কক্সবাজারের সীমান্ত জনপদ টেকনাফের হ্নীলা রঙ্গীখালীর দুর্গম পাহাড়ে সশস্ত্র মানব পাচারকারীদের আস্তানা থেকে ৫৬ জিম্মিকে উদ্ধার করে থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে। উদ্ধার হওয়া জিম্মিদের কাছ থেকে চাঞ্চল্যকর তথ্য মিলেছে।
তাদেরকে আট দিন ধরে গহীন পাহাড়ে বন্দি রাখা হয়েছে। আবার কাউকে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে লাখ টাকায়।
শুক্রবার সকালে তাদের টেকনাফ মডেল থানায় হস্তান্তর করে যৌথবাহিনী।
এদিকে পাহাড়ে মানব পাচারকারীদের গুলিতে সেনাসদস্য নিহতের ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ ও ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। মানব পাচারকারীদের আস্তানা নির্মূলে পাহাড়ে সাঁড়াশি অভিযানের দাবি তুলেছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও জনপ্রতিনিধিরা। এ ঘটনায় শুক্রবার জুমার নামাজের পর টেকনাফের বিভিন্ন স্থানে মানববন্ধন করেছেন ছাত্র প্রতিনিধিরা।
আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার বিকেলে হ্নীলা ইউনিয়নের রঙ্গীখালীর দুর্গম পাহাড়ে মানব পাচারকারীদের বিরুদ্ধে যৌথবাহিনীর অভিযানে গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। এতে সশস্ত্র মানব পাচারকারীদের গুলিতে সেনাসদস্য মো. তিতাস শেখ (২৭) নিহত হন।
ওই অভিযানে মানব পাচারকারী চক্রের পাঁচ সদস্যকে আটক করা হয়। এ সময় একটি পিস্তল, একটি দেশীয় তৈরি বন্দুক ও চার রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়।
যৌথ অভিযানে সেনাবাহিনীর ১০ পদাতিক ডিভিশন (রামু ক্যান্টনমেন্ট), বিজিবি ও পুলিশ অংশ নেয়।
টেকনাফ থানা হেফাজতে থাকা ফরিদপুরের বাসিন্দা আসাদুজ্জামান বলেন, "আট দিন ধরে মানব পাচারকারীরা পাহাড়ের একটি ঝুপড়ি ঘরে আমাকে বন্দি করে রেখেছিল। দুইবার পালানোর চেষ্টা করেও পারিনি।"
পাহাড়ে ৪০ থেকে ৫০ জনের একটি সশস্ত্র পাহারাদল ছিল বলেও দাবি করেন তিনি।
আসাদুজ্জামান জানান, কক্সবাজারের একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরির সুবাদে উখিয়ার কুতুপালং ক্যাম্পের ইমামুল নামের এক রোহিঙ্গার সঙ্গে তার পরিচয় হয়। পরে তাদের মধ্যে যোগাযোগ গড়ে ওঠে। একপর্যায়ে ক্যাম্পে কাজ দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে আট দিন আগে তাকে ডেকে নেওয়া হয়।
তিনি দাবি করেন, সেখানে পৌঁছানোর পর তার মোবাইল ফোনসহ সঙ্গে থাকা সবকিছু কেড়ে নেওয়া হয়। পরে রাতে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে তাকে পাহাড়ে নিয়ে মানব পাচারকারীদের হাতে তুলে দেওয়া হয়।
আসাদুজ্জামানের ভাষ্যমতে, পাহাড়ে গিয়ে তিনি দেখতে পান, তার মতো আরো অর্ধশতাধিক মানুষকে আটকে রাখা হয়েছে। তখনই বুঝতে পারেন, তিনি মানব পাচারকারী চক্রের ফাঁদে পড়েছেন।
তিনি বলেন, ‘দুই দিন আগে শতাধিক নৌকাসহ একটি ট্রলার সাগরপথে যাত্রার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। আমাকে আরো পাঁচজনের সঙ্গে সেখানে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু জায়গা না থাকায় সেদিন আর ট্রলারে তোলা হয়নি।’
পাহাড় থেকে উদ্ধার হওয়া উখিয়ার সেপটখালীর বাসিন্দা মো. সাইফুল ও মিজানুর রহমান সাগর বলেন, ‘কাজ দেওয়ার কথা বলে নূর আলী নামের এক দালাল আমাদের মানব পাচারকারীদের হাতে তুলে দেয়। পরে পাচারকারীদের কাছ থেকে জানতে পারি, তারা আমাদের দুজনকে এক লাখ টাকায় কিনেছে।’
তারা বলেন, ’প্রতিদিন চার-পাঁচজন করে নতুন মানুষ এনে সেখানে জড়ো করা হতো। কেউ কথা বলতে চাইলে তাকে ব্যাপক মারধর করা হতো। আমরাও পালানোর চেষ্টা করায় মারধরের শিকার হয়েছি। পরে আমাদের লোহার শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়।’
টেকনাফ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘পাহাড়ে মানব পাচারকারীদের আস্তানা থেকে উদ্ধার হওয়া ৫৬ জনকে থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে। তাদের পরিচয় ও অন্যান্য তথ্য যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।
এ ছাড়াও পাহাড়ে অভিযানের সময় গুলিতে সেনাসদস্য নিহতের ঘটনায় আইনগত প্রক্রিয়া চলছে বলেও জানান তিনি।
টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম অনীক চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, পাহাড়ে অবস্থানরত সশস্ত্র মানব পাচারকারীদের গ্রেপ্তারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কাজ করছে। অপরাধ করে কারও পার পাওয়ার সুযোগ নেই। মানববন্ধনের বিষয়েও আমরা খোঁজখবর রাখছি।
এমই
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

