কুমিল্লায় এইডসে পাঁচ মাসে সাতজনের মৃত্যু

এম হাসান, কুমিল্লা

কুমিল্লায় এইডসে পাঁচ মাসে সাতজনের মৃত্যু

চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসে কুমিল্লায় এইডসে আক্রান্ত হয়ে সাতজনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নতুন করে এইচআইভি সংক্রমিত হিসেবে শনাক্ত হয়েছেন আরো ৩৭ জন। স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্টদের মতে, জেলায় এইচআইভি সংক্রমণের হার ধীরে ধীরে বাড়ছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এইচআইভি/এইডস এইচটিসি-এআরটি সেন্টারের তথ্যানুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত সাতজন এইডস রোগীর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে জানুয়ারিতে দুজন, মার্চে একজন, এপ্রিলে একজন এবং মে মাসে তিনজন মারা যান।

বিজ্ঞাপন

এইচআইভি/এইডস এইচটিসি-এআরটি সেন্টারের কাউন্সেলর কাম অ্যাডমিন আরিফ হাসান জানান, সবশেষ গত ২৫ মে ২১ বছর বয়সি বিবাহিত এক যুবকের মৃত্যু হয়। এর আগে ১৩ মে ৪৯ বছর বয়সি একজন এবং ৮ মে ৩৫ বছর বয়সি আরেক ব্যক্তি মারা যান। মৃতদের সবাই কুমিল্লা জেলার বাসিন্দা।

সেন্টার সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে কুমিল্লা জেলায় ৩৮৫ জন এইচআইভি সংক্রমিত ব্যক্তি নিয়মিত চিকিৎসা নিচ্ছেন। চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসে কুমেক এআরটি সেন্টারে ৬৭২ জনের নমুনা পরীক্ষা করা হয়। এর মধ্যে ৩৭ জনের শরীরে এইচআইভি সংক্রমণ শনাক্ত হয়। নতুন শনাক্তদের মধ্যে চারজন একই সঙ্গে যক্ষ্মা (টিবি) ও এইচআইভিতে আক্রান্ত।

স্বাস্থ্যকর্মীরা জানান, নতুন শনাক্ত হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ ও সংক্রমণ উৎসের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। শনাক্তদের মধ্যে পাঁচজন পুরুষ যৌনকর্মী, ১৮ জন পুরুষের সঙ্গে পুরুষের যৌন সম্পর্কের ইতিহাস রয়েছে, তিনজন বৈবাহিক সম্পর্কের মাধ্যমে সংক্রমিত এবং দুজন বিদেশে অবস্থানকালে আক্রান্ত হন। এছাড়া একজন নারী যৌনকর্মীর মাধ্যমে সংক্রমিত হয়েছেন এবং দুজন সাধারণ জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। বাকি ছয়জনের সংক্রমণ সম্পর্কিত তথ্য এখনো চূড়ান্তভাবে হালনাগাদ করা হয়নি।

সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এইচআইভি আক্রান্ত ব্যক্তিদের পরিচয় ও ব্যক্তিগত তথ্য কঠোর গোপনীয়তার সঙ্গে সংরক্ষণ করা হয় এবং চিকিৎসা কার্যক্রমও সে নীতিমালা অনুসরণ করে পরিচালিত হয়।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৯ সাল থেকে ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এআরটি সেন্টারে মোট ছয় হাজার ৬৪৬টি এইচআইভি পরীক্ষা সম্পন্ন হয়। এসব পরীক্ষায় ২৭৮ জন এইচআইভি আক্রান্ত ব্যক্তি শনাক্ত হন। তাদের মধ্যে ৪০ জন একই সঙ্গে টিবিতেও আক্রান্ত ছিলেন।

বর্তমানে এআরটি সেন্টারের আওতায় চিকিৎসা গ্রহণকারীর সংখ্যা ৬১৫ জন। ২০১৯ সাল থেকে এ পর্যন্ত এইডসজনিত কারণে মোট ৪৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন কারণে চিকিৎসা কার্যক্রম থেকে বিচ্ছিন্ন রয়েছেন ১৩ রোগী।

সংক্রমণের হার বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বছরভিত্তিক শনাক্তের সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০১৯ সালে ২২৬টি পরীক্ষায় ১৫ জন, ২০২০ সালে ৩১১টি পরীক্ষায় আটজন, ২০২১ সালে ৪৯৮টি পরীক্ষায় ১৪ জন, ২০২২ সালে ৭৮৬টি পরীক্ষায় ২১ জন, ২০২৩ সালে এক হাজার ২৩০টি পরীক্ষায় ৪৮ জন, ২০২৪ সালে এক হাজার ৪৮১টি পরীক্ষায় ৫৮ জন এবং ২০২৫ সালে এক হাজার ৪৪২টি পরীক্ষায় ৭২ জন এইচআইভি পজিটিভ শনাক্ত হন। চলতি বছরের মাত্র পাঁচ মাসে ৬৭২টি পরীক্ষায় ৩৭ জনের সংক্রমণ ধরা পড়ে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এইচআইভি সংক্রমণ প্রতিরোধে সচেতনতা বৃদ্ধি, ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ সম্পর্কে সঠিক তথ্য প্রচার, নিরাপদ যৌন আচরণ নিশ্চিত করা এবং সহজলভ্য পরীক্ষা ও চিকিৎসাসেবা সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। সময়মতো শনাক্তকরণ ও নিয়মিত চিকিৎসা গ্রহণ করলে এইচআইভি আক্রান্ত ব্যক্তিরা দীর্ঘদিন সুস্থ জীবনযাপন করতে পারেন বলেও তারা উল্লেখ করেন।

কুমিল্লার সিভিল সার্জন ডা. আলী নূর মোহাম্মদ বশির আমার দেশকে বলেন, এইচআইভি/এইডস নিয়ে আমরা প্রতি মাসেই সচেতনতামূলক সভা-সেমিনার করছি। এখন থেকে আরো বৃদ্ধি করা হবে। কোন ধরনের কার্যক্রম করলে এসব রোগ হয়, এগুলো নিয়েও উপজেলা এবং জেলা পর্যায়ে সেমিনারে আলোচনা করা হচ্ছে ।

নগরীর বিশিষ্টজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এ রোগের জন্য কয়েকটি বিষয় মাথায় নিয়ে প্রশাসনকে কাজ করতে হবে । এর জন্য আবাসিক হোটেলে দেহ ব্যবসাকে দায়ী করছেন কেউ কেউ। কুমিল্লা নগরীর আবাসিক হোটেল এবং মধ্যরাত পর্যন্ত গোমতী নদীর পাড়ে রাতের বেলা তরুণ-তরুণীদের অবৈধ মেলামেশা নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে ।‌

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন