দখল-দূষণে অস্তিত্ব সংকটে তিতাস নদী

মফিজুর রহমান লিমন, ব্রাহ্মণবাড়িয়া

দখল-দূষণে অস্তিত্ব সংকটে তিতাস নদী
অবৈধ দখল ও বালু দিয়ে নদী ভরাটে হুমকির মুখে নদীর অস্তিত্ব। ছবি: আমার দেশ

একসময় কূলজোড়া পানি আর বুকভরা ঢেউ ছিল তিতাসে। এই নদীকে ঘিরেই রচিত হয়েছিল অমর কথাসাহিত্যিক অদ্বৈত মল্লবর্মণের ‘তিতাস একটি নদীর নাম’। অথচ সেই নদীতে এখন আর কূলভরা পানি কিংবা পাড়ভাঙা ঢেউ নেই। কয়েক দশকের দখল-দূষণে নদীটি এখন প্রায়মৃত। গভীর খনন না হওয়ায় দিন দিন সংকুচিত হয়ে হারিয়েছে নাব্য। যদিও এ নদীকে ঘিরেই একসময় সমৃদ্ধ ছিল ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ব্যবসা-বাণিজ্য, কৃষিসহ স্থানীয় অর্থনীতি।

সরেজমিনে নদীর বিভিন্ন পয়েন্ট ঘুরে দেখা যায়, নদীর পানির চার পাশ কচুরিপানায় ভরপুর। নদীর দুই পাড় ঘিরে অবৈধ দখল, বিভিন্ন অংশে ময়লা-আবর্জনার স্তূপ। বিভিন্ন পয়েন্টে নদীর পাড় বালু দিয়ে ভরাট করা হয়েছে। ময়লা-আবর্জনায় দূষণ, অবৈধ দখল ও কচুরিপানার কারণে হুমকির মুখে নদীর অস্তিত্ব।

বিজ্ঞাপন

বিশেষ করে ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌর শহরের আনন্দ বাজার, মেড্ডা বাজার, বাঁশ বাজার ও কারখানা ঘাটসহ তীরবর্তী এলাকাজুড়ে বাসাবাড়ি এবং বাজারের বিভিন্ন ময়লা-আবর্জনাসহ পশুর বর্জ্য ফেলে রাখা হয়েছে। বর্জ্য পরিশোধনের ব্যবস্থা না থাকায় বছরের পর বছর ধরে পরিবেশ নষ্ট হলেও সংশ্লিষ্টরা কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না। দিনের পর দিন পৌরসভা থেকে এসব বর্জ্য পরিষ্কার না করায় আবর্জনা পচেগলে নদীর পানিতে মিশছে। এতে নদীর পানিও বিষাক্ত হয়ে উঠছে। তাই হুমকির মুখে জনস্বাস্থ্য। একইসঙ্গে নদীতে পানির প্রবাহ না থাকায় নৌচলাচলেও ব্যাঘাত ঘটছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, একসময় মানুষ তিতাস নদীর সৌন্দর্য উপভোগ করতে পাড়ে ভিড় করত। আর এখন ময়লার সয়লাবে চলাফেরা করাই দায়। আনন্দ বাজারে একটি ঐতিহ্যবাহী নৌঘাট রয়েছে। ঘাটটিতে আবর্জনার দুর্গন্ধে চলাফেরা করতে ভীষণ সমস্যা হচ্ছে। তাদের দাবি, দূষণের হাত থেকে পরিবেশকে রক্ষায় দ্রুত সংশ্লিষ্টদের এগিয়ে আসতে হবে।

এ সময় কথা হলে শহরের গোকর্ণঘাট এলাকার জতীন্দ্র দাস বলেন, তিতাস নদীর করুণ দশা দেখে খুব কষ্ট পাই। একসময় এই নদীর ভরা জলে মাছ ধরে আমাদের জেলেপাড়ার জীবন-জীবিকা নির্বাহ হতো। অথচ এখন নদীতে আর আগের মতো পানি নেই, মাছও নেই। আমাদের নতুন প্রজন্ম বেড়ে ওঠার জন্য তিতাসের আঁচল আর খুঁজে পায় না।

আনন্দ বাজার এলাকার খুরশেদ মিয়া বলেন, শহরের অধিকাংশ ড্রেনের ময়লা পানি এই নদীতে মিশছে। এছাড়া নদীর তীরগুলো হয়ে উঠেছে বর্জ্যের স্তূপ। যে যার মতো নদীর বিভিন্ন অংশ দখল করে নিচ্ছে। শুনেছি প্রশাসন থেকে তালিকা করা হয়েছে। তবে এখনো তেমন উচ্ছেদ অভিযান দেখা যায়নি। আমরা চাই নদীটি আবারও খনন করে এর পানিপ্রবাহের ধারা ফিরিয়ে আনা হোক।

জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আকাশ দত্ত বলেন, একদিকে দখলদারিত্বের মনোভাব, অন্যদিকে ময়লা-আবর্জনায় অব্যবস্থাপনার কারণে তিতাস নদীর শহরের অংশের করুণ অবস্থা বিরাজ করছে। ২০২৩ সালে ১১০ কিলোমিটারের মধ্যে ৯০ কিলোমিটার খনন করা হয়েছিল। তৎকালীন সময়ে নদীর নাব্য বেশি থাকায় প্রকল্প পরিকল্পনা থেকে একটি সমীক্ষার মাধ্যমে নদীর শহরের অংশটিকে খনন থেকে বাদ দেওয়া হয়েছিল। কীভাবে নদীর শহরের অংশটিকে বাঁচানো যায়—এ বিষয়ে আমরা সমন্বিত প্রকল্প গ্রহণ করব। এছাড়া নদীর অবৈধ দখল উচ্ছেদে সমন্বিত কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে।

বিআইডব্লিউটিএর আশুগঞ্জ-ভৈরব বাজার নদীবন্দরের কর্মকর্তা নাহিদ হোসেন বলেন, নদীর বর্তমান চিত্র যাচাইয়ে আমরা তিতাস নদীর বিভিন্ন পয়েন্ট পরিদর্শন করেছি। নদীর দখল ও দূষণের দৃশ্য দেখে ব্যথিত হয়েছি। এরকম একটি নদী আজ মৃতপ্রায়। নদীটিকে রক্ষায় সিএস অনুসারে নদীর সীমানা নির্ধারণ করে অবৈধ দখল উচ্ছেদ করা হবে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা প্রশাসক শারমিন আক্তার জাহান বলেন, দূষণ বন্ধে আমাদের অনেক কাজ করতে হবে।

আগে সিএস নকশা অনুসারে নদীর সীমানা নির্ধারণ করতে হবে। নদীর দুই পাড়ে প্রচুর স্থাপনা দেখতে পেয়েছি। শতকরা ৯০ ভাগই নদীর জায়গায়, অবৈধ স্থাপনা। এসবের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন