ঈদুল আজহা যত ঘনিয়ে আসছে খামারিদের ব্যস্ততাও তত বাড়ছে। শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতিতে খামারিদের পাশাপাশি সময় দিচ্ছেন পরিবারের সদস্য ও স্বজনরাও। তাদের প্রত্যাশা, এবার কোরবানির বাজারে গরুর ন্যায্যমূল্য পাবেন খামারিরা। কোরবানিকে সামনে রেখে অনেকেই প্রাকৃতিক ও দেশীয় পদ্ধতিতে গরু লালনপালন ও মোটাতাজা করেছেন। শেষ সময়ে অতিরিক্ত লাভের আশায় পশুর পরিচর্যায় ব্যস্ত সময় পার করছেন তারা। কেউ ব্যাংক ঋণ নিয়ে, কেউ সঞ্চয়ে খামার গড়ে তুলেছেন। তবে গো-খাদ্য, ওষুধ ও পরিচর্যা ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় কোরবানির পশুর বাজারে কাঙ্ক্ষিত দাম পাবেন কি না, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় এখানকার খামারিরা।
দুর্গাপুর (নেত্রকোনা) প্রতিনিধি জানান, কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে নেত্রকোনার দুর্গাপুর উপজেলার ছোট-বড় গরুর খামারগুলোতে এখন ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন খামারিরা। সারা বছর যত্নে লালনপালন করা গরু বিক্রি করে লাভের মুখ দেখার স্বপ্ন দেখছেন তারা। ঈদ উপলক্ষে খামারগুলোতে চলছে বাড়তি পরিচর্যা, উন্নত খাবার সরবরাহ ও শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি।
উপজেলার গাঁওকান্দিয়া ইউনিয়নের নাওদারা গ্রামের খামারি হযরত আলী গড়ে এবার কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে তিনি প্রস্তুত করেছেন ২৬টি গরু। এরই মধ্যে ঢাকার বিভিন্ন পশুর হাটে ৯টি গরু ইতোমধ্যে বিক্রি করেছেন। বর্তমানে তার খামারে রয়েছে আরো ১৭টি গরু।
খামারটিতে প্রতিটি গরুকে বাজার উপযোগী করে তুলতে দেওয়া হচ্ছে বিশেষ খাবার। পাশাপাশি পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্য সুরক্ষার দিকেও রাখা হচ্ছে বাড়তি নজরদারি। ঈদের বাজারে ভালো দাম পাওয়ার আশায় এ বাড়তি যত্ন নেওয়ার উদ্যোগ খামারির।
খামারি হযরত আলী জানান, তার খামারে অস্ট্রেলিয়ান, পঙ্করাজ, ব্রাহামা, শাহীওয়াল ও নেপালি জাতের গরু রয়েছে। গরু জাত ও আকারভেদে প্রতিটির দাম তিন লাখ থেকে সাড়ে চার লাখ টাকা পর্যন্ত আশা করছেন তিনি। সব মিলিয়ে ৬০ থেকে লাখ টাকায় বিক্রির প্রত্যাশা রয়েছে তার। আশানুরূপ দাম পেলে ভবিষ্যতে খামার আরো বড় করার পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।
অপরদিকে সদর ইউনিয়নের চকলেঙ্গুরা এলাকার আজিজুল হকের খামারে রয়েছে ১৩টি গরু। কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে শেষ মুহূর্তের পরিচর্যায় ব্যস্ত সময় পার করছেন খামারের দুই সহযোগী। খামারের কর্মী রাশেদ মিয়া বলেন, সকাল থেকে রাত পর্যন্ত গরুগুলোর পেছনেই সময় দিচ্ছি। খাবার খাওয়ানো, গোসল করানোসহ সব ধরনের যত্ন নেওয়া হচ্ছে। আশা করছি, এবার গরুগুলোর ভালো দাম পাব।
উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. অমিত দত্ত বলেন, খামারিদের আগেই নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল যেন কোনো ক্ষতিকর ওষুধ ব্যবহার না করে প্রাকৃতিক উপায়ে গরু মোটাতাজাকরণ করা হয়। স্বাস্থ্যসম্মত ও নিরাপদ উপায়ে পশু প্রস্তুত করা হয়েছে।
বকশীগঞ্জ (জামালপুর) প্রতিনিধি জানান, জামালপুরের বকশীগঞ্জ উপজেলায় আসন্ন পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে কোরবানির পশু প্রস্তুত করতে ব্যস্ত সময় পার করছেন খামারিরা। উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন ও গ্রামাঞ্চলের ছোট-বড় প্রায় ১৫৮টি খামারে চলছে কোরবানির পশু গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া মোটাতাজাকরণ ও পরিচর্যার কাজ। বাজারে গোখাদ্য ভুসি ও ওষুধের দামের ঊর্ধ্বগতির মধ্যেও আশার আলো দেখছেন স্থানীয় খামারিরা। এছাড়া উপজেলাটি ভারতীয় সীমান্তবর্তী হওয়ায় অবৈধভাবে গরু প্রবেশ নিয়ে শঙ্কায় আছেন তারা। খামারিরা জানান, কয়েক মাস ধরে উন্নত খাবার, নিয়মিত পরিচর্যা ও চিকিৎসাসেবা দিয়ে গরুগুলো লালন-পালন করা হচ্ছে। কেউ কেউ দেশীয় পদ্ধতিতে প্রাকৃতিক খাবার ব্যবহার করে গরু মোটাতাজা করছেন। তবে গোখাদ্য ও ওষুধের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় উৎপাদন খরচ বেড়েছে বলে অভিযোগ করেন তারা।
উপজেলার একাধিক খামারি বলেন, আমরা অনেক আশা নিয়ে গরু পালন করছি। বাজারে ভালো দাম পেলে খরচ ওঠার পাশাপাশি কিছু লাভ হবে। সরকারিভাবে যদি আরো সহযোগিতা পাওয়া যায়, তাহলে খামার সম্প্রসারণ করা সম্ভব।
ধুনট (বগুড়া) প্রতিনিধি জানান, স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে খামারগুলোতে চলছে কোরবানির পশু লালন-পালন করার কর্মযজ্ঞ। খামার ও গ্রামীণ পরিবারে পালিত এসব পশুর মধ্যে রয়েছে—গরু, মহিষ, ছাগল ও ভেড়া। এ উপজেলায় কোরবানির পশুর চাহিদা রয়েছে ৬২ হাজার ২৪০টি। স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে অন্তত ৪ হাজার ১০০ পশু দেশের বিভিন্ন এলাকার কোরবানির পশুর হাটে পাঠানো সম্ভব হবে।
খামারিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বছরজুড়েই তারা কোরবানির বাজারকে কেন্দ্র করে প্রস্তুতি নিয়েছেন। কেউ ব্যাংক ঋণ নিয়ে, আবার কেউ পারিবারিক সঞ্চয় বিনিয়োগ করে খামার গড়ে তুলেছেন। গত বছরের তুলনায় এবার গো-খাদ্যের দাম অনেক বেড়েছে। প্রতি বস্তায় তিন থেকে চারশ টাকা বেশি গুনতে হচ্ছে। ফলে ষাঁড় মোটাতাজাকরণের ব্যয়ও বেড়েছে। সঠিক দামে পশু বিক্রি করতে পারলে লাভের আশা রয়েছে। তবে কোরবানির হাটে ভারতীয় গরু অবাধে ঢুকলে দেশীয় খামারিরা ন্যায্য দাম নাও পেতে পারেন। বর্তমানে সরিষার খৈল প্রতি কেজি ৪৮ থেকে ৫০ টাকা, গমের ভুসি ৫০ থেকে ৫৫ টাকা, ডাবলি ভুসি ৬০ থেকে ৬৫ টাকা এবং কাঁচা ঘাসের আঁটি ১০ থেকে ১৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তবে গো-খাদ্য, ওষুধ ও পরিচর্যা ব্যয় বেড়ে যাওয়ায়, দুশ্চিন্তায় রয়েছেন অনেকে। এতে গরু পালন আগের চেয়ে অনেক বেশি ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এ উপজেলায় কোরবানিযোগ্য ৬৬ হাজার ৩৪০টি পশু প্রস্তুত আছে। ধুনটে নিজ উপজেলার চাহিদা মিটিয়েও উদ্বৃত্ত থাকবে কোরবানির পশু। যা উপজেলার চাহিদার চেয়ে অনেক বেশি।
ধুনট উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. রেহানা খাতুন বলেন, এ বছর কোরবানির পশুর কোনো সংকট হবে না।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


ফতুল্লায় গ্যাস বিস্ফোরণ, নিভে গেল একই পরিবারের ৫ প্রাণ