হঠাৎ বৃষ্টি ও ভারত থেকে আসা পানিতে হাওরাঞ্চলে বোরো ধান ঘরে তুলেও স্বস্তিতে নেই কৃষক। ধান কাটার পর সেগুলো শুকাতে না পারায় গুদামেও রাখার উপযোগী নয়, তাই ভেজা ধান নিয়ে বেকায়দায় পড়েছেন কৃষক। এতে তাদের অস্বস্তি বেড়েছে।
একদিকে ভেজা ধান শুকানোর জায়গা নেই, অন্যদিকে ধান শুকানোর (ড্রাই) মেশিনের সংকটও দেখা দিয়েছে। এ দুই সংকটে চরম বিপাকে হাওরাঞ্চলের বোরো চাষি। ফলে সেসব ধান এখন বিক্রি-অযোগ্য হয়ে পড়ছে। তাদের এ সংকট সমাধানের চেষ্টা করছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। কিন্তু কৃষক ক্ষতি পুষিয়ে ঘুরে দাঁড়াতে পারবে কি না—তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে।
এদিকে হাওরাঞ্চলে সরকার চলতি মৌসুমে ধান সংগ্রহ শুরু করেছে। ধানের দাম মণপ্রতি এক হাজার ৪৪০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু মাঠ পর্যায়ে এ কার্যক্রমের সুফল পাচ্ছেন না অধিকাংশ কৃষক। কারণ, সরকারি গুদামে ধান বিক্রির জন্য নির্ধারিত শর্ত পূরণ করতে পারছেন না তারা।
নীতিমালা অনুযায়ী ধানের আর্দ্রতা সর্বোচ্চ ১৪ শতাংশ হতে হবে। কিন্তু টানা বৃষ্টি ও রোদ না থাকায় হাওরের অধিকাংশ ধানই ভেজা। অনেক ক্ষেত্রে কাটা ধানেই অঙ্কুর গজাচ্ছে। ফলে গুদামে ধান নিয়ে গিয়েও তা ফেরত নিয়ে আসতে হচ্ছে কৃষকদের।
সূত্রে জানা গেছে, খোলাবাজারে ধানের দাম নেমে এসেছে আশঙ্কাজনক হারে। অনেক এলাকায় মণপ্রতি ৪০০-৬০০ টাকায় ধান বিক্রি হচ্ছে, যা উৎপাদন খরচেরও নিচে। এতে কৃষকের লোকসান বাড়ছে। এমন পরিস্থিতির সুযোগ নিচ্ছে মধ্যস্বত্বভোগী চক্র। কৃষকরা অভিযোগ করছেন, ফড়িয়া ও দাদন ব্যবসায়ীরা কম দামে ধান কিনে পরে তা বেশি দামে বিক্রি করছে। এতে প্রকৃত কৃষক বঞ্চিত হচ্ছেন। সুনামগঞ্জের মধ্যনগরের এক আড়তদার জানান, ভেজা ধান মিলাররা নিতে চায় না। তাই কৃষক বাধ্য হয়ে কম দামে বিক্রি করছে। বাজারে স্বাভাবিক চাহিদাও নেই।
কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম আমার দেশকে বলেন, সরকার চাইলে ভেজা ধান কিনে অন্যত্র শুকানোর ব্যবস্থা করতে পারে। এতে কৃষকও বাঁচবে, সংগ্রহ কার্যক্রমও বাড়বে। তিনি আরো বলেন, সংগ্রহের পরিমাণও তুলনামূলক কম। মোট উৎপাদনের তুলনায় এটি খুবই সীমিত। ফলে বাজারে সরকারের প্রভাব কমে যাচ্ছে। ফলে চরম বিপাকে রয়েছে কৃষক।
হাওরাঞ্চলের কৃষকদের জন্য সবচেয়ে বড় সংকট এখন ধান শুকানো। খলা তলিয়ে গেছে, রোদ নেই, বৃষ্টি অব্যাহত। ফলে কাটা ধান দ্রুত নষ্ট হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে ধানে অঙ্কুর গজিয়ে যাচ্ছে, যা বাজারে প্রায় মূল্যহীন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) মহাপরিচালক (ডিজি) আবদুর রহিম আমার দেশকে বলেন, ধান শুকানোর মেশিন সারা দেশ থেকে সংগ্রহ করে সুনামগঞ্জে ৭৪টি এবং কিশোরগঞ্জে পাঠানো হয়েছে ৬৩টি। একটা ড্রাই মেশিনে দুই ঘণ্টায় সাড়ে সাত মণ ধান শুকানো যায়। কিন্তু এটাও পর্যাপ্ত নয়। এছাড়া বিভিন্ন এলাকা থেকে ধান কাটার জন্য শ্রমিক হাওরাঞ্চলে প্রশাসনের মাধ্যমে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। এমনকি কৃষি কর্মকর্তারা কৃষকের কাজে সহায়তা ও পরামর্শ দিতে নিয়োজিত রয়েছেন।
ডিএইর পরিচালক ওবায়দুর রহমান মণ্ডল আমার দেশকে বলেন, সারা দেশে বোরোর আবাদ হয় ৯ লাখ হেক্টর জমিতে। এর মধ্যে হাওরাঞ্চলে রয়েছে চার লাখ ৫৫ হাজার হেক্টর।
মাঠের তথ্যানুযায়ী দুর্যোগে ধান নিমজ্জিত হয় ৫১ হাজার ৩৫৭ হেক্টর জমির। কিন্তু সব ধান কাটতে পারেনি। প্রাপ্ত তথ্যমতে, ইতোমধ্যে সিলেট জেলায় ধান কাটা হয়েছে ৯৪.৭ শতাংশ, মৌলভীবাজারে ৮৮, হবিগঞ্জে ৬৫, সুনামগঞ্জে ৮০, নেত্রকোনায় ৭১.৫২, কিশোরগঞ্জে ৬১.৬২ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ৮১ শতাংশ।
এ বিষয়ে কৃষি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বলছেন, কৃষকের সুবিধা বিবেচনায় সরকার ইতোমধ্যে কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। খাদ্য বিভাগের মাধ্যমে গুদাম পর্যায়ে ধান শুকানোর ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে। পাশাপাশি ইউনিয়ন পর্যায়ে ধান সংগ্রহ কার্যক্রম আরো জোরদার করার পরিকল্পনা রয়েছে।
এদিকে সুনামগঞ্জে বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতায় বোরো ধান এখনো পানিতে তলিয়ে রয়েছে। হাওরের কৃষকরা নিচু এলাকার ধান এখনো কাটতে পারেননি। এদিকে ভেজা ধান না শুকাতে পেরে প্রায় ৩০ ভাগ ধান পচে নষ্ট হয়েছে। সরকার এক হাজার ৪৪০ টাকা দরে ধান কেনার ঘোষণা দিলেও ধান ভেজা থাকায় বেশিরভাগ কৃষকই খাদ্যগুদামে দিতে পারছেন না।
ছায়ার হাওরের কৃষক মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘আমি ১০ কেদার জমির ধান কেটে ১০০ মণ পেয়েছি। রোদের কারণে শুকাতে না পারায় ৩০ মণ ধান অঙ্কুরেই নষ্ট হয়ে গেছে।’
রাসেল মিয়া নামে এক কৃষক জানান, গুদামে সিন্ডিকেট করে ধান-চাল সংগ্রহ করা হয়। আমরা বরাবরই বঞ্চিত হয়েছি। তাই গুদামে ধান নিয়ে গেলেও পরীক্ষা করে ফিরিয়ে দেবে। এসব কারণে গুদামের প্রতি আমাদের আগ্রহ নেই।
জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মুশফিকুর রহমান বলেন, জেলার ২১ হাজার ৩৪৯ টন ধান সংগ্রহের বরাদ্দ এসেছে। এখন পর্যন্ত ৪৭ টন কিনতে পেরেছি।
কিশোরগঞ্জের চিত্রও একই। কৃষি বিভাগের প্রাথমিক হিসাবে প্রায় ১৩ হাজার হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার আর্থিক মূল্য ধরা হয়েছে ২৫৯ কোটি টাকা। তবে স্থানীয় কৃষক ও সংশ্লিষ্টদের দাবি, ক্ষতির প্রকৃত পরিমাণ সরকারি এই হিসাবের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. সাদিকুর রহমান জানান, প্রাথমিক জরিপ অনুযায়ী জেলার অন্তত ৫০ হাজার কৃষক সরাসরি এই ক্ষতির শিকার হয়েছেন।
নেত্রকোনার কলমাকান্দা উপজেলার বাহাদুরকান্দা এলাকার কৃষক বাবুল হোসেন বলেন, রোদ উঠেছে, তাই ভেজা ধান শুকানোয় ব্যস্ত আছি।
বড়খাপন গ্রামের কৃষক জীবন সরকার বলেন, পরিবারের লোকজন নিয়ে পানিতে তলিয়ে যাওয়া ধান ঘরে তোলার চেষ্টা করছি। আর দুর্যোগ হানা না দিলে আমার ক্ষতি কম হবে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আমিনুল ইসলাম জানান, বোরো আবাদ হয়েছে ৪২ হাজার হেক্টর জমিতে। এর মধ্যে বৃষ্টিতে ১৮ হাজার ১৭৫ হেক্টর জমির ধান নষ্ট হয়েছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হন প্রায় ৭২ হাজার কৃষক।
খালিয়াজুরির মেন্দিপুর এলাকার কৃষক লোকমান হেকিম বলেন, এবার অতিরিক্ত বৃষ্টিতে হাওরের অর্ধেক ক্ষেতের ধান পানিতে নষ্ট হয়ে গেছে। পানি আসার আগে ডিজেল সংকটে হারভেস্টার দিয়ে ধান কাটা যায়নি। এরপর পানি এলে বেশি টাকা দিয়েও শ্রমিক পাওয়া যায়নি।
ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক আরিফুল ইসলাম সরদার আমার দেশকে বলেন, দুদিন ধরে রোদ ওঠায় কৃষকের মধ্যে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের তালিকা প্রস্তুতের কাজ চলছে। তাদের সরকারিভাবে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হবে। পাশাপাশি দ্রুত ধান কেটে ঘরে তুলতে কৃষি বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় সহায়তা দিচ্ছি।
হাওরাঞ্চলের অন্যান্য জেলার মতো ময়মনসিংহ এলাকার কৃষকের অবস্থাও বেহাল। এখনো পাকা ও আধাপাকা বোরো ধান পানির নিচে তলিয়ে আছে। ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার মাছিমপুর গ্রামের কৃষক আব্দুর রাশিদ অভিযোগ করে বলেন, নান্দাইল এলাকায় নদী খননের কারণে নদীতে বাঁধ দেওয়া হয়েছে। এতে কাঁচামাটিয়া নদীর পানি আটকে গিয়ে আশপাশের কৃষিজমি ডুবে গেছে। ফলে হাজার হাজার কৃষকের জীবনে দুর্দশা নেমে এসেছে।
ময়মনসিংহ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) ড. উম্মে হাবিবা বলেন, যেসব কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তাদের তালিকা করা হচ্ছে। ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণে কাজ চলছে।
[তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি জসীম উদ্দিন, কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি মুনিরুজ্জামান খান চৌধুরী সোহেল, ময়মনসিংহ প্রতিনিধি মো. আবদুল কাইয়ুম ও নেত্রকোনা প্রতিনিধি ম. কিবরিয়া চৌধুরী হেলিম]
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

