শিক্ষার্থীদের ভাবনায় জুলাই অভ্যুত্থান

উম্মে জোবায়দা

শিক্ষার্থীদের ভাবনায় জুলাই অভ্যুত্থান

জুলাই অভ্যুত্থান এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়। ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থান ছিল মূলত অন্যায়, বৈষম্য ও স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে এক দৃঢ় প্রতিবাদ। রাজপথে উচ্চারিত প্রতিটি স্লোগান ছিল অধিকার, ন্যায়বিচার ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পক্ষে একেকটি অঙ্গীকার। জুলাই অভ্যুত্থানের তাৎপর্য নিয়ে শিক্ষার্থীদের উপলব্ধি ও প্রত্যাশা তুলে ধরেছেন ইডেন মহিলা কলেজের শিক্ষার্থী উম্মে জোবায়দা

বিজ্ঞাপন

রুমিয়া হক শর্মী; ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, ইডেন মহিলা কলেজ
রুমিয়া হক শর্মী; ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, ইডেন মহিলা কলেজ

জুলাই গণঅভ্যুত্থান : অধিকার আদায়ে দৃঢ় প্রত্যয়

জুলাই গণঅভ্যুত্থান এমন এক ইতিহাস, যেখানে সাহস ও প্রতিবাদের ভাষা মিলে রচনা করেছে অধিকার আদায়ের এক অনন্য রক্তাক্ত অধ্যায়। শহরের দেয়ালে ঝুলে থাকা ছেঁড়া পোস্টার, কালো কালির ছাপানো শিরোনামে বুক কেঁপে ওঠা ভোরের কাগজ, রেডিওর ভাঙা শব্দে উচ্চারিত সেইসব নামে তাদের বাড়িতে আর কোনোদিন জ্বলে উঠবে না সন্ধ্যার প্রদীপ। তবুও প্রতিটি শহীদের নাম একেকটি অসমাপ্ত গল্প, একেকটি পরিবারের নিভে যাওয়া স্বপ্ন! আবার একই সঙ্গে একটি জাতির জেগে ওঠার ইতিহাস। জুলাই গণঅভ্যুত্থান/আন্দোলনে বৈষম্য, অন্যায় ও দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে মানুষের সম্মিলিত কণ্ঠ রাজপথে উচ্চারিত হয়েছিল।

জুলাই আমাদের শেখায় অধিকার কখনো করুণা বা দয়ায় অর্জিত হয় না। অধিকার অর্জিত হয় সাহস, ঐক্য, আত্মত্যাগ এবং অটল প্রত্যয়ের মাধ্যমে।

জুলাইয়ের চেতনা আমাদের এমন একটি বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখায়, যেখানে আইনের শাসন হবে অটুট, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকবে সুরক্ষিত, জবাবদিহিতা হবে নিশ্চিত এবং প্রতিটি নাগরিক সমান অধিকার ও মর্যাদা নিয়ে মাথা উঁচু করে বাঁচতে পারবে।

আফিয়া সুলতানা আঁখি; অর্থনীতি বিভাগ, ইডেন মহিলা কলেজ, ঢাকা
আফিয়া সুলতানা আঁখি; অর্থনীতি বিভাগ, ইডেন মহিলা কলেজ, ঢাকা

জুলাইয়ের চেতনায় তারুণ্যের প্রত্যাশা

আফিয়া সুলতানা আঁখি, অর্থনীতি বিভাগ, ইডেন মহিলা কলেজ, ঢাকা

বাংলাদেশের ইতিহাসে ‘জুলাই’ এক অনন্য অধ্যায়। জুলাইয়ের চেতনা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, স্বাধীনতা কেবল একটি রাজনৈতিক অর্জনের নাম নয়। এই চেতনা তরুণদের শুধু প্রতিবাদ করতে শেখায় না, বরং দেশ গঠনের জন্য সৃজনশীল ভূমিকা রাখারও আহ্বান জানায়। জুলাইয়ের চেতনা তরুণদের নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখায় এবং প্রত্যাশা অনেক বাড়িয়ে দেয়। তারা এমন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখে যেখানে কোনো তরুণ যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও বেকার থাকবে না—এমন একটি বাংলাদেশ যেখানে দুর্নীতির পরিবর্তে সততাই হবে সবচেয়ে বড় পরিচয়। যেখানে মতের ভিন্নতা থাকবে, কিন্তু সহিংসতা থাকবে না; থাকবে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সংলাপের সংস্কৃতি। যেখানে নারী ও পুরুষ সমান মর্যাদা নিয়ে রাষ্ট্র গঠনে অংশ নেবে। যেখানে শিক্ষা হবে সৃজনশীল ও গবেষণানির্ভর। যেখানে আইনের শাসন ও সবার জন্য সমান বিচার নিশ্চিত করা হবে। এমন একটি বাংলাদেশ, যেখানে তরুণরা দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার স্বপ্ন নয়; বরং দেশ গড়ার স্বপ্ন দেখবে। জুলাইয়ের এই প্রত্যাশাগুলোকে বাস্তবায়ন করার দায়িত্ব আমার, আপনার এবং সবার।

নাজিয়া তাবাসসুম; সমাজকর্ম বিভাগ, ইডেন মহিলা কলেজ
নাজিয়া তাবাসসুম; সমাজকর্ম বিভাগ, ইডেন মহিলা কলেজ

অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের নাম জুলাই

জুলাই শুধু একটি মাসের নাম নয়; এটি সাহস, আত্মত্যাগ এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর প্রতীক। বৈষম্য, নিপীড়ন ও ন্যায্য অধিকারহীনতার বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতার ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন বাংলাদেশের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। ন্যায়বিচার, সমতা ও মানবিক মর্যাদার দাবিতে শিক্ষার্থী, তরুণ, শ্রমজীবী ও সাধারণ মানুষ এক কাতারে দাঁড়িয়ে অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছিল। এই আন্দোলনে অনেকেই জীবন উৎসর্গ করেছেন, অসংখ্য মানুষ আহত হয়েছেন; তবুও ন্যায়ের পক্ষে মানুষের অঙ্গীকার থেমে থাকেনি। বরং আত্মত্যাগের প্রতিটি ঘটনা আন্দোলনের শক্তিকে আরো দৃঢ় করেছে।

জুলাই আমাদের শেখায়, অধিকার কখনো অনুগ্রহে অর্জিত হয় না; তা অর্জিত হয় সাহস, ঐক্য ও দৃঢ় প্রত্যয়ের মাধ্যমে। শহীদদের আত্মত্যাগ এবং মানুষের অদম্য সংগ্রাম ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গঠনের প্রেরণা জোগাবে। তাই জুলাই শুধু ক্যালেন্ডারের একটি মাস নয়; এটি অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থান, গণমানুষের জাগরণ এবং আশার এক উজ্জ্বল প্রতীক। ইতিহাসের পাতায় জুলাই চিরকাল ন্যায়, অধিকার ও গণতান্ত্রিক চেতনার অনন্য স্মারক হয়ে থাকবে।

আফরিদা ইসলাম; ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, ইডেন মহিলা কলেজ
আফরিদা ইসলাম; ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, ইডেন মহিলা কলেজ

জুলাই বিপ্লবের অগ্রভাগে শিক্ষার্থীরা

জুলাই বিপ্লবের সূচনা কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে হয়। পরে ফ্যাসিস্ট সরকারের বিভিন্ন নৃশংস পদক্ষেপের দরুন তা সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণে একটি গণআন্দোলনে রূপ নেয়। সবার লক্ষ্য ছিল একটাই— ফ্যাসিস্ট সরকারের হাত থেকে মুক্ত হওয়া। আন্দোলনের দিনগুলোয় দেশের বিভিন্ন প্রান্তে প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। শিশু, কিশোর, তরুণ—অনেকেই সহিংসতার শিকার হন। অনেক পরিবার তাদের প্রিয়জনকে হারায়। আন্দোলনকারীদের দমন করতে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়। এ সময় নির্বিচারে গুলি ও হামলা চালানো এবং যোগাযোগব্যবস্থা সীমিত করে দেওয়ার মতো নানা পদক্ষেপ নেওয়া হয়। রংপুরে আবু সাঈদ, ঢাকায় মীর মুগ্ধ, চট্টগ্রামে ছাত্রলীগের হামলায় আকরামসহ হারিয়ে যায় দেশের শত শত মেধাবী সন্তান। এসব ঘটনা তরুণসমাজকে আরো বেশি ঐক্যবদ্ধ করে তোলে। দেশের নানা প্রান্ত থেকে শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ আন্দোলনে যুক্ত হন। তরুণদের সক্রিয় অংশগ্রহণ আন্দোলনকে নতুন গতি দেয়। ইতিহাস সাক্ষী—জনগণের আকাঙ্ক্ষা ও পরিবর্তনের দাবিকে দীর্ঘদিন উপেক্ষা করা যায় না। জুলাই বিপ্লব সেই বাস্তবতারই একটি স্মারক।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন