ভূমি অধিগ্রহণ, ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ ও প্রশাসনিক জটিলতায় মাদারীপুরের শিবচর উপজেলায় দীর্ঘদিন ধরে থমকে আছে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ সেতুর নির্মাণকাজ। উপজেলার কুতুবপুর বাজার, চান্দেরচর ও কলাতলা-নিলখী সেতুর কাজ মাঝপথে বন্ধ থাকায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন আশপাশের বিভিন্ন ইউনিয়নের হাজারো মানুষ। এতে ব্যাহত হচ্ছে শিক্ষার্থীদের যাতায়াত, কৃষিপণ্য পরিবহন ও স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য। একই সঙ্গে নির্ধারিত সময়ে প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়া নিয়ে দেখা দিয়েছে চরম অনিশ্চয়তা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সেতুগুলোর কোনোটির নির্মাণের মেয়াদ পেরিয়ে গেলেও কাজ শেষ হয়নি। কোথাও নদীর মধ্যে শুধু পিলার দাঁড়িয়ে আছে, আবার কোথাও জমি অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণ না পাওয়ার অভিযোগে স্থানীয় জমির মালিকেরা নির্মাণকাজে বাধা দিচ্ছেন। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, জমি অধিগ্রহণ ও ক্ষতিপূরণের বিষয়টি নিষ্পত্তি না করেই নির্মাণকাজ শুরু করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন দপ্তরে যোগাযোগ করেও কোনো সমাধান মেলেনি। মূলত সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ের অভাবই এই সংকটকে দীর্ঘায়িত করছে।
শিবচরের গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ অবকাঠামোর একটি কুতুবপুর সেতু। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ২৯ কোটি ২৯ লাখ টাকা ব্যয়ে ২০২৩ সালের অক্টোবরে ৯০ মিটার দীর্ঘ এই সেতুর নির্মাণকাজ শুরু হয়। ২০২৫ সালের অক্টোবরে কাজের মেয়াদ শেষ হলেও এখন পর্যন্ত মাত্র ৪০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। ভূমি অধিগ্রহণসংক্রান্ত জটিলতা ও প্রশাসনিক অনিশ্চয়তার কারণে কাজ এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। ফলে স্থানীয়দের বিকল্প ঝুঁকিপূর্ণ পথ দিয়ে যাতায়াত করতে হচ্ছে।
অন্যদিকে চান্দেরচর এলাকায় প্রায় ১০ কোটি ৭৫ লাখ টাকা ব্যয়ে ৬৬ মিটার দীর্ঘ আরেকটি সেতুর কাজ ২০২৩ সালের নভেম্বরে শুরু হয়। ২০২৫ সালের মে মাসের মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত এর অগ্রগতি মাত্র ৫০ শতাংশ।
জমির ক্ষতিপূরণ না পাওয়া নিয়ে দীর্ঘদিন যাবৎ মামলা চলমান থাকায় এই অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। উমেদপুর, ভদ্রাসন, কুতুবপুর ও কাঁঠালবাড়ী ইউনিয়নের বাসিন্দাদের যোগাযোগের জন্য এই সেতুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্থানীয় ভ্যানচালক কামাল হোসেন জানান, বর্ষা মৌসুমে বিকল্প রাস্তায় পানি উঠে যাওয়ায় প্রায়ই এখানে দুর্ঘটনা ঘটে। জমির মালিক আলমগীর মৃধা বলেন, ‘আমরা চাই সেতু হোক, কিন্তু তার আগে আমাদের ন্যায্য ক্ষতিপূরণ বুঝিয়ে দেওয়া হোক।’
একইভাবে আড়িয়াল খাঁ নদের ওপর নির্মাণাধীন কলাতলা-নিলখী সেতুটিও ভূমি জটিলতায় অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। এলজিইডির তত্ত্বাবধানে প্রায় ৯৮ কোটি টাকা ব্যয়ে ৬৭০ মিটার দীর্ঘ এই সেতুর কাজ শুরু হয় ২০২৩ সালের অক্টোবরে। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরের মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও জমিসংক্রান্ত বিরোধে বর্তমানে কাজ বন্ধ রয়েছে। এর অগ্রগতি মাত্র ৩৫ শতাংশ। সেতুটি নির্মিত হলে শিবচর ও রাজৈর উপজেলার মধ্যে দূরত্ব উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসত।
ভুক্তভোগী আফজাল শিকদার জানান, সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সমন্বয়হীনতার কারণে কৃষিজীবী মানুষ তাদের জমির ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এলজিইডি জানিয়েছে, জমি অধিগ্রহণের প্রস্তাব ও কাগজপত্র জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে। তবে ভূমি অধিগ্রহণের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত হওয়ার আগেই নির্মাণকাজ শুরু করায় জমির শ্রেণি, মূল্য নির্ধারণ ও মালিকানাসংক্রান্ত এই জটিলতা তৈরি হয়েছে।
শিবচর উপজেলা প্রকৌশলী মো. ইমন মোল্লা বলেন, ‘ভূমি জটিলতার কারণে তিনটি সেতুর কাজ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। আমরা দ্রুত সমস্যা সমাধানের জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সঙ্গে সার্বক্ষণিক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।’
এ বিষয়ে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মুহাম্মদ আশরাফুল আলম বলেন, ‘জমির প্রকৃতি ও নদীর সীমানা নিয়ে কিছু জটিলতা রয়েছে। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ভূমি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। প্রক্রিয়াগুলোর নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত সব ক্ষেত্রে স্বাভাবিক গতিতে কাজ চালানো কঠিন।’
এদিকে স্থানীয়দের দাবি, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ঠিকাদারি ব্যবস্থাপনায় তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তাও প্রকল্পের অগ্রগতিতে কিছুটা প্রভাব ফেলেছে। এলাকাবাসীর দাবি, দ্রুত এই প্রশাসনিক জটিলতা নিরসন করে ন্যায্য ক্ষতিপূরণ প্রদান এবং সেতুগুলোর নির্মাণকাজ শেষ করে নিরাপদ যোগাযোগব্যবস্থা নিশ্চিত করা হোক।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

