কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক হ্রাসের দাবি

নানা সংকটে খুঁড়িয়ে চলছে জয়পুরহাটের পোলট্রি শিল্প

নানা সংকটে খুঁড়িয়ে চলছে জয়পুরহাটের পোলট্রি শিল্প
জামালগঞ্জে মুরগির প্রজনন ও উন্নয়ন খামার। ছবি: আমার দেশ

জয়পুরহাটে পোলট্রি শিল্পে ধস নেমেছে । নানা সমস্যায় পোলট্রি শিল্পে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। অবকাঠামোর অভাব এবং জনবলের ঘাটতি, পোলট্রি খাদ্যের দাম ক্রমাগত বৃদ্ধির কারণে পোলট্রি শিল্পে ধস নেমেছে । এতে খামারিদের ক্রমাগত লোকসান দিতে হচ্ছে। ফলে সেখানকার লাভজনক খামারগুলো লোকসান দিয়ে অলাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে । দেখা দিয়েছে এসব শিল্পে বন্ধ্যত্ব। টিকে থাকার লড়াইয়ে এখানকার অধিকাংশ পোলট্রি শিল্প এখন খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে। এতে করে সংকটে পড়েছেন খামারিরা।

জানা গেছে, আবহমান কাল থেকেই কৃষিনির্ভর জেলা জয়পুরহাট। দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম আলু উৎপাদনকারী অঞ্চল হিসেবেও সুনাম রয়েছে এ জেলার। তবে কৃষির পরেই এই জেলার অর্থনীতির সবচেয়ে বড় শক্তি হয়ে উঠেছে পোলট্রি খাত। স্বল্প আয়ের মানুষদের পুষ্টি চাহিদা মেটানোর সহজ খাত এটি। ১৯৩৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় জেলার আক্কেলপুর উপজেলাধীন জামালগঞ্জ সরকারি মুরগি প্রজনন ও উন্নয়ন খামার। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই প্রতিষ্ঠানটি জয়পুরহাট জেলা ও পার্শ্ববর্তী বগুড়া, গাইবান্ধা, রংপুর, দিনাজপুর, নীলফামারী এবং নওগাঁসহ সমগ্র উত্তরাঞ্চলে হাঁস-মুরগি পালনের আধুনিক প্রযুক্তি সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। সরকারি এই খামারটি উন্নত প্রজাতির মোরগ-মুরগির বাচ্চা উৎপাদন, বিতরণ এবং প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু রেখেছে। ১৯৯২-২০০৯ সাল পর্যন্ত তৎকালীন উপপরিচালক শাহ জামাল ক্রসের মাধ্যমে সোনালি মুরগির উদ্ভাবন ও প্রচলন শুরু করেন।

বিজ্ঞাপন

জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মহির উদ্দিন জানান, ‘জেলায় বর্তমান সোনালি মুরগির খামার-৩,৩৮০টি, ব্রয়লার মুরগির খামার-১,৩৩৫টি, লেয়ার মুরগির খামার-১,২৫০টি এবং হাঁসের খামার রয়েছে ১৯৪টি। বাচ্চা উৎপাদনের হ্যাচারি রয়েছে ৫৩টি। বর্তমানে ২ কোটি মুরগি রয়েছে। হ্যাচারিগুলোতে বছরে গড়ে প্রায় সাড়ে ছয় হাজার কোটি বাচ্চা উৎপাদিত হচ্ছে। জেলায় ফিড মিল রয়েছে ১১টি। যেখানে বছরে গড়ে ৩ লাখ ২১ হাজার টন খাদ্য উৎপাদিত হচ্ছে। সব মিলিয়ে এই খাতে বছরে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা লেনদেন হচ্ছে।’ স্থানীয় ও জাতীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগ সূত্রে জানা যায়, জনসংখ্যার প্রায় ৩০-৪০ ভাগ পোলট্রি খাতের সঙ্গে জড়িত। ফিডমিল, হ্যাচারি, খামার, কাঁচামাল, পরিবহন, মজুরি, টেকনিক্যাল সাইড, মুরগির বিষ্ঠা ক্রয়-বিক্রয় সব মিলিয়ে কর্মসংস্থান হয়েছে প্রায় ৩ লাখ ৬০ হাজার মানুষের। ২০০৬ সালে জামালগঞ্জ সরকারি খামারে হ্যাচারি স্থাপন করা হয়। তখন থেকেই বেশি পরিমাণে উৎপাদিত হচ্ছে সোনালি মুরগির বাচ্চা।

পোলট্রি ডেভেলপমেন্ট অফিসার মাহবুবুর রহমান আমার দেশকে বলেন, ‘মাসে ৪ বারে ১২-১৫ হাজার বাচ্চা উৎপাদিত হয় এই খামারে। এই খামার থেকে বছরে প্রায় ৫৫-৬০ লাখ টাকা রাজস্ব আয় হচ্ছে। চাহিদার তুলনায় এখানে উৎপাদন হচ্ছে অনেক কম। সে সুযোগে বেসরকারি পর্যায়েও গড়ে উঠেছে অসংখ্য হ্যাচারি। তারাই এখন বেশিরভাগ বাচ্চা সরবরাহ করছেন। আক্কেলপুর উপজেলা কর্মকর্তা আমিনুল ইসলাম জানান, ‘হ্যাচারি ব্যবসায় লাভবান হচ্ছেন খামারি উদ্যোক্তারা।

জানা যায়, সরকারি হ্যাচারিতে উৎপাদিত ১-২ দিনের বাচ্চা বিক্রি হচ্ছে ১৫-২০ টাকায়। সেখানে বেসরকারি হ্যাচারি থেকে উৎপাদিত ১-২ দিনের বাচ্চা বিক্রি হচ্ছে ৪৫-৫০ টাকায়। ৩৫ বিঘা জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত সরকারি এই খামারটি এখন নানা সমস্যায় জর্জরিত হয়ে পড়েছে। অবকাঠামোর অভাব এবং জনবলের ঘাটতির কারণে বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটিতে বেহাল দশা বিরাজ করছে। ১২টি শেড সংবলিত এই খামারের চারটি শেড সম্পূর্ণ পরিত্যক্ত। যেকোনো মুহূর্তে ছাদ ভেঙে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। অসংখ্য বাঁশের খুঁটি দিয়ে ছাদগুলো কোনোভাবে আটকিয়ে রাখা হয়েছে। পর্যাপ্ত শেড না থাকায় বর্তমানে মাত্র ছয় হাজার মুরগির সংকুলান হয়েছে। সরকারি এই খামারে যা চাহিদার তুলনায় অত্যন্ত কম।

উপপরিচালক ডা. ওয়ালী-উল-ইসলাম আমার দেশকে বলেন, ২০টি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র সাতজন। উপপরিচালক, পিডিওসহ তিনজন অফিসার রয়েছেন। ৪র্থ শ্রেণির ৯টি পদের সবকটিই শূন্য। কোনো কর্মচারীই নেই। একজন ড্রাইভার থাকলেও ইলেকট্রিশিয়ান নেই। বাইরে থেকে ভাড়াটে লোক এনে খামার পরিচর্যাসহ সব কাজ চালাতে হচ্ছে। জনবল সংকট এবং অবকাঠামো নির্মাণের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে বারবার চাহিদাপত্র দিয়েও কোনো কাজ হয়নি। যেহেতু নিয়োগ বন্ধ আছে, তাই ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষও জনবল সংকট মেটাতে পারছে না বলে তিনি জানান। অফিসারদের থাকার আবাসিক কোনো ব্যবস্থা নেই। নেই কোনো গবেষণার ব্যবস্থা।

উৎপাদন খরচ বৃদ্ধিতে চরম লোকসানের মুখে পড়েছেন প্রান্তিক ও বেসরকারি খামারিরা। তাদের ভাষায় উৎপাদন খরচ বেশি বিক্রয় মূল্য কম। তাদের অভিযোগ, পোলট্রি খাদ্যের দাম ক্রমাগত বাড়ছে। তৃণমূল খামারিরা বলছেন বিগত ৬ মাসে তিনবার খাদ্যের দাম বেড়েছে। প্রতি ৫০ কেজি বস্তায় সব কর্পোরেট কোম্পানি বাড়িয়েছে ১২৫ টাকা।

খাদ্য তৈরির কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক হ্রাস করলে বাজার স্থিতিশীল রাখা সহজ হবে বলে অভিজ্ঞ মহলের ধারণা। ৫০ কেজির বস্তা কিনতে হচ্ছে ৩,৬০০ টাকায়, যা আগে পাওয়া যেত দুই থেকে আড়াই হাজার টাকায়। বিভিন্ন ওষুধ এবং ভ্যাকসিনের দামও ঊর্ধ্বগতি। খামারিদের মতে মুরগি উৎপাদন খরচের ৭০ ভাগ ব্যয় হচ্ছে খাদ্যের পেছনে। ১ কেজি সোনালি মুরগির উৎপাদন খরচ ২৪০-২৪৫ টাকা। কিন্তু বিক্রি হচ্ছে ২৫০-২৮০ টাকায়।

বিদ্যুৎ ও পরিবহন খরচ, ভ্যাট-ট্যাক্স, কর্মচারীদের মজুরি বৃদ্ধি, সব মিলিয়েই বেকায়দায় বেসরকারি খামারিরা। তারা বলছেন বিদ্যুৎ বিল আগের তুলনায় প্রায় তিনগুণ বেশি।

খামারি কামারুজ্জামান রতন বলেন, ‘বাজারে অনেক সময় মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধের লেবেল পালটিয়ে নতুন মেয়াদ বসিয়ে বিক্রির ঘটনাও ঘটে। সেই সমস্ত ওষুধ ব্যবহার করে আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি। খাদ্য ও ওষুধসহ বিভিন্ন উপকরণের ক্রমাগত মূল্য বৃদ্ধির কারণে অসংখ্য প্রান্তিক খামারি ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন। বিপুল অঙ্কের টাকা ইতোমধ্যেই বিনিয়োগ করার কারণে এখান থেকে বের হয়েও আসতে পারছেন না অনেকেই। ইতোমধ্যেই অসংখ্য খামারি ব্যবসা গুটিয়ে ফেলেছেন।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন