Dr. Hasanuzzaman Chowdhury

বাংলাদেশে ২০২৪ সালের ৩৬ জুলাই বিপ্লব তথা বর্ষাবিপ্লবের আলোকে এর দাবি অনুযায়ী প্রকৃত অর্থে রাষ্ট্রের জনমালিকানা প্রতিষ্ঠা না করা মানে হচ্ছে ছাত্র-জনতার এত বিশাল ত্যাগ এবং জীবনদানের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা।

চৌদ্দশ বছরের ইতিহাসে অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে একবারের জন্য এসেছিল অবিস্মরণীয় ১৯৭১। এটা ছিল আমাদের জীবনবদলের আকাঙ্ক্ষাযুক্ত সামাজিক সম্মিলন প্রয়াস, আমাদের মুক্তিযুদ্ধ। এমন উজ্জ্বল উদ্ধারের কাল আমরা ইতোপূর্বে কখনো দেখিনি। ইতিহাসের ঘুরপথে তা

একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর। অসহ্য যন্ত্রণা, কষ্ট, ত্যাগস্বীকার ও বেদনা পেরিয়ে নতুন দিনে পৌঁছে যাওয়ার শুরুর কালের স্বপ্নে বিভোর সেই সময়কার সাড়ে ৭ কোটি জনতা, ঢাকার রাজপথে যার কেন্দ্রভাগ। যারা দেখেনি, যাদের জন্ম হয়নি কিংবা বোঝার বয়স হয়নি সে সময়, তারা বুঝতেই পারবে না হাজার বছরের পথ পেরিয়ে, চব্বিশ বছরের অভ্যন

জুলাই গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে করা মামলায় পতিত মাফিয়া শাসক শেখ হাসিনা এবং তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানের মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে ঢাকার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। জুলাই গণহত্যার হুকুমদাতা হিসেবে তাদের বিরুদ্ধে অনা অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে বলে রায়ে উল্লেখ করা হয়ে

বাংলাদেশে নভেম্বর-২০২৫-এ যে অবস্থা চলছে, পরাজিত ফ্যাসিবাদ ও আধিপত্যবাদের যে প্রকাশ্য হুমকি, অপতৎপরতা এবং অন্তর্ঘাত চলছে, তাতে করে জনঐক্য ও রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা সর্বাধিক জরুরি। এই পরিস্থিতিতে জুলাই সনদের ভিত্তিতে আগামী ত্রয়োদশ নির্বাচনের আগেই গণভোট হবে কি না এ নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলো

শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ১৬ বছরের মাফিয়াতন্ত্র ও ফ্যাসিবাদী শাসনের পর বর্ষাবিপ্লব-পরবর্তী সময়ে সমগ্র দেশবাসী আশা করেছিল নতুন বন্দোবস্তের ভিত্তিতে নতুন এক রাষ্ট্রকাঠামো নির্মিত হবে। নতুন ধারার সরকারব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠিত হবে। সংগঠন ও কাঠামোয় গুণগত পরিবর্তন আসবে। রাষ্ট্রসংস্কারের মৌলিক ভাবনা বাস্তবায়িত

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট, ৩৬ জুলাই বা বর্ষাবিপ্লব দীর্ঘদিনের না-পারা আন্দোলন-সংগ্রামকে পরিমাণগত পরিবর্তন থেকে গুণগত পরিবর্তনের দিকে নিয়ে গিয়েছিল। ওই দিন ১৬ বছরের ফ্যাসিস্ট আওয়ামী জালিমতন্ত্রের পতন নিশ্চিত করে ছেড়েছে ছাত্র-শ্রমিক-জনতা।

‘দো নাথিং ক্যান ব্রিং ব্যাক দি আওয়ার/ অব স্প্লেনডার ইন দি গ্রাস, অব গ্লোরি ইন দি ফ্লাওয়ার/ উই উইল গ্রিভ নট, রাদার ফাইন্ড/ স্ট্রেংথ ইন হোয়াট রিমেইন্স বিহাইন্ড’—উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থের কবিতা থেকে এই উদ্ধৃতি। এর অনুবাদ আমি এভাবে করছি—‘যদিও কিছুই পারে না ফেরাতে ক্ষণ/ ঘাসের ঔজ্জ্বল্য আর পুষ্প মহিমার মন

ফ্রান্জ ফ্যানোর কথা দিয়ে শুরু করি। তিনি বলেছিলেন, ‘যতবার স্বাধীনতা বিপন্ন হবে, আমরা সংশ্লিষ্ট হবোই। আমরা সাদা, কালো, হলুদ যা-ই হই না কেন। আর যতবার স্বাধীনতা রুদ্ধ হবে, আমি নিজেকে ততবার জড়িয়ে ফেলব।’

অত্যন্ত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর পক্ষ থেকে তোলা আদিবাসী দাবিটি আদৌ গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ হচ্ছে—১. এটা সত্যের ও ইতিহাসের চূড়ান্ত অপলাপ; ২. এটা বাংলাদেশের ২০ কোটি জনগণকে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক করার শামিল; ৩. এটা আমাদের এককেন্দ্রিক রাষ্ট্র এবং এর সাংবিধানিক কাঠামোবিরোধী

‘নাটক কম করো পিও।’ ঢাকার দেয়ালে গ্রাফিতি এরূপ। ৩৬-এর স্পিরিট দ্বিতীয় দফা তীব্র কশাঘাত দ্বারা ৩২-কে গুঁড়িয়ে দিয়ে এর ফ্যাসিবাদী হিন্দুত্ববাদী হিন্দুস্তানি দালালদের ও তাদের প্রভুদের ‘কামব্যাক’ করার দিবাস্বপ্ন ও কৃত্রিম ধান্ধাতাড়িত মাতমকে উলঙ্গ করে দিয়েছে।

ঢাকার ধানমণ্ডি ৩২ নাম্বারের বাসাটি নতুন করে গুঁড়িয়ে, জ্বালিয়ে, পুড়িয়ে জয় বাংলা করে দিয়েছে গত ৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ তারিখে হাজারো, লাখো ছাত্র-জনতা।

ফ্যাসিস্ট হাসিনার কুশাসনে সিলেটে একটি ব্যঙ্গাত্মক রাজনৈতিক ছড়া প্রচলিত ছিল। তা হচ্ছে-‘হাসিনারে হাসিনা/ তোর কথায় নাচি না/ তোর বাপের কথায় নাচিয়া/ দেশ দিস্লাম বেচিয়া’।

ছাত্রলীগ, যুবলীগ, শ্রমিক লীগ, লালবাহিনী ও রক্ষীবাহিনীর খুনি কসাইদের। মুজিবের সময়ই তার ছেলে শেখ কামাল অবৈধ অস্ত্র ব্যবহার, গৃহবধূ ধর্ষণ, ব্যাংক লুট, চাঁদাবাজি ও বিরোধীদের খতমের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ভারতীয় জেনারেল উবানের তৈরি মুজিবের রক্ষীবাহিনী শরীয়তপুরের বামপন্থি নেতা শান্তি সেনের স্ত্রীকে ধর্ষণসহ হাজ

আওয়ামী ফ্যাসিবাদ দাঁড়িয়েছিল লেট লুজ বা লেলিয়ে দেওয়ার ওপর। কতটা ঘৃণ্য ছিল পিতা শেখ মুজিব ও কন্যা শেখ হাসিনার কুশাসন! মুজিব তার কুশাসনের গোড়া থেকেই ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠায় এগোয়।

বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠাকারী একই আওয়ামী লীগের দুই কালের দুজন। একই পরিবারের পিতা শেখ মুজিব সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে সেই ১৯৭২ সালের শুরুতেই ফ্যাসিবাদের কর্ষণ ও বপন শুরু করে এবং এরপর জনবিচ্ছিন্ন অবস্থায় বলপ্রয়োগে মউতে চলে যায়।

অনেক কষ্টে পাওয়া বাংলাদেশ। অনেক দামে কেনা। কিন্তু বিকিয়ে গেল কি বিনামূল্যে? এ প্রশ্ন উত্থাপিত হচ্ছে এ জন্য যে, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে হাজারো মাইলাই ম্যাসাকার পেরিয়ে লাখ শহীদের ত্যাগ এবং ২০২৪ সালের নজিরবিহীন ছাত্র-গণঅভ্যুত্থান ও বিশাল কোরবানির পরও আমরা যেন কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারছি না।

এত বিশাল ছাত্র গণঅভ্যুত্থানের পরও বাংলাদেশের উসর ভূখণ্ডে ফ্যাসিবাদ গিয়েও যেন যায় না। নিষ্ফলা মাঠে হাহাকার চাষিজনের। পাষণ্ড বাবা দিয়ে শুরু হয়। পামরকন্যা দিয়ে বিষাক্ত হয়ে যায় আদিগন্ত জমিন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর প্রথমবারের মতো অবৈধ কর্তৃত্ববাদ, স্বৈরতন্ত্র, একনায়কত্ব

১৯৭১-এ অগণ্য রক্তের বিনিময়ে জনযুদ্ধে সাফল্য লাভ করে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছিল। যেটাকে আমরা মুক্তিযুদ্ধ বলি, স্বাধীনতার যুদ্ধ বলি। কিন্তু এরপর ৫৩ বছর কেটে গেলেও আমরা এই বাংলাদেশি জনগণ নিজেদের বৈষম্য, শোষণ, বঞ্চনা, অনাচার থেকে যেমন মুক্ত করতে পারিনি, তেমনি পাইনি প্রকৃত স্বাধীনতা।