ভারতে ভোটের অঙ্কে মুসলিমরা কোথায়

বিশেষ প্রতিনিধি, কলকাতা

ভারতে ভোটের অঙ্কে মুসলিমরা কোথায়

পাঁচ রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল আবার সামনে এনেছে ভারতের রাজনীতিতে মুসলিম প্রতিনিধিত্বের সংকটের প্রশ্ন। মোট ৭২৩টি আসনের মধ্যে ১০৪ জন মুসলিম বিধায়ক নির্বাচিত হলেও দেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) একজনও মুসলিম বিধায়ক নেই। শুধু তাই নয়, বেশ কয়েকটি রাজ্যে বিজেপি কোনো মুসলিম প্রার্থীই দেয়নি।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি শুধু নির্বাচনি কৌশল নয়; ভারতে মুসলমানদের অপ্রাসঙ্গিক করে তুলতে চাইছে। এতদিন পশ্চিমবঙ্গে বিশ্বাস করা হতো, মুসলিম ভোট ব্যাংক না হলে এখানে ক্ষমতায় আসা যায় না। কিন্তু কট্টরপন্থি বিজেপি হিন্দুভোট একত্র করে দেখিয়ে দিয়েছে, মুসলমানদের ভোট তাদের দরকার নেই। তাই ভোটের পরেই নিধনযজ্ঞ শুরু হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

আসাম, পশ্চিমবঙ্গ, কেরালা, তামিলনাড়ু ও পুদুচেরি—এই পাঁচ রাজ্যের নির্বাচনে ৭২৩টি আসনের বিপরীতে নির্বাচিত মুসলিম বিধায়কের হার মাত্র ১৪ দশমিক ৩৬ শতাংশ। এই পরিসংখ্যানের আড়ালে যে চরম সত্যটি লুকিয়ে আছে তা হলো, দেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল বিজেপির পক্ষ থেকে একজনও মুসলিম প্রতিনিধি নির্বাচিত হননি। প্রকৃতপক্ষে, এই রাজ্যগুলোয় বিজেপি একজন মুসলিম প্রার্থীকেও মনোনয়ন দেয়নি।

বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ ও আসামে বিজেপির রাজনৈতিক কৌশল নতুন করে আলোচনায় এসেছে। এই দুই রাজ্যে ‘অনুপ্রবেশকারী’ ইস্যুকে সামনে রেখে তীব্র সাম্প্রদায়িক প্রচার চালিয়েছে দলটি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এর মাধ্যমে বিজেপি স্পষ্ট বার্তা দিতে চেয়েছে, মুসলিম ভোট ছাড়াও সংখ্যাগুরু হিন্দু ভোট একত্র করেও ক্ষমতায় আসা সম্ভব। সমালোচকদের দাবি, এই প্রবণতা মুসলিম সম্প্রদায়কে মূলধারার রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। তাদের মতে, এটি কার্যত সংখ্যালঘুদের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকের অবস্থানে ঠেলে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করছে।

এদিকে কেন্দ্রীয় সংখ্যালঘু বিষয়ক মন্ত্রী কিরেণ রিজিজু ও বিজেপির আইটি সেল প্রধান অমিত মালব্য কংগ্রেসকে ‘মুসলিম লিগ’ বলে আক্রমণ করেছেন। রিজিজুর দাবি, কংগ্রেস মুসলিমদের শুধু ভোটব্যাংক হিসেবে ব্যবহার করে এবং বিভেদের রাজনীতি করছে। কিন্তু বিজেপির নিজেদের খতিয়ানের দিকে তাকালে দেখা যায়, উত্তরপ্রদেশের মতো বিশাল রাজ্যেও বিজেপির কোনো মুসলিম বিধায়ক নেই।

পশ্চিমবঙ্গে ২৯৩টি আসনের মধ্যে ৩৯ জন মুসলিম বিধায়ক নির্বাচিত হয়েছেন। এর মধ্যে ৩৪ জনই তৃণমূল কংগ্রেসের। বিজেপির কোনো মুসলিম প্রতিনিধি নেই। আসামে মুসলিম জনসংখ্যা প্রায় ৩৪ শতাংশ হলেও সীমানা পুনর্নির্ধারণের পর মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনের সংখ্যা ৩৫ থেকে কমে ২২-এ নেমে এসেছে। বিরোধীদের অভিযোগ, এতে মুসলিমদের রাজনৈতিক প্রভাব কমানোর চেষ্টা করা হয়েছে।

কেরালা ও তামিলনাড়ুর চিত্রটি কিছুটা ভিন্ন হলেও মুসলিমদের রাজনৈতিক ক্ষমতা সংকোচনের প্রবণতা সেখানেও বিদ্যমান। কেরালায় ইউডিএফ জোটের জয়ে ৩৫ জন মুসলিম বিধায়ক নির্বাচিত হয়েছেন, যার বড় অংশই মুসলিম লিগের। তামিলনাড়ুতে ২৩৪ জন বিধায়কের মধ্যে মাত্র সাতজন মুসলিম, যা মোট জনসংখ্যার তুলনায় খুবই অপ্রতুল। পুদুচেরিতে একজনও মুসলিম বিধায়ক নির্বাচিত হননি।

‘দ্য ইন্ডিয়া ফোরাম’-এর বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, শুধু বিজেপি নয়, অন্যান্য প্রধান বিরোধী দলগুলোও মুসলিম প্রার্থী মনোনয়নের ক্ষেত্রে দিনদিন রক্ষণশীল হয়ে পড়ছে। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে কংগ্রেস রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ, ছত্রিশগড় ও গুজরাটের মতো রাজ্যে কোনো মুসলিম প্রার্থী দেয়নি। তৃণমূল কংগ্রেস, সমাজবাদী পার্টি বা আরজেডির মতো দলগুলো সম্মিলিতভাবে মাত্র ৪৩ জন মুসলিমকে টিকিট দিয়েছিল।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি আসলে ‘সংখ্যাগুরু সাম্প্রদায়িকতা’র কাছে তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষ দলগুলোর আত্মসমর্পণেরই নামান্তর। যখন একটি বৃহৎ গণতান্ত্রিক দেশে জনসংখ্যার অনুপাতে প্রতিনিধিত্বের হার ক্রমাগত কমতে থাকে এবং সরকারি দল একটি বিশেষ সম্প্রদায়কে সম্পূর্ণ বর্জন করে, তখন সেই গণতন্ত্রের কাঠামোটিই প্রশ্নবিদ্ধ হয়। ২০২৬-এর এই নির্বাচন প্রমাণ করে দিল, ভারতের সংসদীয় রাজনীতিতে মুসলিমদের কণ্ঠস্বর রোধ করার যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল, তা এখন পূর্ণতা পাওয়ার পথে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন