ত্রয়োদশ সংসদের শুরু থেকেই জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়ন তথা সংস্কার ইস্যুতে সম্পূর্ণ বিপরীত অবস্থানে সরকারি ও বিরোধী দল। গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিজয়ী সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণের দিন থেকেই এ নিয়ে বিরোধ ও বিতর্ক প্রকাশ্য রূপ নেয়। পরে প্রথম অধিবেশনের শুরু থেকে শেষ দিন পর্যন্ত সংসদে সরকারি ও বিরোধীদলীয় সদস্যরা দফায় দফায় আলোচনা-বক্তব্য রাখলেও কোনো সমাধান হয়নি। বরং শেষ দিনে সরকারি দলের সদস্যদের বক্তব্যে জুলাই সনদের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন নিয়ে আরো অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে বিরোধী অঙ্গনে। এ কারণে জামায়াতে ইসলামীসহ ১১ দলীয় ঐক্য ঘোষিত আন্দোলন কর্মসূচি জোরদারের মাধ্যমে তাদের দাবি আদায়ের টার্গেটে অনড় অবস্থান অব্যাহত রয়েছে।
এদিকে, গণভোটের রায় ও জুলাই সনদ অনুযায়ী সরকার সংবিধান সংস্কারের উদ্যোগ নিলেও তাতে পিআর (প্রপোরশনাল রিপ্রেজেন্টেশন) নিয়ে প্রধান জটিলতা দেখা দিতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। কারণ, জুলাই সনদের ১৮ নম্বর ধারায় উচ্চকক্ষ গঠনের বিষয়ে বলা হয়েছে, নিম্নকক্ষের নির্বাচনে প্রাপ্ত ভোটের আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (পিআর) পদ্ধতিতে উচ্চকক্ষের ১০০ সদস্য নির্বাচিত হবেন। জামায়াত ও বিএনপিসহ ২৪টি দল এর সঙ্গে একমত পোষণ করে স্বাক্ষর করে। তবে উচ্চকক্ষের গঠন প্রক্রিয়া নিয়ে বিএনপিসহ সাতটি দলের ভিন্নমত আছে। তাদের মতে, নিম্নকক্ষের আসনের সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতিতে উচ্চকক্ষ গঠিত হবে। তাই পিআর নিয়ে সরকারি দলের ভিন্নমত থাকায় সংস্কার বাস্তবায়নে বড় জটিলতার শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
সূত্রমতে, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিজয়ীরা শপথ নেন ১৭ ফেব্রুয়ারি। একই সঙ্গে জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবেও শপথের আয়োজন করা হয়। তবে জামায়াত নেতৃত্বাধীন বিরোধী দলের ৭৭ সদস্য দুটি শপথ নিলেও সরকারি দল বিএনপির সদস্যরা সংবিধানবিরোধী আখ্যা দিয়ে সংস্কার পরিষদ সদস্যের শপথ নেননি। এ নিয়ে ক্ষোভ ও প্রতিবাদের অংশ হিসেবে সেদিন মন্ত্রিসভার শপথ অনুষ্ঠানে যোগ দেননি বিরোধী দলের সদস্যরা।
এদিকে, গত ১২ মার্চ ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরুর দ্বিতীয় দিনে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলামসহ অনেকে বিষয়টি তুলে ধরলে এ নিয়ে সরকারি দলের সদস্যরা বিতর্কে জড়ান। পরে এ ইস্যুতে বিরোধীদলীয় নেতার আনা মুলতবি প্রস্তাবের ওপর আলোচনা হলেও তার কোনো ফল আসেনি। এ নিয়ে বিরোধী দল সংসদ থেকে ওয়াকআউট করে।
অন্যদিকে, সরকারি দলের পক্ষ থেকে গণভোটের রায় ও জুলাই সনদ বাস্তবায়নের বিষয়ে সংসদে ও বাইরে একেক সময় একের ধরনের বক্তব্য দিতে শোনা যায়। তারা বলেছেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ সংবিধানবিরোধী। সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ গ্রহণের বিষয়টিও সংবিধানে নেই। তারা জুলাই সনদ অক্ষরে অক্ষরে মানবেন বলে ঘোষণা দিলেও তা কেবল সংবিধান সংশোধন করে বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করার পর বাস্তবায়নের আশ্বাস দেন। সরকারের এমন মনোভাবের সঙ্গে সম্পূর্ণ দ্বিমত পোষণ করে গণভোটের রায় অনুযায়ী জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দাবিতে সংসদে বক্তব্য রাখার পাশাপাশি রাজপথেও ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন আন্দোলন কর্মসূচি চালাচ্ছে জামায়াতসহ ১১ দলীয় ঐক্য।
সূত্রমতে, সংসদের প্রথম অধিবেশনের শেষ দিকে সরকারি দলের পক্ষ থেকে সংবিধান সংশোধনে একটি বিশেষ কমিটি গঠনের প্রস্তাব করে তাতে বিরোধী দল থেকে সদস্য আহ্বান করা হয়। তবে তাতে সাড়া দেয়নি বিরোধী দল। বরং সরকারি দল এ উদ্যোগের মাধ্যমে ছলচাতুরি করছে বলে অভিযোগ করে জামায়াত।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও ১১ দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, গণভোটের রায় বাস্তবায়নই হচ্ছে সরকারের দায়িত্ব। সংবিধান সংশোধন হলো রুটিনওয়ার্ক। এটার জন্য আবার কমিটি গঠন, এ প্রক্রিয়ায় আমরা যাব কি না, সে বিষয়ে আমাদের অবস্থান আগেই পরিষ্কার করেছি। কারণ, আমরা সংস্কার চাই। সংস্কারের জন্যই তো মানুষ ভোট দিয়েছে। এখানে ছলচাতুরি করে অন্যদিকে ডাইভার্ট করার কোনো সুযোগ নেই।
তিনি বলেন, সরকার গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না করে শুরুতেই ন্যক্কারজনক কাজ করেছে। ৭০ শতাংশ মানুষের রায়কে উপেক্ষা ও অবজ্ঞা করেছে। সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ নিয়ে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করে ১৮০ দিনের মধ্যে তাদের সব সংস্কার প্রস্তাব, বিশেষ করে সাংবিধানিক সংস্কারের বিষয়গুলো বাস্তবায়ন করার কথা। সরকারি দল সে প্রতিশ্রুতি দিলেও জনগণের মত উপেক্ষা করে সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ নেয়নি। এখন তারা সংসদে ছলচাতুরি করে সংবিধান সংশোধনের প্রস্তাব আনার প্রক্রিয়া শুরু করেছে। আমরা এর নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি এবং দেশবাসীকে সজাগ করছি। এটার বিরুদ্ধে আরো জনমত তৈরি এবং আন্দোলন আরো বেগবান ও শক্তিশালী করা হবে।
বিএনপির নোট অব ডিসেন্টের কারণে সংস্কারে পিআর প্রশ্নে জটিলতা হবে কি না—জানতে চাইলে হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, গণভোটের রায় অনুযায়ী আমরা জুলাই সনদের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন চাই। পিআর না মানার কোনো প্রশ্ন নেই।
একই ধরনের মন্তব্য করে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, গণভোটে প্রায় ৭০ ভাগ মানুষের রায়ের মধ্য দিয়ে জুলাই সনদে নোট অব ডিসেন্টের কার্যকারিতা শেষ হয়ে গেছে। এখন জুলাই সনদ পুরোপুরি বাস্তবায়নের কোনো বিকল্প নেই। পিআর পদ্ধতিতেই উচ্চকক্ষ গঠন করতে হবে।
জানা গেছে, বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারে সাংবিধানিক সংস্কার প্রসঙ্গে প্রথমেই বলা হয়েছে, ‘সংবিধান সংস্কারের বিষয়ে গত বছরের ১৭ অক্টোবর জুলাই জাতীয় সনদ যে আঙ্গিকে ঐকমত্য ও স্বাক্ষরিত হয়েছে, সেগুলো সে মতে বাস্তবায়নে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।’
আর ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত গণভোটের ব্যালটের মাধ্যমে জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ এবং জুলাই জাতীয় সনদে লেখা সংবিধান সংস্কারসম্পর্কিত চারটি প্রস্তাবের প্রতি হ্যাঁ/না সম্মতি নেওয়া হয়েছে। প্রস্তাব চারটি হলো—‘নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন এবং অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান জুলাই সনদে বর্ণিত প্রক্রিয়ার আলোকে গঠন করা হবে। আগামী জাতীয় সংসদ হবে দুই কক্ষবিশিষ্ট ও জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে ১০০ সদস্যবিশিষ্ট একটি উচ্চকক্ষ গঠিত হবে এবং সংবিধান সংশোধন করতে হলে উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের অনুমোদন দরকার হবে। সংসদে নারী প্রতিনিধি বৃদ্ধি, বিরোধী দল হতে ডেপুটি স্পিকার ও সংসদীয় কমিটির সভাপতি নির্বাচন, মৌলিক অধিকার, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, স্থানীয় সরকার, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতাসহ তফসিলে বর্ণিত যে ৩০টি বিষয়ে জুলাই জাতীয় সনদে ঐকমত্য হয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়নে আগামী সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী রাজনৈতিক দলগুলো বাধ্য থাকবে। জুলাই জাতীয় সনদে বর্ণিত অপরাপর সংস্কার রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি অনুসারে বাস্তবায়ন করা হবে।’ ওই নির্বাচনে প্রায় ৭০ ভাগ মানুষ ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে ভোট দেন।
এদিকে, গত ৩০ এপ্রিল সংসদের প্রথম অধিবেশনের সমাপনী দিনে জুলাই সনদ ইস্যুতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের বক্তব্য নিয়ে নতুন বিতর্ক সৃষ্টি হয়। সংস্কারের বাহানায় নির্বাচন না হয়, সে আশঙ্কায় সবকিছুতে আপস করে জুলাই সনদে সই করেছেন বলে দাবি করেন তিনি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, নির্বাচনের স্বার্থে আমরা অনেক কথা বলিনি। আমাদের একটি তাগাদা ছিল যে, এরা সংস্কারের বাহানায় যদি নির্বাচনটা না হতে দেয়, সেজন্য আমরা সবকিছুতে আপস করে জুলাই জাতীয় সনদেও স্বাক্ষর করেছি। একত্রিত হয়েছি, সমঝোতা হয়েছে।
সংবিধান সংস্কার ও জুলাই জাতীয় সনদ নিয়ে ওঠা বিতর্কের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বিএনপি কখনোই জুলাই সনদ থেকে বিচ্যুত হয়নি; বরং কিছু দল নির্দিষ্ট কিছু বিষয়ে দ্বিমত পোষণ করলেও বিএনপি বরাবরই জনগণের সার্বভৌমত্বের পক্ষে ছিল।
তিনি সংবিধানের ধারা উল্লেখ করে বলেন, অর্ডিন্যান্স বা অধ্যাদেশের মাধ্যমে সংবিধানের মৌলিক কাঠামো পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। যেকোনো বড় সংস্কারের ক্ষেত্রে জনগণের সরাসরি রায়ের প্রয়োজন রয়েছে বলেই বিএনপি গণভোটের প্রস্তাব দিয়েছিল। জাতীয় সনদ নিয়ে কোনো ধরনের বিভ্রান্তি ছড়ানো থেকে বিরত থাকার জন্য তিনি বিরোধীদলীয় সদস্যদের প্রতি আহ্বান জানান।
জুলাই সনদ ইস্যুতে বিএনপির অবস্থানের সমালোচনা করে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেছেন, জুলাই সনদকে বিএনপি অন্তহীন প্রতারণার দলিলে পরিণত করেছে। এ সনদে নোট অব ডিসেন্ট দিয়ে সেটাকে কলুষিত করা হয়েছে, গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারগুলোর পাশেই নোট লেখা হয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, বলপ্রয়োগ করে ঐকমত্য কমিশনকে চাপ দিয়ে জুলাই সনদে নোট অব ডিসেন্ট লেখানো হয়েছে।
গণভোট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সবার সম্মতির ভিত্তিতেই সবাই মিলে গণভোটে অংশগ্রহণ করেছি। নির্বাচনের পর বিএনপি ভিন্ন অবস্থান নেয়। নির্বাচনের আগে পরিষ্কার করা প্রয়োজন ছিল, গণভোট আপনারা মানেন না। তিনি দাবি করেন, গণভোট অনুসারে অতিদ্রুত সাংবিধানিক সংস্কার পরিষদ গঠন করা উচিত।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

