বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর উদ্যোগ কার্যকর হতে পারে জুনে

এম এ নোমান

বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর উদ্যোগ কার্যকর হতে পারে জুনে

পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী ও বিতরণকারী সংস্থাগুলো ইতোমধ্যে তাদের প্রস্তাব বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনে (বিইআরসি) পাঠিয়েছে। প্রস্তাবে পাইকারি পর্যায়ে ইউনিট প্রতি এক দশমিক ২০ টাকা (১৭ শতাংশ) থেকে এক দশমিক ৫০ টাকা (২১ শতাংশ) দাম বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি গ্রাহক পর্যায়ে এক দশমিক ২৯ টাকা (১৪ দশমিক ২১ শতাংশ) থেকে এক দশমিক ৬১ টাকা (১৭ দশমিক ৭৬ শতাংশ) বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে। বিদ্যুৎ বিতরণকারী সংস্থা ও বিইআরসি সূত্র আমার দেশকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।

বিইআরসি সূত্র জানায়, বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি), পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ (পিজিসিবি), পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড, ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি পিএলসি (ডেসকো), ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ডিপিডিসি), ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ওজোপাডিকো) এবং নর্দার্ন ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানির (নেসকো) গ্রাহক পর্যায়ে মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব পর্যালোচনা শুরু করেছে বিইআরসি। সবগুলো সংস্থার প্রস্তাবের ওপর আগামী ২০ ও ২১ মে রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউটে গণশুনানি অনুষ্ঠিত হবে।

বিজ্ঞাপন

শুনানি শেষে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত পেলে জুনের শুরু থেকে বর্ধিত মূল্য কার্যকর করতে চায় বিদ্যুৎ খাতের বিতরণ কোম্পানিগুলো। সরকারও এ ব্যাপারে ইতিবাচক বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো দাবি করছে।

বিদ্যুতের নতুন দাম নির্ধারণের বিষয়ে বিদ্যুৎ বিভাগের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা আমার দেশকে বলেন, বর্তমানে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় ১২ টাকার বেশি। গড় বিক্রয়মূল্য সাত টাকার কিছু বেশি। এতে সরকারকে প্রতি ইউনিটে প্রায় পাঁচ টাকা লোকসান দিতে হচ্ছে।

তিনি বলেন, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতে ৩৮ হাজার ৬৩৭ কোটি টাকা ভর্তুকি দেওয়ার পরও লোকসান হয়েছে ১৭ হাজার ২১ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছর শেষে মোট ঘাটতির পরিমাণ ৫৬ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়াবে বলেও আশঙ্কা রয়েছে। দাম কিছুটা বাড়িয়ে বিদ্যুৎ খাতে ১০ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি কমানো সরকারের লক্ষ্য বলে জানান ওই কর্মকর্তা। তবে, বিদ্যুৎ বিভাগের প্রস্তাবে ১৬ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি কমানোর কথা বলা হয়েছে।

বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর উদ্যোগের সমালোচনা করেছেন এ খাতের বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, শেখ হাসিনার সাড়ে ১৫ বছরের স্বৈরতান্ত্রিক শাসনামলে তৈরি হওয়া অলিগার্ক ও লুটেরা শ্রেণির হাতে যে ভয়াবহ লুটপাট হয়েছে তার বিচার হওয়া জরুরি। ওই সময়ের লুটের দায় এখন সাধারণ মানুষকে শোধ করতে হচ্ছে।

ঘাটতি কমাতে চায় বিদ্যুৎ বিভাগ

দাম বাড়ানোর বিষয়ে বিইআরসিকে দেওয়া বিদ্যুৎ বিভাগের চিঠিতে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে বিদ্যুতের পাইকারি ও খুচরা মূল্যহার সমন্বয়ের বিষয়ে মন্ত্রিসভার বৈঠকে বিস্তারিত পর্যালোচনা হয়েছে। সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব প্রণয়নের উদ্দেশ্যে অর্থমন্ত্রী, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী, বাণিজ্যমন্ত্রী, অর্থ সচিব, বিদ্যুৎ সচিব এবং জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের সচিবের সমন্বয়ে কমিটি করা হয়। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অর্থ বিভাগে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় সভায় মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে বিদ্যুতের পাইকারি ও খুচরা মূল্যহার সমন্বয়ের লক্ষ্যে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড দুটি প্রস্তাব উপস্থাপন করে।

পিডিবির প্রস্তাবের বরাত দিয়ে বিদ্যুৎ বিভাগ বিইআরসিকে লেখা চিঠিতে আরো উল্লেখ করে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সম্ভাব্য বিদ্যুৎ উৎপাদন ও ক্রয় বাবদ মোট ১৪ লাখ ৩১ হাজার ৮৭ দশমিক এক মিলিয়ন টাকা রাজস্ব চাহিদার বিবেচনায় প্রতি ইউনিটে গড় বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যয় হবে ১২ দশমিক ৯১ টাকা। বিদ্যমান ট্যারিফে সম্ভাব্য রাজস্ব আদায় হবে সাত লাখ ৭৫ হাজার ৫৩৮ দশমিক চার মিলিয়ন টাকা। এতে পিডিবির সম্ভাব্য ঘাটতি হবে ছয় লাখ ৫৫ হাজার ৫৪৮ দশমিক ৭ মিলিয়ন টাকা। এ ঘাটতি পূরণে গড় বিক্রয়মূল্য ইউনিট প্রতি এক দশমিক ২০ টাকা (১৭ শতাংশ) বৃদ্ধি করলে ঘাটতি হ্রাস পাবে ১৩ হাজার ২৯৮ দশমিক ১৬ কোটি টাকা এবং ইউনিট প্রতি এক দশমিক ৫০ টাকা (২১ শতাংশ) বৃদ্ধি করলে ঘাটতি হ্রাস পাবে ১৬ হাজার ৬৬২ দশমিক ৭০ কোটি টাকা।

স্ল্যাব সমন্বয়ে পিডিবির প্রস্তাব

বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর পাশাপাশি গ্রাহক পর্যায়ে স্ল্যাব সমন্বয়েরও প্রস্তাব দিয়েছে পিডিবি। এতে আবাসিক গ্রাহক পর্যায়ে বর্তমানে বিদ্যমান ৭৬-২০০ ইউনিটের স্ল্যাবের পরিবর্তে শূন্য থেকে ২০০ ইউনিটের স্ল্যাব প্রবর্তনের কথা বলা হয়েছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে অতিরিক্ত প্রায় দুই হাজার ৬৫৭ দশমিক ১২ কোটি টাকা এবং আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে অতিরিক্ত প্রায় দুই হাজার ৮৪৫ দশমিক ৬৬ কোটি টাকা ভর্তুকি কমানো সম্ভব হবে। স্ল্যাব সমন্বয়ের ফলে দরিদ্র গ্রাহকদের সুরক্ষা প্রদান, বেতনভোগী মধ্যবিত্ত গ্রাহকদের বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে উদ্বুদ্ধ করবে এবং বিদ্যুৎ খাতে অপেক্ষাকৃত ধনী গ্রাহকদের অংশে ভর্তুকির পরিমাণ হ্রাস পাবে।

পিডিবির পর্যালোচনায় পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম এক দশমিক ৫০ টাকা বৃদ্ধি এবং সে অনুযায়ী খুচরা পর্যায়ে বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি ৭৬-২০০ ইউনিটের স্ল্যাবের পরিবর্তে শূন্য থেকে ২০০ ইউনিটের স্ল্যাব প্রবর্তন করার বিষয়ে সভায় একমত পোষণ করা হয়েছে বলেও বিদ্যুৎ বিভাগের চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

উৎপাদন ব্যয় ও বিক্রিতে বিশাল ফারাক

পিডিবির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা আমার দেশকে বলেন, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের গড় উৎপাদন খরচ ছিল ১১ দশমিক ৮৩ টাকা, বিক্রি করা হয়েছে ছয় দশমিক ৯৯ টাকায় (পাইকারি)। ওই অর্থবছরে এক লাখ এক হাজার ১৮৭ মিলিয়ন ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছে। প্রতি ইউনিটে পাঁচ দশমিক ৯৯ টাকা লোকসান হয়েছে। বর্তমানে এ লোকসানের পরিমাণ আরো বেশি বলে জানান তিনি।

পিডিবির দেওয়া পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, দেশের ৫০টি গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন সক্ষমতা রয়েছে ১২ হাজার ১৯৪ মেগাওয়াট, যা মোট উৎপাদন ক্ষমতার ৪৩ শতাংশ। ফার্নেস অয়েলভিত্তিক ৫৪ বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন ক্ষমতা ১৯ শতাংশ (৫৬৩৪ মেগাওয়াট), ডিজেলচালিত পাঁচটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্ষমতা তিন শতাংশ, কয়লাচালিত আট বিদ্যুৎকেন্দ্রের ২২ শতাংশ (৬১৯৩ মেগাওয়াট), একটি জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎপাদন ক্ষমতা এক শতাংশ (২৩০ মেগাওয়াট), সৌর এবং বায়ু বিদ্যুতের ১৭টি কেন্দ্রের ক্ষমতা তিন শতাংশ (৮২৯ মেগাওয়াট) এবং আমদানি করা হচ্ছে ৯ শতাংশ (২৬৩৬ মেগাওয়াট)।

সূত্র জানায়, গ্যাস দিয়ে উৎপাদনে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের খরচ পড়েছে সাত দশমিক শূন্য ৯ টাকা, কয়লায় ১৩ দশমিক ২০ টাকা, ফার্নেস অয়েলে ২৭ দশমিক ৩৯ টাকা, আদানির বিদ্যুৎ আমদানিতে ১৪ দশমিক ৮৬ টাকা, ভারত সরকারের কাছ থেকে কেনা বিদ্যুতের দাম পড়েছে ৮ দশমিক ৭১ টাকা এবং সৌরবিদ্যুতে খরচ পড়েছে ১৫ দশমিক ৪৬ টাকা।

পিডিবির কর্মকর্তারা জানান, ২০২৪ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি গ্রাহক ও পাইকারি পর্যায়ে নির্বাহী আদেশে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়। ওই আদেশে পাইকারি বিদ্যুতের গড় দর ছয় দশমিক ৭০ টাকা থেকে পাঁচ শতাংশ বাড়িয়ে সাত দশমিক শূন্য চার টাকা করা হয়। অন্যদিকে গ্রাহক পর্যায়ে গড়ে আট দশমিক ৫০ শতাংশ হারে মূল্যবৃদ্ধি করা হয়।

দাম বাড়ানোর প্রক্রিয়ার বিষয়ে বিশিষ্ট জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম আমার দেশকে বলেন, বিদ্যুৎ খাতের বিশাল ঘাটতির জন্য লুটপাট ও অপচয় দায়ী। এ ঘাটতি ধরে দাম সমন্বয়ের সুযোগ নেই। আগে ঘাটতির বৈধতা নিরূপণ করে অপ্রয়োজনীয় খরচ বাদ দিতে হবে। এরপর ঘাটতি থাকলে তা নিয়ে গণশুনানি হতে পারে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন