে ঢাকায় আসেন। মিরপুর দুয়ারীপাড়া সরকারি কলেজে বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি করান মেয়েকে। মেয়ের পড়ালেখার সুবিধার জন্য কলেজের পাশেই মিরপুর-২ এইচ ব্লকে কম ভাড়ায় একটা ছোট্ট বাসা ভাড়া নেন। বাবা মিরপুর এলাকায় রিকশা চালাতেন। আর মা বাসাবাড়িতে কাজ করতেন।

৫ আগস্ট সকালে বাবা-মা তাদের কাজে বের হন। এ সুযোগে রিতা বেলা ১১টার দিকে বাসা থেকে বের হয়ে ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচিতে যোগ দিতে যায়। দুপুরে মা ঘরে ফিরে দেখেন, মেয়ে নেই। তিনি খুঁজতে বের হন। আশপাশে অনেক খোঁজাখুঁজির পরও মেয়েকে কোথাও পাননি। সন্ধ্যা পর্যন্ত মেয়ের কোনো খোঁজ না পেয়ে বিভিন্ন মেডিকেল কলেজের মর্গে খোঁজাখুঁজি শুরু করেন।

এক মেডিকেল থেকে আরেক মেডিকেলে দৌড়াদৌড়ি করে রাত ১০টার পর সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে মেয়ের মরদেহ খুঁজে পান তারা। গায়ের জামাকাপড় দেখে মেয়েকে শনাক্ত করেন। আহত রিতাকে মেডিকেলে নিয়ে আসা ব্যক্তিদের কাছ থেকে পরিবার জানতে পারে, তার মাথার এক পাশ দিয়ে গুলি ঢুকে অন্য পাশ দিয়ে বের হয়ে গিয়েছিল। তাকে সোহরাওয়ার্দী মেডিকেলে নিয়ে আসার পর তাৎক্ষণিক চিকিৎসা মেলেনি; চিকিৎসা দিতে বিলম্ব হয়। চিকিৎসকরা যখন রিতার চিকিৎসা শুরু করেন, ততক্ষণে সে আর বেঁচে ছিল না। পরদিন মেয়ের মরদেহ নিয়ে বাবা-মা গ্রামের বাড়িতে চলে যান। গ্রামের কবরস্থানে রিতাকে দাফন করা হয়।

ছোটবেলা থেকেই পড়ালেখার পাশাপাশি সহশিক্ষা কার্যক্রমেও সক্রিয় ছিল রিতা। ইসলামি গান, হামদ ও নাতে রাসুলবিষয়ক বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে কয়েকবার প্রথম হয়েছে সে। শিক্ষকদেরও স্বপ্ন ছিল, রিতা একদিন অনেক বড় হবে। মেধাবী এই ছাত্রী আদর্শ সমাজ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে। কিন্তু অকালেই ঝরে গেল আরেকটি ফুল।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন