পদ্মার চরাঞ্চল এখন আইনের চোখ ফাঁকি দিয়ে গড়ে ওঠা ভয়াবহ বন্দুকযুদ্ধের ময়দান। রাজশাহী, নাটোর, পাবনা ও কুষ্টিয়ার বিস্তীর্ণ এই চর এলাকা ক্রমেই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। বালুমহাল ও চর দখল এবং আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা একাধিক সশস্ত্র গোষ্ঠীর দাপটে পুরো অঞ্চল পরিণত হয়েছে আতঙ্কের জনপদে।
দিনের আলোয় প্রকাশ্যে স্পিডবোটে অস্ত্রের মহড়া, ড্রোনের সহায়তায় অবস্থান শনাক্ত করে গুলি ও প্রকাশ্যে চাঁদাবাজি এখন চরবাসীর নিত্যদিনের বাস্তবতা। এমন পরিস্থিতিতে উদ্বেগ ও আতঙ্কে দিন পার করছেন চরাঞ্চলের বাসিন্দারা। চরম নিরাপত্তা শঙ্কার কথা জানিয়েছেন অনেকে।
গত মঙ্গলবার বিকালে রাজশাহীর বাঘা, নাটোরের লালপুর ও কুষ্টিয়ার দেলৗতপুর সীমান্তবর্তী পদ্মার চরজাজিরা এলাকায় দুর্বৃত্তদের গুলিতে নিহত হন বালুমহালের ম্যানেজার আজিজুল হাকিম (৩৫)। আজিজুল নাটোরের বাগাতিপাড়া উপজেলার হিজলি পাবনাপাড়া গ্রামের আব্দুল শেখের ছেলে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, মঙ্গলবার সকালে কয়েকটি স্পিডবোটে ছয়-সাতজন অস্ত্রধারী চর এলাকায় আসে। তাদের একটি স্পিডবোটের ওপর ড্রোন ক্যামেরা উড়তে দেখা যায়। তারা আকাশে ড্রোন উড়িয়ে ভুক্তভোগীর অবস্থান খোঁজ করছিল। এরপর এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়তে থাকে। পরে আজিজুলকে তুলে নিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয়।
ঈশ্বরদীর লক্ষ্ণীকুণ্ডা নৌ পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ খন্দকার শফিকুল ইসলাম জানান, বাঘার হবিরচর এলাকায় বালুমহালকে কেন্দ্র করে দুপক্ষের মধ্যে গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। পরে চরজাজিরা এলাকা থেকে একটি স্পিডবোটে আজিজুলের লাশ পাওয়া যায়। নিহতের বাঁ চোখের ওপর গুলি লাগার চিহ্ন রয়েছে। গুলি মাথা ভেদ করে বেরিয়ে গেছে।
বাঘা থানার ওসি সেরাজুল হক জানান, প্রশাসনের কাছে পদ্মার চরাঞ্চলে সক্রিয় অন্তত ১১টি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর তথ্য রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছেÑকাঁকন, মণ্ডল, টুকু, সাঈদ, লালচাঁদ, রাখি, শরীফ কাইগি, রাজ্জাক, চল্লিশ, বাহান্ন এবং সুখচাঁদ-নাহারুল বাহিনী।
বর্তমানে সবচেয়ে আলোচিত নাম ‘কাঁকন বাহিনী’। হাসানুজ্জামান কাঁকন নামে এক ব্যক্তির নেতৃত্বে এই বাহিনী রাজশাহীর বাঘা, চারঘাট, নাটোরের লালপুর, পাবনার ঈশ্বরদী ও কুষ্টিয়ার দেলৗতপুরের বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, বালুমহাল নিয়ন্ত্রণ, জমি দখল, চাঁদাবাজি, স্পিডবোট ছিনতাই এবং সশস্ত্র মহড়ার মাধ্যমে তারা দীর্ঘদিন ধরে আধিপত্য বিস্তার করে আসছে।
স্থানীয় বাসিন্দা, ভুক্তভোগী পরিবার এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন সূত্র বলছে, আজিজুল হাকিম হত্যাকাণ্ড কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। ২০২৫ সালের শুরু থেকে বালুমহাল ও চর দখলকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ, গোলাগুলি ও সন্ত্রাসী হামলায় ব্যাপক হতাহতের ঘটনা ঘটে। ওই সব ঘটনার একাধিক মামলায় কাঁকন বাহিনী ও প্রতিদ্বন্দ্বী গ্রুপগুলোর নাম উঠে এসেছে।
পুলিশ ও নৌ পুলিশের সূত্র জানায়, কাঁকন বাহিনীকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন থানায় অন্তত ছয়টি মামলা হয়েছে। যৌথবাহিনীর অভিযানে বাহিনীটির অন্তত ১৫-২০ সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অস্ত্র, গুলি, নগদ অর্থ ও অন্যান্য আলামতও উদ্ধার হয়েছে। কিন্তু বাহিনীর শীর্ষ নেতৃত্ব এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। কাঁকন গ্রেপ্তার হচ্ছে না কেনÑএমন প্রশ্ন এখন ঘুরপাক খাচ্ছে চরবাসীর মনে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, চার জেলার বিস্তীর্ণ দুর্গম চরাঞ্চল, নদীপথনির্ভর যোগাযোগব্যবস্থা এবং প্রশাসনিক সীমারেখার জটিলতার কারণে অভিযান পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়ে। অপরাধীরা দ্রুত অবস্থান পরিবর্তন করে এবং এক জেলার চর থেকে অন্য জেলার চরে চলে যাওয়ার সুযোগ পায়।
ভেড়ামারা-দেলৗতপুর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার দেলোয়ার হোসেন জানান, সবশেষ সংঘর্ষে শতাধিক গুলি ছোড়ার তথ্য পাওয়া গেছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, আধুনিক ভারী অস্ত্র, বিশেষ করে একে-৪৭ ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে। বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে।
আজিজুল হাকিম হত্যাকাণ্ডের পর পদ্মার চরাঞ্চলের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে নড়েচড়ে বসেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, রাজশাহী ও খুলনা রেঞ্জ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা যেথৗভাবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন। চার জেলার বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলে সক্রিয় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে সমন্বিত অভিযান পরিচালনার পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।
এর আগে ‘অপারেশন ফার্স্ট লাইট’ নামে বিশেষ অভিযানে পুলিশ, র্যাব ও এপিবিএন সদস্যরা ৫৮ জনকে গ্রেপ্তার করেন। উদ্ধার হয় ১০টি আগ্নেয়াস্ত্র। কিন্তু স্থানীয়দের দাবি, শুধু বিচ্ছিন্ন অভিযান নয়; বরং দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং চার জেলার সমন্বয় ছাড়া পদ্মার চরাঞ্চলে শান্তি ফিরবে না।
গুলির শব্দে ঘুম ভাঙে চরবাসীর
আজিজুল হাকিম হত্যাকাণ্ডের পর চরাঞ্চলের সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলে ভয়াবহ বাস্তবতার চিত্র ফুটে ওঠে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক চরবাসী বলেন, সন্ধ্যার পর নদীপথে চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। অনেক এলাকায় কৃষকরা জমিতে যেতে সাহস পান না। গরু চরানো, মাছ ধরা কিংবা ফসল ঘরে তোলার ক্ষেত্রেও বিভিন্ন গোষ্ঠীকে চাঁদা দিতে হয়।
স্থানীয় এক কৃষক বলেন, আমরা বন্দুকের আওয়াজ শুনে ঘুমাই আবার গুলির শব্দে জাগি। কখন কোথায় গুলি শুরু হবে, কেউ জানি না।
স্থানীয় প্রবীণদের মতে, প্রায় দুই দশক আগে পদ্মার চরাঞ্চলে পান্না বাহিনী ও লালচাঁদ বাহিনীর রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে বহু মানুষ নিহত হয়েছিলেন। পরে অভিযানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোয় নতুন করে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর উত্থান ঘটেছে। বালু ও চরের জমিকে কেন্দ্র করে বিপুল অর্থনৈতিক স্বার্থ, রাজনৈতিক আশ্রয় ও ভৌগোলিক দুর্গমতাই তাদের টিকে থাকার মূল কারণ।
রাজশাহী রেঞ্জ নৌ পুলিশের সুপার মোহাম্মদ সোহেল রানা জানান, আজিজুল হাকিম হত্যার ঘটনায় তদন্ত চলছে। জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হবে।
রাজশাহী, নাটোর, পাবনা ও কুষ্টিয়ার সংযোগস্থলে বিস্তৃত পদ্মার চর এখন শুধু একটি ভৌগোলিক অঞ্চল নয়, এটি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। বালুমহালের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বী গোষ্ঠীগুলোর সংঘর্ষে একের পর এক প্রাণ ঝরছে, আতঙ্কে দিন কাটছে হাজারো মানুষের। চরবাসী পুরো অঞ্চলের সশস্ত্র আধিপত্যের অবসান চান।
চরের বাসিন্দারা বলেন, একজন যায়, আরেকজন আসে কিন্তু বন্দুকের রাজত্ব শেষ হয় না। আজিজুল হাকিমের রক্তাক্ত লাশ উদ্ধার সে সংকটকেই আবার সামনে এনেছে। প্রশাসনের ঘোষিত যৌথ অভিযান ও কঠোর অবস্থান বাস্তবে পদ্মার চরে শান্তি ফিরিয়ে আনে কি না, সেটা দেখার অপেক্ষায় চর এলাকার বাসিন্দারা।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

