হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে উড়োজাহাজ অবতরণের পর লাগেজ পেতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে। যাত্রীদের অভিযোগ, প্রায়ই ফ্লাইট থেকে নামার পর বেল্টে লাগেজ আসতে ৪৫ মিনিট থেকে দেড় ঘণ্টা পর্যন্ত সময় লেগে যায়। এতে বিশেষ করে বয়স্ক যাত্রী, নারী ও শিশুদের চরম দুর্ভোগে পড়তে হচ্ছে। বিমানবন্দরের অব্যবস্থাপনা নিয়ে অভিযোগের শেষ নেই যাত্রী ও এয়ারলাইনসগুলোর।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, বিমানবন্দরে দক্ষ জনবলের অভাব রয়েছে। এছাড়াও রয়েছে লাগেজ পেতে বিড়ম্বনা, লাগেজ কাটা, মূল্যবান মালামাল চুরি, যাত্রীসেবা নিশ্চিত না করা। জনবল সংকট ও সমন্বয়হীনতার অভিযোগও রয়েছে। মূলত এসব অভিযোগ বহুকালের হলেও এ চিত্র যেন কখনো বদলাবে না।
সম্প্রতি আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্য, ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে আসা বেশ কয়েকজন যাত্রীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ইমিগ্রেশন শেষ করার পরও লাগেজের জন্য দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে নির্ধারিত বেল্ট পরিবর্তন করা হয়। আবার কোনো কোনো সময় লাগেজ খালাস শুরু হতেও অস্বাভাবিক দেরি হয়।
গত ১১ মে সোমবার নিউ ইয়র্ক থেকে দেশে ফেরেন জেসমিন রেজা। কাতার এয়ারওয়েজের একটি ফ্লাইটে তিনি বেলা ১১টা ১৫ মিনিটে শাহজালালে অবতরণ করেন। জেসমিন জানান, এত লম্বা জার্নি করে এসে ল্যাগেজের জন্য দেড় ঘণ্টা অপেক্ষা করে লাগেজ পেতে হয়েছে।
গত ৭ মে সাউদিয়া এয়ারলাইনসের জেদ্দা থেকে আগত এজাজ আহমেদ নামক এক যাত্রী আমার দেশকে জানান, বেলা ১১টা ৪০ মিনিটে এয়ারক্রাফটটি অবতরণ করে। এরপর লাগেজ পেতে তার সময় লাগে এক ঘণ্টা ৫০ মিনিট। লম্বা এ সময় অপেক্ষা করতে করতে এজাজ সাহেব এবং তার স্ত্রী রিনা বিরক্ত হন। লম্বা জার্নি করে এসে আবার বিমানবন্দরে দেড় ঘণ্টা লাগেজের জন্য অপেক্ষা করা অত্যন্ত কষ্টকর।
এ সময় দুবাই থেকে আগত আরেক যাত্রী বজলুর রহমান আমার দেশকে জানান, দেশে ফিরে লাগেজের জন্য অপেক্ষা করা কষ্টকর। দুবার বেল্টে গিয়ে ফিরে আসি। তৃতীয়বার গিয়ে লাগেজ পাই। এখানকার প্রসিডিউর খুব স্লো। অথচ আমরা দেশের বাইরে গেলে ইমিগ্রেশন শেষ করেই লাগেজ পেয়ে যাই।
সংশ্লিষ্টদের মতে, সমস্যার বড় কারণ
পুরোনো অবকাঠামো ও সীমিত যন্ত্রপাতি। অনেক সময় পর্যাপ্ত ব্যাগেজ ট্রলি, কনভেয়ার সিস্টেম বা গ্রাউন্ড সাপোর্ট ইকুইপমেন্ট পাওয়া যায় না। আবার কোনো যন্ত্রপাতি বিকল হলে পুরো প্রক্রিয়াই ধীর হয়ে পড়ে।
অ্যাভিয়েশন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী একটি আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের লাগেজ সাধারণত ২০-৩০ মিনিটের মধ্যে বেল্টে আসা উচিত। কিন্তু শাহজালালে বহু ক্ষেত্রে সে সময়সীমা অতিক্রম হয়। এতে বিদেশি যাত্রীদের কাছেও দেশের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, থার্ড টার্মিনাল পুরোপুরি চালু হলে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হতে পারে। কারণ, সেখানে আধুনিক ব্যাগেজ হ্যান্ডলিং সিস্টেম, স্বয়ংক্রিয় কনভেয়ার এবং উন্নত স্ক্যানিং সুবিধা যুক্ত করা হয়েছে। তবে শুধু অবকাঠামো নয়, দক্ষ ব্যবস্থাপনা ও জবাবদিহিও জরুরি বলে মনে করছেন তারা।
অ্যাভিয়েশন বিশ্লেষকদের মতে, যাত্রীসেবার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলোর একটি হলো দ্রুত লাগেজ সরবরাহ। কারণ, একজন যাত্রীর ভ্রমণের শেষ অভিজ্ঞতাই তার পুরো যাত্রা সম্পর্কে ধারণা তৈরি করে। আর সেই জায়গাতেই এখনো বড় প্রশ্নের মুখে দেশের প্রধান শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর।
সূত্র জানায়, আইকাও বা আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থার নিয়ম অনুযায়ী ফ্লাইট অবতরণ বা বিমানের ইঞ্জিন বন্ধ হওয়ার পর একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ব্যাগেজ ডেলিভারি শুরু ও শেষ করার সুপারিশ রয়েছে। আইকাওর বৈশ্বিক মানদণ্ড অনুযায়ী নিয়মগুলো হলো—বিমানের ইঞ্জিন বন্ধ করার ১০ মিনিটের মধ্যে প্রথম ব্যাগটি ব্যাগেজ বেল্টে পৌঁছাতে হবে। শেষ লাগেজ বিমানের ইঞ্জিন বন্ধ করার পর থেকে সর্বোচ্চ ৩০ মিনিটের মধ্যে সব যাত্রীর ব্যাগেজ ডেলিভারি শেষ করার নির্দেশনা রয়েছে।
তবে এ সময়সীমা বিমানবন্দর এবং এয়ারলাইনসের মধ্যকার সার্ভিস কোয়ালিটি রিকোয়ারমেন্টস এবং অপারেশন ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ডেলিভারি অ্যাগ্রিমেন্ট অনুযায়ী পরিচালিত হয়। ক্ষেত্রবিশেষ বিমানের আকার এবং বিমানবন্দরে যাত্রী চাপের ওপর ভিত্তি করে এ সময়ে কিছুটা তারতম্য হতে পারে।
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে মহিলা যাত্রীদের টয়লেটের অবস্থা অত্যন্ত নোংরা। ফ্লোরে টিস্যু ও পানি পড়ে থাকে। কমোডগুলোর অবস্থাও খারাপ। দুর্গন্ধ, নোংরা। অনেক দিন ধরে বাথরুমগুলো সংস্কার করা হয় না। ক্লিনাররা টয়লেটের কাছাকাছি অবস্থান করলেও তা অপরিচ্ছন্ন অবস্থায় দেখা যায়।
সিভিল অ্যাভিয়েশন কর্তৃপক্ষ জানায়, টার্মিনাল-১ এবং টার্মিনাল-২-এ মোট আটটি বেল্টের মধ্যে বর্তমানে একটি নষ্ট রয়েছে। এছাড়া বর্তমানে হজ ফ্লাইট পরিচালিত হচ্ছে। ফলে বিমানবন্দর থেকে কিছু লোক হজ ক্যাম্পে পোস্টিং দেওয়া হয়েছে। ফলে এখানে লোকের স্বল্পতা রয়েছে। হজ ফ্লাইট শেষ হলে এ সমস্যা থাকবে না।
নভো এয়ারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মফিজুর রহমান আমার দেশকে বলেন, পৃথিবীর বেশিরভাগ দেশেই যাত্রীরা দ্রুততম সময়ের মধ্যে লাগেজ পেয়ে থাকেন। কিন্তু বাংলাদেশে এ লাগেজ পেতে এক থেকে দেড় ঘণ্টা সময় লেগে যায়। এর সম্পূর্ণটাই গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের ব্যাপার। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস যেহেতেু বিমানবন্দরের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের দায়িত্বে রয়েছে, তাই এটি বিমানের ওপর বর্তায়। বিমানের উচিত এ সমস্যাগুলো সমাধানে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া।
বাংলাদেশ এয়ারলাইনস পাইলট অ্যাসোসিয়েশনের (বাপা) সাবেক সভাপতি ক্যাপ্টেন হেলাল আমার দেশকে জানান, সকালের দিকে অনেকগুলো এয়ারলাইনসের উড়োজাহাজ একসঙ্গে অবতরণ করলে তখন লাগেজ পেতে দেরি হয়। কারণ, শাহজালালের ধারণক্ষমতার চেয়ে এখন অনেক বেশি যাত্রী এ বিমানবন্দর ব্যবহার করছেন। সেজন্য এ সমস্যা মাঝে মধ্যে সৃষ্টি হয়। তাছাড়া গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের বেশকিছু প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি নেই। যেমন টো-ট্রাক্টর নেই। ব্যাগেজ পরিবহনের জন্য প্রয়োজনীয় গাড়িরও স্বল্পতা রয়েছে। থার্ড টার্মিনাল চালু হলে লাগেজের এ সমস্যাগুলো থাকবে না বলে আশা করি।
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের প্রধান নির্বাহী গ্রুপ ক্যাপ্টেন এসএম রাগীব সামাদ আমার দেশকে বলেন, মধ্যপাচ্য রুটের ফ্লাইটগুলোয় সাধারণত বড় এয়ারক্রাফট থাকে। যাত্রীদের ব্যাগেজও বেশি হয়। যেমন সাউদিয়া এয়ারলাইনসে তিন শতাধিক যাত্রী থাকে। ফলে স্বাভাবিকভাবে ব্যাগেজ আসতে সময় লাগে। উড়োজাহাজ অবতরণ করার পর বোর্ডিং ব্রিজ লাগানো হয়, এরপর যাত্রীরা নেমে আসেন। ইমিগ্রেশন শেষ করে লাগেজ নিয়ে, কাস্টমস করিয়ে বেরিয়ে যান। এ লাগেজ পেতে সময় লাগে এক থেকে দুই ঘণ্টা। ৩০টি কনটেইনারে মালামাল আসে। একসঙ্গে তিনটির বেশি কনটেইনারে মালামাল আনা যায় না। অনেক এয়ারলাইনস আবার সব লাগেজ একসঙ্গে আনতে পারে না। যেমন সালাম এয়ার ও সাউদিয়া। লাগেজ বেশি হলে অনেক সময় তারা পরবর্তী উড়োজাহাজে ব্যাগেজ আনে। আর বিমানবন্দরের টয়লেটগুলো আমাদের ক্লিনাররা সব সময় পরিষ্কার করছে। তারা চেষ্টা করে বাথরুমগুলো পরিষ্কার রাখতে। তবে অনেক যাত্রী আছেন, যারা প্রপারওয়েতে টয়লেটগুলো ব্যবহার করতে পারেন না।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন



পাকিস্তানকে উড়িয়ে বাংলাদেশের ইতিহাস