রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আতাউল্যাহর বিরুদ্ধে ছয়টি গবেষণা প্রবন্ধে চৌর্যবৃত্তি বা প্লেজিয়ারিজমের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, নিজের পিএইচডি থিসিস থেকে হুবহু অংশ কপি করে তিনি এসব প্রবন্ধ প্রকাশ করেছেন এবং সেগুলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগে অধ্যাপক পদে নিয়োগের আবেদনের সঙ্গে জমা দিয়েছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, ইরানি কবি নিযামী গাঞ্জুবীকে কেন্দ্র করে রচিত এসব প্রবন্ধে একই ভাষা, বাক্য গঠন ও বিশ্লেষণ কাঠামোর পুনরাবৃত্তি রয়েছে, যা গবেষণা নীতিমালা অনুযায়ী সরাসরি চৌর্যবৃত্তির আওতায় পড়ে।
গবেষণা প্রবন্ধ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ‘নিযামী গাঞ্জুবীর কাব্য-প্রতিভা ও প্রেম দর্শন’ শীর্ষক তার পিএইচডি থিসিস থেকে উদ্ধৃতি বা যথাযথ রেফারেন্স ছাড়াই বড় বড় অংশ নেওয়া হয়েছে। ভূমিকা, কবির পরিচিতি, জীবন পরিক্রমা এবং মূল আলোচনার দীর্ঘ অনুচ্ছেদ থিসিস থেকে প্রায় অবিকল ব্যবহার করা হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে দাঁড়ি-কমাসহ পুরো অনুচ্ছেদ হুবহু মিলেছে।
অভিযুক্ত ছয়টি প্রবন্ধ হলো—‘নিযামী গাঞ্জুবীর কাব্য-প্রতিভা : একটি পর্যালোচনা’, ‘নিযামী গাঞ্জুবীর কাব্যে আল-কুরআনের প্রভাব’, ‘নিযামী গাঞ্জুবীর কাব্যে প্রজ্ঞা’, ‘নিযামী গাঞ্জুবী কাব্যে বিষয় বৈচিত্র্য’, ‘নিযামী গাঞ্জুবীর কাব্যে নৈতিকতা’ এবং ‘নিযামী গাঞ্জুবীর দার্শনিক চিন্তাধারা’।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রতিটি প্রবন্ধে কোনো ধরনের সূত্রের উদ্ধৃতি ছাড়াই থিসিসের নির্দিষ্ট পৃষ্ঠা থেকে ধারাবাহিকভাবে তুলে দেওয়া হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে, ‘নিযামী গাঞ্জুবীর কাব্য-প্রতিভা : একটি পর্যালোচনা’ প্রবন্ধে ভূমিকা ও জীবন পরিক্রমা অংশে থিসিসের ১, ৫৩, ৫৪, ৫৫, ৫৭ ও ৫৮ নম্বর পৃষ্ঠার অংশ ব্যবহার করা হয়েছে। একই ভাবে মূল আলোচনায় ১০১ থেকে ১১৭ নম্বর পৃষ্ঠার দীর্ঘ অংশ হুবহু কপি করা হয়েছে।
এছাড়া ‘নিযামী গাঞ্জুবীর কাব্যে আল-কুরআনের প্রভাব’ প্রবন্ধের ভূমিকা অংশে থিসিসের ৫৩, ৫৭ ও ৫৮ নম্বর পৃষ্ঠা ব্যবহার করা হয়েছে এবং মূল অংশে ১৪৭ থেকে ১৬১ নম্বর পৃষ্ঠা পর্যন্ত অংশ হুবহু কপি করা হয়েছে। ‘নিযামী গাঞ্জুবীর কাব্যে প্রজ্ঞা’ প্রবন্ধের ভূমিকা অংশে ৫৩, ৫৪ ও ৫৭ নম্বর পৃষ্ঠা থেকে নেওয়া হয়েছে এবং মূল অংশে ১৪০ থেকে ১৪৭ নম্বর পৃষ্ঠা পর্যন্ত সরাসরি কপি করা হয়েছে।
‘নিযামী গাঞ্জুবী কাব্যে বিষয় বৈচিত্র্য’ প্রবন্ধের ভূমিকা অংশে ১৬৪, ৫৪, ৫৭ ও ৭৪ নম্বর পৃষ্ঠা থেকে নেওয়া হয়েছে এবং মূল অংশে ১৬৪ থেকে ১৭৩ নম্বর পৃষ্ঠা পর্যন্ত হুবহু ব্যবহার করা হয়েছে। ‘নিযামী গাঞ্জুবীর কাব্যে নৈতিকতা’ প্রবন্ধের ভূমিকা অংশে ১৩৪ ও ৫৮ নম্বর পৃষ্ঠা থেকে এবং মূল অংশে ১৩৪ থেকে ১৪০ নম্বর পৃষ্ঠা পর্যন্ত কপি করা হয়েছে। এছাড়া ‘নিযামী গাঞ্জুবীর দার্শনিক চিন্তাধারা’ প্রবন্ধের ভূমিকা অংশে ৫৭ নম্বর পৃষ্ঠা থেকে নেওয়া হয়েছে এবং মূল অংশে ১২২ থেকে ১৩৫ নম্বর পৃষ্ঠা পর্যন্ত অংশ হুবহু ব্যবহার করা হয়েছে।
গবেষণা নীতিমালা কী বলে
আন্তর্জাতিক গবেষণা নীতিমালা অনুযায়ী থিসিস থেকে প্রবন্ধ তৈরির ক্ষেত্রে হুবহু অংশ কপি করা গ্রহণযোগ্য নয়। গবেষককে নতুন ভাষায় (প্যারাফ্রেজিং) বিশ্লেষণ উপস্থাপন করতে হয় এবং মূল উৎস হিসেবে থিসিসকে যথাযথভাবে উদ্ধৃত করতে হয়। নিজের গবেষণা হলেও সেটিকে রেফারেন্স ছাড়া পুনঃপ্রকাশ করলে তা ‘সেলফ-প্লেজিয়ারিজম’ বা আত্মচৌর্য হিসেবে বিবেচিত হয়। অধ্যাপক আতাউল্যাহর ক্ষেত্রে এসব মৌলিক নীতিমালাও অনুসরণ করা হয়নি। বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, এটি শুধু আত্মচৌর্য নয়; বরং গবেষণা জালিয়াতির শামিল।
ফারসি ভাষা ও সাহিত্যের জ্যেষ্ঠ এক শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, তার প্রকাশিত প্রবন্ধগুলোর সঙ্গে পিএইচডি থিসিস মিলিয়ে দেখা গেছে, পাতার পর পাতা হুবহু কপি করা হয়েছে। এটি নিছক অনিয়ম নয়; বরং স্পষ্ট গবেষণা জালিয়াতি।
শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. আনোয়ার হোসেন বলেন, গবেষণাপত্রের মূল উদ্দেশ্য হলো নতুন বিশ্লেষণ ও মৌলিক অবদান উপস্থাপন করা। থিসিসের অংশ হুবহু কপি করে নতুন প্রবন্ধ হিসেবে প্রকাশ করা আন্তর্জাতিক গবেষণা নীতিমালার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। এতে পুরো একাডেমিক ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে অধ্যাপক আতাউল্যাহ বলেন, তার থিসিস সম্পূর্ণ নিজস্ব গবেষণা এবং সেখান থেকে প্রবন্ধ প্রকাশ করা একাডেমিক অঙ্গনে প্রচলিত প্রক্রিয়া। হুবহু নকলের অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, একটি থিসিস থেকে একাধিক আর্টিকেল প্রকাশ হয়। ওখান থেকে তো কিছু জিনিস আমার আছেই।
এদিকে ঢাবির কলা অনুষদের ডিন ও ফারসি বিভাগের অধ্যাপক ড. আবুল কালাম সরকার বলেন, কোনো আবেদনকারীর বিরুদ্ধে প্লেজিয়ারিজমের অভিযোগ উঠলে তা গুরুত্বসহকারে খতিয়ে দেখা হয়। অভিযোগ প্রমাণ হলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ঢাবির উপউপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. আব্দুস সালাম বলেন, আপনার মাধ্যমে বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
গত বছরের ডিসেম্বরে একটি শূন্যপদে অধ্যাপক নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

