পাহাড়ি ঢল আর অতিবৃষ্টিতে নিম্নাঞ্চলে দেখা দিয়েছে বন্যা। তলিয়ে গেছে কৃষকের ফসল। এতে দিশাহারা হয়ে পড়েছেন কৃষক। সরকারিভাবে তারা সহযোগিতাও পাচ্ছেন না।
সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, বৃষ্টি কমে যাওয়ায় ধান কাটা ও শুকাতে বেড়েছে কৃষকের ব্যস্ততা। ঝলমলে রোদে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছিলেন হাওরের কৃষক সমিরণ শর্মা। তিনি বলেন, আমি সাত কেদার জমির বোরো ধান কেটেছি। আরো পাঁচ কেদার জমি পানির নিচে রয়ে গেছে। চার আনা ধানে অংকুর এসে নষ্ট হয়ে গেছে। টানা কদিন রোদ থাকায় বাকি ধান শুকাতে পেরেছি।
বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার কৃষি কর্মকর্তা মো. আসাদুজ্জামান জানান, খরচার হাওরে তিন হাজার হেক্টর জমি আবাদ করা হয়েছে। বেশিরভাগ ধান কাটা হয়েছে। কিছু ধান বৃষ্টিতে ভিজে নষ্ট হয়েছে। রোদ ওঠায় কৃষকরা এখন স্বস্তিতে আছেন।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ওমর ফারুক জানান, হাওরাঞ্চলের কৃষকরা দ্রুতগতিতে ধান কাটছেন।
জেলা প্রশাসক সমর কুমার পাল বলেন, হাওরে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের তালিকা করা শুরু হয়েছে। ৪০০ কৃষককে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে। পর্যায়ক্রমে এ সহায়তা প্রত্যেক উপজেলায় দেওয়া হবে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি জানান, অনুকূল আবহাওয়া ও ভারী বৃষ্টিপাত না হওয়ায় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে মেদির হাওরসহ বিভিন্ন হাওরে টানা কয়েক দিনের ভারী বর্ষণে অন্তত ৩০৫ হেক্টর বোরো ধানের জমি পানির নিচে তলিয়ে আছে।
নাসিরনগর উপজেলা কৃষি বিভাগ জানায়, নাসিরনগরের হাওরে চলতি বোরো মৌসুমে ১১ হাজার হেক্টর জমিতে ধানের আবাদ করা হয়। তবে আগাম পানি আসার আগেই ৭০ শতাংশ ধান কাটা হয়। পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় বর্তমানে প্রায় ৩০৫ হেক্টর ধানি জমি পানিতে নিমজ্জিত রয়েছে।
গাইবান্ধা প্রতিনিধি জানান, গাইবান্ধা জেলায় দফায় দফায় কয়েক দিনের বৃষ্টিতে ক্রমেই তলিয়ে যাচ্ছে জেলার নদীবেষ্টিত নিম্নাঞ্চলের ধানক্ষেত। শ্রমিক সংকটে ধান কাটতে পারছেন না কৃষকরা। এতে বিপাকে পড়েছেন তারা। তাই ব্যস্ত সময় পার করছেন গাইবান্ধার কৃষকরা। এবার এক মণ ধান বিক্রি করেও মিলছে না একজন শ্রমিকের মজুরি।
গাইবান্ধা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক রোস্তম আলী জানান, এ বছর বোরো ধান চাষের লক্ষ্যমাত্র নির্ধারণ করা হয়েছে এক লাখ ২৯ হাজার ২০ হেক্টর। ইতোমধ্যে বিভিন্ন জাতের ধান কাটা শুরু হয়েছে।
কালীগঞ্জ (ঝিনাইদহ) প্রতিনিধি জানান, ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলায় পুরোদমে শুরু হয়েছে বোরো ধান কাটা । বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে এখন পাকা বোরো ধানের সোনালি সমারোহ। দুলছে ধানের শীষ। কৃষকের চোখে ছিল স্বপ্ন আর স্বস্তির ঝিলিক। কিন্তু সে আনন্দের মাঝেই দেখা দিয়েছে গভীর উৎকণ্ঠা। টানা বৈরী আবহাওয়ায় পাকা ধান এখন পড়েছে বড় ঝুঁকিতে। গত কয়েক দিনের লাগাতার কালবৈশাখী, বজ্রপাত ও ভারী বৃষ্টিতে ঝিনাইদহ জেলার বিভিন্ন এলাকার মাঠে পড়ে থাকা ধান মারাত্মক ক্ষতির আশঙ্কায় রয়েছে। তবে শ্রমিক সংকটে ধান কাটা নিয়ে বিপাকে পড়েছেন কৃষক। দ্বিগুণ মজুরি দিয়েও শ্রমিক মিলছে না। পুরুষের পাশাপাশি নারীরা সমানতালে ধান কাটা ও মাড়াইয়ের কাজে অংশ নিচ্ছেন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি বোরো মৌসুমে জেলায় ধান চাষের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৯০ হাজার ২৮০ হেক্টর জমি। তবে তা ছাড়িয়ে আবাদ হয়েছে ৯০ হাজার ২৯১ হেক্টর। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে তিন লাখ ৯৯ হাজার ৮৬ টন চাল। কিন্তু মৌসুমের শেষ সময়ে এসে প্রতিকূল আবহাওয়া কৃষকদের দুশ্চিন্তা বাড়িয়ে দিয়েছে।
ঝিনাইদহ সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নূর-এ-নবী জানান, ৬ মে পর্যন্ত মাত্র ২০ হাজার ৮০১ হেক্টর জমির ধান কাটা সম্ভব হয়েছে, যা মোট আবাদি জমির ২০ শতাংশ। অর্থাৎ এখনো প্রায় ৮০ শতাংশ ধান মাঠেই রয়েছে।
ঝিনাইদহ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কামরুজ্জামান বলেন, এবার ধানের ফলন ভালো হয়েছে। বড় কোনো দুর্যোগ না হলে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করছেন।
গফরগাঁও (ময়মনসিংহ) প্রতিনিধি জানান, ময়মনসিংহের গফরগাঁও উপজেলাজুড়ে বোরো ধানের শীষ বের হওয়ার আগ মুহূর্তে দেখা দেয় কালবৈশাখী। এর কয়েক দিন পর শুরু হয় শিলাবৃষ্টি। এতে উপজেলার ১৫ ইউনিয়নেই পাকা ও আধাপাকা ধানের ব্যাপক ক্ষতি হয়। শিলাবৃষ্টিতে অনেক কৃষকের পুরো ধান পড়ে যায়। এখন অবিরাম বৃষ্টি হচ্ছে। এ বৃষ্টিই যেন কৃষকের চোখের অশ্রু হয়ে ঝরছে এখন। হাজারো স্বপ্নের সোনালি ফসল এখন পানির নিচে তলিয়ে আছে। এ যেন স্বপ্নের অপমৃত্যু।
গফরগাঁও উপজেলা কৃষি অফিসার কৃষিবিদ শাকুরা নান্মী জানান, এবার বোরোর আবাদ ভালো হলেও ঝড়, শিলাবৃষ্টি ও টানা বৃষ্টিতে উপজেলার ২২২ হেক্টর জমির ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
বেতাগী (বরগুনা) প্রতিনিধি জানান, উপকূলীয় জনপদ বরগুনার বেতাগীতে টানা বৃষ্টিপাতের কারণে ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। গত কয়েক দিন ধরে অবিরাম বর্ষণে মাঠের ফসল পানির নিচে তলিয়ে গেছে। ফলে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন কৃষকরা। চলতি মৌসুমে এই উপজেলায় সাত হাজার হেক্টর জমিতে বোরো ধান ও শাকসবজি চাষ করা হয়েছে।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, গত এক সপ্তাহ ধরে টানা বৃষ্টিতে আমন ধান, শাকসবজি, মুগডাল, বাদাম, মরিচসহ বিভিন্ন মৌসুমি ফসল সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেক ক্ষেতে পানি জমে থাকায় গাছ পচে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা অনিমেষ বালা বলেন, টানা বর্ষণে চলতি মৌসুমে বেতাগী উপজেলায় প্রায় সাত হাজার হেক্টর জমির বোরো ধান ও শাকসবজির ব্যাপক ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
কেন্দুয়া (নেত্রকোনা) প্রতিনিধি জানান, অকাল কালবৈশাখী ও টানা বর্ষণে দিশাহারা হয়ে পড়েছেন হাজারো কৃষক। কৃষি বিভাগের তথ্যানুযায়ী, কেন্দুয়া উপজেলায় চলতি মৌসুমে দুই হাজার ৫৬০ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ করা হয়। কিন্তু নানা প্রতিকূলতায় এর প্রায় অর্ধেক জমির ফসল ঘরে তোলা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। মৌসুমের শুরুতেই বিএডিসি সরবরাহকৃত বীজের ত্রুটির কারণে ব্রি-৮৮ জাতের প্রায় ৩৭৫ হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়ে যায়। এরপর টানা বর্ষণ ও জলাবদ্ধতায় আরো প্রায় ৪০০ হেক্টর জমির ফসল পানির নিচে তলিয়ে গেছে।
নান্দাইল (ময়মনসিংহ) প্রতিনিধি জানান, ময়মনসিংহের নান্দাইলে চলতি বোরো মৌসুমে ৯৩৫ হেক্টর ধান চাষ করা হয়েছে। টানা ভারী বর্ষণ ও জলাবদ্ধতায় প্রায় ২০২ হেক্টর জমির বোরো ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে এবং ৭০৫ হেক্টর জমির ফসল আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়েছেন স্থানীয় কৃষকরা। শ্রমিক সংকটে ধান কাটা যাচ্ছে না বলেও কৃষকরা অভিযোগ করেছেন।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নাঈমা সুলতানা বলেন, অতিবৃষ্টি ও জলাবদ্ধতায় প্রায় ২০২ হেক্টর জমির ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে। এতে কৃষকের ক্ষতির পরিমাণ আনুমানিক ছয় কোটি ৮৬ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
গোমস্তাপুর (চাঁপাইনবাবগঞ্জ) প্রতিনিধি জানান, চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলায় উজান থেকে নেমে আসা ঢল আর টানা অতিবৃষ্টিতে কয়েক হাজার হেক্টর জমির ধান পানির নিচে তলিয়ে গিয়ে কৃষকদের মুখে নেমে এসেছে হতাশার ছায়া।
গোমস্তাপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সাকলাইন হোসেন জানান, ‘পানি দ্রুত নেমে গেলে কিছু ধান হয়তো রক্ষা করা সম্ভব। তবে দীর্ঘদিন পানি স্থায়ী হলে ক্ষতির পরিমাণ আরো বাড়বে।’
চিলমারী (কুড়িগ্রাম) প্রতিনিধি জানান, কুড়িগ্রামের চিলমারীতে টানা কয়েক দিনের বৃষ্টি ও রোদের অভাবে ভুট্টা চাষে বড় ধরনের বিপর্যয়ের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এ পরিস্থিতিতে উপজেলা কৃষি অফিস কৃষকদের করণীয় সম্পর্কে পরামর্শ দিচ্ছে। চিলমারী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কনক চন্দ্র রায় জানান, চলতি মৌসুমে ২ হাজার ৩২০ হেক্টর জমিতে ভুট্টা চাষ হয়েছে। ক্ষতি কমাতে মাঠপর্যায়ে কৃষকদের নিয়মিত পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে এবং ক্ষতিগ্রস্তদের প্রণোদনার আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

