একসময় গানই ছিল তার পরিচয়, গান গেয়েই চলত সংসার। মাটির সুরে পালাগান গেয়ে মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছিলেন বাউলশিল্পী মোস্তফা বয়াতি। স্বপ্ন ছিল গানকে ঘিরেই এগিয়ে যাওয়ার। কিন্তু হৃদরোগ কেড়ে নিয়েছে তার কণ্ঠের স্বাভাবিক শক্তি। দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থতার সঙ্গে লড়াই করতে গিয়ে শেষ সম্বলটুকুও হারিয়েছেন তিনি। এখন নিজের চিকিৎসা, বৃদ্ধ বাবা-মায়ের চিকিৎসা ও সংসারের ব্যয় মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন এই শিল্পী। জীবনের এমন কঠিন সময়ে সরকার ও সমাজের বিত্তবানদের কাছে সহযোগিতার আবেদন জানিয়েছেন তিনি।
শিল্পী মোস্তফা বয়াতি উপজেলার আচমিতা ইউনিয়নের গনেরগাঁও গ্রামের মেনু মিয়ার ছেলে।
১৯৯২ সালে ওস্তাদ লাল মিয়া বয়াতির হাত ধরে বাউল গানের জগতে তার পথচলা শুরু হয়। ২০০৬ সালে বাংলাদেশ টেলিভিশনের (বিটিভি) সংগীতশিল্পী চূড়ান্ত নির্বাচনি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে সফলতার সঙ্গে উত্তীর্ণ হন মোস্তফা বয়াতি। এরপর পল্লীগানের নিয়মিত শিল্পী হিসেবে তালিকাভুক্ত হন তিনি। ছোটবেলা থেকেই বাউলগানের প্রতি ছিল তার গভীর অনুরাগ।
কিন্তু ২০০৯ সালে হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার পর বদলে যায় তার জীবনের গল্প। চিকিৎসক কর্নেল (অব.) জিহাদ খানের অধীনে চিকিৎসা নিচ্ছেন তিনি। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী, জোরে কথা বলা ও গান গাওয়া নিষেধ। অথচ যে গান ছিল তার বেঁচে থাকার অবলম্বন, সেই গান থেকেই আজ দূরে থাকতে হচ্ছে তাকে।
ভিটেবাড়ি ছাড়া তার কোনো ফসলি জমি নেই। গান গেয়ে উপার্জিত অর্থের সঞ্চয় এবং সামান্য যে ফসলি জমি ছিল, তাও বিক্রি করে চিকিৎসার পেছনে ব্যয় করেছেন। এখন অর্থাভাবে নিয়মিত চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে মানসিক রোগে আক্রান্ত বাবা দিন-রাতের পার্থক্য বুঝতে পারেন না। অসুস্থ মায়ের ওষুধের খরচ এবং সংসারের ব্যয় বহন করাও তার পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না।
মোস্তফা বয়াতির ছাত্রী লিজা বয়াতি, মৌ মিম বয়াতি, সাথী বয়াতি, ঐশী বয়াতি, সোনিয়া বয়াতি, মুন্না বয়াতি, ফারজানা বয়াতি, হ্যাপি বয়াতি ও আদরি সরকার জানান, তারা মোস্তফা বয়াতির কাছ থেকে গান শিখছেন। মাঝেমধ্যে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গান গাওয়ার সুযোগ পেলে সেখান থেকে পাওয়া পারিশ্রমিকের কিছু অংশ উস্তাদের চিকিৎসা ও ওষুধ কেনার জন্য দিয়ে থাকেন।
মোস্তফা বয়াতির স্ত্রী সেলিনা খাতুন জানান, তার স্বামী গান গেয়েই সংসারের খরচ বহন করতেন। কিন্তু অসুস্থ হওয়ার পর থেকে আর গান গাইতে পারেন না। স্বামীর কষ্ট চোখের সামনে দেখেও কিছু করতে না পারার বেদনা তাকে প্রতিনিয়ত কুরে কুরে খাচ্ছে। বর্তমানে মোস্তফা বাড়িতে কয়েকজন ছেলেমেয়েকে গান শেখান। সেখান থেকে পাওয়া সামান্য অর্থ দিয়েই কোনো রকমে দিন কাটছে পরিবারটির।
নিজের অসহায়ত্বের কথা তুলে ধরে বাউলশিল্পী মোস্তফা বয়াতি বলেন, ‘২০০৯ সালে হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার পর থেকে আর আগের মতো গান গাইতে পারি না। আমার গাওয়া ৩৫টি অডিও ক্যাসেট বাজারজাত করেছি। গানই ছিল আমার একমাত্র সম্পদ ও জীবিকার অবলম্বন। আমার যা কিছু সঞ্চয় ছিল, সব চিকিৎসার পেছনে খরচ করেছি।
এখন মানসিক রোগে আক্রান্ত বাবা, অসুস্থ মা, স্ত্রী ও এক ছেলেকে নিয়ে খুব কষ্টে দিন পার করছি। নিজের চিকিৎসা করাব, নাকি বাবা-মায়ের চিকিৎসা করাব, নাকি সংসার চালাব—কিছুই বুঝে উঠতে পারছি না। আমার চিকিৎসার জন্য সরকার ও সমাজের বিত্তবানদের সহযোগিতা চাই।’
একসময় যে কণ্ঠে পল্লীগানের সুর ছড়িয়ে পড়ত মানুষের হৃদয়ে, আজ সেই কণ্ঠ একেবারেই নীরব। অভাব আর অসুস্থতার সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই করছেন এই শিল্পী। সমাজের হৃদয়বান মানুষ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এগিয়ে এলে হয়তো আবারও চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পাবেন তিনি। ফিরে পেতে পারেন স্বাভাবিক জীবনে বেঁচে থাকার স্বপ্ন।
এমএইচ
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

